চান্দিনার মহিচাইলে জমিদার ভৈরব সিংহের জমিদার বাড়িদর্শন

ঈদের পরদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম ইতিউতি ঘোরাঘুরি করতে। কুমিল্লাগামি বাস যখন লাকসাম রোডে, তখন রাস্তার ধারের এক বিলে দেখি অসংখ্য তারা শাপলা। এই শাপলাকে বেগুনী শাপলাও বলে। স্বাভাবিক শাপলার তুলনায় আকারে ছোট নীলচে বেগুনী রঙের শাপলাগুলো সবুজের দঙ্গলে নিজেদের রূপের ছটা যথাযথভাবে ফোটাতে না পারলেও কাছ থেকে খুব আকর্ষণীয় হবে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পাব্লিক বাস না হয়ে যদি নিজস্ব ট্রান্সপোর্টে আসতাম, আমি অবশ্যই এখানটায় নামতাম।

পানের বরজ। সোর্স: লেখিকা

যাই হোক, কুমিল্লার বিশ্বরোড বাস থেকে নেমে নিলয়কে পেয়ে গেলাম। ও আগে থেকেই আমাদের জন্য এখানে অপেক্ষা করছিল। মহিচাইলে কীভাবে যাব, তা তো জানি না। গুগল ম্যাপে দেখেছিলাম, মাত্র ৩৮ মিনিট লাগে। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল, ঢাকাগামী যেকোনো লোকাল বাসে চড়লেই হলো। আমরাও কোনো বাছ বিচার না করে ছাড়ি ছাড়ি এমন একটা বাসে চেপে বসলাম।

কন্ডাকটর ভাড়া কাটতে এসে জিজ্ঞেস করলো, আমরা কোথায় যাব। প্রথমে চান্দিনা বললেও, পরে ভেঙে বললাম, আমরা মহিচাইল জমিদার বাড়ি যাব। সে জানালো, তাহলে আমাদের চান্দিনা না নেমে মাধাইয়া নামা উচিৎ। ওখান থেকে অহরহ সিএনজি মহিচাইল যাচ্ছে। ভাড়া চাইলো ৬০ টাকা করে।

মন্দির। সোর্স: লেখিকা

মাধাইয়া নেমে মহিচাইলের সিএনজিতে উঠে পড়লাম। ভাড়া ৩০ টাকা করে নিচ্ছে। আমার ভাই আরমান সিএনজি ওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নিচ্ছেন! ঈদ আসলেই খালি গলা কাটা!”

এমনভাবে বললো, যেন সে সত্যিই এখানকার বাসিন্দা। কিছুক্ষণ পর জানা গেল, ভাড়া সত্যিই ২০ টাকা করে।

যাই হোক, মাধাইয়া থেকে মহিচাইল যাবার পথটা বেশ ভালো ছিল। গ্রাম্য পরিবেশে মসৃণ পিচঢালা রাস্তায় স্মুদলি চলে এলাম মিনিট বিশেকের মধ্যেই। রাস্তার পাশে কিছু মসজিদ, মন্দির দেখতে পেলাম। বেশ সুন্দর।

বাড়ির সামনেই একটা বড়সড় কাঠমালতি ফুলগাছ। সোর্স: লেখিকা

মহিচাইল নেমে এক ডিসপেনসারিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানকার জমিদার বাড়িটা কোথায়?’

লোকটা ফিরতি জানতে চাইলো, ‘আপনি কোন জমিদার বাড়ি খুঁজছেন, এখানে তো কয়েকটাই জমিদার বাড়ি।’

মনে মনে খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। এসেছি যখন সবগুলো ঘুরেই যাব। এই মনোভাব জানাতেই বললো, ‘এই কাছেই সিংহ বাড়ি। হাঁটা দূরত্বে।’ রাস্তাটা দেখিয়ে দিল।

আলপনা।  সোর্স: লেখিকা

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। বাজার থেকে পার্শ্বরাস্তায় নেমে চমৎকার একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখতে পেলাম। সাধারণত প্রাথমিক বিদ্যালয় এত বড় দেখিনি! ১৯৪২ সালে স্থাপিত এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুটি ভবন।

একটি বেশ পুরনো। এটা বেগম রোকেয়ার নামে নামকরণ করা হয়েছে। আর অন্যটি একদম নতুন। সদ্যই নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে হয়তো। এই ভবনটি নামকরণ করা হয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে।

কারুকাজ। সোর্স: লেখিকা

পিচঢালা সরু রাস্তা ধরে হাঁটছি। একপাশে আখের ক্ষেত। অন্যপাশে বড় বড় সব গাছ। কিছুদূর সামনে গিয়ে দেখি পানের বরজ! তাও একটা নয়, বেশ কয়েকটা! সিংহ বাড়ির সীমানাতেও আছে। পানের বরজ পেরুতেই একটা শ্মশানভূমি চোখে পড়লো। ভেবেছিলাম, এটাই বুঝি জমিদারদের শ্মশান। পরে দেখলাম, না। আরেকটু সামনে রয়েছে ওটা।

জমিদারের ছেলের ঘরের নাতির বৌ। সোর্স: লেখিকা

জমিদার ভৈরব সিংহ ছিলেন এই বিশাল কুমিল্লা এবং ত্রিপুরা রাজ্যের জমিদার। তিনি বর্তমান কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার, মহিচাইল ইউনিয়নের, মহিচাইল গ্রামে থেকে জমিদারী করতেন। জমিদার ভৈরব সিংহের শ্মশানের এপিটাফ পড়ে বোঝা গেলো বাড়িটি একশ বছরের পুরাতন।

এদের জমিদারী ছিলো চান্দিনা, বরুড়া, দাউদকান্দি ও দেবিদ্বারে। ভৈরব চন্দ্র সিংহ প্রজা বান্ধব জমিদার ছিলেন বলে শোনা যায়। রাস্তার পাশেই দাঁড়ানো জমিদার বাড়িটি এখন ভেঙে পড়ছে। বছর দুয়েক আগে ভৈরব চন্দ্রের নাতি ক্ষিতিশ চন্দ্র সিংহও মারা গেছে। বেঁচে থাকতে তিনি আশা করেছিলেন, তাদের পূর্ব পুরুষের স্মৃতিচিহ্ন বাড়িটি রক্ষায় সরকার এগিয়ে আসতেও পারে।

সিঁড়ি পেয়ে উপরে উঠলাম। জায়গায় জায়গায় ভাঙা। সোর্স: লেখিকা

জমিদার বাড়ির একটু আগেই একটা মন্দির ও নাটমন্দির আছে। জমিদার বাড়ির ভেতর দিয়ে সামনে এগুতেই, এক মহিলাকে দেখতে পেলাম। তার কৌতূহলী দৃষ্টি দেখে জানতে চাইলাম, এই বাড়িটা কার, তিনি কে হন, এসব সৌজন্যমূলক কথাবার্তা।

ভদ্রমহিলা অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে জানালেন, তিনি জমিদারের ছেলের ঘরের নাতির বৌ। এই বাড়িতে আসার পর জমিদারির কোনো কিছুই নিজের চোখে দেখেননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা ভারতে চলে গিয়েছিলেন।

কালকুঠুরীর সামনে দাঁড়িয়েই পোজ নিয়ে ছবি তুললাম। সোর্স: লেখিকা

বাড়িটি কিছুদিন আগেও থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন নাকি বৃষ্টি হলেই ছাদ থেকে সারাদিন পানি ঝরতে থাকে। তাই আর এখানে থাকা হচ্ছে না। জমিদারের কারুকার্য মণ্ডিত বংশধরেরা ব্যবহার করছে, স্টোর রুম হিসেবে।

এই পর্যন্ত আমি যত জমিদার বাড়ি গিয়েছি, বেশিরভাগই ছিলো পরিত্যক্ত। জমিদারের উত্তরাধিকারের সাথে কথা বলার সুযোগ খুবই কম ছিল। কিন্তু এখানে এসে ভৈরব সিংহের নাতবৌয়ের সাথে আলাপ করে খুব ভালো লেগেছিল। খুব অমায়িকতা পেয়েছিলাম জমিদারের ছেলের ঘরের নাতির বৌয়ের কাছ থেকে। বার বার বলছিলেন, এত দূর থেকে এসেছ, একটু বসে যাও। আর বিদায়ের সময় বললেন, ‘যাই বলতে হয় না। আসি বলো।’

ওপরতলা। সোর্স: লেখিকা

জমিদার বাড়ির সামনে থেকে দ্বিতীয় দরজাটির পিছনেই নাকি কালোকুঠুরী ছিল। অন্য অনেক জমিদারদের মতো এরাও বেশ অত্যাচারী ছিল। কাউকে শাস্তি দিতে হলে, মাটির নিচের দরজা, জানলা বিহীন একটা ঘরে আটকে রাখতো, যাতে আলো বাতাসের অভাবে লোকটা মরে যায়। এটা একটা সুড়ঙ্গের মতো। এর শেষ মাথায় দেয়াল।

এলাকার লোকজন বলে, জমিদার ভৈরব কাউকে শাস্তি দিতে হলে এই সুড়ঙ্গে অপরাধীকে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতেন। দিনের পর দিন অন্ধকার সরু সুড়ঙ্গের ভেতরে না খেতে পেয়ে, ভয়ে মানুষটা মারা যেত। এটাকে স্থানীয়রা আন্ধারমানিকও বলে। আমি ওই কালোকুঠুরীর সামনে দাঁড়িয়েই পোজ নিয়ে ছবি তুললাম।

জমিদারের সমাধি। সোর্স: লেখিকা

তারপর পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখলাম। সামনের এই কাঠামোটা বাদে বেশিরভাগ অংশই ভেঙে গেছে, পরগাছায় ছেয়ে আছে সেসব। তবুও এক জায়গায় সিঁড়ি পেয়ে উপরে উঠলাম। জায়গায় জায়গায় ভাঙা। সেসব না হয় এড়িয়ে চলা গেল, কিন্তু উপরে উঠে যদি দেখি খাদের মতো একটা জায়গা ছাড়া আর কিছুই নেই, তাহলে কেমন লাগে?

ছাদ। সোর্স: নাঈম

যাই হোক, মূল বাড়ির ছাদটাই টিকে আছে। ওটায় ওঠার সিঁড়িও মোটামুটি খারাপ না। এখানে কিছুক্ষণ থেকে মহিচাইল বাজারের পথ ধরলাম। এত এত জমিদার বাড়ি অবহেলায় নষ্ট হয়ে যেতে দেখছি যে, এখন আর এসবে কোনো অনুভূতি কাজ করে না।

মহিচাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। সোর্স: লেখিকা

মহিচাইল বাজারে এসে সিএনজি খুঁজছি মাধাইয়ার যাওয়ার জন্য। সিএনজিচালক এমনভাবে মাধাইয়া হাঁকছে, মনে হচ্ছিল, মাদিহা মাদিহা শোনাচ্ছে। আমি আর নিলয় একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। তারপর সেই সিএনজিতে চেপেই ফিরতি পথ ধরলাম।

কীভাবে যাবেন

কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে বাসে মাধাইয়া। মাধাইয়া থেকে সিএনজিতে মহিচাইল। আবার ঢাকা থেকে কুমিল্লার লোকাল বাসে চড়লে বিশ্বরোড পর্যন্ত আসার দরকার নেই। সরাসরি মাধাইয়া নেমে গেলেই হবে। মহিচাইল বাজার থেকে ৭-৮ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে জমিদার বাড়ি।

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. চান্দিনা আমার জন্মস্থান। অথচ এই জায়গাটার নাম কখনো শুনিনি! কী কম জানাশোনা নিয়ে যে বেঁচে আছি! কুমিল্লায় আবার যাওয়া হলে অবশ্যই যাবো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পানথুমাই: এক অলস দুপুরের গল্প

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অজানা সৌন্দর্য চালন্দা গিরিপথ