লাল-সবুজের অপেক্ষা!

প্রতিদিন অফিসের নানান কাজ, অকাজ, ঝামেলা কোনো মতে শেষ করে যখন বাসায় ফিরি, পরদিন সকালের অপেক্ষায় থাকি, তাকে দেখার জন্য! প্রতিদিন লাল-সবুজ রঙে সেজে আমাকে ক্রস করে যায়। তার আমার দিকে আসার ছন্দ, প্রথম দৃষ্টি বিনিময় দেখে আর উপভোগ করে। যদিও তার সাথে প্রায় প্রতিদিনই আমার দৃষ্টি বিনিময় হয়। তবুও কেন যেন প্রতিদিনের দৃষ্টি বিনিময়ই আমার কাছে প্রথম আর একান্ত আনন্দের মনে হয়। ঠিক যেন আজই প্রথম দেখলাম তাকে। প্রতিদিন তাকে এভাবে দেখাটাই যেন তার সাথে আমার প্রথম দেখা। যেটা প্রতিদিন আমাকে নতুন করে একই রকম দুর্বার একটা আনন্দের শিহরণ বইয়ে দেয়, আমার চেতনা জুড়ে।

আর তারপর যেটা হয়, সেটা হলো… মনটা যেমনই থাকুক কিছুটা আনন্দের পরশ লাগে প্রাণে, একটা হালকা বাতাসের ঝাপটা লাগে মুখে এসে, যেন কিছুটা চাপমুক্ত করে দেয় আমাকে, একটা অন্যরকম আবেশ ছুঁয়ে যায় আমাকে, নতুন উদ্যম পাই সেই দিনের হাজারো চাপ সামলে নেবার জন্য। তার দিয়ে যাওয়া সেই অজানা আনন্দ আর সুখের বাতাসে ভাসতে ভাসতে ভাবি, একদিন…

এভাবে একদিন… ছবিঃ সংগ্রহ 

একদিন আমিও যাবো তার সাথে-সাথে, পাশে-পাশে, সে যেথায় যায় তার সাথে, তার কাছে। তার লাল-সবুজের সাজের সাথে। হারাবো তার অপরূপ সাজের মাঝে। যেতে যেতে শুনবো তার সুর তোলা গুনগুন গান, কান পেতে রইবো শুনতে তার খিলখিল হাসি, চোখ মেলে দেখবো তার প্রতি আরও হাজারো মানুষের আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকা, তার রূপে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা, দেখবো তাকে কখনো মেঘ ছুঁয়ে যায়, কখনো সে নিজেই সবুজে হারায়, কখনো হলুদ সরিষা ক্ষেতে অবাধ্য হয়ে ছুটে যায়, কখনো রোমাঞ্চ খোঁজে কোনো গুহায় বা পাহাড়ের গুহার ভেতর দিয়ে ছুটে চলা অন্ধকার রাস্তায়, কখনো ধীর লয়ে হেঁটে বেড়ায় সবুজ সমুদ্রের সবুজ-সোনালি চা বাগানে, কখনো নিজেকে ভিজিয়ে নেয় কোনো জলাশয় বা বৃষ্টির জলে, দূর করে নেয় সকল ক্লান্তি।

কখনো আমাকে নিয়ে থেমে যাবে নির্জন কোনো লোকালয়ে, এক শীতের সকালে,  সেখানে ধোঁয়া ওঠা লাল চায়ে চুমুক দেব তার পিঠে হেলান দিয়ে। কখনো সবুজ, কচি ডাবের মুখে চুমুক দেব নোনতা পানির দারুণ স্বাদ নিতে, কোনো এক গরমের ক্লান্ত দুপুরে। কখনো কোনো গ্রামের গাছ পাকা হলুদ-সবুজ সাগর কলায় সুখ খুঁজে নেব, তার কোলে মাথা রেখে। আর এরপর ঘুমিয়ে যাবো তার আঁচলের ছায়া তলে, তার ছন্দময় ছুটে চলার দোলায় দোল খেতে খেতে। এমন করে ভাবি, ঠিক এমন করেই।

লাল সবুজের অপেক্ষা। ছবিঃ সংগ্রহ 

তো কদিন ধরে অফিসের খুব বেশী ব্যস্ততা যাচ্ছে, কাজ কাজ আর কাজ। কাজের চাপে অন্যকিছু মনে করার মতো কোনো সময় পাওয়া যাচ্ছিল না কিছুতেই। এমনকি এত, এত প্রিয় লেখালেখি থেকে পর্যন্ত দূরে ছিলাম! মন আনচান করছে কীসের জন্য যেন? অস্থির লাগছিল খুব নিজের জন্য কোনো সময় খুঁজে না পেয়ে বেশ বিষণ্ণ বোধ করছিলাম নানা রকম ঝামেলায়।

আজ সকালেও তাই। মনটা মনে ছিল না। কোথায় যেন কী নেই? কী যেন খুঁজে ফিরছিলাম মনে মনে। একটা বেশ ঘন কালো মেঘ যেন ছেঁয়েছিল আমার সুখের, কল্পনার আর বর্ণিল আকাশের সবটুকু জুড়ে। উহ! বেশ অসহ্য লাগছিল কাল রাত থেকেই। এমনকি এই সকালেও সেই গুমোট ভাবটা আঁকড়ে ধরে ছিল যেন। সেই গুমোট মন নিয়েই অফিসের গাড়িতে চেপে বসলাম প্রিয় জানালার পাশে, কানে হেড ফোন গুঁজে গানের মাঝেই কিছুটা প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টা।

মিরপুরের ধুলোর সাগর পেরিয়ে, কয়েকটি মোড় নিয়ে গাড়ি মিরপুর ফ্লাইওভারে উঠতেই তার কথা মনে পড়লো! নিজের অজান্তেই একটুখানি হাসলাম আর তাকিয়ে রইলাম তার চলার পথের দিকে। আমাকে ক্রস করে ছুটে যাওয়া সেই দিকে, অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকলাম তার লাল-সবুজ সাজ দেখতে, অনেকটা আকুল হয়ে। ফ্লাইওভার পার হতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটও যেন ঘণ্টার চেয়ে দীর্ঘ মনে হতে লাগলো আমার কাছে। অদ্ভুত!

তার অপূর্ব লাল-সবুজের সাঁজ! ছবিঃ সংগ্রহ 

না অদ্ভুত না মোটেই। প্রিয় কিছুর অপেক্ষা, অনেক কাঙ্ক্ষিত কিছু দেখতে চাওয়ার আকুলতা সব সময় কেন যেন অনেক লম্বা মনে হয় সবার কাছে। সেই অপেক্ষা আর অপেক্ষার সেই প্রতিটি প্রহরই যেন সুখের একটা একটা মুহূর্ত! এই সে এলো, এই দেখা দিল, এই বুঝি আমায় দেখে মুচকি হাসল, এই বোধহয় তার লাজুক পলক ফেলল! আর এই বুঝি ছন্দ তুলে নিমেষেই ছুটে পালিয়ে গেল, চোখের আড়ালে!

ঠিক এমনই অনুভূতি হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। আর একা একা হাসছিলাম নিজেই নিজের সাথে, কিন্তু চোখ ছিল অপলক তার ছন্দ তুলে চলে যাওয়া রাস্তার দিকে। ফ্লাইওভার থেকে নামছি আর তার অপেক্ষায় তাকিয়ে আছি রাস্তার দিকে… বুকের মধ্যে একটা ধড়ফড় অনুভূতি গ্রাস করছিল ক্ষণে ক্ষণে, এই এলো, দেখা দিল আর ছুটে গেল বুঝি!

হ্যাঁ সে এলো, তার সেই লাল সবুজ সাজে সেজে, হেলেদুলে, এঁকেবেঁকে তবে বেশ ধীরে-ধীরে। বোধহয় আমার আকুল আহ্বান আর তার প্রতি আমার মোহাছন্নতা সে অনুভব করতে পেরেছে। তাই সে আজ এলো অনেক ধীরে ধীরে। চলে গেল ঠিকই তার পথে। তবে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে তাকে দেখার সুযোগ দিয়েছে আজ! তাকে দেখেছি অনেক সময় নিয়ে আর প্রাণ ভরে। দুজন দুজনকে ক্রস করে দূরে হারিয়ে গেলাম। তবে মনের মধ্যে সেই সুখের রেশ রেখে গেছে আজ, দিয়ে গেছে এক মুঠো কোমল বাতাস, আর দূর করে গেছে মনের মধ্যে গুমোট হয়ে থাকা কালো মেঘ, নিমেষেই!

তাকে দেখা। ছবিঃ সংগ্রহ 

তাই তাকে মনে মনে কথা দিয়েছি… একটু চাপ কমুক, একটু মুক্ত হই ঝামেলাগুলো থেকে, একটু সময় বের করে নেই নিজের জন্য, তারপরই একদিন কোনো এক রাঙা সকালে অথবা সুখের সাঁঝ বেলাতে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবো। তোমার অপেক্ষায় তোমার বারান্দায় অথবা তোমার আঙিনায়, তোমার সাথে যাবো বলে। কোনো এক অজানায়, যেখানে তুমি যাও প্রতিদিন, সেখানেই।

তোমার লাল-সবুজের আঁচলের ছায়া তলে হেলে-দুলে, নিজেকে এলিয়ে দিয়ে অথবা চোখ বুজে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে, তোমার আচ্ছন্নতায় মুগ্ধ হয়ে।

অরণ্যের পথ ধরে। ছবিঃ সংগ্রহ 

প্রহর গুনছি আমি সেই দিনের অপেক্ষায়…

সেই লাল-সবুজ ট্রেনে করে হারিয়ে যাবার প্রতীক্ষায়…

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বের সেরা কিছু সস্তা খাবার

আলীকদমে রহস্যে ঘেরা আলীর গুহায় একদিন