দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সমাধিক্ষেত্র চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি

একদিন সারাদিন চট্টগ্রাম ঘুরবো, এই ইচ্ছে নিয়ে গিয়েছিলাম বন্দর নগরীতে। ঘুরেছি। পরদিন সকাল সাড়ে এগারোটায় ট্রেন। যেহেতু অনেকটা সময় পাওয়া গেছে, তাই সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলাম চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি দেখতে। কিছু চিনি না বলে বন্ধু নিলয় কিছুক্ষণ পর পরই কল করে খবর নিচ্ছিল, আমি হারিয়ে যাচ্ছি কিনা। গতকাল সারাদিন অফিস ফাঁকি দিয়ে আমার সাথে সঙ্গ দিয়েছে চট্টগ্রাম শহর ঘুরে দেখার জন্য। আজ আর পারেনি। তাই ফোনে যতটুকু সহায়তা করা যায়, করছে।

প্রবেশপথ পেরুনোর পর পিচঢালা রাস্তা। সোর্স: লেখিকা

জিইসি মোড় থেকে রিকশাওয়ালা সিমেট্রি আসার জন্য ভাড়া চেয়েছিল ৫০ টাকা। নিলয় বলেছিল, এখান থেকে হেঁটে যেতে বড়জোর পনেরো মিনিট লাগবে। বাদশা মিয়া সড়কের মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসতে লাগলো সাত মিনিট। তারপর বাদশা মিয়া সড়কে পা বাড়িয়েই বুঝলাম, কেন রিকশাচালক এত টাকা চেয়েছে। এই রাস্তাটা ক্রমশ খাড়া উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। এত উপরে টেনে নিতে রিকশাওয়ালার জান বেরিয়ে যেত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কাছেই। ওটা ঘুরে নিয়ে ঢুকে পড়লাম বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সমাধিসৌধ দেখতে। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম পিচঢালা রাস্তা ধরে। রাস্তার দুই ধারে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ। তারমধ্যে সবার আগে নজর কাড়বে বড় বড় কাঠগোলাপ গাছগুলো। সাদা এবং লাল, দুই ধরনের গাছ জুড়েই ফুটে রয়েছে অসংখ্য ফুল।

সমাধিস্থলের মাঝখান বরাবর একটি দৃষ্টিনন্দন ক্রুশ চিহ্নিত বেদি। সোর্স: লেখিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তি সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বাদশা মিয়া সড়কের পাহাড়ের টিলায় এই ওয়ার সিমেট্রি প্রতিষ্ঠা করে। সূচনালগ্নে এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রায় ৪০০টি কবর ছিল। তবে বর্তমানে এখানে ৭৫৫টি কবর বিদ্যমান, যার ১৭টি অজানা ব্যক্তির।

এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাতীয় বিদেশী সৈন্যদের প্রায় ২০টি (১ জন ডাচ এবং ১৯ জন জাপানি) সমাধি আছে। এছাড়া এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) চট্টগ্রাম-বোম্বের একটি স্মারক বিদ্যামান।

মূল গেট দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানে লেখা একটা রেজিস্ট্রার আছে। সোর্স: লেখিকা

পাহাড়ের কোলে শান্ত, নিরিবিলি, শ্যামল ছায়ায় ঘুমিয়ে আছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সেনা ও বিমান বাহিনীর ৭৫১ জন বীর যোদ্ধা। দেশের মায়া কাটিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে যুদ্ধ করে বিজয়ীর বেশে দেশে ফেলে আসা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র আর আত্মীয় স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বেশির ভাগ হতভাগারা পরিবার-পরিজনের অজ্ঞাতসারেই হাজার হাজার ক্রোশ দূরে সমাহিত হয়েছেন।

“১৯৩৯-১৯৪৫ যে ৬৫০০ নাবিক ও বাণিজ্য জাহাজের লস্কর দেশমাতৃকার সেবায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে সমুদ্রের অতল তল ভিন্ন যাহাদের আর কোনও সমাধি নাই এই পুস্তকে তাহাদের নাম রহিল।” সোর্স: লেখিকা

দুপাশে ফুলের বাগানওয়ালা পিচঢালা রাস্তা পেরিয়ে সামনে গেলেই চোখে পড়বে ওয়ার সিমেট্রির প্রধান ফটক। ফটকের ঠিক মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। সমাধিস্থলের মাঝখান বরাবর একটি দৃষ্টিনন্দন ক্রুশ চিহ্নিত বেদি। বেদির দুই ধারে সার বেঁধে শুয়ে আছেন ১২টি দেশের সেনা ও বিমান বাহিনীর ৭৫৫ জন যোদ্ধা।

প্রায় ৪ একর জমিতে অবস্থিত এ সমাধিক্ষেত্রের গেটে দাঁড়িয়ে একটি নোটিশ দেখতে পেলাম। তাতে কিছু প্রয়োজনীয় কথা লেখা আছে। তার মধ্যে উল্লেখ্য তথ্যগুলো আমি দিয়ে দিচ্ছি। কবরস্থানের ভেতরে খাওয়া, ধূমপান করা, দাঁড়িয়ে গল্প করা নিষেধ। ডিএসএলআর ক্যামেরা ও মডেল ফটোগ্রাফি নিষেধ।

পূর্ব দিকে ক্রুশের বেদির পিছনে আছে ছোট্ট প্রার্থনা ঘর। সোর্স:লেখিকা

মূল গেট দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানে লেখা একটা রেজিস্ট্রার আছে। রেজিস্ট্রারটি কোন সময়ে লেখা সে তথ্য নেই। বেদিতে লেখা আছে:
“১৯৩৯-১৯৪৫ যে ৬৫০০ নাবিক ও বাণিজ্য জাহাজের লস্কর দেশমাতৃকার সেবায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে সমুদ্রের অতল তল ভিন্ন যাহাদের আর কোনও সমাধি নাই এই পুস্তকে তাহাদের নাম রহিল।”
পূর্ব দিকে ক্রুশের বেদির পেছনে আছে ছোট্ট প্রার্থনা ঘর।

সেখানে বাংলা এবং ইংরেজিতে কিছু ইতিহাস ও তৎকালীন মানচিত্র দেওয়া আছে। সেখান থেকে কিছু তথ্য- ৭৫১টি যুদ্ধকালীন সমাধিতে রয়েছেন ১৪ জন নাবিক, ৫৪৩ জন সৈনিক এবং ১৯৪ জন বৈমানিক। যুদ্ধকালীন সমাধি ছাড়াও ৪টি সমাধি এ কবরস্থানে রয়েছে। মোট ৭৫৫ জনের সমাধি এখানে।

বেদির দুই ধারে সার বেঁধে শুয়ে আছেন ১২ টি দেশের সেনা ও বিমান বাহিনীর ৭৫৫ জন যোদ্ধা। সোর্স: লেখিকা

নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৯ জন, নিউজিল্যান্ডের ২ জন, অবিভক্ত ভারতের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, বার্মার ২ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন ও জাপানের ১৯ জন।

আমি ঘুরে ঘুরে সব দেখেছি। বৈমানিকদের আলাদা কবরের সারি, মুসলিমদের আলাদা, আফ্রিকানদের আলাদা। এমনকি এক জায়গায় একটা কবরে আঠারো জন জাপানিকে সমাহিত করা হয়েছে।

আফ্রিকানদের দুই সারি কবর। সোর্স: লেখিকা

এ সমাধিটি কমনওয়েলথ গ্রেভস কমিশন রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। কর্মচারীদের বেতনও তারা দেয়। এছাড়া প্রচুর বিদেশি আসে। বেশিরভাগেরই যেহেতু পরিবার-পরিজন জানে না তাই হয়তো পারিবারিক দর্শনার্থী কম। ওয়ার সেমেট্রির প্রতিষ্ঠাকালে এই এলাকাটি একটি বিশাল ধানের ক্ষেত ছিল, যদিও বর্তমানে এটি বেশ উন্নত এলাকা এবং শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এক জায়গায় একটা কবরে আঠারো জন জাপানিকে সমাহিত করা হয়েছে। সোর্স: লেখিকা

মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই যুদ্ধ সমাধিতে চল্লিশ জাতের বৃক্ষরাজি রয়েছে। রয়েছে দেবদারু, গর্জন, মেহগনি, ইউক্যালিপ্টাস, পাম গাছ। এছাড়া গন্ধরাজ, বেলি, পাতাবাহার, লেনথেনা, গোলাপ লেটারলিফসহ কয়েক শতাধিক দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ সমাধিতে এক অবর্ণনীয় স্বর্গীয় মোহের সৃষ্টি করেছে।

একই সময়ে আরও একটি সিমেট্রি করা হয় কুমিল্লার ময়নামতিতে। প্রতি বছর ১১ নভেম্বর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর হাইকমিশনার এবং প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার যুদ্ধ সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ফ্লাইং অফিসারের কবর। সোর্স: লেখিকা

সময়সূচি

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্যে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত থাকে। এখানে প্রবেশ করতে কোনো ফি এর দরকার হয় না। প্রবেশপথে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখা আছে, “সিমেট্রির গেট বন্ধ থাকলে দয়া করে খোলার জন্য অনুরোধ করবেন না।”

কীভাবে যাবেন

চট্টগ্রামের জিইসির মোড় থেকে সোজা পূর্ব দিকে প্রবর্তক মোড় বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে কিছুদূর গিয়ে বামে মেরী’স স্টোপস ক্লিনিক রেখে কিছু দূর এগিয়ে গেলে একটা তিন রাস্তার চত্বর পাওয়া যাবে। ওটা পেরিয়ে একটু সামনে এগুলেই ডানে (দক্ষিণ) যে রাস্তাটা গেছে সেটাই বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক। জায়গাটির নাম মেহেদীবাগ। ওয়ার সিমেট্রির অবস্থান ১৯ বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক, মেহেদীবাগ।

এই সড়ক ধরে হেঁটে গেলেই সিমেট্রি পাওয়া যাবে খুব সহজেই। আমি সাজেশন দেব এখানে রিকশা নিয়ে না আসার। জিইসি থেকে হেঁটে আসাই ভালো উপায়। তবে কেউ সিএনজি করে আসতে চাইলে, অনায়াসেই আসতে পারবে।

এখানকার লোকাল লোকজনও খুব ভালো করে ওয়ার সিমেট্রির অবস্থান সম্পর্কে জানে না। জিইসির বেশিরভাগ রিকশাচালক চিনতে পারছিল না। তাই পথের মোটামুটি ধারণা নিয়ে গেলে ভালো হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: অপরূপা হামহামের জলকাব্য

রহস্যময় দ্বীপ মাদাগাস্কারের অজানা তথ্য