পরিবারের সবার সাথে ফ্যান্টাসি কিংডমে একদিন

বেশ কিছুদিন আগের কথা। নরসিংদী থেকে আমার বড় মামা, মামী ও তাদের দুই সন্তান ঢাকায় এসেছে বেড়াতে। উঠেছে আমাদের বাসায়। কয়েকটা দিন বেশ আনন্দে ছিলাম আমরা সবাই। তারা আসার পর বনানী থেকে আরেকজন খালাতো ভাইকে আসতে বলল।

সেও চলে এলো। মামার ইচ্ছে ছিলো আমাদের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। তাই আমাদের সবার কাছে মতামত জানতে চাইল কোথায় গেলে ভালো হয়। আমরা যে যার মতো মতামত দিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত কার্যকর হলো ফ্যান্টাসি কিংডমের যাত্রা। মামাতো ভাই, বোন এবং খালাতো ভাই সাব্বির ও আমরা শেষমেষ ভোট দিলাম ফ্যান্টাসি কিংডমকে। পরদিন ছিল শুক্রবার।

সকাল সকাল সবাই ঘুম থেকে উঠলাম। আম্মু সকালের নাস্তা প্রস্তুত করবে বলে সবকিছু রেডি করছিল। এমন সময় মামা, মামী বললো বাসায় রান্না করার কোনো প্রয়োজন নেই। সকালের নাস্তা সহ দুপুরের খাবার বাইরে খাবো।

ব্যস, সবাই তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত হয়ে গেল। আম্মুও বাসায় রান্নার ঝামেলা করেনি। আম্মু, মামা, মামানি, আবদুল্লাহ, মোনা, আমি, সাব্বির, রিজা, ঝুমা, নাদিয়া সকলে বেরিয়ে পড়লাম ফ্যান্টাসি কিংডমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে ছিল আগে থেকে গাড়ি ভাড়া করে রাখার। কিন্তু কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করেও ব্যবস্থা হয়নি। তাই মামা চাইলো বাসে করে যেতে।

আমাদের বাসার রোডের মাথায় একটি হোটেল আছে। সেখান থেকে আমরা সবাই পরোটা, ডিম, ডাল ও চা খেয়ে নিলাম। দারুণ রোমাঞ্চকর লাগছিল। মামা ও মামাতো ভাই-বোনের হৈ হুল্লোড় দেখে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কয়েকদিনের ট্যুরে যাচ্ছি।

তারপর একটি বাসে করে আমরা গাবতলী গেলাম। গাবতলী থেকে বিআরটিসি বাসে উঠলাম ফ্যান্টাসি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বিআরটিসি ডাবল ডেকার বাসের দোতলায় বসলাম আমরা সবাই। বেশ উপভোগ করলাম জার্নিটা। তবে বিআরটিসি বাস খুব ধীরে ধীরে চলছিল মনে হয়েছে। বিভিন্ন স্টপেজে বাস থামছিল এবং রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিল।

মোহাম্মদপুর থেকে সাভার যেতে সময় লেগেছিল দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। বিআরটিসি বাস সাভার নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে আমাদের নামিয়ে দিয়েছে। তারপর আমরা ফ্যান্টাসি কিংডমগামী একটি বাসে করে ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে নামলাম। তারপর তো আমাদের খুশির সীমা ছিল না। মামা এবং সাব্বির টিকেট কেটে আনলো। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কোনো রাইডে চড়বো না। শুধুমাত্র ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে যাবো এবং ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের সব রাইডে চড়ব।

Photo: Fantasy kingdom

টিকেট কেটে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। তারপর খানিকটা ঘুরলাম। ফটোসেশন করলাম। স্বপ্নরাজ্যের মতো লাগছিল ফ্যান্টাসি কিংডমকে। অপরূপভাবে সাজানো। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সজ্জা ছিল অসাধারণ। ফ্যান্টাসি কিংডমের মূল গেট মূলত অসাধারণ এবং প্রধান আকর্ষণ। তাছাড়া বিভিন্ন রাইডগুলো বেশ রোমাঞ্চকর। আমার ছোট বোনেরা এবং মামাতো ভাই বিভিন্ন রাইডে চড়েছে।

ছবিসূত্রঃ লেখক

আমি রাইড খুব ভয় পাই। এত উঁচু উঁচু রাইডে আমি চড়তে পারি না। ভয়ে হাত পা কাঁপে।

ছবিসূত্রঃ লেখক

ওয়াটার কিংডমে প্রবেশের রাস্তাটি বেশ চমৎকার। নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ এই সরু গলি দিয়ে হাঁটতেই মন আনন্দে ভরে উঠল। নীল আলোকরশ্মিতে পরিপূর্ণ ছিল চলার পথ। আমরা খানিক সময় ধরে দেখলাম এবং কিছু ছবি তুললাম। ভার্চুয়াল অ্যাকুরিয়াম টানেল পার হয়ে ওয়াটার কিংডমে যেতে হয়।

ছবিসূত্রঃ লেখক

দারুণ অনুভূতি অর্জন করেছিলাম আমরা। ওয়াটার কিংডমে যেতেই চেঞ্জিং রুমে গিয়ে সবাই ড্রেস চেঞ্জ করে পানিতে নেমে পড়লাম। হুড়মুড় করে পানিতে নেমেছি। দিনটি ছিল শুক্রবার। তাই বেশ ভিড় ছিল। পরিবার ও আত্মীয়দের নিয়ে অনেকেই এখানে এসেছে। কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে ওয়াটার কিংডমের সকল রাইড এবং ওয়েভপুল।

ছবিসূত্রঃ লেখক

সমুদ্রের মতো এখানে কৃত্রিম ঢেউ দেওয়া হয়। আমরা পুরোটা বেশ উপভোগ করেছি। সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছে ৯ বছর বয়সী মামাতো ভাই আবদুল্লাহ। সে তো নিজের মতো করে এখান থেকে সেখানে, এক রাইড থেকে অন্য রাইডে চড়ছিল।

ওর ছুটোছুটি, আনন্দ- উল্লাস দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। আমার কেবল মনে হয়েছে ওর আনন্দের জন্যই আজকে আমাদের ভ্রমণটা সার্থক হয়েছে। আমরা সবাই অনেকটা বড়। আমরা আবদুল্লাহর মতো ওতো ছুটোছুটি করছি না।

ছবিসূত্রঃ লেখক

তবে পুরো মূহুর্তটা দারুণভাবে উপভোগ করেছি। এছাড়াও রয়েছে ফ্যামিলি পুল, স্পাইড ওয়ার্ল্ড, লেজি রিভার, ওয়াটার ফল, মাল্টি স্পাইড, লস্ট কিংডম, ড্যান্সিং জোন, ডুম স্পাইডসহ মজাদার ও রোমাঞ্চকর রাইড।

ছবিসূত্রঃ newsg24

প্রতিটি ওয়াটার পুলে আমরা গিয়েছি। ড্যান্সিং জোনে বেশ মজা হয়েছে। অনেক মানুষ থাকায় এবং মিউজিক থাকায় সবাই মিলে একসাথে অনেক নাচানাচি হয়েছে। ড্যান্সিং জোনের উপর থেকে একজন ডিজে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল এবং গান বাজাচ্ছিল।

আর পানিতে থাকা সকল ভ্রমণ পিয়াসুরা উল্লাসে মেতে উঠেছিল। অনেক মানুষের ভিড়ে কিছু বখাটে ছেলেও ছিল, যারা মেয়েদের বিরক্ত করার ফন্দি এঁটেছিল মনে। আমাদের সাথে গার্ডিয়ান থাকায় কোনো রকম দুষ্টুমি করতে পারেনি।

ছবিসূত্রঃ লেখক

এখানে কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়ার জন্যে এখানে রয়েছে একাধিক শপ। আইসক্রিম শপ থেকে আমরা সবাই আইসক্রিম খেয়েছিলাম। পানিতে নামার পর আমরা প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। কখন যে তিন-চার ঘণ্টা চলে গেছে টেরই পাইনি।

ছবিসূত্রঃ লেখক

ফ্যান্টাসি কিংডমে বিভিন্ন রাইড ও ওয়াটার কিংডমের বিভিন্ন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক স্টাইলে  তৈরি করা হয়েছে। কনকর্ড গ্রুপ এটি তৈরি করেছে। এখানে বিভিন্ন রাইড ছাড়াও রয়েছে হেরিটেজ পার্ক, রিসোর্ট ও অন্যান্য সুবিধাদি। রিসোর্টে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন রুম রয়েছে। যে কেউ চাইলে তার অভিরুচি অনুযায়ী যেকোনো একটি রুমে থাকতে পারে।

রিসোর্টে রয়েছে ক্যাফে সুবিধা, রেস্টুরেন্ট, কার পার্কিং, কনফারেন্স সেন্টার, সাইবার ক্যাফে, সিনেমা হল ও বিভিন্ন গেমের আয়োজন। ফ্যান্টাসি কিংডমের ভেতরে বিয়ে, জন্মদিন, পার্টি, সেমিনার, পুনর্মিলনী সহ নানা প্রোগ্রামের আয়োজনের সুব্যবস্থা রয়েছে।

খোলা ও বন্ধের সময়সূচী

প্রতিদিনই ফ্যান্টাসি কিংডম খোলা থাকে। সাধারন দিনগুলোতে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ছুটির দিনগুলোতে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

টিকেট মূল্য

ফ্যান্টাসি কিংডমের প্রবেশমূল্য ও রাইড মিলিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফ্যান্টাসি কিংডমে বিভিন্ন ছাড় দেয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকেট মূল্য ৩৮০ টাকা, প্রবেশ ও সব রাইড মিলিয়ে ৭০০ টাকা। চার ফুটের কম বাচ্চাদের জন্য প্রবেশমূল্য ২৫০ টাকা, সব রাইড ৪৫০ টাকা।
ফিচার ইমেজ সোর্স- কালের কণ্ঠ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজার সন্ধানে

মেঘালয়ে মেঘবিলাস: লাইতলুম ক্যানিয়নের মুগ্ধতা