মুগ্ধতায় মোড়ানো সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ

প্রায় সবার প্রথম সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা হয় সম্ভবত কক্সবাজার গিয়ে। আমার হয়েছিল সেন্ট মার্টিনসে। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সম্পর্কে সবাই কম-বেশি জেনে থাকবেন, তাই এর বিস্তারিত পরিচিতির দিকে যাচ্ছি না। স্বভাবতই এর স্থানীয় নাম নারিকেল জিঞ্জিরা হয়েছে নারিকেলের আধিক্যের কারণেই। কিন্তু নারিকেল এখানে একেবারেই সহজলভ্য নয়! একটা লম্বা পথ পাড়ি দিয়েই যেতে হয় সেন্ট মার্টিনস।

প্রথমে বাসে করে টেকনাফ, জ্যাম না থাকলেও টানা ১২ ঘণ্টার বিশাল যাত্রা, তারপর শিপে (দেখতে একদমই জাহাজের মতো নয়, মাঝারি ধরনের লঞ্চ বলা যেতে পারে!) করে সোজা গন্তব্যস্থলে। সেখানেও আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। নাফ নদী পেরিয়ে শিপ সাগরে ঢুকে পড়লেই পানির রঙের পরিবর্তন বেশ ভালো মতোই চোখে পড়ে। সি-গাল পাখিগুলো এ সময় শিপের আশেপাশে উড়তে থাকে। যাত্রীদের ছুড়ে দেয়া চিপসের টুকরো পানিতে পড়ার আগেই দক্ষতার সাথে এরা মুখে পুরে নেয়, বেশ উপভোগ্য দৃশ্য!

পূর্বের সৈকতে, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

নির্দ্বিধায় ক্লান্তিকর এই যাত্রার ছাপ আপনার উপর পড়বেই, স্বাভাবিক। শিপ দ্বীপের ঘাটে থামার পর ভ্যানে উঠে যখন সৈকতে পৌঁছে যাবেন, তখন সমুদ্রের হালকা গর্জন, ছোট ছোট ঢেউ আর কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানি দেখে আপনার সব ক্লান্তি কর্পূরের মত বাতাসে মিলিয়ে যাবে, সেটাও স্বাভাবিক!

চলছে লাফঝাঁপ! ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

দ্বীপের প্রায় সবগুলো রিসোর্টে ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না, তাই রাতে পুরো দ্বীপ ঢেকে যায় আদিম বুনো সৌন্দর্যের মায়াবী চাদরে। আর এটাই সেন্ট মার্টিনসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ! প্রকৃতির এই কাঁচা সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ আপনি খুব কম জায়গাতেই পাবেন।

হ্যামকে প্রশান্তি! ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

মাথার ওপর তারাভরা বিশাল আকাশ, সৈকতে উদাস করে দেয়া নীরবতা আর অন্ধকারে মোড়া সুবিশাল সমুদ্রের গর্জনের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম প্রথম রাতেই। একাকিত্ব গ্রাস করে ফেলছিল প্রতি মুহূর্তে। মধ্যরাত পর্যন্ত সৈকতে হাঁটাহাঁটি করেছিলাম নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো, একা একা।

সন্ধ্যা নামছে, ছবিঃ আরেফিন ইসলাম

এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না হয়তো! বলতেই হবে যারা এখন পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনসে গিয়ে একটি রাতও কাটাতে পারেননি, তারা দুর্ভাগা!

ছেঁড়া দ্বীপ, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

পরদিন ভোরে উঠে বেরিয়ে পড়লাম ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে। জোয়ারের সময় পানি বেড়ে গেলে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে খানিকটা আলাদা হয়ে যায়, তাই এমন নাম। হেঁটে, সাইকেলে, ট্রলারে বা স্পিড বোটে করে এখানে আসা যায়। আমি হেঁটেই গিয়েছিলাম।

ছেঁড়া দ্বীপে আমরা, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

এখনকার পানি আরো স্বচ্ছ! পানির অনেক গভীর পর্যন্ত সবকিছু দেখা যায় একদম স্পষ্টভাবেই। তবে এই দ্বীপের বিশেষত্ব সূর্যাস্ত দেখার মাঝে। প্রথমবার ছেঁড়া দ্বীপে গিয়ে দেখতে পারিনি, তাই দ্বিতীয়বার এই সুযোগটা হাতছাড়া করিনি।

মোহনীয় সূর্যাস্ত! ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

একাকি, নিরিবিলি কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটানোর জন্য সেন্ট মার্টিনসের দ্বিতীয় কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না আমার। হ্যামকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থেকে দুলতে থাকা, সমুদ্র দেখতে দেখতে সকালের নাস্তা খাওয়া, সন্ধ্যায় সৈকতে বসে কাঁকড়া ভাজা খাওয়া আর রাতের নিস্তব্ধতা আপনাকে যথেষ্ট মানসিক প্রশান্তি দেবে, নিঃসন্দেহে!

কাঁকড়া আর মাছ ভাজা খওয়া চলছে, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

সমুদ্রের প্রতি আমার আলাদা দুর্বলতা আছে। আমার উদাসীনতা দেখে আমার বন্ধুরা সেটার সুযোগ নিয়ে আমাকে রাতের আঁধারে ভূত পেত্নি সেজে ভয় দেখিয়েছিল, যদিও সেটাতে তেমন কোনো কাজ হয়নি! পুরো ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম দেখে তারা খুব হতাশ হয়েছিল!

কিনতে পারেন কম দামে শুঁটকি! ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

এমন আরো অনেক মজার স্মৃতি ফেলে এসেছি দ্বীপটায়, অদ্ভুত মায়ার জালে জড়িয়ে গিয়েছি। যারা এখনো যাননি, গিয়ে ঘুরে আসুন, আপনারাও জড়িয়ে যাবেন!

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৭টার বাসে চলে যাবেন টেকনাফ। ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে বাস আপনাকে শিপের কাউন্টারে নামিয়ে দেবে। কেয়ারি সিন্দাবাদ, বে ক্রুজ, গ্রিন লাইনসহ আরো কয়েকটি শিপ সেন্ট মার্টিনসে যায়। শিপে উঠে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার মাঝেই পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
কক্সবাজার থেকে আসতে চাইলে বাস বা জিপে করে টেকনাফ জেটি ঘাটে চলে আসতে হবে। এরপর একই নিয়মে শিপে করে সেন্ট মার্টিনস।

খুঁটিনাটি

নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শিপ চলাচল করে। যখন শিপ চলে না, তখন ট্রলার বা স্পিড বোটে করে দ্বীপে যেতে পারবেন। আপনি যত ভালো সাঁতারুই হয়ে থাকুন না কেন, এক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই সাথে রাখতে হবে।

কাঁকড়া খাওয়ার সময় সাবধান থাকবেন। হজমে সমস্যা থাকলে না খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।পশ্চিমের সৈকতে প্রবালের পরিমাণ কম, পানিতে নেমে বেশ আরাম পাবেন। জোয়ার ভাটার সময় সৈকতে মাইকিং করা হয়। সতর্কবাণী অনুযায়ী পানিতে নামবেন এবং উঠবেন।

পুরো দ্বীপে সম্ভবত সবচেয়ে ভালো ভিউ পাবেন পশ্চিমের সৈকতের প্রিন্স হেভেন রিসোর্টের দোতলা থেকে। তবে এর রুমগুলো মাঝারি মানের। সময় ভেদে ১,২০০-২,০০০ টাকার মধ্যে রুম পেয়ে যাবেন।
পূর্বের সৈকতে মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম। অন্ধকার আর নির্জনতা অনুভব করতে চাইলে রাতে অবশ্যই ঘুরে আসবেন এখান থেকে। নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার সময় চেষ্টা করবেন হেঁটে যেতে। হোটেল ম্যানেজারকে বললে উনিই গাইড যোগাড় করে দেবেন। আসার সময় ট্রলার বা স্পিড বোটে আসতে পারেন। স্পিড বোটে আসলে আলাদা একটা রোমাঞ্চ অনুভব করবেন। ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা। যাওয়া আসা ৬০০ টাকা। ট্রলারে যাওয়া আসার ভাড়া এর অর্ধেক।

জেটি ঘাট থেকে শিপ সেন্ট মার্টিনস এর উদ্দেশ্য সকাল ৯.৩০ টায় ছেড়ে যায়। দ্বীপ থেকে টেকনাফের জেটি ঘাটে ফেরার শিপ ছেড়ে যায় দুপুর ৩.৩০টায়। সবগুলো শিপ একই সময় ছেড়ে যায় এবং ফিরে আসে। এই সময়ের মধ্যে শিপ ধরতে না পারলে আপনাকে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

যাওয়া এবং আসা মিলিয়েই আপনাকে শিপের টিকেটটি দেয়া হবে। কবে ফিরে আসবেন সেই তারিখ টিকেট কেনার সময়ই জানিয়ে দিতে হবে। নির্দিষ্ট তারিখের এক বা দুই দিন আগে বা পরে আসতে চাইলেও আসতে পারবেন। তবে তখন আপনাকে দাঁড়িয়ে আসতে হবে, সিটে বসতে পারবেন না।
সেন্ট মার্টিনসের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে এমন কিছু করবেন না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। প্রবাল কিনবেন না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

৭টি পরিচিত স্থান যার গোপন তথ্য আপনি জানেন না

মেঘপাহাড়ের দেশ সাজেক ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত