পৃথিবীর উচ্চতম গ্রাম কিবের অভিযান

টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাস ছুটছে সাড়ে বারো হাজার ফুট উঁচু রাস্তা দিয়ে। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে পাশেই দেখা যাচ্ছে পাথুরে রাস্তা খাড়া নেমে গেছে হাজার হাজার ফিট নিচে৷ ছোট ছোট ধুসর পাথরে সাজানো পাথরগুলো দূর থেকে দেখে মনে হয় বালির পাহাড়। অনেক দূরে ভ্যালির শেষে আলো ছায়ার অদ্ভুতুড়ে আবহাওয়া দেখে ভয় হচ্ছিলো মনে মনে। ৭০ লিটারের বিশাল ব্যাকপ্যাকটা আকড়ে ধরে বসে রইলাম।

সারি সারি পাহাড় কেটে বানানো আঁকাবাকা রাস্তায় গাড়ি চলছে। লোকাল বাসের যাত্রীদের অধিকাংশই স্পিতি স্থানীয়। কাজ সেরে অনেকেই বাড়ির দিকে ফিরছেন। আর কিছু অভিযাত্রিদের সবাই চুপচাপ বসে পাহাড় দেখছেন। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিস্তৃত স্পিতি রিভার। পর্বতের বরফ গলা হিম শীতল জল বয়ে চলেছে নদীর বিভিন্ন অংশ দিয়ে, একেবেঁকে। এর মধ্যেই ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করেছে। নিঃশ্বাস নিতেও যে স্বাভাবিক লাগছে না বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না।

পর্বতে ভুতুড়ে আলো। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

হিমালয়ের বৌদ্ধ মন্দির বা মনেস্ট্রিগুলো যে এত সুন্দর হয় তা কিবের যাবার পথে কি মনেস্ট্রি না দেখলে আসলেই বুঝতাম না। দূর থেকেই দেখা যায় ছোট একটা পাহাড়কে সাপের মতো পেঁচিয়ে ঘরবাড়িগুলো শেষ হয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় একটা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে।

প্রায় ১৪ হাজার ফিট উপরে মানুষ সৃষ্ট সারি সারি দালানের একটা পাহাড় কী করে টিকে আছে শত শত বছর তা ভাবতে ভাবতে বাস এসে থামল কি মনেস্ট্রির সামনে। ততক্ষণে অনেকেই নেমে গিয়েছেন মনেস্ট্রির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

কি মনস্ট্রি,  স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

কি মনেস্ট্রি থেকে যখন বাস ছাড়ল ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ঝর ঝর করে বৃষ্টির পানি চুইয়ে ঝাপসা হয়ে আসছে গাড়ির উইংশিল্ড। ঝাপসা কাঁচের ভেতর দিয়েই গাড়ির পাইলট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চালাচ্ছেন গাড়ি। পাহাড়ি চড়াই বেয়ে বাঁক নিতে গিয়ে মাঝে মাঝে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্রেক কষে গাড়ি পেছন দিকে চালিয়ে মোড় নেয়া লাগছে।

গাড়ি না পেছালে রাস্তার বাইরে ঝুলে থাকা পাথরের সাথে যখন তখন বিশাল সংঘর্ষ হয়ে যেতে পারে। এভাবেই শ্বাসরুদ্ধকারী কিছু মোড় নেবার পর পাহাড়ের উপর থেকে দূরের কিবের দেখা যাচ্ছিলো ১৪,২০০ ফিট উপরে। ছোট্ট গ্রামটিতে ততক্ষণে সূর্যের শেষ আলোর শেষ রেখাটিও নিস্তেজ হয়ে আসছিল।

পাহাড় আর মেঘে ঘেরা গ্রাম। কিবের, স্পিতি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

ছয়টা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম পৃথিবীর উচ্চতম গ্রামে। ৫০-৬০টি ঘরবাড়ির এই গ্রামে খুব বেশী হলে ১৮০-২০০ জন মানুষের বাস। ধূসর স্পিতিতে প্রাণের ছোঁয়া বলতে কিবেরে দেখা যায় সবুজ মটরশুটি আর গমের মাঠ। বছরে ছয় মাস বরফ জমে বন্ধ হয়ে থাকে গ্রামের সাথে বাইরের সব ধরনের যোগাযোগ। তাই ছয় মাসের রসদ আর জীবিকা ফসলের উপরই নির্ভর করে।

রোদের রেখা না থাকলেও পশ্চিমের আলোর আভাতে চকচক করছে পুরো গ্রামের ভ্যালিটি। এখানে হোমস্টে রয়েছে কিছু, যেখানে দর্শনার্থী বা অভিযাত্রীদের থাকা বা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। এরকমই সারকং হোমস্টে। কাঠ পাথরের দুইতলা বাড়িটিতেই আমরা ঘর ভাড়া করলাম। ব্যাগ রেখে দিনের আলোতেই গ্রামটি ঘুরে দেখার জন্যে তর সইছিলো না।

সবুজ আর ধূসরের চাদর।  কিবের, স্পিতি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

পৃথিবীর সব থেকে উঁচু গ্রাম কিবেরটি মায়া দিয়ে ভরা। চারপাশের পর্বতের দেয়াল দিয়ে ঘেরা এই গ্রামটি থেকেই মাউন্ট কানামো অভিযানে যান অভিযাত্রীরা। তাই অভিযাত্রীদের কাছে এই গ্রামের সৌন্দর্য শোনা যায়। গ্রামের মানুষগুলো মূলত তিব্বতীয়ান। স্থানীয়রা তিব্বতী, হিন্দি বা স্পিতিয়ান ভাষার সবগুলোতেই কথা বলে থাকেন। অধিকাংশই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তিব্বতী সংস্কৃতিতেই এখানকার জীবন চলে।

এই উচ্চতায় অক্সিজেন এর পরিমাণ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাসে অনেকের সমস্যা হচ্ছিল আর অল্প হাঁটতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। বিশাল এক পাহাড়ি প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সেদিনের সন্ধ্যা কাটিয়ে গ্রামে ফিরে এসে তিব্বতীয়ান মোমো দিয়ে পেটপূর্তি করে সেদিনের মতো গল্পগুজবে কেটে যেতে লাগল শীতল অথচ নীলাভ আভাযুক্ত গ্রামের বন্য একটি রাত।

স্কুলগামী ছোট্ট বন্ধু।  কিবের, স্পিতি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় ঘুম ভাঙল। উচ্চতার জন্য এই অসুস্থতা স্বাভাবিক বিষয়। দরজা খুলে বের হতেই বুঝলাম দুটো সাধারণ জ্যাকেটেও মানাচ্ছে না। শীতে মরি মরি অবস্থায় থার্মাল ডাউন পরে বের হলাম। আলো ফুটে আসছে পাহাড়ের ওপাশে। কাছেই পর্বতের মাথায় এক রাতেই জমে গেছে বরফের বিশাল স্তর।

বিপদে পড়লাম মুখে পানি দিতে গিয়ে। এত ঠাণ্ডা পানি চোখ, মুখ যেন পুড়িয়ে দিচ্ছিল। কোনোমতে সে পর্বটা পার করে সকালের চা খেয়ে বের হলাম ডে হাইকের জন্য। পরদিন মাউন্ট কানামো অভিযানে যাচ্ছি, শরীরকে উচ্চতার জানান দেবার দরকার ছিল।

চেরিং দোর্জ এর হোমস্টে।  কিবের, স্পিতি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

কিবের থেকে উপরে উঠলেই চোখে পড়ে স্পিতির গ্রামগুলোর আসল সৌন্দর্য। চারদিক দিয়ে ঘেরা প্রায় পাচ হাজার মিটার উঁচু আকাশ ছোঁয়া পর্বতের প্রাচীরের মধ্যমনি হয়ে আছে গ্রামটি। উঁচু ধূসর প্রান্তর থেকে সবুজ মাঠের ঝলকানি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে পৃথিবীর যে কোনো ভ্রমণপ্রিয় মানুষের।

পেছনে কিবের। কিবের, স্পিতি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

অনেক উঁচু থেকে যখন সূর্যের শেষ আলোয় পৃথিবীর সব থেকে উঁচু গ্রামটি দেখছিলাম, মুহুর্তটা ছিলো স্বপ্নের মতো। ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে একটি জনপদ কীভাবে প্রচণ্ড রুক্ষ আবহাওয়া নিজের করে টিকে আছে এত উচ্চতায় ভাবতেই অবাক লাগে। নিজের প্রাত্যহিক আধুনিক জীবন থেকে বের হয়ে এই বন্য পরিবেশের মাঝে নিজেকে রাখলেই উড়ে যায় সব ক্লান্তি, কষ্ট, অসহায়তা।

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

কিবের যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি, অথবা চণ্ডীগড়। ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজা গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি।

HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন। কাজা থেকে কিবেরে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় একটা বাস চলাচল করে। ভাড়া পড়বে পুরুষ ৩০ রুপি, নারী ২৫ রুপি। কাজা থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করেও কিবের যাওয়া যায়। খরচ পড়বে ১,০০০ রুপি।

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. ভাল লিখছিস। বাই দ্যা ওয়ে আর লেখা আর কই? পাইনা তো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বানরের অভয়ারণ্য ভালুকার বিটবনে একদিন

দিয়াবাড়ির খালে নৌকাভ্রমণ আর কাশফুলের শুভ্রতায় হারিয়ে যাওয়া একটি বিকেল