লিখতে পারেন আপনিও!

ভ্রমণ হলো আত্মার সঞ্জীবনী। এই প্রাণ-সঞ্চারকারিণীর গুরুত্ব দেশ বিদেশের বিখ্যাত সব লেখকের ভ্রমণ কাহিনী, নিবন্ধতে বরাবরই প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও স্বর্ণ যুগের সেই সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অন্নদা শঙ্কর রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক লেখকেরা সবাই ভ্রমণকে প্রাণের খোরাক হিসেবে দেখেছেন। লিখেছেন ভ্রমণ বিষয়ক দুর্দান্ত সব কাহিনী ও নিবন্ধ।

লেখালেখির বিষয়টি সার্বজনীন। এই সাগরে রত্নাকর হওয়ার অধিকার সবার। তাই লিখতে পারেন আপনিও। আপনার ছোট ছোট ভ্রমণ অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠতে পারে চমৎকার সব নিবন্ধ। লেখালেখির মুক্তাঞ্চলে আপনি স্বাধীন, বাঁধনহারা। আপনি চাইলেই হতে পারেন অন্য রকম অন্য ধারা। এখানে শুধু লিখতে হবে। বাকি সব কিছু যথা সময়ে পাশাপাশি নিজ মহিমায় সেজে উঠবে।

ভ্রমণ বিষয়ক দুর্দান্ত সব নিবন্ধ লেখার জন্য শুরুর দিকে কিছু বিষয় খেয়ালে রাখা জরুরী। এগুলো শুধুমাত্র গাইডলাইন আর মানারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে নিবন্ধ লেখার প্রাথমিক ধারণার জন্য এগুলো খুবই কার্যকরী।

১। পরিছন্ন স্টোরিলাইন

ভ্রমণ নির্দিষ্ট কোনো গল্প নয় বরং অনেকগুলো ঘটনার সমষ্টি। এই ঘটনাগুলোর স্মৃতি সুখের, তিক্ততার কিংবা অন্য অনেক অনুভূতির সঞ্চার করেতে পারে। শুরুতে একজন লেখক হিসেবে আপনার দায়িত্ব এমন একটি নির্দিষ্ট গল্প বেছে নেওয়া যা আপনি বলতে চান। তখন ওই গল্প সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোকেও বেছে নিতে হবে।

গল্প বাছাইয়ের ধারণার জন্য পত্রিকা, সাময়িকী ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধ সম্পর্কে জানাশোনা থাকা জরুরী। এই প্রসঙ্গে অল্প সময়ে বিস্তর ধারণা নিতে সর্বাধিক পঠিত কিংবা জনপ্রিয় নিবন্ধগুলোর শুরুর দিকের মোটা হরফের সূচনামূলক লেখাগুলো পড়তে পারেন।

ছবিঃ youtube  

২। লক্ষ্য ঠিক করুন

ভ্রমণে ফিজিক্যাল অবজেক্টিভ থাকতে পারে। যেমন ধরুন আপনি কোনো পর্বতের চূড়া সামিট করবেন। এতে নিবন্ধতে একটি উদ্দেশ্য ও দিকনির্দেশনা আপনা থেকেই তৈরি হবে। আর পাঠকও আপনার সঙ্গে থাকবে কেননা তারাও জানতে চায় শেষ পর্যন্ত আপনি লক্ষ্য অর্জনে সফল হবেন কি না।

তবে অনেক ক্ষেত্রে ভ্রমণে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নাও থাকতে পারে।  ধরুন এমনিতেই কোথাও ঘুরতে গেলেন। সেই ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্দিষ্ট করুন। এতে পাঠক ধারণা পাবে আপনি তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। কেননা পাঠক পড়তে পড়তে অজানাতে হারাতে চায় না বরং অজানাতে নিজেকে খুঁজে পেতে চায়।

ছবিঃ uckfield news

৩। গল্প অনুযায়ী অভিজ্ঞতাকে আকার দিন

গল্পে চরিত্র, প্লট, কথোপকথন, নাটকীয়তা, স্থান, গতি অনেক কিছুই থাকবে। আপনাকেই এগুলোর জীবন দিতে হবে। এদের ব্যবস্থাপনা এমন হবে যেন পাঠক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকে। যখন আপনি স্টোরিলাইন ঠিক করলেন তখন সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতাগুলোও নির্বাচন করুন। বাকিগুলো বাদ দিন। কেননা অধিকাংশ ভ্রমণ নিবন্ধ দুই হাজার শব্দ অতিক্রম করে না।

ছবিঃ  nothhelm

৪। দুর্দান্ত ইন্ট্রো লিখুন

আপনার যেমন ইচ্ছা তেমনভাবেই নিবন্ধ শুরু করতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখবেন পাঠক যেন আকর্ষিত হয়। নাটকীয়তা, হাস্যরস, কথোপকথন যে কোনো কিছুই দিয়ে শুরু করা যায়। এখানে লক্ষ্য একটাই, পাঠককে সম্মোহিত করা। ইদানীং নিবন্ধগুলো ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে শুরু করা হয়। পরে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘটনাতে আপনি কীভাবে সম্পৃক্ত তার বর্ণনা দেওয়া হয়।

৫। কথোপকথন সম্পৃক্ত করুন

‘দেখ! ওই দিকে! ভাঙা ডিঙ্গির মাথায় একটা সিংহ!’ তপুদা ফিসফিস করে বলল। অন্য ভাবে বললে, সেখানে গিয়ে ভাঙ্গা ডিঙ্গিতে একটা সিংহ দেখলাম। কোন বাক্যটি আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে? কথোপকথন দৃশ্যকে জীবন্ত করে তোলে, গল্পের চরিত্রগুলোকে ব্যক্তিত্ব দেয় আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে পাঞ্চ পাওয়া যায়। তাই যখন ভ্রমণ করবেন তখন মানুষ কী বলছে কীভাবে বলছে তার নোট রাখতে চেষ্টা করুন।

ছবিঃ alarmy

৬। দেখান এবং বলুন

‘দেখানো’ এবং ‘বলা’ এই দুইভাবেই খুব মজা করে গল্প বলা যায়। আমরা নিজেদের অজান্তেই এভাবে গল্প বলি। দেখানো হলো গল্প বলার গতি কমিয়ে কী দেখেছেন তা বিস্তারিত বর্ণনা করা। আপনি কী দেখেছেন, কী শুনেছেন, খাবারের স্বাদ কেমন ছিল, কী অনুভব করেছেন এরকম বিষয়গুলো লেখকের চোখ দিয়ে লিখনিতে পাঠককে দেখানো যায়। অন্য দিকে এরকম লেখা যেমন, বিশ্রাম নিতে সবাই তাঁবুতে ফিরে গেলাম… এটা হচ্ছে বলা, অর্থাৎ এক রৈখিকভাবে বর্ণনা করে যাওয়া।

ছবিঃ indiantouristplace

৭। ইমপ্রেস নয় এন্টারটেইন করুন

নবিশ লেখকেরা অনেক সময় সাহিত্যিক বাক্যাংশ, বিচিত্র সব শব্দ ও নাম দিয়ে নিবন্ধকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করে থাকে। ভালো লেখকেরা এই ক্ষেত্রে হেমিংওয়ের বচন অনুসরণ করে, ‘আমি যা দেখি ও অনুভব করি তা সব থেকে ভালো ও সাধারণভাবে লেখাই আমার লক্ষ্য।’ তাই বলে লেখা নিয়ে খেলবেন না কিংবা অনুসন্ধান করবেন না এমনটা কিন্তু নয়। শুধু খেয়াল রাখবেন এমন কাজ করতে গিয়ে যেন পাঠককেই হারিয়ে না বসেন।

 ছবিঃ nothhelm

৮। প্রাণবন্ত শব্দ ব্যবহার করুন

ভ্রমণ বিষয়ক নিবন্ধতে প্রাণবন্ত শব্দ ব্যবহারের চেষ্টা করুন। তবে এমন শব্দ ব্যবহার করবেন না যা দিয়ে অন্য অনেক কিছুকেই বোঝাতে পারে। তাই এমন শব্দ ব্যবহার করুন যা ওই নির্দিষ্ট জায়গাকেই নির্দেশ করে, তা অত্যুক্তিও হবে না আবার অন্য কিছুকেও বোঝাবে না। যেমন ব্যবহার করলেন ‘সাগর কন্যা কুয়াকাটা’, ‘দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার’, ‘প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ’ এরকম।

ছবিঃ indiantouristplace

৯। সংকেত দিন

এক প্যারা থেকে অন্য প্যারাতে যাওয়ার সময় কী নিয়ে আলোচনা করতে চলেছেন তার সংকেত দিন। এতে পাঠক কোন বিষয়ে পড়তে চলেছে তা জানতে পারবে। মনে রাখবেন লেখার মতো পড়াও পরিশ্রম সাধ্য কাজ। তাই পাঠকের আকর্ষণ ধরে রাখার সকল কৌশল আয়ত্ত করতে হবে।

ছবিঃ  alarmy

১০। শেষ করতে সময় নিন

ভ্রমণের অনেক ঘটনা, তথ্য-উপাত্ত পরিবেশন করতে গিয়ে অনেকে হঠাৎ করে লেখা শেষ করে দেন। এতে করে পাঠকেরা স্তম্ভিত ও কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে আলাদা প্যারা করুন। কিংবা কোনো অভিজ্ঞতারই বর্ণনা করুন। শেষ করার আগে ইঙ্গিত দিন। পাঠককে বোঝান সমাপ্তি সন্নিকটে। ভাবুন কোথায় শুরু করেছিলেন, সফরের প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। অভিজ্ঞতাগুলোর গাছপাথর করতে পারেন। অনুগ্রহ করে ‘সেখানে আমি আবার ফিরে যেতে চাই’ এর থেকে উৎসাহমূলক ইতি টানতে চেষ্টা করুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গাইডহীন তাজিংডং জয়ের গল্প!

মিনি সুইজারল্যান্ডের সবুজ কার্পেটে!