ঐতিহাসিক পুরনো ঢাকা হেঁটে ঘোরার গল্প

প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য শহরের মতো ঢাকার ঐতিহ্য কোনোভাবে আলাদা বা ছোট চোখে দেখা যায় না। এই ঢাকারই রয়েছে শত শত বছরের পুরনো গল্পগাথা। হাজার বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য ঘুরে দেখতে হলে এই সময়ে চলে আসতে হবে পুরনো ঢাকায়। আবছায়া অন্ধকারে ব্যস্ত অলিগলির ফাঁকে-ফোকরে যেখানে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ঢাকার রাজ-রাজা আর সাধারণ মানুষের গল্প।

সারাদিন হেঁটে হেঁটে এসব কালের সাক্ষী হতে সেবার বেরিয়ে পড়েছিলাম পুরনো ঢাকার গলিগুলোতে। সরু সরু গলিগুলোর গা ঘেঁষে সুবিশাল প্রাচীন অট্টালিকা দেখতে দেখতে সারাদিন কেটে যাবে, প্রাচীন গল্পগুলো এমনভাবে ভিড় করে, যেন পিছিয়ে যেতে হয় শত শত বছর আগের সেই প্রাচীন জনপদে।

শত বছরের পুরনো বাড়ি। ছবিঃলেখক 

কার্জন হলের সামনে নাগলিঙ্গম গাছটার নীচে এসে দাঁড়ালাম আমি আর আমার হাঁটার বন্ধু সারিয়া মাহিমা। পায়ে হেঁটে পুরান ঢাকার প্রথম দিন আজ। একটু পানি খেয়ে, বিশ্রাম করে হাঁটতে শুরু করলাম চাংখারপুল এলাকার দিকে। আমাদের রুট প্লানের প্রথম  বিষয়টি ছিল হোসেনী দালান।

৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবরে ইরাকের কারবালা যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে শিয়া ধর্মাবলম্বীদের জন্য নির্মিত এই মসজিদটি অপরূপভাবে সাজানো। নিরাপত্তা কর্মীরা আমাদের তল্লাশী করে ভেতরে ঢুকতে দিলেন। একটি বিশাল মঞ্চের উপর গড়ে তোলা হয়েছে সুদৃশ্য ও সাজানো এই অট্টালিকা। এর ভেতরে রয়েছে একটি মাজার। সব মিলিয়ে অসাধারণ দেখতে এই প্রাচীন হোসেনী দালান।

হোসেনী দালান। ছবিঃ লেখক 

হোসেনী দালান থেকে গুগল ম্যাপ দেখে সোজা চলে এলাম লালবাগ কেল্লা। এই লালবাগেই আমাদের সাথে যুক্ত হলো আরেক বন্ধু ফাতেমা হক। লালবাগ এলাকার বাসিন্দা হওয়াতে ও আমাদের সহজে টিকেট নিয়ে ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করল। ১৬৭৮ থেকে ১৬৮৪ সালের মধ্যে মুঘল আমলে নির্মিত এই বিশাল কেল্লা ছিল মুঘল রাজাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।

ঢুকেই চোখে পড়ে সুবিশাল পরি বিবির মাজার, দরবার হল ও মসজিদ। এছাড়া এর চারদিকে ঘেরা সুবিশাল প্রাচীরের মধ্যে রয়েছে সবুজ ঘাসের গালিচা আর বিশাল ঘাট বাঁধানো পুকুর। ঢাকা শহরের আধুনিকতার মাঝে এই ছোট্ট জায়গাটি মনে করিয়ে দেয় কীভাবে চলত প্রাচীন জনপদগুলোর শাসন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ ঘুরে দেখতে লেগে গেল প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের মতো সময়।

লালবাগ কেল্লায় হন্টন দল। 

লালবাগ কেল্লা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দিকে। হেঁটে যেতে মিনিট দশেক সময় লাগে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে ঢাকা ও ঈশ্বরী শব্দ দুটি থেকে। অর্থাৎ ঢাকার ঈশ্বরী বা ত্রাণকর্তা। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা বল্লাল সেন এই সুবিশাল মন্দিরটি স্থাপন করেন। মন্দিরের গেটে জুতা রেখে ভেতরে ঢুকলাম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র একটি স্থান এই মন্দিরটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে ধরে এই মন্দিরটিতে হয়েছে মূল মন্দীরের সাথে বর্ধিত ৪টি স্তম্ভ কাঠামো ও একটি পুকুর ঘাট। সব ধরনের পূজোর সময় এই মন্দিরটি মুখরিত হয়ে থাকে বিশ্বাস ও ধ্যানের জালে। কপালে তিলক লাগিয়ে ঘুরে দেখলাম এর আনাচে কানাচে। লক্ষ্য করলাম বাইরের দেশ থেকেও পুরান ঢাকার এই স্থাপনা দেখতে এসেছেন অনেকে।

ঢাকেশ্বরী মন্দির। ছবিঃ লেখক 

মন্দির দেখা শেষে যখন বাইরে আসলাম সূর্য তখন মাথার উপরে। চকবাজারের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। পথের মধ্যে খাবারের আয়োজন করা হলো। পুরান ঢাকার বিখ্যাত খাবার “বড় বাপের পোলায় খায়”। প্রায় ৪০ রকমের বিভিন্ন পদের সমন্বয়ে তৈরি এই খাবার খুব একটা মুখরোচক ছিল না যদিও।

গুগল ম্যাপ থেকে পুরনো ঢাকার মধ্যে এগোনো বেশ কষ্টের। মাঝে মাঝেই পথ ভুলে এ গলি থেকে ও গলিতে চলে যাচ্ছিলাম। সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে একটু ক্লান্তিও চলে এসেছে সবার মধ্যে। তবে শত শত বছরের পুরনো দালানগুলোর ভেতর দিয়ে আবছা অন্ধকার আর স্যাঁতস্যাতে রাস্তায় নিজেকে সেই শত বছর আগে খুঁজে পাওয়াটা অনুভব করতে পারলেই খারাপ লাগবে না।

প্রাচীন বাড়ী। ছবিঃ লেখক 

এবার পথে ঘাটে লোকের কাছে শুনে এগোলাম বড় কাটরার দিকে। কাটরা সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় কাটরার নিচে দাঁড়িয়েই একজনের কাছে শুনলাম। উনি হেসে দিয়ে বললেন এটাই বড় কাটরা। ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময় মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা এই গেটের মতো দেখতে সুবিশাল কাঠামো নির্মাণ করেন।

এর সাথেই বেশ কিছু দোকান ঘর সংযুক্ত করে দেন। এখানে শাহ সুজা বসবাসের জন্য তৈরি করেছিলেন কিন্তু কিছুদিন পর উনি দাওয়াখানায় সময় কাটাতে শুরু করলে কাটরাগুলো মুসাফিরদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার হতে শুরু করে। একটা সময় এখানে ফরাসি ভাষায় লেখা বেশ কিছু ফলক ছিল যা এখন কালের বিবর্তনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে।

সামনে থেকে বড় কাটরা। ছবিঃ লেখক 

বড় কাটারা দেখা শেষ করে বেশ কিছু গলি পার করে চলে এলাম ছোট কাটরা। এটিও আকারে বিশাল। পুরনো ঢাকার অন্ধকার গলি আর পুরনো বাড়িঘরগুলোর মধ্যে মিশে গিয়েছে এই স্থাপনাটিও। ১৬৬৩-১৬৬৭ সালের মধ্যে সুবাদার শায়েস্তা খান এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন।

বেশ কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে এই প্রাচীন সম্পদগুলো। বিকেল গড়িয়ে যেমন সন্ধ্যা নেমে এসেছে একই সাথে সারাদিন হাঁটাহাটি করে আমরাও ক্লান্ত ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম কার্জন হল পর্যন্ত। সেদিনের মতো আবার নতুন ঢাকায় নিভে এলো রোদের আভা।

রুট ও খরচের খসড়া:

(কার্জন হল – হোসেনী দালান – বকশী বাজার হয়ে লাল বাগ ফ্রন্ট – ঢাকেশ্বরী মন্দির- বড় কাটরা- ছোট কাটরা)

এইভাবে অথবা নিজে ম্যাপ দেখে রুট প্লান করে ঘুরতে পারেন। রিকশায় ঘুরলে সময় অনেক কম লাগবে এবং এর থেকে বেশী জায়গায় ঘুরতে পারবেন। দুপুরে যে কোনো হোটেল থেকে খেয়ে নিতে লাগবে ১০০-২০০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

৩০ সেকেন্ড, ৫০ টাকা আর অনন্য রোমাঞ্চের গল্প

শীতের অরণ্য ডুয়ার্সে…