যশোরের ভাটপাড়া: যে গ্রামের বয়স ২,০০০ বছরেরও বেশি

চলুন আজ একটি গ্রাম থেকে ঘুরে আসি যা দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। কি, চমকে গেলেন? চমকে যাওয়ারই কথা। কিন্তু কথাটি সত্যি। যশোর জেলার অভয়নগর থানায় অবস্থিত গ্রামটি। গ্রামের নাম ভাটপাড়া। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুই হাজার বছর আগের সেই সূত্র। কীভাবে জানতে চান?
গাঙ্গেয় অববাহিকায় বহু নদীর বয়ে আনা পলিতে গঠিত আমাদের বাংলাদেশ। এর পূর্বে সে লুকিয়ে ছিল সমুদ্রের বুকে। তারপর একদিন কালের নিয়মে আর পলির পরতে পরতে জেগে উঠল সে। জন্ম নিলো গাছপালা, এলো পশুপাখি। তারপর এলো মানুষ। এই বঙ্গভূমিতে যারা সবার আগে আবাস গেড়েছিল তাদের মধ্যে ছিল ভীম, মুন্ডা, কোলসহ আরো অনেক জাতি।
এমনই একটি জাতির নাম ছিল মাগধ জাতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, যীশু খ্রিষ্টের জন্মেরও দুই হাজার বছর আগে তারা বসবাস করত প্রমত্ত ভৈরবের তীরে এই স্থানে। নিজেদের তারা পরিচয় দিতো ভাট নামে। সেই থেকে এই জায়গা পরিচিত ভাটপাড়া নামে।

ভৈরব নদী; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

যদিও আজ সেই মাগধ জাতির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। থাকার কথাও নয়। যুগে যুগে এই বাংলায় আশ্রয় গেড়েছে কত শত জাতি। তাদের রক্ত মিলেমিশে এক হয়ে জন্ম নিয়েছে বাঙালি- এক সংকর জাতি। তেমনি মাগধরাও মিশে গেছে অন্যান্য জাতির সাথে। হারিয়ে গেছে তাদের আলাদা সত্ত্বা। কিন্তু ভাটপাড়া গ্রামে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। ঈশ্বর যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে এই গ্রামকে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদী। অন্য প্রান্তে রয়েছে হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান- জগন্নাথধাম।
নদীর অপর পাড়ে খান জাহান আলী (হ্যাঁ, ইনি সেই বিখ্যাত বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা) তাঁর বঙ্গ অভিযানের এক পর্যায়ে আস্তানা গেড়েছিল। চলুন আমার সাথে। দেখিয়ে নিয়ে আসি আপনাদের সেই নিদর্শনগুলোতে।
মাসখানেক আগে বাড়ি যাওয়ার পথে বন্ধুকে নিয়ে ঘুরে এসেছিলাম এই গ্রাম। খুলনা থেকে যশোরগামী রাস্তায় চেপে পৌঁছে গেলাম নওয়াপাড়ায়। তারপর মোটরসাইকেল ভাড়া করে তাতে চেপে বসলাম। কিন্তু শেষতক আর যাওয়া হলো না। ভাটপাড়া বাজারের আগে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। তারপর সেই দিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে গেলাম ক্ষণিকের জন্য।

তারপর একটা ভ্যানকে ডেকে উঠে বসলাম পরবর্তী পথ পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্যে। ভাটপাড়ায় পৌঁছে পরিকল্পনা করলাম সবার আগে জগন্নাথধাম দর্শন করে আসব। সেই মোতাবেক চললাম জগন্নাথ বাড়ি। ভাটপাড়া’র জগন্নাথধাম একটি প্রাচীন মন্দির এবং হিন্দুদের তীর্থক্ষেত্র।
দয়ারাম গোস্বামী ছিলেন একজন পরম বৈষ্ণব ভক্ত। তিনি তার বাড়িতে নিয়মিত রাধাকৃষ্ণের আরাধনা করতেন। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অলৌকিক উপায়ে ভৈরব নদী দিয়ে ভেসে আসে একখণ্ড নিম বৃক্ষ। সেই নিম বৃক্ষ দিয়ে দয়ারাম গোস্বামী তৈরি করেন জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রার অপূর্ব প্রতিমা। মূল মন্দিরের আশেপাশে আরো ছোট ছোট কয়েকটি মন্দির আছে। সেগুলোও প্রাচীন। সেসব মন্দিরে রয়েছে শ্রী চৈতন্য, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্যের অপূর্ব সুন্দর বিগ্রহ।
প্রতিবছর এখানে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অসংখ্য লোকের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত এলাকা। জগন্নাথধামে ঢুকলে জগন্নাথ-বলরাম আর সুভদ্রার প্রতিমাগুলো ভক্তদের হৃদয় বিমোহিত করে তোলে। আর রথযাত্রায় তো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ দেয় অসংখ্য মানুষ। হরেক পদের মিষ্টি, মাটির খেলনা, মৌসুমি ফল আর গৃহস্থালী জিনিস বিক্রি হয় ধুমসে।

মেলার পাখি; ছবিঃলেখক

এই মেলার দুইটি বিশেষত্ব আছে- একটি হলো মেলার এক প্রান্তে পাখি বিক্রি হয়। ছোটদের আগ্রহ থাকে সেই দিকে। শালিক, ময়না, টিয়ে, ঘুঘু, কোকিল সহ আরো নানারকম পাখি পাওয়া যায় এখানে। অবশ্য সরকারী কড়াকড়িতে এখন পাখির মেলার সেই জমজমাট রূপ আর নেই। আরেকটি বিশেষত্ব হলো ভাটপাড়ার ঋষি-পল্লীর মানুষেরা এই মেলায় তাদের হাতে তৈরি বাঁশ ও বেতের নানান জিনিস হাজির করে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে গৃহস্থালি জিনিস- ধামা, চালুনি, মাছ ধরার খলুই, ধান ঝাড়ার কুলো, বাঁশের ঝুড়িসহ শত রকম জিনিস।
মেলা দেখতে দেখতে খানিক ক্লান্ত হয়ে পড়লে ভাবলাম যাই মুক্ত বায়ু ভক্ষণ করে আসি। গেলাম ভাটপাড়া খেয়া ঘাটে। এটি একটি ব্যস্ত ঘাট। কোনো ব্রিজ নেই এখানে। ওপাশে কয়েকটি পাটের মিল রয়েছে। প্রকাণ্ড নৌকায় করে সাধারণ যাত্রীরা, মিলের শ্রমিকেরা এপার থেকে ওপারে যাতায়াত করে। এত বড় খোলা নৌকা আমি আর কোথাও দেখিনি। এমনকি এই নৌকাগুলোতে করে চার চাকার গাড়িও পার হয়।
বাশের বোঝা; ছবিঃ লেখক

নদীর পাড়ে যেতেই ঠাণ্ডা হাওয়া আপনার মুখে হাত বুলিয়ে যাবে। শীতল হয়ে যাবে আপনার দেহ। নদীর পাড়ে বসে পড়তে মন চাইবে। হয়তো ইচ্ছে হবে নদীর জলে পা ডুবিয়ে দিতে। আর তখনই চোখে পড়বে কাদার উপরে কী যেন ছোট ছোট একটা কিছু দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে আঁতকে উঠবেন। আরে এ যে কাঁকড়া। লক্ষ লক্ষ গুড়ো কাঁকড়ায় নদীর তীরের কাদামাটির উপর দিয়ে খেলে বেড়ায় সারাক্ষণ। কিন্তু চাইলেই তাদের ধরতে পারবেন না। যেই হাত নাড়িয়েছেন তো সেই মুহূর্তে লুকিয়ে পড়বে পিচ্চি পিচ্চি গর্তের মধ্যে।
হঠাৎ করেই আপনার চোখের কোণে ধরা পড়বে নদী দিয়ে কী যেন প্রকাণ্ড একটা ভেসে যাচ্ছে। কাঁকড়াগুলো থেকে চোখ সরাতেই অবাক হবেন। বিশাল বিশাল বাঁশের বোঝাই নদীর বুক দিয়ে ভেসে যাচ্ছে জলের টানে। তার উপরে আবার বসে আছে একজন মানুষ। বৈঠার মতো কিছু দিয়ে সেই বাঁশের ঝাঁকের দিক ঠিক রাখছে তারা। এভাবে তিন চারদিন তারা ভেসে যাবে। তারপর পৌঁছাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। এমন মজার ব্যাপার কখনো দেখেছেন, যেখানে মালামাল নিজেই চলে যায় তাও মানুষকে ঘাড়ে করে?
এখানে পাওয়া গেছিলো খান জাহান আলীর চিহ্ন; ছবিঃ লেখক

আমরা নদী পার হয়ে ওপারে গেলাম। একটি মসজিদ আছে আর খানিকটা খোলা মাঠ। তার একপাশ লোমশ উঁচু হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে ওখানে খনন করতে গিয়ে প্রাচীন ধ্বংস স্তূপের চিহ্ন পেয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছিলেন, খান জাহান আলী যখন যশোরের বারোবাজার হয়ে এপথে বাগেরহাটে গিয়েছিলেন, তখন পথিমধ্যে পয়গ্রাম কসবাতে যে দশ বছর কাটিয়েছিলেন, তখনই নির্মিত হয়েছিল এই স্থাপনা। সে স্থাপনা একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আবার মাটির তলে বুজিয়ে ফেলা হয়েছে তাকে।
আমরা সব কিছু ঘুরে ঘুরে দেখে নদীর তীরে একটি উপুড় করে রাখা নৌকার গায়ে হেলান দিলাম। দৃষ্টি নদীর বুকে। সেখানে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানা। ঠিক এইভাবে সময়ের বুকে ভেসে গেছে মাগধেরা, দয়ারাম গোস্বামী কিংবা খান জাহান আলীর মতো মানুষেরা। সময়ের আহ্বানে সবাইকে ভেসে যেতে হয়।
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নড়াইল বাধাঘাট ভ্রমণ: যার মায়ায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বুর্জ খলিফা: মানবসৃষ্ট পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থাপনা (ভিডিও)