চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর

চট্টগ্রামে একটা সারাদিন ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা যখন করেছিলাম, তখন জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটি আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না। বাতিঘর ঘুরে পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু দেখতে এসেছিলাম রাস্তার এপাশে। দেখি একটা পার্ক। নিলয় আমাকে সেদিকে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে বললো, ‘এখানে কিন্ত জিয়া জাদুঘর আছে। যাবি নাকি?’

পরিকল্পনার বাইরে থাকলেও সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি হলো না। জাতীয় জাদুঘরের অন্তর্ভুক্ত কোনো জাদুঘরই আমি না দেখে ছাড়বো না।

জাদুঘরটি যে ভবনে, সেটি খুবই সুন্দর। লাল টালির ছাত আর সাদা দালানের বাড়িটি আসলে একটি সার্কিট হাউজ। ভবনটি এতটা নান্দনিক দেখতে, ঠিক যেন বাংলাদেশী স্থাপনা বলে মনে হয় না। আসলেও তাই। ভালো করে খেয়াল করে বোঝা গেল, এটায় ইংরেজ আমলের স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি। ১৯১৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এটি তৈরি করেছিল।

প্রবেশ টিকিট; source : লেখিকা

এছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই ভবনটি পাক বাহিনীর টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বহু নিরপরাধ বাঙালিকে ধরে এনে পাক বাহিনী এখানে অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে। এত বছরের পুরনো হলেও, ভবনটি এখনও বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। ভবনের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে জিয়াউর রহমানের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে এই সার্কিট হাউজে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গুপ্ত হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জিয়ার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এখানে জাদুঘর করা হয়। জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে রাষ্ট্রপতি জিয়ার ব্যবহার করা ব্যক্তিগত সামগ্রী দিয়ে। প্রায় হাজারখানেক বস্তুগত নিদর্শন রয়েছে এখানে। এছাড়াও তিনি কী কী করেছিলেন তার বর্ণনা রয়েছে। ভবনটিতে জিয়াউর রহমানের উপর প্রকাশিত বিভিন্ন বই নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি পাঠাগারও। সেখানে রয়েছে অভিজাত একটি অডিটোরিয়াম।

সার্কিট হাউজের চূড়া; source : লেখিকা

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে মোট ১৭টি গ্যালারী। প্রথম গ্যালারীতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে। তার সৈনিক জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে। দ্বিতীয় গ্যালারীতে রয়েছে মেজর জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়। কালুরঘাটের বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল যে বেতার যন্ত্রে, সেটি সহ আরো নানান সামগ্রী স্থান পেয়েছে সেখানে।

তৃতীয় গ্যালারীটিতেও মুক্তিযুদ্ধ প্রাধান্য পেয়েছে। সেক্টর ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের নানা কর্মকাণ্ড ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি সেখানে ঠাঁই পেয়েছে।

চতুর্থ গ্যালারীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত রণ প্রস্তুতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

আবক্ষ ভাস্কর্য ; source : লেখিকা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান মুক্ত অঞ্চল হিসেবে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীতে একটি ডাকঘর স্থাপন করেন। পঞ্চম গ্যালারিতে রাখা আছে এই পোস্ট অফিস স্থাপনের নিদর্শন।

ষষ্ঠ গ্যালারিতে জিয়াউর রহমানের সৈনিক জীবনের নানা চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে জিয়াউর রহমানের সামরিক পোশাক, ব্যাগ, টুপি, ছড়িসহ আরো অনেক সামগ্রী।

সপ্তম গ্যালারিতে বিএনপির সূচনাকালে জিয়াউর রহমানের স্বহস্তে লেখা বিএনপির আদর্শ, উদ্দেশ্য সম্বলিত ম্যানিফেস্টো স্থান পেয়েছে। এছাড়া সেখানে আছে বিএনপির দলীয় পতাকা এবং মনোগ্রামের ছবি।

অষ্টম গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে জিয়াউর রহমানের বেশ কিছু বিরল ছবি। এগুলো এই জাদুঘর ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না।

নবম গ্যালারিটিতে সাজানো আছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের বঙ্গভবনে অফিস করাকালীন দৃশ্য। বঙ্গভবনে যে চেয়ার এবং টেবিলে বসে জিয়া প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই চেয়ার টেবিলও এ গ্যালারিতে রাখা হয়েছে।

লাল টালি; source : লেখিকা

বাংলাদেশের কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে খাল খনন কর্মসূচি চলাকালে জিয়াউর রহমান নিজেই খাল কাটায় অংশ নিয়েছিলেন। দশম গ্যালারিতে পুতুল দিয়ে গাঠনিক রূপে সেই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এগারো নম্বর গ্যালারিতে এ অঞ্চলের ৭টি দেশ নিয়ে গঠিত হওয়া সার্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার জন্য জিয়াউর রহমানই গড়ে তুলেছিলেন সার্ক। সার্কভুক্ত ৭টি দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানদের পোট্রেট রয়েছে সেখানে।

দ্বাদশ গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের বিদেশ সফরের বেশ কিছু দুর্লভ ছবি। এছাড়াও তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ব প্রচার মাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছিল, তার কাটিং রাখা আছে। ত্রয়োদশ গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিদেশ সফরকালে বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দেয়া উপহার সামগ্রী। এইসব সামগ্রী আমার খুব পছন্দ হয়েছিল।

গ্যালারী চৌদ্দ এবং পনেরোতেও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ছিল। সেই সাথে বিদেশ সফর এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিদেশী সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দুর্লভ অনেক ছবি আছে।

নান্দনিক স্থাপনা; source : লেখিকা

ষোড়শ গ্যালারিতে এলে যে কারোর মন খারাপ হবে। কারণ এখানে আছে একটি খাট ও ছোট্ট টেবিল। টেবিলের উপর রাখা আছে একটি গ্লাস। যেন এক্ষুনি কেউ এসে বিছানায় বসে গ্লাসে করে পানি পান করবে! মারা যাবার রাতে এ কক্ষেই রাত্রি যাপন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।

খাটের পাশে মেঝেতে রাখা কার্পেট এবং কক্ষ থেকে বের হওয়ার পথে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ এখনো আছে। শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। দেয়ালে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। এই ঘরেই ঘাতকের বুলেটে ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল জিয়াউর রহমানের শরীর। এই গ্যালারিটি শাহাদাত গ্যালারি হিসেবে পরিচিত।

এর পরই গ্যালারি নম্বর সতেরো। এই সার্কিট হাউজে খুন হবার পর জিয়াউর রহমানের লাশ গোপনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগরে দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়। পরে সেখান থেকে লাশ তুলে নিয়ে ঢাকায় তাকে দাফন করা হয়। রাঙ্গুনিয়ার প্রথম কবর এবং ঢাকার কবরের চিত্র ডিউরমার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে এখানে।

গড়ে প্রতিদিন ৪৩২ জন মানুষ জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন। বছরে প্রায় সোয়া লাখ পর্যটক আসে এই জাদুঘরে এখানে। দর্শনার্থী ফি থেকে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টাকা আসছে। অডিটোরিয়াম ভাড়া দিয়েও আয় করছে জাদুঘরটি।

জাদুঘর ভবনের পাশে আরো একটি ভবন আছে। সেদিকে প্রবেশ নিষেধ। জাদুঘরের ঠিক পাশেই যে পার্কটি রয়েছে, সেটি আর জাদুঘরের মাঝে কেবল একটি শিকের বেড়া। বেড়ার ওপাশের পার্কে দিনে দুপুরে চলছে অনৈতিক কার্যকলাপ। এসব দেখে আরো কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে থাকলেও বেরিয়ে এলাম জিয়া জাদুঘর চত্বর থেকে।

জিয়া জাদুঘর; source : লেখিকা

জাদুঘরের সময়সূচী

সপ্তাহে ৫ দিন খোলা থাকে জাদুঘর। বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দুইদিন সরকারী ছুটি ছাড়া বাকি ৫ দিন দর্শনার্থীরা জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারেন। তবে শুক্রবারে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় খোলা থাকে জাদুঘরটি। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘর।

কীভাবে যাবেন

জাদুঘরটি জিরো পয়েন্ট থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে চট্রগ্রাম স্টেডিয়ামের কাছে কাজীর দেউরিতে অবস্থিত। ঢাকা থেকে চট্রগ্রামে সরাসরি সড়ক, রেল ও আকাশপথে যাওয়া যায়। চট্রগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকে বাস, অটোরিকশা, টেম্পো অথবা ব্যক্তিগত গাড়িতে জাদুঘরে আসা যাবে।

Feature Image : লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতীয় ভিসায় নতুন ও কার্যকর পোর্ট সংযোজন

এক নো-ম্যান্স ল্যান্ডের গল্প