লালাখাল: জনশূন্যতা, বিস্তৃত প্রকৃতি এবং নিখাদ প্রশান্তি

পানসীতে বসে সকালের নাস্তার পর চা খাচ্ছি সবাই। বাইরে বৃষ্টিও থেমে গেছে। ভোর ৬টায় যখন সিলেট পৌঁছেছি, তখনও বৃষ্টি ছিল খানিকটা। ঠিক এক বছর পর আবারো এসেছি সিলেটে। বিছানাকান্দি, রাতারগুলে যাওয়া হয়েছিল সেবার, কিন্তু লালাখালের ভেতরে নৌকা নিয়ে আর ঢোকা হয়নি। ঘাটে পৌঁছাতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল এবং ফিরে যেতে হয়েছিল। এবার তাই লালাখাল দিয়েই ঘোরাঘুরিটা শুরু হচ্ছে।
পানসীতে ঢোকার সময় সামনেই কয়েকটা সিএনজি দাঁড়িয়েছিল। কথাবার্তা বলে তিনটা সিএনজি ঠিক করে ফেললাম। ড্রাইভাররা অপেক্ষা করছেন। চা টা শেষ করেই লালাখালের দিকে বেরিয়ে পড়ছি। আবারো হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। হালকা বৃষ্টিটা ভারি হওয়ার আগেই আমরা পনেরো জন সিএনজিতে উঠে পড়লাম। সকাল ৯টায় আমাদের নিয়ে সিএনজিগুলো চলতে শুরু করল লালাখালের পথে।

শ্যামলিমা! ছবিঃ জিম

বিছানাকান্দি বা রাতারগুলের মতো লালাখাল যাওয়ার রাস্তাটা তেমন ভাঙাচোরা নয়। মোটামুটি উপভোগ করতে করতেই আপনি পৌঁছে যাবেন নৌকা ঘাটে। লালাখালের নৌকা ঘাট আছে বেশ কয়েকটা। এবার আমরা সারিঘাটের ঘাটে যাচ্ছি না। সিএনজির ড্রাইভাররা অন্য একটা ঘাটে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। বললেন এই ঘাটে মানুষ আসে কম। নৌকার ভাড়াও অন্য ঘাটগুলো থেকে তুলনামূলক কম। ১০.৩০টায় আমরা পৌঁছে গেলাম এই ঘাটে। ঘাটের নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের ড্রাইভারদেরকে। কেউই নাম বলতে পারেননি। কোনো সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি।
খালের এক পাশে পাহাড়, ছবিঃ জিম

নৌকা ভাড়া করে ১১টার মধ্যে আমরা লালাখালের বুকে চলতে শুরু করলাম। এখানে এসে ড্রাইভারের কথার সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম। ঘাটে ছিল মোট ছ’টা নৌকা। আমরা ছাড়া অন্য কোনো দল নেই সেখানে। নৌকাও পেয়েছি বেশ সস্তায়। নৌকাটাকে বড়ই বলতে হবে। পনেরো জনের জায়গা হয়েছে সহজেই। নৌকার ভেতরে বসেছে দশ জন। ছাদে আমিসহ আছে আরো চারজন।
আমরা ১৪ জন! ছবিঃ জিম

খালের পানি এখনো ঘোলাটে। সবুজাভ নীল রঙের পানির দেখা পেতে হলে আরোও ভেতরের দিকে যেতে হবে। আমরা সেই পানি দেখার অপেক্ষাতেই আছি। এখানকার পানিতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থের বেশ জোরালো উপস্থিতি আছে। এই খনিজগুলোই পানিকে দিয়েছে এই চোখ ধাঁধানো রঙ!
সবুজ পানি! ছবিঃ জিম

ভারতের মিন্তদু নদীটি লালাখালে সারিনদী হিসেবে মিশেছে। লালাখালের চারপাশে আছে উঁচু নিচু অসংখ্য পাহাড় আর চা-বাগান। নৌকা যত ভেতরের দিকে যাচ্ছে আমরাও প্রকৃতির ততই কাছাকাছি চলে যাচ্ছি। নৌকার ইঞ্জিনের বিরক্তিকর শব্দটুকু না থাকলে এই সময়টা হয়তো উপভোগ করা যেত আরো দারুণভাবে। ইঞ্জিনের শব্দটা বাদ দিলে এই জলভ্রমণের অভিজ্ঞতাটিকে অসাধারণ বলতেই হবে!
নৌকার ছাদে বসে চারপাশ দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল টেরই পাইনি। হঠাৎ নিচে তাকিয়ে দেখি পানি আর ঘোলাটে দেখাচ্ছে না! একদম গাঢ় সবুজ একটা রঙে ছেয়ে আছে চারপাশ। আরেকটু সামনে এগুতেই রঙটা গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ হয়ে এলো। তারপর যতই সামনে এগুতে থাকলাম পানির রঙ সবুজাভ নীল থেকে নীলাভ হয়ে উঠতে থাকলো। আকাশের নীল আর লালাখালের পানির এই সবুজাভ নীল দেখে কিছুক্ষণের জন্য হয়তো নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন আপনি! প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলাটা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভালো, নিঃসন্দেহে!
অসাধারণ প্রকৃতি, ছবিঃ অনাবিল

দেড় ঘণ্টা পর আমাদের নৌকা লালাখালের ভেতরে এক পাড়ে এসে থামলো। নৌকা থেকে নেমে সবুজ পানিতে দাপাদাপি করছিলাম সবাই। ওই পাড়ে যে রাস্তাটা আছে, সেটা ধরে সামনে এগিয়ে গেলেই পড়বে চা-বাগান। নতুন করে চা-বাগান দেখার চাইতে খালের পানিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকাকেই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হলো আমাদের। এবং আমরা সেটাই করলাম!
যারা সাঁতার জানে না, নৌকায় থাকা লাইফ জ্যাকেটগুলো নিয়ে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়লো। খালের মাঝামাঝি জায়গাটায় পানি খুব বেশি গভীর নয়। সেখানেই ছিলাম সবাই। আরো গভীরে যাওয়ার জন্য লাইফ জ্যাকেটের সাহায্য নিয়েছি, যারা সাঁতার জানি তারাও। সাবধান থাকাটা সবসময়ই লাভজনক!
পুরো জায়গাটায় আমরা ছাড়া কেউ নেই। একদম জনমানবশূন্য! এই শূন্যতাও আপনি যথেষ্ট উপভোগ করবেন। দেশের ট্যুরিস্ট স্পটগুলো প্রতিনিয়তই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছে। নিজেদের মতো করে সময় কাটানোর ব্যাপারটা ইদানীং তাই বেশ দুঃসাধ্য। লালাখালে গিয়ে এই প্রশান্তিটুকু ভালোভাবেই অনুভব করেছিলাম আমরা। আনন্দ বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ।
আমাদের নৌকা, ছবিঃ জিম

প্রায় এক ঘণ্টা সবুজ পানির রাজ্যে কাটিয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম সবাই। নৌকা ফিরতি পথ ধরলো। দুপুর ২টার মধ্যে আমরা ঘাটে পৌঁছে গেলাম। এক বছরের পুরোনো আফসোস ঘুঁচে গেল কয়েক ঘণ্টায়!

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে সিলেট। শহরের যে কোনো জায়গা থেকে সিএনজি বা মাইক্রোবাসে করে লালাখালের ঘাট। এরপর নৌকায় করে লালাখাল।

খুঁটিনাটি:

বর্ষার শেষ দিক এবং পুরো শীত লালাখালের সবুজাভ রঙ দেখার আদর্শ সময়।
সারিঘাট হয়ে না গিয়ে অন্য ঘাট হয়ে গেলে নৌকার ভাড়া কম পড়বে।
আগে জাফলং হয়ে পরে লালাখাল যেতে চাইলে সকাল ৭টার মধ্যে বেরিয়ে পড়বেন এবং ১২টার আগেই সারিঘাটের জন্য রওনা দিয়ে দেবেন।
বিকেলের দিকে ঘাটে পৌঁছালে লালাখাল ঘুরে দেখতে পারবেন না।
আমরা ৮০০ টাকায় নৌকা পেয়েছিলাম। নৌকা আমাদের সাথে ছিল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা।
সিএনজি ড্রাইভার (০১৭২৯৫৫৯৯২১) আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।
লালাখাল অবশ্যই পরিচ্ছন্ন রাখবেন। চিপস, কেক বা অন্য কিছু খেয়ে প্যাকেটগুলো কোনোভাবেই পানিতে ফেলবেন না। সিগারেটের ফিল্টার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রাখবেন।
ফিচার ইমেজ – সিজান আহমেদ জিম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সেন্ট মার্টিনসের স্মরণীয় রাত

E T B এর ইভেন্ট: চন্দ্রনাথ এবং বাঁশবাড়িয়ায় ইটিবির অভিযান