পাহাড়ঘেঁষা টলটলে জলের মহামায়ায় হারাতে

বহুদিন পর চট্টগ্রামের সৌন্দর্যের মাঝে হারাতে চলে গেলাম। প্রথমে অপরূপ পাহাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে ট্রেকিং করে ঘুরে এলাম বাংলার ঝর্ণা রানী খ্যাত খৈয়াছড়া ঝর্ণা। এরপর খৈয়াছড়া থেকে ফেরার পথে একটি হোটেল থেকে দুপুরের খাবার সেরে নিয়ে আমরা ১৩ নারীর মাঝারি দলটি পথ ধরলাম মহামায়া লেকের মায়ায় হারাতে।

লেগুনায় আমাদের যাত্রা শুরু হয় খৈয়াছড়ার পর। সেখান থেকে খুব অল্প সময়েই আমরা পৌঁছে যাই মহামায়া লেকের কাছাকাছি। লেগুনা থেকে নেমেই চোখে পড়ে একটি রেলপথ। একটু দূরেই চোখে পড়া পাহাড়, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা সবুজের চাদর আর দূর আকাশে ভেসে থাকা শুভ্র মেঘের ভেলা আমাদের আটকে নিলো এ পথেও কিছুটা সময় কাটাতে।

মহামায়া যাওয়ার পথে; সোর্স: লেখিকা

মহামায়া লেকটি মহামায়া ইকো পার্কের ভেতর অবস্থিত। এই ইকো পার্কে ঢোকার প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। টিকেট কেটে গেট থেকে অনেকটা উঁচুতে উঠে যাওয়া পথ ধরে চলতে শুরু করলাম সবাই।

পার্কের ভেতর অসংখ্য গাছ। অনেক গাছেই তখন হলুদ, সাদা, লাল, গোলাপী ফুলের বাহার। খানিকটা হেঁটে ভেতরে ঢুকতেই দূর থেকে চোখে এক প্রশান্তির ছোঁয়া জুড়ে দেয় টলটলে পানির অসম্ভব সুন্দর এই লেকটি। তার সঙ্গে পাড়ে বাঁধা রঙিন নৌকা আর কায়াকের সৌন্দর্য তো চোখে পড়ার মতোই!

পাহাড়ি পথ ধরে লেকের দিকে; সোর্স: লেখিকা

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত সুন্দর টলটলে জলের এই লেকটি একটি কৃত্রিম লেক। ইন্টারনেট ও সেখানকার স্থানীয় লোকেদের থেকে পাওয়া তথ্য মতে চমৎকার এই লেকটি ১১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আমাদের ফেলে আসা তপ্ত দুপুরের শেষভাগে এই লেকটি হয়ে উঠেছিলো চোখ এবং মনে প্রশান্তির বাহক।

লেকটির পানি একেবারে টলটলে এবং শীতল, পুরো লেকটি জুড়েই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়, পাহাড়ি গুহা এবং ঝর্ণা। এখানে কায়াকিং করার দারুণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্যাডেল নৌকাতেও নিজেদের মতো করে ঘুরতে পারবেন। পাশাপাশি ছোট, বড় নানা আকৃতির নৌকাতেও ঘুরতে পারবেন লেকে।

পাহাড় ও আকাশ মেশানো লেকের জল; সোর্স: লেখিকা

ঢাকা থেকে কায়াকিংয়ের ইচ্ছে নিয়ে গেলেও দুর্ভাগ্যবশত কায়াকিংয়ের সুযোগ আমরা পেলাম না। তাদের কোনো একটা সমস্যার কারণে কায়াক বন্ধ ছিল। প্যাডেল নৌকায় ঘোরায় পরিশ্রম খুব বেশি। এতে আশপাশের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ কমে যাবে। তাই আমরা সাধারণ নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

৪ জন ঘুরে বেড়ানো যায় এমন নৌকায় দলের ৪ জন করে চেপে বসলাম। সঙ্গে একজন মাঝি। সে নৌকা চালিয়ে আমাদের লেকটি ঘুরে দেখাবেন। ঘণ্টাপ্রতি ৬০০ টাকা। নৌকায় চেপে বসতেই ছোট্ট মাঝি ভাইটি বৈঠা চালিয়ে সাঁইসাঁই করে নৌকা বেয়ে চললেন।

লেকে নৌকা ভ্রমণ; সোর্স: লেখিকা

জলের কাছাকাছি এসে এই লেকের সৌন্দর্য আরো ভালোভাবে টের পাওয়া যায়। এই লেকটির নাম ‘মহামায়া’ হওয়ার স্বার্থকতা এখানেই। আমরা প্রচণ্ড মায়ায় সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছিলাম। পাহাড়ের পাশঘেঁষে বয়ে চলা নৌকায় বসে পুরো সৌন্দর্যটিতে একেবারে ডুবে যাচ্ছিলাম।

সকাল থেকে বহু পথ হেঁটে ট্রেকিং করে আসার ক্লান্তি নিমেষে মিইয়ে দেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এই প্রকৃতির, তা খুব করে টের পেলাম। সবুজে মোড়ানো পাহাড়, অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট করা পাহাড়ি গুহাগুলো, লেকের টলটলে জলে মেশা আকাশের নীল আর সাদায় অদ্ভুত এক ঘোর জাগানো সৌন্দর্যের মিশেল তৈরি হয়েছিলো যেন!

লেক থেকে ঝর্ণার পথে; সোর্স: লেখিকা

মাঝির সঙ্গে সখবশত আমরাও বৈঠা চালালাম। আধা ঘণ্টার মধ্যেই নৌকা এক পাড়ে এসে থামানো হলো। জানলাম এখান থেকে হেঁটে একটু সামনে গেলেই ছোট্ট একটি ঝর্ণা রয়েছে। আমাদের মতো আরো কিছু নৌকা এসে ভিড়লো এই একই স্থানে। সবাই মিলে আমরা ঝর্ণার দিকে পা বাড়ালাম।

একটু হেঁটে যেতেই ছোট্ট ঝিরিপথ চোখে পড়ল, এরপর দূরের ছোট্ট ঝর্ণাটি। এখন ঝর্ণাটিকে ছোট্ট মনে হলেও প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় এর জলের ধারা খুব বেড়ে যাওয়ার কথা। আমাদের জন্য এই ঝর্ণাটি ছিলো একটি ‘বোনাস’। নিজেদের স্বল্প সময়ের এই ভ্রমণ তালিকায় খৈয়াছড়া ঝর্ণা আর মহামায়া লেক তুলে নিয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম সবাই। সেখানে নাম না জানা আরো এতগুলো পাহাড় আর ঝর্ণা তো বোনাস পাওয়া হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত, তাই না!

বোনাস পাওয়া লেকের ঝর্ণাটি; সোর্স: লেখিকা

এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরো অসংখ্য নৌকাকে তোয়াক্কা না করে আমাদের নৌকাটি ফেরার পথ ধরল। নিজেরা প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গেলেও সময়ের তাড়াটা ঠিক টের পাচ্ছিল মাঝি ছেলেটি। আমরা ফিরতে ফিরতে আমাদের থেকে বয়সে অনেক ছোট এই মাঝির গল্পও শুনে নিলাম।

স্কুল শেষে সে আর তার বন্ধুরা এখানে আসে। প্রতিদিন ৩/৪ বার এভাবে ঘণ্টাপ্রতি দর্শনার্থীদের নিয়ে যাওয়া আসা এই লেকে তার। ক্লান্ত লাগে, হাত-পা ব্যথা হয় তবুও কাজটা তার দরকার। আমরা ঘণ্টাপ্রতি ৬০০ টাকা গুণলেও ঘণ্টাপ্রতি নৌকা চালিয়ে প্রত্যেকবারে তার আয় ১৫০ টাকা। ঘাম জড়ানো চোখ-মুখে হতাশার ছাপ ছিল না ছেলেটির। হাঁপাতে হাঁপাতে বেশ আগ্রহ নিয়েই নিজের আর এখানকার মাঝিদের কথা শোনালো।

পাহাড়ের উপর ঝুলে থাকা মেঘেরা; সোর্স: লেখিকা

‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো
রাত বলেছে যাই
সাগর বলে কুল মিলেছে
আমি তো আর নাই’

যাবো যাবো বলা মেঘের মতো আমাদেরও যেতে হবে বলে সবাই মিলে গানটির সুর ধরলাম। এই মহামায়া লেকের সৌন্দর্যে হারিয়ে বলাই যায় ‘আমি তো আর নাই’।

নৌকায় ঘোরা শেষে আমরা লেকের পাড়ে বসে বিকেলটিকে হারিয়ে যেতে দেখলাম। একে অন্যের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। লেকের পাড়ের শীতল বাতাসে সন্ধ্যার গন্ধ ছড়াতেই সবাই উঠে পড়লাম। মীরসরাই থেকে সীতাকুণ্ডের হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম। অনেকটুকু প্রাকৃতিক প্রশান্তি ভেতরে নিয়ে আমাদের ফেরার পালা দেয়াল ভর্তি শহরে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে প্রথমে আসতে হবে মীরসরাইয়ের ঠাকুরদিঘী বাজার। ননএসি বাসের ভাড়া ৪২০-৪৮০ টাকা। এসি বাসে ৮০০- ১,১০০ এর মধ্যে। ঠাকুরদিঘী বাজার থেকে সিএনজিতে করে মহামায়া ইকো পার্ক। ভাড়া জনপ্রতি ১৫-২০ টাকা। ইকো পার্কে ঢুকতে জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা।

কায়াকিং বা নৌকায় ঘোরার ক্ষেত্রে:

কায়াকিং করতে চাইলে ঘণ্টায় কায়াকের ভাড়া ৩০০ টাকা। একটি কায়াকে ২ জন যাওয়া যায়। নৌকা ৪ জনের জন্য, ভাড়া ঘণ্টাপ্রতি ৬০০ টাকা। বড় নৌকাগুলোর খরচ আরো বেশি। এছাড়া ইঞ্জিন নৌকাও রয়েছে লেকে। তাতে অনেক জন মিলেও ঘুরতে পারবেন।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের টয় ট্রেনে…

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত কিছু স্থান