নিরিবিলি পিকনিক স্পটে মজার ভ্রমণ

নড়াইল জেলার সাথে পার্শ্ববর্তী জেলা সমূহের উন্নতমানের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি উন্নত মানের পার্ক, পিকনিক স্পট এবং রিসোর্ট। এর মধ্যে নিরিবিলি পিকনিক স্পট অন্যতম। আমার এবার টার্গেট নিরিবিলি পিকনিক স্পট। সঙ্গী হিসেবে আছেন আরেক পর্যটক অচিন্ত্য আসিফ।
তাই সকাল সকাল নড়াইল থেকে রওনা দিলাম নিরিবিলি পিকনিক স্পটের উদ্দেশ্যে। নিরিবিলি পিকনিক স্পট লোহাগড়া উপজেলার লক্ষীপাশা ইউনিয়নের রামপুরে অবস্থিত। খুলনা-কালনা এক্সপ্রেস (বাস) গাড়ি এই রুটে যাতায়াত করে। আমরা গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পরে এক্সপ্রেস আমাদের রাস্তার উপরে ‘…এই নিরিবিলি, এই নিরিবিলি…’ বলে নামিয়ে দিয়ে সামনের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা হতচকিত। কোনদিকে যাব?

মামদো ভূত; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

পরে রাস্তার অন্যপাশে তাকাতে দেখি একটি সাইনবোর্ডওয়ালা ফটক। একটি ছোট রাস্তা সেই ফটক থেকে শুরু হয়েছে। আমরা সেই রাস্তায় নেমে গেলাম। কয়েকশ গজ যেতেই নিরিবিলি পিকনিক স্পটের গেট আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো।
এখন জনসমাগমে পরিপূর্ণ থাকলেও আজ থেকে ২৫০ বছর আগে এলাকাটিতে ঘন জঙ্গল ছিল। ছিল নানারকম গাছপালা, পাখি আর বন্য পশু- বাঘডাস, শিয়াল, সজারু, বুনো শুকর প্রভৃতি। এমনকি মাঝে মাঝে বাঘেরও দেখা মিলত। এমন সময়ে এখানে হঠাৎ একদিন আবির্ভূত হন আধ্যাত্মিক সাধক শাহ পজু দেওয়ান। তার অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। ফলে দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ কামেল ফকিরের আস্তানায় ভিড় জমাত। নিরিবিলি পিকনিক স্পটে ঢুকতে তার মাজার এখনো চোখে পড়ে।
আমরা টিকিট কিনে ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেলাম। আমার বন্ধু অচিন্ত্য আসিফ যে কিনা নিজেকে বীর দাবি করে সে শুকনো মাটিতে হোঁচট খেল। সামনে তাকিয়ে দেখি এক প্রকাণ্ড ভৌতিক মুর্তি আমাদের দিকে মুখ ব্যাদান করে তাকিয়ে রয়েছে- যেন গিলে খাবে। কিন্তু না। ওটা স্রেফ একটা মূর্তি। আমরা এবার তাকে পাকড়াও করলাম আমাদের ফোনের ক্যামেরায়। আমরা আরো একটু এগোলাম। তারপরে হঠাত আসিফ বলে উঠলো,
-আচ্ছা অমিতাভ তোর সেই সারস আর বাঘের গল্প মনে আছে- ঐ যে যে গল্পে বাঘের গলায় কাঁটা ফুটে যায় আর সারস সেই কাঁটা বের করে দেয়?
আমি বললাম, হ্যাঁ মনে তো আছে। কিন্তু কেন?
আসিফ সামনে অংগুলি হেলন করে বলল,  ঐ দেখ!
আমি তাকিয়ে চমৎকৃত হয়ে গেলাম। সারসের সেই কাঁটা বের করার দৃশ্য সেখানে মূর্ত হয়ে আছে।
জিরাফ; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

আর একটু দূরে দেখি একজোড়া জিরাফ মাথা উঁচু করে আমগাছ তলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদের ঠ্যাংয়ের তলায় দাঁড়িয়ে আসিফের ছবি তোলার শখ চাপল। আমি মানা করলাম। বললাম,
-দেখ জিরাফের ঠ্যাংয়ের গুঁতো খেয়ে কিন্তু সিংহও অক্কা পায়। আর তুই তো রোগাপটকা হিউম্যান বিইং! ও তবু জেদ ধরল, আমি ছবি তুলবোই। এর পর থেকে যত প্রাণী আসুক না কেন সবগুলোর সাথে মোলাকাত করব!
কী আর করা! ছবি তুলতেই হলো। কিন্তু ওর ভাগ্য ভালো যে সেগুলো পাথরের জিরাফ ছিল। তাই লাথি খেতে হয়নি। এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে আমরা একটা ছোট্ট পুকুরের পাড়ে আসলাম। দেখি অনেকগুলো রাবারের নৌকা/বোট অলস পড়ে আছে। আজ কেন জানি মানুষজন বেশি নেই। আসলে অফ সিজন কী না! তাই বোটগুলো নিশ্চুপ। আমরা জল-কাদার মানুষ। জল আর নৌকা দেখলে স্থির থাকলে পারিনে। দুজনের নৌকা চড়ার খায়েশ জাগল।
বোট রাইডিং; ছবিঃ অচিন্ত্য আসিফ

তারপরের আধঘণ্টা আমরা দুজনে দুটি বোটে করে সারা পুকুর দাপিয়ে বেড়ালাম। তখন বুঝলাম রক্তের গ্লুকোজের সরবরাহ ইতোমধ্যে কমে এসেছে তখন আমরা বেরিয়ে এলাম নতুন করে গ্লুকোজের চালান দিতে। আগে থেকে কিনে আনা ডিম কলা সাটিয়ে দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, এবার?
এবার চল পিকচার জোনে। পার্কের মধ্যে ছোট্ট একটু জায়গায় হরেক রকম বিষয়- তন্বী নারী, হিংস্র বাঘ, ব্ল্যাক প্যান্থার, ভয়ানক ডাইনোসরসহ বহু প্রাণীর মূর্তি নিপুণ দক্ষতায় বানানো রয়েছে। আসিফ আগেই বলে রেখেছে যতরকম প্রাণী আসুক না কেন সেগুলোর সাথে সে মোলাকাত করবেই!
তাই এবার এক একটি মূর্তির সাথে নানা ভঙ্গিমায় পোজ দেওয়া শুরু করলো আর আমি অনবরত ছবি তোলা চালিয়ে যেতে থাকলাম। এমনকি তন্বী বালিকার মূর্তির সাথে কোমর পাকড়াও করে লাস্যময় পোজও বাদ গেল না। আমি অবশ্য ঘোর আপত্তি জানালাম, আর যাই হোক, এটি হিংস্র প্রাণী হতে পারে না। ও বলল, থাম তো তুই!
কী আর করা! আমি চুপচাপ ছবি তুলতে লাগলাম। অবশেষে সমস্ত ‘হিংস্র’ প্রাণীর পালা শেষ হলে আমরা এবার অন্যদিকে গেলাম। এস এম সুলতান আর্ট গ্যালারি, জাদুকরের মজাদার ম্যাজিক, নাগরদোলার দোল, রেলে চড়ে ভূতুড়ে গুহায় ভুতের দর্শন, ক্যাকটাস বাগান, মনীষীদের মূর্তিসহ আরো অনেক কিছু দেখার পরে হঠাত সামনে আবিষ্কার করলাম লেখা ‘মিনি চিড়িয়াখানা”। আমি সোৎসাহে বললাম,
-চল ভেতরে যাই! বন্ধু আসিফ কেমন জানি দোনোমনা করে বলল, নাহ! থাক!
এমনও পোজ হয়; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

আমি খানিকটা জোর করেই টিকিট কাটলাম। তারপরে ভেতরে ঢুকলাম। দেখি প্রকাণ্ড একটি ময়াল সাপ একটি খাঁচার মধ্যে পড়ে রয়েছে। আর একটু এগোতেই ভাল্লুকের খাঁচা! বিশাল তাগড়া ভাল্লুক তার মধ্যে পাক খাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো খাঁচার সামনের সে শক্ত তারের জাল, কিন্তু ফুটোগুলো বেশ বড় বড়। ওর ভেতর দিয়ে ভালুকটি মাঝে মাঝে আঙুল বের করে দিচ্ছে। আসিফকে বললাম,
-ভাই, এবার ভাল্লুকের সাথে একটা ছবি তুললে কেমন হয়? তুই ওর সাথে হ্যান্ডশেক কর! আমি ছবি তুলি? ওটা নিশ্চয়ই হিংস্র!
ও আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল,
-এমন গোবেচারা প্রাণীকে তোর হিংস্র মনে হয়? দেখ! কত্ত কিউট! আহারে! এর মতো শান্ত প্রাণী আর দুইটা হয় না। নাহ, এর সাথে ছবি তোলা যাবে না।
কীভাবে যাবেন?
নড়াইলের সাথে রাজধানী ঢাকার সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে। নড়াইলে কোনো রেলস্টেশন নেই। তবে সড়কপথ যথেষ্ট উন্নত। ঢাকা থেকে আসতে চাইলে আরিচা দৌলতদিয়া ঘাট পার হয়ে যশোর থেকে নড়াইল তারপর চিত্রা নদী পার হয়ে ১৫ মিনিটের রাস্তা নিরিবিলি পিকনিক স্পট।
আর যদি একটু কম খরচ করতে চান তাহলে ঢাকা-লক্ষীপাশা রুটের হিনো স্যালুন কোচ যেমন: সোহাগ, ঈগল, দ্রুতি, দিগন্ত, ফাইভ-স্টারের যে কোনো একটিতে চড়ে বসতে পারেন। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১৫০ টাকা পর্যন্ত। চিত্রা নদী পার হলে ১৫ মিনিটের রাস্তা এলে দেখবেন হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিরিবিলি পিকনিক স্পটটি।
Feature Image: Amitav Aronno
 

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: জামতলার রসগোল্লা, খেজুরের গুড় আর নকশি কাঁথার যশোর

কী আছে এমন দক্ষিণ কোরিয়ায় যা পর্যটকদের হৃদকম্পন বাড়িয়ে তোলে?