চুনখোলা মসজিদের মায়ায় একদিন বাগেরহাটে

প্রাচীন খলিফাতাবাদের পথে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ সফল বলা যায়। খান জাহান আলীর তৈরি সেই প্রাচীন রাস্তা ধরে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পকেট থেকে লিস্ট বের করলাম। এবার টার্গেট চুনখোলা মসজিদ। খান জাহান আলী নাকি তার সমগ্র শাসনকালে ৩৬০টি মসজিদ আর দীঘি স্থাপন করেছিলেন।
আমরা এর আগে এক পর্বে আপনাদের সুদূর যশোরের শুভরাড়া গ্রামে খান জাহান আলীর মসজিদ দেখিয়ে এনেছিলাম। খান জাহান আলীর সবগুলো মসজিদ আজ আর দেখতে পাওয়া যায় না। তবু যে কয়টি টিকে আছে তা নেহাত কম নয়। এর একটি চুনখোলা মসজিদ। এই মসজিদটি দেখতে যাওয়ার আগ্রহের কারণ হলো এটি জনমানুষের চোখের আড়ালে চুনখোলা নামক গ্রামের প্রান্তসীমায় ধানক্ষেতের মাঝখানে অবস্থিত।

খান জাহান আলীর মাজার; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

আমি চন্দ্রঘোনা গ্রাম থেকে উত্তরদিকে রওনা হলাম। লক্ষ্য সেই চুনখোলা গ্রাম। পথ যথেষ্ট ঘোরালো। ভরসা স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে পাওয়া ঠিকানা। চুনখোলা গ্রামের নামকরণের পেছনে এক মজার ইতিহাস আছে। এখানে এককালে প্রচুর চুনাপাথরের নির্যাস পাওয়া যেত, তাই এর নাম চুনখোলা।
ধারণা করা হয়, খান জাহান আলী তার বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য যে চুন প্রয়োজন তা এর আশেপাশেই উৎপাদন করতেন। মাথার উপরে সুয্যি মামা আগুন ঢালছে। সকাল থেকে হাঁটার উপরেই আছি। এতক্ষণে শরীর থেকে ঘাম ছুটছে। শরীর থেকে জল কমে যাওয়ায় তেষ্টাও পেয়েছে। আমি খানিকটা দূরে একটু মুদি দোকান দেখতে পেলাম। সেখানে গিয়ে আলাপ জমানোর জন্য বললাম, ‘কাকা, কোক আছে?’
উনি উত্তর দিলেন, ‘আছে কিন্তু ঠাণ্ডা হইব না।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা তাই দেন।’
উনি আমার ক্যামেরা দেখে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাস করলেন, ‘আপনে কি সাংবাদিক?’
আমি কিছু বললাম না। শুধু একটু হাসি উপহার দিলাম। উনি নিজের ধারণাকে সঠিক ধরে নিয়ে জিজ্ঞাস করলেন, ‘কই যাইবেন?’
‘চুনখোলা মসজিদে যাব। কদ্দুর এখান থেকে?’
‘এই তো সামনেই। আরেকটু গেলেই পাবেন।’
চুনখোলা মসজিদ; ছবিঃ উইকিপিডিয়া

আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম। মাটির রাস্তা বেয়ে খানিকদূর যেতেই চোখের সামনে রাস্তার শেষ মাথায় উঁকি দিলো একটি ছোট এক গম্বুজ মসজিদ। চারপাশে গাছপালা আর সামনে দুটি ছোট ডোবার মাঝে তার সরল নির্মাণ কৌশল আমাকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিলো। চারপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। তাহলে এখানে মসজিদ কেন?
পাঁচশো বছর আগে এখানে নিশ্চয়ই মানুষের আবাস ছিল। অবশ্য অন্যরকমও হতে পারে। খান জাহান আলী শুধু ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, সেই সাথে একজন শাসকও ছিলেন। সুতরাং তার নিশ্চয়ই শত্রুও ছিল কিছু। তার মূল দরবার ছিল ষাটগম্বুজ মসজিদ। সেখানেই তিনি শাসনকার্য চালাতেন। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ মনে করেন, তার বাড়ির পশ্চিমদিকে যে প্রহরা চৌকি ছিল সেটিকে কেন্দ্র করেই এই মসজিদ নির্মিত হয়।
আশেপ্সহের দৃশ্য; ছবিঃঅমিতাভ অরণ্য 

আমি মসজিদের দিকে আরো এগিয়ে গেলাম। দু’পাশে দুটি ডোবামতো জায়গা। সেখানে দুজন গ্রাম্য মহিলা মশারী দিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরছেন। আর ডোবার মধ্যে চুনখোলা মসজিদের প্রতিবিম্ব ভাসছে। এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ইট দিয়ে তৈরি আর পোড়া মাটির অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মসজিদটির স্থপতি খান জাহান আলী। আবার কেউ কেউ বলেন খান জাহান আলীর কোনো এক কর্মচারী এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী খান জাহান আলী নির্মিত অন্যান্য স্থাপত্যশৈলী থেকে ভিন্ন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার চুনখোলা মসজিদকে ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করে। এরপরেই বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়।
বহুদিনের ক্ষয়ের ফলে পোড়ামাটির কারুকাজ আর ইটের দেয়ালসমূহ নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৮০ সালে ইউনেস্কোর সহায়তায় চুনখোলা মসজিদ সংস্কার করা হয়। মসজিদটির বাইরের দিক লম্বায় প্রায় ৪০ ফুট এবং ভেতরের দিক ২৫ ফুট। আশেপাশের সৌন্দর্য এই সরল গঠনের মসজিদকে দান করেছে অনন্যতা।
খান জাহান আলীর খননকৃত মসজিদ। ছবঃ অমিতাভ অরণ্য

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে আপনি দুইভাবে বাগেরহাট যেতে পারেন- সরাসরি এবং খুলনা হয়ে। ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যায় অনেকগুলো বাস। সকালের ট্রিপগুলো ছাড়ে সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে। বিকেলের ট্রিপগুলো ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। এসব পরিবহনের মধ্যে রয়েছে- মেঘনা পরিবহন যাদের কাউন্টার যোগাযোগ নাম্বার- ০১৭১৭১৭৩৮৮৫৫৩, পর্যটক পরিবহন যাদের কাউন্টার যোগাযোগ নাম্বার- ০১৭১১১৩১০৭৮।
এছাড়া রয়েছে আরা, বলেশ্বর, হামিম, দোলা প্রভৃতি পরিবহন।  গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে পাবেন হানিফ, সোহাগ আর ইগলের মতো গাড়িগুলো। এগুলো আপনাকে পৌঁছে দেবে বাগেরহাট শহরে। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ষাটগম্বুজ মসজিদে। বাকি গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আপনাকে স্থানীয় কারো উপর নির্ভর করতে হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে খুলনা রেলস্টেশনে। তারপর সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে কিংবা রূপসা ঘাট পার হয়ে বাসে সোজা ষাটগম্বুজ মসজিদ।

কোথায় থাকবেন?

খুলনার অন্যতম আধুনিক হোটেল হলো ‘হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল’। এটি কেডিএ এভিনিউতে অবস্থিত। ফোন নাম্বার ০৪১-৭২১৬৩৮। এখানে থাকতে হলে ভালোই টাকা খসবে আপনার। সিঙ্গেল রুমের জন্য পড়বে বারোশো টাকা আর ডাবল টুইন রুমের জন্য দুই হাজার টাকা।
আরেকটি অভিজাত হোটেলের নাম ‘হোটেল ক্যাসল সালাম’। সুইমিং পুলবিশিষ্ট এই হোটেলটি হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনালের সামনেই অবস্থিত। ফোন নাম্বার- ০৪১-৭২০১৬০। এখানে থাকতে হলে আপনাকে গুণতে হবে নন এসি সিঙ্গেল: ১,০০০ টকা, এসি স্ট্যান্ডার্ড সিঙ্গেল: ১,৫০০ আর স্ট্যান্ডার্ড কাপল: ১,৮০০ টকা। এছাড়া আছে হোটেল সিটি ইন, হোটেল জেলিকো, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ইন, হোটেল মিলেনিয়াম প্রভৃতি।
কম খরচে থাকতে চাইলে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশে অনেকগুলো হোটেল আছে। ফেরিঘাট বাস টার্মিনালের সামনেও কিছু হোটেল রয়েছে।
এছাড়া আপনি চাইলে বাগেরহাটেও থাকতে পারেন। বাগেরহাট সদরে অনেকগুলো হোটেল আছে । পাশাপাশি আছে সরকারি গেস্ট হাউস। লোকপ্রিয় হোটেলের একটি রেল রোডে অবস্থিত মমতাজ হোটেল। এই হোটেলটিতে সেবার মান বেশ ভাল এবং খরচও একটু বেশি। মমতাজ হোটেলের আশেপাশে থাকার জন্য আরো কিছু হোটেল রয়েছে। খান জাহান আলীর মাজারের সামনে আছে হোটেল অভি। এখানে থাকতে হলে গুণতে হবে ৪০০ টাকা। ফোন: ০১৮৩৩৭৪২৬২৩।
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: বাগেরহাটের প্রকৃতি

বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত ফুড ফেস্টগুলো