সবুজের ভিড়ে হারাতে লাউয়াছড়া জাতীয় বনে

অফিসের কাজে ১০ জনের একটি টিম এলাম আমরা শ্রীমঙ্গলে। কাজের পাশাপাশি সকলেই ভেবে রাখলাম ঘুরে দেখবো যতটা সম্ভব। বাকিদের তুলনায় আমার আগ্রহের পরিমাণটা ছিল বেশি। একে তো ঘুরতে বেশ ভালোবাসি, তার উপর আমার প্রথম সিলেট ভ্রমণ!

বেশ কিছু জায়গা এই ৩ দিনের ভ্রমণে ঘুরে দেখা হয়েছে। তবে এবারে সিলেট ভ্রমণ ডায়েরি থেকে তুলে আনা লাউয়াছড়া জাতীয় বন ভ্রমণের ইতিবৃত্ত।

আপনারা যারা হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ সিনেমাটি দেখেছেন, তাদের সিনেমায় দেখা বনের দৃশ্য, আলাদা এক পরিবেশ খুব নজর কেড়েছিল কি? আমার কেড়েছিল। বিশেষ করে ‘আমার আছে জল’ গানটির দৃশ্য। সিনেমাটির ৫২:৪৭ সেকেন্ডের দৃশ্যে যখন হলুদ রঙের পোশাকে বিদ্যা সিনহা সাহা মীম এসে দাঁড়ায় একটি রেললাইনের সামনে! মনে আছে বনের ভেতরের সেই রেইলাইনটির কথা?

আমার আছে জল সিনেমার শ্যুটিং স্পট; সোর্স: লেখিকা

চারপাশে গাছের সমারোহ। অভিনেত্রী যখন সেই রেললাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলো, চেয়ে থেকে আমি সে দৃশ্যে রেললাইন আর বনের সৌন্দর্যই দেখছিলাম শুধু! সিনেমায় দেখা সে দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছিলো সিলেটের কমলগঞ্জের এই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেই। সিনেমায় দেখা দৃশ্যের চেয়ে বাস্তবের দৃশ্যটা আরও বেশি সবুজ, আরও অনেক বেশিই সুন্দর।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেখার উদ্দেশ্যে যখন আপনি কমলগঞ্জের রাস্তায় ঢুকবেন মূলত তখন থেকেই শুরু হবে আপনার মুগ্ধতা। কারণ বিশালাকার গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির শুনতে পাবেন তখন থেকেই। দুই পাশে ঘন বন রেখে তার মাঝের একটু পর পর বাঁক নেয়া রাস্তা ধরে যখন গাড়ি চলতে থাকে তখন বেশ ভিন্ন এক অনুভূতি তৈরি হয় ভেতরে।

আমরা যখন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কাছে পৌঁছালাম তখন পুরোপুরি বিকেল। প্রথমেই টিকেট কেটে নিলাম প্রবেশের জন্য। তারপর সময় নষ্ট না করে ১০ জনের দল ঢুকে পড়লাম বনের সৌন্দর্য অবলোকন করতে। রাস্তায় বেশ ভালো ঝলমলে পরিবেশ রেখে এলেও বনে ঢুকতেই কিছুটা অন্ধকার চোখে পড়লো, পাশাপাশি বেশ শীতল পরিবেশও। ভূতুড়ে কিছু নয়। সবটাই মূলত গাছপালার জন্য।

বনের মাঝে রেলপথ; সোর্স: লেখিকা

স্রষ্টা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য এই বনে উজাড় করে দিতে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেননি। বনপ্রাণীর অভয়ারণ্য এই বন। নানা প্রজাতির বৃক্ষ শিকড় আটকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই বনে। কোনো কোনো বিশালাকার বৃক্ষের দেহ অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়েও আছে মাটিতে। যেহেতু এটি জাতীয় বন, তাই এর কোনো গাছ কাটার বা পড়ে গেলে সরিয়ে রাখার নিয়ম নেই।

সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার একটি উপজেলা কমলগঞ্জ। এই কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটির আয়তন ১,২৫০ সেক্টর। ১৯৯৭ সালে এই বনটিকে জাতীয় বন হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার। নানা দুর্লভ প্রজাতির গাছ ও বিলুপ্তপ্রায় বহু প্রাণীর বাস এই বনে।

বিশাল বিশাল গাছের ভিড়ে কিছু সরু ও মাঝারি আকারের রাস্তা চলে গেছে বিভিন্ন দিকে। এই বনটি পায়ে হেঁটে ঘুরে আসতে ৩টি পথ রয়েছে সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য। একটি আধা ঘণ্টার পথ, একটি এক ঘণ্টার পথ ও অন্যটি ৩ ঘণ্টার পথ। এছাড়াও আরো কিছু পথ ধরে এখানকার কর্মরত লোক ও আশেপাশের কিছু লোকজন চলাচল করেন। তবে ভ্রমণকারীদের সেসব পথ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

সবুজে ঘেরা বনের সৌন্দর্য; সোর্স: লেখিকা

খানিকটা শীতল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে যখন আমরা নিরবে হেঁটে চলছি, তখন কানে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির মিলিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকলাম সবাই। বনের ভেতর থাকা পশু-পাখিদের বিরক্ত না করে নিরবে হাঁটাই উত্তম। বিশেষ করে দূর থেকে প্রাণীদের দিকে ঢিল ছুড়বেন না কখনোই।

এই পায়ে হাঁটা ভ্রমণে আমরা আধা ঘণ্টার পথটি ধরে শুরু করেছিলাম। তবে পথটি ঠিক আধা ঘণ্টারই ছিলো নাকি আমাদের হাঁটার গতি কম ছিলো সেটা বুঝে উঠতে পারিনি কেউ। হাঁটতে হাঁটতে বনের ভেতরের অন্ধকার বাড়তেই থাকলো। পথগুলো অস্পষ্ট হতে থাকলো। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব পথ চললাম শেষের দিকে। পথে দেখা পেলাম ছোট আকারের হরিণের। দুই একটা সাপেরও দেখা পাওয়া গেলো। দূরে একপাশে চোখে পড়লো বানরের দল।

বিশালাকার গাছ ও ছোটবড় গুল্মলতায় ছেয়ে থাকা বনের ভেতর সরু মাটির রাস্তা, হিমশীতল পরিবেশ, আলো-ছায়ার অদ্ভুত মায়াজাল, অসংখ্য পাখির বিচিত্র ডাকে অদ্ভুত শব্দের মিশ্রণ, তার সাথে পায়ের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মুড়মুড়ে শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম পুরোটা সময়।

বনের এ জায়গাটিতে পাবেন সাত রঙের চা; সোর্স: লেখিকা

এই বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটি রেললাইন। এই রেললাইনেই মূলত আমার আছে জল সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিলো। জায়গাটিতে বড় বোর্ডে তা লিখে রাখা হয়েছে। রেললাইনটি চলে গেছে বনের ভেতর থেকে অনেকটা দূরে। এটি একটি গেটম্যানহীন রেললাইন। যখন তখন রেলগাড়ি চলে আসতে পারে। তাই এই জায়গাটিতে সতর্ক থাকবেন।

রেলগাইনের কাছে এসে দেখা হলো এই বনের অফিসার আনোয়ার হোসেন ভাইয়ের সঙ্গে। বনের মূল গেট পর্যন্ত যেতে যেতে শোনালেন তার বনে বনে কাটিয়ে দেয়া ২৮ বছরের অভিজ্ঞতার কিছু গল্প। কীভাবে এই ২৮ বছর কাটিয়েছেন বনের গভীরতা, বনের ভেতর রাতের নিস্তব্ধতা আর বন্যপ্রাণীর ভিড়ে! সব মিলিয়ে আমার জন্য বেশ ভিন্ন আর অনেক বেশি ভালোলাগা মিশ্রিত এক অভিজ্ঞতা ছিল এবারের সিলেট ভ্রমণ পর্বে।

যেভাবে যাবেন:

প্রথমেই আপনাকে শ্রীমঙ্গল যেতে হবে। ঢাকা থেকে রেল ও সড়ক পথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকার কমলাপুর আন্তঃনগর ট্রেন ‘পারাবাত এক্সপ্রেস’ প্রতিদিন সকাল ৬:৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় (মঙ্গলবার ব্যতিত)। দুপুর ২টায় প্রতিদিন ছেড়ে যায় ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’। বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০টায় ছেড়ে যায় ‘উপবন এক্সপ্রেস’। ভাড়া ১১৫ টাকা থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে।

ঢাকার সায়েদাবাদ, কমলাপুর থেকে হানিফ, শ্যামলী, ইউনিক ইত্যাদি পরিবহন শ্রীমঙ্গল যায়।

বাস বা ট্রেন যোগে শ্রীমঙ্গল পৌঁছে সিএনজি বা বাসে যেতে পারবেন কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মাজুলা সিঙ্গাপুর: সিঙ্গাপুরের পথে এগিয়ে চলা

পথে পথে পটুয়াখালী থেকে বরগুনা