শুভরাড়া খাঞ্জালী মসজিদ: ইতিহাস আর রূপকথা মিলেমিশে যেখানে একাকার

পড়াশোনার যাঁতাকলে নাভিশ্বাস উঠে গেছে, আর কিছুকাল এভাবে অতিবাহিত করলে প্রাণটাই হারানোর আশংকা করছিলাম। পিতৃপ্রদত্ত প্রাণকে তো আর এভাবে হারানো যায় না- তাই মানে মানে একদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শ্বশুরবাড়ির পথে।এটুকু পড়ে আঁতকে ওঠার দরকার নেই- ওটা আমার শ্বশুরবাড়ি নয়; সে সৌভাগ্য এখনো হয়নি! তাই কবিগুরুর শ্বশুরবাড়ি দিয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাই।
খুলনা থেকে বাসে করে যখন ফুলতলায় পৌঁছুলাম, তখন সবে সকাল চারপাশ আলো করে পাখা মেলেছে। আমি এক ভ্যান চালককে পাকড়াও করে রওনা হলাম। বিয়ে নিয়ে কবিগুরুর জীবনে বহু তামাশা হয়েছিলো, শেষমেশ মামাবাড়ির দেশ যশোরের দক্ষিণডিহির ভবতারিণী দেবীর সংগেই তিনি গাঁটছড়া বাঁধেন। দক্ষিণ-ডিহি যেতে হয় ফুলতলা থেকে। আমিও সেই মতো ভ্যানে চড়ে বসেছি। একা বলে ভাড়া বেশিই বটে- বিশ টাকা।
নিজে গ্রামের জলকাদাময় পরিবেশ থেকে উঠে এসেছি বলেই কিনা জানিনে, প্রান্তিক মানুষের সাথে আমার দ্রুত ভাব জমে যায়। যথারীতি ভ্যান-চালক আংকেলের সাথেও গল্প শুরু হলো। কথায় কথায় তার কাছে এলাকার খোঁজ নিতে শুরু করলাম। এই এলাকার তিন গম্বুজওয়ালা একটি মসজিদের কথা উইকিপিডিয়াতে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু সেটি সম্পর্কে তিনি কোনো খোঁজ দিতে পারলেন না। বরং অন্য একটি মসজিদের খোঁজ পেলাম। সেটি অবশ্য এক গম্বুজওয়ালা।

রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

সেটি নাকি জ্বিনের মসজিদ- মসজিদের কাছে জ্বিনের কবর নাকি আছে- প্রকাণ্ড সেই কবর। স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অনেক লম্বা। ভৈরব নদীর তীরে এই মসজিদ আর সেই অলৌকিক জ্বিনের কবর কবে থেকে রয়েছে কেউ নাকি জানেনা- শুনে কৌতূহল হলো। যখন দক্ষিণ-ডিহি পৌঁছুলাম, সবে নয়টা বাজে। মসৃণ আলোয় পুরনো দালান নবরূপে সেজে আছে। দুয়েকটি ভাতশালিক এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে খাবারের খোঁজে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারলাম না। বিকেলের আগে নাকি এটি খুলবে না। এই সময়ে কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো ভ্যান চালকের কাছ থেকে শোনা পুরনো মসজিদের কথা। সেখানে যেতে হলে আমাকে এখন ভৈরব নদী পার হতে হবে। যে জায়গায় ঘাট সেটি বেশ বড় বাজার। নাম শিকিরহাট। সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করলাম মসজিদটি সম্পর্কে। কেউ একজন উত্তর করলো, “আরে, ওটা তো শুভরাড়া গ্রামে”।
শুনে আমার পেটের ভেতর থেকে রাশি রাশি হাসি সোডা ক্যানের হঠাৎ খোলা মুখ বেয়ে বেরিয়ে আসা বুদবুদের মতোন বেরিয়ে আসতে লাগলো। এই গ্রামটি আমার বহুল পরিচিত। আমাদের দূর সম্পর্কের কিছু আত্মীয় স্বজনও নাকি ছিল এই এলাকায়। কোনোদিন না আসলেও অনেক গল্প শুনেছি গ্রামটির- অবশ্য অন্য নামে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোন একটি নাম উচ্চারণের সুবিধার্থে অপভ্রংশ হয়ে অদ্ভুত এক নাম ধারণ করে বসে আছে, যার সাথে মূল নামের স্বর বিন্যাসটুকুই অবশিষ্ট আছে। বাকি সব উধাও। শিবনগর থেকে হয়ে যায় শিমনাগর, খড়রিয়া থেকে খড়েলা। ঠিক তেমনি শুভরাড়া গ্রামটির আঞ্চলিক নাম শুখনাড়া।
এই সেই মসজিদ; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

মসজিদটি বাঁশবন আর জঙ্গলে ঘেরা একটা জায়গায় অবস্থিত। অনেকদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে ছিল। ৩০-৪০ বছর আগে এটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। মাটির তলা থেকে মসজিদ উঠেছে এমন একটি আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল তখন।
মসজিদ তালাবন্ধ। ঢুকতে পারলাম না। ছবি তোলার ভালো অ্যাঙ্গেলও পেলাম না। ঘুরে ঘুরে মসজিদটি দেখলাম। মজবুত গঠনে এক গম্বুজওয়ালা মসজিদ। চার প্রান্তে চারটি টারেট। পুরু লাল ইটের দেওয়াল। মসজিদের সামনের দেয়ালের সাথে টিনের চালা দিয়ে মক্তব বানানো হয়েছে- এতে পুরাকীর্তিটির সৌন্দর্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবশ্য খুব কম দর্শনার্থীই এখানে আসে। তবু সরকারের উচিত মক্তবের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের টানানো নাম ফলক দেখতেই চক্ষুকর্ণের বিবাদ-ভঞ্জন হলো। এর নির্মাতা খান জাহান আলী। কি অবাক হচ্ছেন নাকি? কোথায় বাগেরহাট আর কোথায় যশোরের নিভৃত পল্লীর এই মসজিদ। ইতিহাসে আপনার আগ্রহ থাকলে অবশ্য অবাক হবেন না।
নামফলক; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

রাজা গণেশকে পরাজিত করে খান জাহান আলী যশোরের বারোবাজার দিয়ে এই দক্ষিণবঙ্গে প্রবেশ করেন। পথিমধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি জায়গায় কিছুকাল করে অবস্থান করেন। এই এলাকায় ও তিনি কিছুকাল ছিলেন। এখানে স্থাপন করেছিলেন একটি শহর, যার নাম পয়গ্রাম কসবা। তিনি যেখানেই যেতেন তার বিরাট সেনাবাহিনীকে কাজে নামিয়ে দিতেন। এমনও নাকি হয়েছে, সকালে উঠে দেখা গেছে রাতারাতি একটি দীঘি তৈরি হয়ে গেছে কিংবা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে আস্ত মসজিদ। প্রবাদ আছে, তিনি ৩৬০টি মসজিদ আর দীঘি স্থাপন করেছিলেন। এটি তার একটি।
এবার জ্বিনের কবর দেখার পালা। আরো ভেতরের দিকে ভৈরব নদীর তীর ঘেঁষে একটি পুরনো কবর রয়েছে- কত পুরনো কবর, কেউ জানে না। এমনকি কার কবর- তাও কারো ধারণা নেই। কে তুমি এখানে শুয়ে আছ নিঃশব্দে? কে ছিলে তুমি?
ইস্টকস্তম্ভ নিশ্চুপ! মাঝে মাঝে দু-একটি পাখি ডেকে উঠছে বিরামহীন শুধু। আর কোনো শব্দ নেই কোথাও। নদী থেকে একটি নালা উঠে এসেছে এদিকে। সেখানে কয়েকজন মানুষ বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। পায়ের নিচে অচেনা সব ঘাস- তাতে প্রেয়সীর নাকের ঝিকমিক করা নোলকের মতো গাঢ় বেগুনী ফুল।
অচেনা কবর; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

ধারণা করলাম, কোন এক ধর্মপ্রচারকের কবরই হবে। খাঞ্জালীর প্রধান মুরিদ হয়তো। যিনি তার সঙ্গ ছেড়ে এই নিভৃত পল্লীতে থেকে গিয়েছিলেন। কালক্রমে তার নাম-পরিচয়-কীর্তি সব মুছে গেছে কালের ধারায়- ভৈরবের জলরাশিতে অজস্র কচুরিপানা যেভাবে ভেসে চলেছে নিরন্তর।
মসজিদ দেখে ফিরছি। এমন সময়ে রাস্তার ভেতরে কাজ করছে এমন একটি ছেলে ডাক দিলো, “অ ভাই। মসজিদে আইছিলেন নাহি?”
-আমি বললাম, হুরে ভাই!
-অ! কিন্তু মসজিদ তো বন্ধ!
কথায় কথা বাড়ে, ভোজনে বাড়ে পেট! আমাদের কথা চলতে লাগলো। জানতে পারলাম, মসজিদের চাবি তার কাছেই থাকে। বলল-
ভেতরে দেখবেন না?
দেখব তো রে ভাই! কিন্তু ভেতরে ঢুকুম কেমনে?
আপনি দেখতে চান?
দেখা যাবে?
সে সোৎসাহে মাথা নাড়ল। আমি মসজিদ দেখতে চাওয়ায় সে খুবই খুশি! যেন সারা সকাল জুড়ে আমারই জন্য অপেক্ষা করছিল বেচারা।
চলেন চলেন, আমি দেখামুনে।
আলামিনের সাথে সেলফি।

ছেলেটার নাম আল-আমিন। আমাকে নিয়ে গিয়ে মসজিদের দরজা খুলে দিলো। আমি প্রবেশ করলাম পাঁচ-ছয়শো বছর আগে নির্মিত এক সৌধে। কী সহজ সরল অথচ অভূতপূর্ব নির্মাণ কৌশল। যেদিন মসজিদটি নির্মিত হয়েছিলো তার পর পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে- তবু স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এটি। দাঁড়িয়ে থাকবে আরো অনন্ত সময়ব্যাপী।

কীভাবে যাবেন:

খুলনা থেকে বাস কিংবা মাহেন্দ্র করে ফুলতলা নামতে হবে। তারপর সেখান থেকে ভ্যানে করে শিকিরহাট নদী পার হয়ে ভ্যানে করে যেতে হবে। শুভরাড়া না বলে শুখনাড়া শব্দটি ব্যবহার করবেন। এটি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
 

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. Apnar lekhati pore khubi bhalo laglo…..onek ojana koutoholi hobar moto tottho je amader Bangladesh ei lukie ache….tar amra koto tukui jani……! Kintu likhen bidhay Omitab Oronno marka nijer ehen peculiar nam rakte hobe keno??…..borong poitrik namey liklei to onek simple hoto…!!

  2. জীবন ও জগতের লক্ষ উদ্দেশ্য ও ইতিহাস জানা একটি মহান নেশা,আমিও এতে আসক্ত,এ ধরনের তথ্য আরো পেলে জানিয়ে বাধিত করবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হরিণ প্রজনন কেন্দ্র ও পশু পাখির অভয়ারণ্য কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক

রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ার জামদানি পল্লীর গল্পকথন