পাহাড় ট্রেকিংয়ে মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

গত কয়েক বছরে সারা বিশ্বে ভ্রমণ পিপাসুর সংখ্যাটা বেশ বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। অপরূপ এই দেশটির সকল প্রান্তের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে চলছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের দল। পথ থেকে পথে, গ্রাম থেকে গ্রামে, পাহাড় থেকে পাহাড়ে। সাথে নদী, সমুদ্র, ঝর্ণা কোনোটিই বাদ যাচ্ছে না ভ্রমণের তালিকা থেকে। তার মধ্যে পাহাড় ট্রেকিং বর্তমানে অধিক জনপ্রিয়।

আজকালকার তরুণরা অ্যাডভেঞ্চার বেশি পছন্দ করে। তাই পাহাড় ট্রেকিং তাদের প্রিয় তালিকার শীর্ষে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চোখ বুলালেই এর সত্যতা টের পাওয়া যায়। পাহাড় ট্রেকিং অনেকটা অ্যাডভেঞ্চার অনুভূতি এনে দেয় বলে তরুণ থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের ট্রাভেলারদেরই দেখা যায় পাহাড়ি পথে।

তবে পাহাড় ট্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু বিষয় জানা উচিত বা খেয়াল রাখা উচিত। নিজে পাহাড় ট্রেকিংয়ে গিয়ে যেসব বিষয় খেয়াল করেছি তা নিয়েই মূলত এই লেখাটি। আর আমার এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জেনে আপনার পরবর্তী পাহাড় ট্রেকিংয়ের প্রস্তুতিটি হয়তো কিছুটা ভালো হতে পারে।

চলুন জেনে নেয়া যাক পাহাড় ট্রেকিংয়ের সময় মনে রাখার মতো কয়েকটি বিষয়।

১. ব্যক্তিগত সুস্থতা নিশ্চিত করা:

পাহাড়ি পথে লেখিকার যাত্রা; সোর্স: আকতার-উজ-জামান মুন্না

পাহাড় ট্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। আপনার শারীরিক অবস্থা যদি কিছুটাও খারাপ হয়, তবে দয়া করে সেই সময় পাহাড় ট্রেকিংয়ে যাবেন না। কারণ সচরাচর আমরা সমতল ভূমিতে হেঁটে অভ্যস্ত, তাই পাহাড়ি রাস্তাটিকেও তেমন ভেবে নেই। পথটা যে কঠিন ঠিক সেখানে না যাওয়া পর্যন্ত বুঝতে পারি না।

তাছাড়া পাহাড়ি পথগুলোতে কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাও হাতের নাগালে বা সহজেই পাওয়া যায় না। তাই আপনার কিছুটা অসুস্থতা যদি অনেক পথ যাওয়ার পর বড় অসুস্থতায় রূপ নেয়, তবে আপনার সঙ্গে আরো অনেকগুলো মানুষ বিপদে পড়বে, যদি দলে যান। (আমাদের নিজেদের মধ্যে একজন পাহাড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাকি সকলকেই বিপদে পড়তে হয়েছিলো।)

২. পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউকে দলে রাখা:

পাহাড়ি পথে দলে চলাচল; সোর্স: নাজমুন নাহার স্নিগ্ধা

পাহাড় ট্রেকিংয়ে একা না যাওয়াই উত্তম। দলে গেলে যেমন একে অন্যের খেয়াল রাখার সুযোগ থাকে, তেমনি আনন্দগুলো ভাগাভাগি করারও সুযোগ থাকে। আর দলে গেলে খেয়াল রাখা উচিত যাতে একজন হলেও এমন কেউ থাকে যে এই পথটিতে পূর্বে ট্রেকিং করেছে ও এই পথটি সম্পর্কে জানে।

সেক্ষেত্রে কোন পথে কী বিপদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, কোন পথে কীভাবে চললে সুবিধা হয় তা সম্পর্কে সে আগেই বলে দিতে পারবে। এতে বাকিরাও সে অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে পারবে। (দলে পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কেউ না থাকায় কিছু কিছু স্থানে চলতে কষ্ট হয়েছিলো)।

৩. চোখ-কান খুলে পথ চলা:

পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে পথ চলা; সোর্স: নাজমুন নাহার স্নিগ্ধা

পাহাড়ি রাস্তা কখনো চওড়া, কখনো সরু, কখনো কোথাও ভেজা মাটির পথ আর কখনো বা শুকনো ধুলো ভরা। একেক পথে একেক রকম প্রস্তুতি নিয়ে হাঁটতে হয়। চওড়া পথে যেমন নিশ্চিতে হাঁটতে পারবেন, সরু পথে তেমনটি পারবেন না। আবার ভেজা মাটিতে হাঁটার সময় যেমন খেয়াল রাখতে হবে যাতে পিছলে না পড়েন, তেমন শুকনো ধুলোর মাটিতেও খেয়াল রাখতে হবে যাতে পা পিছলে পড়ে না যান।

এক্ষেত্রে একেক পথে একেক রকম প্রস্তুতির প্রয়োজন। তাই নিজেকে সব পথের জন্যই মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। যেহেতু পথগুলো বলে-কয়ে রূপ পাল্টাচ্ছে না, তাই চোখ-কান খোলা রেখে পথ চলাই একমাত্র উত্তম পন্থা।

৪. যেসব অসুস্থতায় অধিক সতর্ক থাকা উচিত:

পাহাড়ি পথে বিশ্রাম নিয়ে নেয়া; সোর্স: লেখিকা

অনেকেরই হাইটফোবিয়া বা উচ্চতার ভয়জনিত একটি সমস্যা থাকে। এটি নিয়ে যদিও বেশিরভাগই আলাদা করে ভেবে দেখে না। তবে যদি আপনি পাহাড়ের পথে ভ্রমণে যান তবে আপনার এই বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা উচিত যে আপনার উচ্চতা ভীতি আছে কিনা।

এটি নির্ণয় করার একটি সহজ উপায় হলো বাড়ির ছাদ বা উঁচু স্থানের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিচে তাকানো। যদি নিচে তাকালে আপনার অনেক ভয় কাজ করে, মাথা ঘুরে ওঠে কিংবা শরীরে হালকা কাঁপুনি আসে তবে ধরে নিতে হবে আপনার হাইট ফোবিয়া বা উচ্চতা ভীতি রয়েছে। আর এটি সাধারণ পর্যায়ের ভীতি নাকি গুরুতর পর্যায়ের, সেটিও আপনি তখনই বুঝতে পারবেন।

হাইট ফোবিয়া থেকে থাকলে আপনার পাহাড় এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। কারণ পাহাড়ি উচ্চতায় গেলে এই ভীতি আপনার গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে (আমাদের দলে যে ব্যক্তিটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তার অসুস্থতার মূল কারণ ছিল হাইট ফোবিয়া)।

আর তাছাড়া আপনার যদি অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট থেকে থাকে তবে প্রয়োজনীয় ওষুধ অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। কারণ পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় সমতলে হাঁটার তুলনায় শারীরিক কসরত করতে হয় কিছুটা বেশি। শ্বাসকষ্টের সমস্যাটা তাতে বেড়ে যেতে পারে, তাই ইনহেলার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়াল করে সঙ্গে নিন (আমি নিজেই শ্বাসকষ্টে ভুগেছিলাম। শীতকালে যাওয়ায়, ঠাণ্ডায় সমস্যা আরো বেড়েছিল)।

৫. একই তালে হাঁটা:

পাহাড়ের বুক জুড়ে থাকা পথ; সোর্স: নাজমুন নাহার স্নিগ্ধা

পাহাড়ে চলার প্রথম দিকে সকলেই খানিকটা বেশি উত্তেজিত ও আনন্দিত থাকে। সেই অতি উত্তেজনা ও আনন্দেই পথ চলে অনেক দ্রুত, কেউ কেউ প্রায় দৌড়েই আগানোর চেষ্টা করে। এতে করে অনেকটা শক্তি শুরুতেই খরচ হয়ে যায়, পরবর্তীতে তারাই দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়। তাই পাহাড়ে চলার সময় অতি দ্রুত কিংবা অতি ধীরে না চলে একটি নির্দিষ্ট তালে চলাই উত্তম।

একই তালে পথ চললে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। এতে করে আপনার শরীরও একইভাবে মানিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবে। পাহাড়িদের হাঁটার গতি লক্ষ্য করে বুঝতে পারবেন তারা তাড়াহুড়ো না করে একই তালে হাঁটেন। অভ্যস্ততার পাশাপাশি এটি একটি পদ্ধতিও শক্তি ধরে রাখার (পাহাড়িদের কাছ থেকেই জেনেছিলাম এ তথ্য)।

সর্বোপরি, ভীতির কিছুই নেই। পাহাড় ট্রেকিং খুব বেশি কঠিন কিছুই নয়। তবে আমরা যেহেতু সমতল ভূমিতে চলাচল করে অভ্যস্ত তাই পথটি আমাদের জন্য কিছুটা কঠিন। তবে নিজেদের কিছুটা পূর্ব জ্ঞান ও পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে সেই কিছুটা কঠিন পথও সহজ হয়ে উঠবে। প্রস্তুতিগুলো নিয়ে আজই না হয় বেড়িয়ে গেলেন পাহাড়ের উদ্দেশ্যে! পাহাড় প্রেম এক অসাধারণ অনুভূতি। এই যে, নিজেই এই পাহাড়ের প্রেমে ডুবে গেছি!

ফিচার ছবি- সানজিদা আলম ইভা

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: আর্মেনিয়ানদের আরমানিটোলা

রাঙামাটি শহরে পাহাড়িদের ঐতিহ্যময় উপহারের পসরা