বরফের চাদরে ঢাকা মানালির মুগ্ধতায়

মানালি পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা, বিয়াস নদীর গা ঘেঁষে আর পাহাড়ের পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে, রাতের আকাশের তারাদের অভিবাদন, খণ্ড চাঁদের আলোকিত আমন্ত্রণ আর দূরের শ্বেত শুভ্র পাহাড় চূড়াদের নিমন্ত্রণ, মানালিতে স্বাগতম।

ঝমঝম শব্দে লোহার ব্রিজ পেরিয়ে মানালি শহরে ঢুকে পড়লাম। আলোয় আলোয় আলোকিত সারা মল চত্বর, রাস্তা-ঘাট, গাছপালা, বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট, যেন পুরো শহর সেজেছে বিয়ের সাজে। আসলেই তাই, মানালিতে বছরের প্রথমটা এমনই বর্ণময়, বর্ণিল, বাঁধনহারা, বাঁধভাঙা।

বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। ছবিঃ লেখক

উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা, মায়া আর মাদকতা, আবেগ আর আকুলতায় ভরা, ঝকঝকে-তকতকে, রঙে-রঙে রঙিন আর লোকে-লোকে লোকারণ্য প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কোণ। নেই কারোই কোনো ব্যস্ততা।

নেই দ্রুত হাঁটার কার্যকারিতা, নেই হাক-ডাকের বালাই, এ যেন স্বপ্নের এক অলসপুরী। আমাদের গাড়ি সরু পীচ ঢালা রাস্তা ধরে আর পাহাড়ের বাঁকে-বাঁকে, এঁকেবেঁকে উপরের দিকে উঠছে আর বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না, মনে হচ্ছে নেমে হেঁটেই যাই। কিন্তু পথ যে চিনি না, গাড়ি চলছে তো চলছেই থামার কোনো লক্ষণই নেই।

সবাই নামার জন্য অস্থির, আর কতক্ষণ? এই সামনেই ড্রাইভারের উত্তর, কিন্তু পথ যেন শেষই হতে চায় না। কতক্ষণই বা ৫ বা ৭ মিনিট। তাই যেন অনন্তকাল।
“আমাদের হোটেল?”
“হবে সেখানেই, যার পরে আর রাস্তা নেই।”
“যে জায়গা থেকে আর কোথাও যাওয়া যায় না।”
“যার পরে আর গাড়ি যায় না।”
“প্রত্যন্ত এলাকায়, যার পরে আর কিছুই নেই।”

এই সব উল্টোপাল্টা মন্তব্য করছিলাম আমি সারাদিনের ক্লান্তির অবসন্নতায়। আমার কথা শুনে ড্রাইভার একটু মন খারাপই করলো। আর অন্যরাও আমাকে বকতে লাগলো, থামাতে চাইলো।
তবে হ্যাঁ গাড়ি থামলো, একদম পথের শেষেই, একেবারেই প্রান্তরে, যার পরে আসলেই আর যাবার জায়গা, রাস্তা বা সামনে নেই কোনোই গন্তব্য। সুতরাং এবার আমি আবারো সরব হলাম, আগের মন্তব্যগুলো সঠিক ছিল বলে।

মানালির স্বপ্ন কুটির। ছবিঃ শাহরিয়ার

হোটেলে ঢুকে গেলাম, হুড়মুড় করে, কোনো দিকেই না তাকিয়ে, ক্লান্তিতে ক্লিষ্ট হয়ে, স্নান করে শান্ত হতে। ঘণ্টাখানেক পরে নিচে নেমে এলাম, সবাই একে একে। এবারই প্রথম হোটেলের পাশে বরফ দেখলাম। মনটা খুশিতে নেচে উঠলো শিমলাতে, প্রথম বরফ দেখার মতোই।

কিছুটা আশ্বস্ত হলাম, যাক তবে বরফের আশেপাশেই আছি। দু-একটা করে ছবি সবাই তুললাম। তখনো জানি না যে আমরা চারদিকে বরফের স্তূপ আর বরফে ঢাকা এক স্বপ্ন কুটিরেই রাত কাটাবো।
হেঁটে হেঁটে নেমে গেলাম মলের দিকে।

কিছুক্ষণ আগে উপরে উঠার রাস্তা ধরে, কিন্তু দেখতে পারিনি তেমন কিছুই শুধু পথে বিভিন্ন ঢং আর আকৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটিরের আবছা সৌন্দর্য ছাড়া, চারদিকে যে কুয়াশায় জড়ানো মেঘে মোড়ানো বরফে হারানো নিয়ন বাতির অনুজ্জ্বল আলোতে নেভানো।

মল চত্বরে কিছুক্ষণের উন্মত্ততা শেষে, গরম গরম রসগোল্লায় মন ভরে, আস্ত মুরগীর গ্রিল, নান বা সেই জাতীয় রুটি, আর সাথে সামান্য পানীয় নিয়ে মানালির বিখ্যাত উইন্টার ফেস্টিভ্যালের বর্ণিলতার উষ্ণতা গায়ে মেখে ফেরার পথে, অন্ধকারে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন কিছু উদ্ধার করতে করতে রুমে ফেরা আর খেয়ে দেয়ে ডাবল কম্বলের নিচে উষ্ণতার খোঁজে হারিয়ে যাওয়া।

কে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কেউ জানি না। খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ কচলে, বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। সারাদিন কী করবো এই সব ভাবতে ভাবতে জানালার অনেক ভারী পর্দা সরাতেই হাঁ হয়ে গেলাম। শরীরের প্রতিটি রোম জেগে উঠলো। স্তম্ভিত হয়ে ভুলে গেলাম পিছনের সবকিছু এক নিমেষেই।

মানালির অদ্ভুত সকাল। ছবিঃ শাহরিয়ার

এ তো পুরোই স্বপ্নপুরী। এতদিন ধরে সিনেমায় যেমন দেখেছি হলিউড, বলিউডের। যতদূর চোখ যায় শুধু সাদা আর সাদা। নরম বরফে মোড়ানো চারদিক পাইনের কালো গাছ আর সাদার শুভ্রতায় মোড়ানো পাতা। কাছের পাহাড়, দুরের পাহাড় সব সবই বরফে জড়ানো, সাদায় মোড়ানো, বারান্দায় বরফ।

রেলিংয়ে বরফ। জানালায় বরফ। বরফ আর বরফ। যেন বরফের জন্মভূমি, বরফের একাকার চারদিক।
সবাই মিলে শতেক ছবি তো তুললামই। কিছুক্ষণ পরে পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরে নেমে এলাম হোটেলের নিচে এবার সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ প্রায়। আরে এ যে অনেক নাম শোনা হাদিম্বা টেম্পলের পাশেই আমরা। যেন সুইজারল্যান্ডের আবহ।

দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত স্তরে স্তরে উঠে যাওয়া বরফ পাহাড়। যেখানেই একটু সমতল, সেখানেই একটি রঙিন কুটির। হাজার রঙের বর্ণিলতায় সাজানো। যার যে রঙ ইচ্ছে মতোন। বাড়ির ছাদগুলো সব তুষারে ঢাকা। গাড়িগুলো সব তুষারে জড়ানো। প্রতিটি কুটিরের প্রবেশ মুখে যেন তুষারের দেয়াল। তুষারের গেট।

তুষারের আঙিনা। ছবিঃ জামিল

পত্রহীন আপেলের গাছে গাছে তুষারের ঝুলে থাকা। সেও এক অপার্থিব সম্মোহন। ওখানেই কাটিয়ে দিলাম একটি বেলা তুষার মেখে, তুষার ছুঁড়ে, তুষারে হেঁটে, বরফে শুয়ে, স্লাইডিং করে, লাফিয়ে-দাপিয়ে, বরফ নিয়ে মারামারি করে

উদ্দাম উদযাপন করে, আপেলের গাছে ঝুলে পাইনের বনে হারিয়ে গিয়ে জমাট বাঁধা তুষার কেটে কেটে যতদূর পারি হেঁটে হেঁটে সেই অপার রূপ-রস-গন্ধ, তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করে গত রাতের অপূর্ণতার আফসোসে পুড়ে পুড়ে পূর্ণতার প্রাপ্তিতে, বরফের শ্বেত শুভ্রতায় হারিয়ে গিয়ে।

স্তব্ধ করে দেয়া শুভ্রতা। ছবিঃ লেখক

যেভাবে আর যখন গেলে মানালির এই রূপ পাওয়া যায়:

ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লী বাস, ট্রেন বা প্লেন। দিল্লী থেকে বাস বা জীপে করে মানালি যেতে হবে। আর মানালির এই রূপ পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির যে কোনো সময়।
ফিচার ইমেজ- শাহরিয়ার

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
    • ২০ হাজার জন প্রতি ট্রেন আর বাসে যাওয়া আসা করলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তেতুলিয়া: সমতলের চা বাগানের গল্প

বাংলাদেশের চমৎকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাস ডায়েরি