গ্রামে শীত আসে বিশেষ রূপে

শীতকাল আমাদের জন্য অন্যান্য ঋতু থেকে সবসময় আলাদা। শীতের ছোঁয়া পেতেই বদলে যায় আমাদের মানসিক অবস্থা ও চারপাশের পরিবেশ। এসময়ে আমরা নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া থেকে শুরু করে পোশাক পরিচ্ছদে পর্যন্ত নিয়ে আসি ভিন্নতার ছোঁয়া।

শীতকে বরণ করে নিতে শহরের চাইতে গ্রামে থাকে বিশেষ আয়োজন ও মালমসলা। শুধু শীতকাল নয়, বছরের ছয়টি ঋতুকে মনের মতো করে উপভোগ করতে গ্রাম সবচেয়ে উপযোগী জায়গা। আমাদের বইপত্রে যে বাংলাদেশের চিত্র দেখতে পাই, তার আসল প্রতিফলনই খুঁজে পাওয়া যায় গ্রামে। গ্রামের মানুষও আলাদা আলাদাভাবে উপযোগ করে প্রতিটি ঋতুকে। ঋতুগুলোও তার আসল রূপ নিয়ে হাজির হয়ে যায় গ্রামে। যার মধ্যে শীত অন্যতম।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাঝে কালির ছড়া গ্রাম। ছবি :লেখক

আমার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার ঈদঁগাও ইউনিয়নের কালিরছড়া গ্রামের আদলে আপনাদেরকে গ্রামের শীতকালের গল্প শোনাতে চলে এসেছি আমি । চলুন তাহলে আর দেরি না করে শুরু করা যাক।

শীতকাল শুরু হওয়ার মাসখানেক আগেই শিশির ভেজা সকাল আমাদের কাছে চলে আসে শীতের আগমনী বার্তা রূপে। সকালে প্রতিটি গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো জানিয়ে দেয় শীতের উপস্থিতি। টিনের চালে শিশির বিন্দু পড়ার শব্দও বিমোহিত করে প্রতিটি মুহূর্তে। এই বুঝি চলে এলো শীতকাল। তাই আর দেরি না করে তাকে বরণ করে নিতে বছর জুড়ে আলমারিতে জমিয়ে রাখা লেপ-তোষক রোদে গরম করে নেওয়া হয়। আর তাড়ানো হয় পুরনো গন্ধকে।

ধান মাড়ায় ও শুকানোর কাজ হচ্ছে। ছবি :লেখক

প্রতিদিন রাতে পাখা ছেড়ে ঘুমাবে কি ঘুমাবে না এমন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতেই চলে আসে শীতকাল। শুরু হয়ে যায় আরামপ্রিয় মানুষদের সুখের দিন। নানা স্তরের মানুষ নিজ নিজ সাধ্যকে কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করে পুরো ঋতুকে উপভোগ করতে। আর সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন গ্রামের কৃষক। এখনই যে তার সারা বছরের সঞ্চয় করার সময় চলে এসেছে। তার সকল পরিশ্রমের সুফল পাওয়ার সময় এসেছে।

শীতকালে হয় নানারকম সবজির চাষ। ছবি :লেখক

পাকা ধান ঠিক মতো ঘরে তোলা, মাড়ায় করা, মিষ্টি রোদে ধান শুকিয়ে তোলা, জমিদারের ভাগ জমিদারকে বুঝিয়ে দিয়ে নিজের ভাগকে গোলায় তোলা। আবার সবদিকে ধান কাটার ধুম পড়ে বলে যে কৃষকরা নিজের কাজ আগে আগে শেষ করে ফেলে তারা শ্রমিক হিসেবে অন্যের ধান কাটতে যায়। ফলে সুযোগ হয় বাড়তি আয়ের।

খেজুর গুড়ের ভাপা পিঠা। ছবি: লেখক

তারপরও বসে থাকার সুযোগ নেই কৃষকের। ধান কেটে ফেলা জমিতে শুরু হয় বেগুন, টমেটো, মরিচ, ঢেড়শ, শিম, বরবটি সহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজির চাষ। বেশিরভাগই নিজেদের সবজির চাহিদা মেটাতেই এসব চাষ করে, তারপরও যারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে করে তারা স্থানীয় বাজার বা পাইকারি আড়তদারদের কাছে এসব সবজি বিক্রি করে। বলা যায় গ্রামের কৃষকদের কাছে শীতকাল আসে আশীর্বাদ রূপে।

শীতকে উপেক্ষা করে মাঠে মাঠে চলে ব্যাডমিন্টন খেলা। ছবি :লেখক

শহরের মতো পোড়া মোবিল দিয়ে এখানে আগুন পোহানো হয় না। আগুন পোহাতেও এ গ্রামে করা হয় বিশেষ আয়োজন। এসময়ে গাছের পাতাগুলোও ঝরে পড়ার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। দিনের শেষভাগে বাড়ির চারপাশের গাছ থেকে পড়া শুকনো পাতাগুলোকে এক জায়গায় জমিয়ে রাখেন মা। কুয়াশা ভেজা সকালেই সে পাতা দিয়েই আগুন পোহানো হয়।

গ্রামের সূর্যাস্ত। ছবি :লেখক

আবার সকালের মধুর রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে হয়ে যায় এক পরশা খোশগল্প বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পারিবারিক আলোচনা। এ এক একেবারে নিয়মিত ব্যাপার প্রতিটি পরিবারের জন্য। আবার এ সকালেই পাড়ার ছোট ছোট খুপরি দোকানগুলোতে রং চা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়।

চলছে চড়ুইভাতি। ছবি: লেখক

আর সন্ধ্যা বেলা গরম গরম গুড়ের জিলাপি আর মুড়ি খেতে খেতে জমে ওঠে বন্ধুত্বের আড্ডা। এই শীতের মৌসুমেই দেশের নানা প্রান্তে পড়ালেখা করতে যাওয়া গ্রামের বন্ধুগুলোও বাড়ি চলে আসলে হয়ে যায় এক মিলনমেলা। আবার কনকনে শীতকে তোয়াক্কা না করে মাঠে মাঠে চলে ব্যাডমিন্টন খেলা।

শীতের বিশেষ আকর্ষণ থাকে পিঠা। খেজুরের রস, দেশি মুরগী আর বড় আলুর তরকারী দিয়ে ভাপাপিঠার কোনো জুড়ি নেই। বলতেই জিভে জল চলে আসছে। সূর্য উঠার আগেই মা চুলায় চলে যায় ভাপা পিঠা তৈরি করতে। আর কনকনে শীতেই হয় আহার। এছাড়া শীতের আরও পিঠা রয়েছে চিতই, পাটিসাপটা, দুধ পুলি, পাঙ্কন ইত্যাদি।

গুড়ের জিলাপি। ছবি :লেখক

আবার যদি বলতে যাই আমাদের শীতঋতু আসে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে। তখন প্রায় সব স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। এটা বাচ্চাদের জন্য বেড়ানোর সবচেয়ে উপযোগী সময়। তার মধ্যে অন্যতম হলো নানুবাড়ি। এসময় সকলের মিলনমেলা থাকে গ্রামের প্রতিটি ঘরে। ছোট-বড় সকলে মিলে হয়ে যায় চড়ুইভাতি। নিজেদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে এই চড়ুইভাতি বেশ কার্যকর। সব ধরনের ব্যস্ততা ভুলে পরিবারের সকলের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর এই তো সুযোগ।

রাত ৮/৯টা বাজতেই এখানে নেমে আসে গভীর রাত। থেমে যায় সকল ধরনের কর্মচাঞ্চল্য। চারদিকে নেমে আসে নীরবতা। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ আর টিনের চালে শিশির পড়ার শব্দ হতে পারে আপনার বাকি রাতের সঙ্গী।

শহরের কোলাহলকে ছুটি দিয়ে এমন প্রশান্তিতে কয়টা দিন কাটাতে চাইলে আজই বেরিয়ে পড়ুন কোনো বন্ধুর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্য। তাকে জানিয়ে বা না জানিয়ে। হয়তো সেও অপেক্ষা করছে আপনাকে তার গ্রামীণ প্রকৃতি দেখাতে। আর গ্রাম নির্বাচন করার সময়ও একটু দেখেশুনে করবেন, না হয় আপনার নানা বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফিচার ইমেজ : মোমেন উদ্দিন চৌধুরী

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যদুনাথ রায়ের জমিদার বাড়ির আদ্যোপান্ত

নিসর্গপ্রেমীদের খৈয়াছড়া ঝর্ণায় অ্যাডভেঞ্চার