বিশ্বের দুর্দান্ত কিছু মেট্রোরেল ভ্রমণ

মেট্রোরেল আমাদের দেশে তেমন পরিচিত না হলেও বাইরের বিশ্বে এটি যাতায়াতের ব্যবস্থা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। মেট্রোরেল সাধারণত শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতি বিরতিতেই দাঁড়ায়। তাই শহরের এক জায়গা থেকে কাছাকাছি অন্য কোনো জায়গায় যেতে মেট্রোরেলের জুড়ি মেলা ভার। যাতায়াতের কাজে তো বটেই, পর্যটনের খাতিরেও মেট্রোরেল বেশ জনপ্রিয়। কোনো শহরকে নিগূঢ়ভাবে চিনতে হলে দুটি জিনিস করা যায়। প্রথমটি পায়ে হেঁটে পুরো শহর ঘুরে দেখা, আর দ্বিতীয়টি হলো যদি মেট্রোরেলের ব্যবস্থা থাকে সেই শহরে তবে মেট্রোরেলে চেপে বসা। মেট্রোর জানালার কাঁচে ধীর গতিতে স্বাভাবিক ছন্দে ধরা পড়বে শহরের নাগরিকতা আর সাবলীল ঐতিহ্য। তাই যদি দেশের বাইরে কোথাও ঘুরতে যান তবে মেট্রোরেল ভ্রমণ করতে কখনো ভুল করবেন না। আমাদের আজকের আয়োজন জনপ্রিয়, আধুনিক এবং প্রাগৌতিহাসিক তেমনি কিছু মেট্রোরেল ভ্রমণ নিয়ে।

১. বুয়েনাস আইরেস মেট্রোরেল

স্প্যানিশ ভাষাভাষীর অঞ্চলে সর্বপ্রথম মেট্রোরেল চালু করা হয় আর্জেন্টিনার বুয়েনাস আইরেসে। আমেরিকান অঞ্চলে প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে চতুর্থ মেট্রোরেল স্টেশন বুয়েনাস আইরেস মেট্রোর লিনিয়া ছিল এই নেটওয়ার্কের প্রথম লাইন যেটা পিংক গভর্নমেন্ট হাউস খ্যাত প্লাজা দি মায়ো থেকে শুরু হতো যেখানটায় ইভিটা তার বিখ্যাত বেলকনি বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন।

ছবিঃ flyertalk.com

জমকালো পাতালের মধ্য দিয়ে এই মেট্রো ছুটে চলে বুয়েনাস আইরেসের কংগ্রেস ভবন এভেনিডা দি মায়ো পর্যন্ত। বুয়েনাস আইরেসের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে খ্যাত এই মেট্রোরেলের বয়স প্রায় ১০০ বছরের মতো। ১৯১৩ সালে প্রথম এর উদ্বোধনের সময় থেকে এখনো এর অভ্যন্তর সাজানো আছে পালিশ করা কাঠ, টিউলিপের আদলে বানানো বাতি আর সিটের সাথের জানালা দিয়ে যদিও বগিতে ঢোকার রাস্তায় বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় দরজা। ২০১৩ সালে পূরণ হয়েছে এই হেরিটেজ রেলের ১০০ বছর।

২. বুদাপেস্ট মেট্রোরেল

বিশ্বের প্রথম মেট্রোরেল লাইন থেকে মাত্র ছয় মাস পিছিয়ে থাকা বুদাপেস্ট মেট্রোরেল লাইন বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরাতন মেট্রো পাতাল রেল সিস্টেম। হাংগেরীর প্রতিষ্ঠাতা ম্যাগইয়ারের ১,০০০ তম জন্মবার্ষিকী মনে রাখার উপলক্ষে ১৮৯৬ সালে চালু হয় বুদাপেস্ট পাতাল মেট্রো। যদিও লন্ডন পাতাল মেট্রোর ৩৩ বছর পরে এর উদ্ধোধন করা হয়, তবুও এটিই বিশ্বের প্রথম বিদ্যুৎ চালিত মেট্রোরেল।

ছবিঃ upload.wikimedia.org

টক্করে থাকা অন্যান্য পাতাল মেট্রোরেলের মতো এটি অত গভীর রেল লাইনের অধিকারী না কারণ এটি বানানোই হয়েছিল এন্ড্রাসি এভিনিউয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। অনেক আগের মেট্রোরেল হলেও প্রতি দুই মিনিটে স্টেশনে আসে ট্রেনগুলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যাত্রী ভর্তি করে নিয়ে চলে যায়। বুদাপেস্টের সাংস্কৃতিক দিক সম্পর্কে জানতে হলে চড়ে বসতে হবে এই মেট্রোতে, এটি আপনাকে পুরো বুদাপেস্টের একটি স্বচ্ছ ভ্রমণ করাবে। ভরোস্মার্টি স্কয়ার থেকে শুরু হয় এর যাত্রা আর যাত্রাপথে পড়বে বিখ্যাত ক্যাফে গারবিউড যা এই ট্রেনের থেকে ৪০ বছর পুরোনো। পথে আরো পড়বে ট্রেন মিউজিয়াম, সেন্ট স্টিফেনস ব্যাসিলিকা, স্টেট অপেরা হাউস, কয়েকটি থিয়েটার আর হাউস অফ টেরর। সবচেয়ে মজার বিষয়, এত কিছু একসাথে দেখে ফেলতে একবারের জন্যও ট্রেন থেকে নামতে হবে না আপনাকে।

৩. এথেন্স মেট্রোরেল

ইউরোপের নামীদামী আধুনিক সব মেট্রোরেলের ভিড়ে এথেন্সের এই মেট্রোরেল ঠিক আধুনিকতার প্রতীক না হয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক রোল মডেল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। এটি কেবল বিশ্বের প্রত্নতত্ত্বীয় জিনিসপত্রে সমৃদ্ধ নয় বরং বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো প্রত্নতত্ত্ব দিয়ে ভরপুর। একটি মেট্রোরেল ব্যবস্থায় গোটা এক জাদুঘর যদি দেখা যায় তবে মানতে হবে আসলেই রেল-ব্যবস্থাটিতে দেখার মতো আছে অনেক কিছুই।

ছবিঃ travelpassionate.com

পাতালের দেয়াল কেটে কেটে সেই দেয়ালে সাজিয়ে রাখা আছে পুরো গ্রিক ইতিহাস। ১৯৯০ দিকে শুরু হওয়া এই রেলের কাজ ছিল এথেন্সের মেগা প্রজেক্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। শুধু তাই নয়, ৫০,০০০ হাজার প্রত্নতত্ত্বের অধিকারী এই মেট্রোরেল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক প্রত্নতত্ত্বীয় খননকার্যের স্বীকৃতি প্রাপ্ত। ২০০৪ সাল থেকে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এথেন্সের এই রেলভ্রমণে মনে হবে প্রাচীন কোনো যুগে আধুনিক এক যানে আপনি স্বপ্নভ্রমণ করছেন। সিনত্যাগ্মা স্টেশনের লাইন ১ থেকে শুরু হয় এই রেলের যাত্রা আর পথিমধ্যে পড়ে রোমান স্নানাগার, মার্বেলের অসংখ্য ভাস্কর্য, প্রায় ২,০০০ বছরের পুরনো মৌচাক আর পঞ্চম অব্দের কিছু মোজাইক কারুকার্য। এথেন্সের এই মেট্রোরেল ভ্রমণ এখানেই শেষ নয়, লাইন ৩ এ ১.৪০ পাউন্ড খরচ করে দেখা মিলবে এথেন্সের সাংস্কৃতিক রত্নভাণ্ডারের যা দেখার ইচ্ছে মনে পোষণ করে গ্রিস ঘুরতে যাওয়া প্রায় সব পর্যটক।

৪. নিউ ইয়র্ক মেট্রোরেল

মূলত ১৮৭০ সালে শুরু হওয়া এই মেট্রো ব্যবস্থা ১৯০৪ সালে নতুন রূপ লাভ করে। ১৯০৪ সাল থেকে পাতাল রেলের চালু করা হয় নিউ ইয়র্কে। ১৮৮৮ সালে নিউ ইয়র্কে ঘটে যাওয়া প্রবল তুষারঝড় আমেরিকান সরকারকে বাধ্য করে রাস্তার উপরের মেট্রো ব্যবস্থাটিকে ভূমির নিচে দিয়ে নেয়ার। পরের শতাব্দিতে যখন হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিউ ইয়র্কের যাতায়াত ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছিল তখনই সিদ্ধান্ত হয় পাতাল দিয়ে চলবে এই মেট্রোরেল।

ছবিঃ 1366x768wallpaper.com

আজকের বিশ্বে মোট ২৪টি রুটের ৪৬৮টি স্টেশনে মোট ২০৯ মাইল পথ পাড়ি দেয়া মেট্রোরেল ব্যবস্থা হচ্ছে নিউ ইয়র্ক মেট্রোরেল। লন্ডনের মেট্রো ব্যবস্থাকে টক্কর দেয়া এই আধুনিক ও ব্যয়বহুল মেট্রোরেল চলে দিনের ২৪ ঘণ্টা, বছরের ৩৬৫ দিন আর সব কয়টি বগিই এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। নিউ ইয়র্ক মেট্রোর রুট ব্যবস্থা এতই জটিল যে বাইরের সাধারণ পর্যটকদের তা বোধগম্য হবে না। স্থানীয় নিউ ইয়র্কবাসীরা তাই প্রতিটি ট্রেনকে এর রুটের নামে চেনেন। পর্যটনের জন্য এই মেট্রোরেল ব্যবস্থার সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে দ্য কিউ ট্রেন। সূর্যমূখী ফুলের হলদে রঙের রুট আর ব্রডওয়ে এক্সপ্রেস হিসেবে পরিচিত এই ট্রেন গ্রিক প্রতিবেশি এস্টোরিয়া থেকে, চলতে থাকে কুইনস, ম্যানহাটন হয়ে ফিফথ এভিনিউয়ের সেট্রাল পার্কে। সেখানে যাত্রা বিরতি দিয়ে আবার ছুটে চলে ৪৭তম এবং ৭ম হেল’স কিচেন, টাইম স্কয়ারে। পুরো নিউইয়র্কের সুন্দর একটি ভ্রমণকাব্য লেখা হয়ে যাবে এই রেল ভ্রমণকালেই।

৫. প্যারিস মেট্রোরেল

প্যারিস মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয় ১৯০০ সালের দিকে। স্লিক লাইন ১ এর মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া এই রেলের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে পুরো প্যারিস শহরটা ঘুরে দেখানো। প্যারিসের পূর্ব থেকে পশ্চিমে ব্যাস্তিলে,লুভ্রে থেকে তুইলেরিস, কনকর্ডে ছুটে যাওয়া এই মেট্রোরেলে চেপে বসলে চোখে পড়বে প্যারিসের কিছু বিখ্যাত নিজস্বতা যা দেখার আগ্রহ পথ যত গড়াবে ততই বাড়বে।

ছবিঃ unsplash.com

প্যারিসের স্থানীয় আর পর্যটকদের ভিড়ে এটি এখন প্যারিসের সবচেয়ে ব্যস্ততম যাতায়াত ব্যবস্থা। একদম ড্রাইভারবিহীন স্বয়ংক্রিয় রেল আর পেছনে ফেলে যাওয়া চিত্রকর্মে সাজানো প্রতিটি স্টেশন এই রেলের চাহিদা কমতে দেয়নি সেই উদ্ধোধনের দিন থেকে। এই রেলের বিখ্যাত লাইন নম্বর হলো ২নং লাইনটি। দুই নম্বর লাইন ধরে যতই ট্রেন সামনে আগাবে ততই মনে হবে যেন অতীতে ফিরে যাচ্ছেন আপনি, অনেকটা টাইম মেশিনের মতো। এই লাইন ধরে রেলগাড়িটি এগিয়ে যায় বড় এক ধনুকাকার পথ ধরে যার পথিমধ্যে পড়ে পোর্টে ডুফাইন, পিয়েরে লাচাইসে যা বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত সমাধিস্তম্ভ যেখানে জিম মরিসন, অস্কার ওয়াইল্ডের মতো ব্যক্তিত্বরা শায়িত আছেন চিরনিদ্রায় । স্থাপত্যবিদ্যায় যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য আছে করনেল ফ্যাবিয়েন যেখানটায় অস্কার নিইমেয়ের ফরাসী কম্যুনিস্ট পার্টির প্রধান কার্যালয় নকশা করেছিলেন। এই ভ্রমণের পথিমধ্যে আরো পড়বে সেন্ট মার্টিন ক্যানাল, ব্যাসিন দে লা ভিলেত্তে সহ অসাধারণ প্যারিসের দুর্দান্ত সব জায়গা।
ফিচার ইমেজ- allwallpaper.in

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সূর্যাস্তে নীলাচল ও মেঘলাকথন

বালিতে বসে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১০ ফাইনাল দেখা