কোণার্ক সূর্য মন্দিরের অসাধারণ চিত্রকলা ও অতীত ইতিহাস

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলার কোণার্ক শহরে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কোণার্ক সূর্য মন্দির স্থাপন করা হয়। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের নরসিংহদেব। ধারণা করা হয়, তিনি ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে সাতটি ঘোড়ায় টানা চব্বিশ চাকার একটি রথ হিসেবে কল্পনা করে। সাতটি ঘোড়া সাত দিনের প্রতীক এবং চব্বিশটি চাকা চব্বিশ ঘন্টার প্রতীক। পুরো মন্দিরের দেয়ালজুড়ে অসাধারণ কারুকাজ রয়েছে। প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি। চব্বিশটি চাকা মানে চব্বিশটি পক্ষ। চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা। আটটি দাঁড়কে অষ্টপ্রহর ধরা হয়। নিখুঁতভাবে সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এখান থেকে।

ছবিসূত্রঃ গোলাম মর্তুজা

মন্দিরের প্রবেশপথে রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি। সিংহগুলো লড়াই করছে রণহস্তীর সঙ্গে। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ছায়াদেবীর মন্দির, নৃত্যকক্ষ, মায়া মন্দির। অভিনব নকশা, কারুকাজ ও চিত্রকলায় সাজানো এই মন্দিরটি বেশ আকর্ষণীয় ও সুন্দর। দেয়ালে খোদাই করা হয়েছে দেবদেবীর প্রতিকৃতি ও আরো অনেক কিছু। সাধারণ মানুষের জীবন, ফসল কাটা, যুদ্ধজীবন, যুদ্ধ দৃশ্য, পূজা, কিছু নিছক দুষ্টু প্রকৃতির ছবিসহ অনেক ছবি খোদাই করা আছে দেয়াল জুড়ে। এছাড়াও রয়েছে দেবতা, সমকামিতা, নাগ, মানুষ, বীণা, বালিকা বধূ, ছয় হাতের শিব, মোহিনী, নৃত্যরত নরনারী, মিঠুন মূর্তি, প্রেমিক যুগল, ফাঁদ দিয়ে হাতি ধরা, রাজদরবারের নানান দৃশ্য, বিয়ের শোভাযাত্রা, শিকারের দৃশ্য।
ছবিসূত্রঃ গোলাম মর্তুজা

কোণার্ক সূর্য মন্দিরটি ভারতের সেরা সাতটি ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বহু আগে থেকে। ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলা থেকে মন্দিরটির দূরত্ব ৩৫ কিঃমিঃ এবং ভুবনেশ্বর থেকে ৬৫ কিঃমিঃ। এই মন্দিরটি সূর্যের বিভিন্ন অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। সূর্যমন্দিরটি নির্মিত হয়েছে সূর্যের বিভিন্ন কোণের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। সংস্কৃত শব্দ কোনা, কোণ কিংবা সূর্যের সমন্বয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে এবং এটি সৌরদেবতা সূর্যকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
ছবিসূত্রঃ গোলাম মর্তুজা

দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের দেয়ালে বিভিন্ন টেরাকোটা খোদাই করা এবং কোণার্ক সূর্য মন্দিরে অসাধারণ সকল চিত্রকলা খোদাই করা। এই চিত্রকলাগুলো সাধারণ মানুষের জীবনের কথা বলে। যৌনতা, কাম ইত্যাদিও প্রকাশ পায় খোদায়কৃত চিত্রকলায়। এই মন্দিরটিতে যেন গণিত, বিজ্ঞান ও চিত্রকলার অপূর্ব মিশেল প্রকাশ পায়। এই মন্দিরটিকে পূর্বমুখী করে তৈরি করা হয়েছে যেন দিনের প্রথম আলো মন্দিরে পড়ে। তবে এই মন্দিরের ভেতরে এখন আর প্রবেশ করা যায় না।
ছবিসূত্রঃ গোলাম মর্তুজা

জনশ্রুতি আছে, ১০ হাজার মানুষ ১২ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই মন্দিরটি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কলিঙ্গ রীতিতে নির্মিত মন্দিরের চূড়াগুলো পিরামিড আকৃতির। মন্দিরের সামনে অবস্থিত নাটমণ্ডপে দেবদাসীরা দেবতার উদ্দেশ্যে পূজানৃত্য পরিবেশন করতেন। মন্দিরটির উচ্চতা ৮৫৭ ফুট এবং দেয়াল ২০০ ফুট উঁচু। নাটমন্দির, ভোগ মন্দির, গর্ভগৃহও রয়েছে মন্দিরের ভেতরে। আগে মন্দিরটির অনেক জৌলুস থাকলেও এখন তেমনটা নেই। বালিতে ডুবে গেছে মন্দিরের অনেক অংশ।
ছবিসূত্রঃ flickr.com

লোকমুখে শোনা যায়, শ্রীকৃষ্ণের ছেলে শম্ভু দীর্ঘদিন যাবত কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত থাকার পর একদিন চন্দ্রভাগা নদীর তীরে সূর্য দেবতার প্রার্থনায় রত হন। বারো বছর তপস্যার পর তিনি সুস্থ হন। দীর্ঘদিন তপস্যার পর তিনি সুস্থ হয়েছেন বলে নরসিংহদেব তার সম্মানার্থে সূর্য দেবতার মন্দির নির্মাণ করেন। চন্দ্রভাগা নদীর লোনা পানি, নিমের বাতাস, সূর্যের কিরণে শম্ভু সুস্থ হয়েছে বলে জানা যায়।
ছবিসূত্রঃ flickr.com

মন্দিরটির অনেক ইতিহাস রয়েছে। কালের পরিক্রমায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে বিশেষ অংশ সমূহ। তার পেছনে অবশ্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। বাংলার সুলতান সুলায়মান খান করনানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণে কোনার্ক মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ধারণা করা হয়, কালাপাহাড় ১৫০৮ সালে রাজ্য আক্রমণ করে। পরবর্তীতে নরসিংহদেব মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছে বলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত নরসিংহদেবই মন্দিরের অনেকটা ধ্বংস করেন। ১৬২৬ সালে নরশিমাদেব সূর্যদেবের বিগ্রহটি পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে নিয়ে যান এবং পৃথক মন্দিরে সূর্য ও চন্দ্রদেবতার বিগ্রহ স্থাপন করেন। কোণার্ক মন্দিরের অনেক কারুকাজ করা পাথর পুরীর মন্দিরে নিয়ে যান যার ফলে কোণার্ক মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে শুরু করে।
ছবিসূত্রঃ flickr.com

আবার মারাঠা শাসনামলেও কোণার্ক মন্দিরের প্রয়োজনীয় স্থাপনা, কারুকার্যখচিত দেয়াল কোণার্ক মন্দির থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। মারাঠা শাসনামলে কোণার্ক মন্দিরের বিশাল স্তম্ভ নিয়ে পুরীর মন্দিরে রাখা হয়। পরবর্তীতে মারাঠা প্রশাসন নাট মন্ডপটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ভেঙে ফেলে। তাছাড়া পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমণের কারণেও কোণার্ক মন্দির বন্ধ করে দেয়া হয়। আঠারো শতকে এসে কোণার্ক মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এর অনেক অংশ বালিতে চাপা পড়ে যায়। পরিত্যক্ত থাকায় আশপাশের অংশ ঘন বনে ছেয়ে যায়। এর ভেতরে ডাকাতের আস্তানা গড়ে ওঠে।
ছবিসূত্রঃ flickr.com

দীর্ঘদিন যাবত অবহেলায় পড়ে থাকা কোণার্ক মন্দিরটিকে বিংশ শতকে উদ্ধার করা হয়। ১৯০৪ সালে বড়লাট লর্ড কার্জন ৩০ বছর পরিত্যক্ত থাকা কোণার্ক মন্দিরকে উদ্ধার করেন। যদিও পুরোপুরি উদ্ধার করা হয়নি। কারণ এর আগে মন্দিরের অনেক খোদাইকৃত অংশ অন্যত্র নিয়ে গেছে অনেকেই। তবুও মন্দিরটি উদ্ধারের পর থেকে সমানভাবে মানুষের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে উক্ত অঞ্চল। প্রতিবছর কারুকার্য খচিত এই মন্দিরটি দেখতে যায় হাজার হাজার দর্শনার্থী। কোণার্ক মন্দিরের অনেক অংশ এখন সূর্য মন্দির ও উড়িষ্যার মন্দিরে রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয়দের নিপুণ শৈলী ও নান্দনিক কারুকার্য সত্যিই মানুষের মনে বিস্ময় জাগায়।
মন্দিরের প্রতি দেয়ালে দেয়ালে সাধারণ মানুষের দিনযাপন, যৌনতা, কাম, বাসনার অনেক চিত্র শোভা পায় আজও। নৃত্যরত যুবক, চুম্বনের নানা ধরন, পোরাণিক কাহিনী সহ অনেক কিছু প্রকাশ পায় মন্দিরের স্তরে স্তরে। মোট কথা, প্রাচীণ ভারতীয়দের জীবন যাপন, কাম বাসনা, শিল্প সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা, মননশীলতা, শিল্পমনা হৃদয়ের প্রকাশ দেখা যায় কোণার্ক সূর্য মন্দিরে।
ফিচার ইমেজ সোর্স- flickr.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নুসা পেনিডার কেইলিংকিং, ক্রিস্টাল বে, অ্যাঞ্জেলস বে’তে ভ্রমণবিলাস

পূর্ণিমার আলোয় নাফাখুমে ক্যাম্পিং