সবুজ পাহাড়ি গ্রাম ও ঝর্ণার টানে খৈয়াছড়ায়

বর্ষায় বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি যেন আরও সবুজ হয়ে ওঠে। এই সময়টি এডভেঞ্চার প্রেমী ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বেশ আকাঙ্ক্ষিত একটি সময়। কারণ বর্ষায় নদী, লেক, হাওড় এবং ঝর্ণার চিত্র অনেক বেশিই সুন্দর হয়ে ওঠে। তাছাড়া ভ্রমণ পিপাসুর একটি দল সারাবছর ধরে বর্ষার অপেক্ষায় থাকে ঝর্ণার সৌন্দর্য অবলোকন করতে।

স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাকালে ঝর্ণায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে জলের ধারা বেশি সুন্দর থাকে। এ সময় পাহাড়, ঝর্ণা আলাদা এক রূপ পায়। সেই রূপের সৌন্দর্যে হারাতেই এবারে আমাদের খৈয়াছড়া ঝর্ণা ভ্রমণের প্ল্যান করা। স্বল্প সময়ে চমৎকার একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে এই খৈয়াছড়া ঝর্ণা হতে পারে দারুণ একটি ব্যাপার, এমনটিই মনে হয়েছে আমাদের।

সবুজ-শ্যামল পাহাড়ি পথ; সোর্স: লেখিকা

১১ জন মেয়ের দলটি আমরা ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে রাত সাড়ে ১১টার বাসে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হই। মোটামুটি জ্যামহীন পথ পেরিয়ে ভোরে আমরা সীতাকুণ্ড বাস স্ট্যান্ডে নেমে পড়ি। দলে সবাই মেয়ে হওয়ায় সবার নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক নানা বিষয় চিন্তা করে ঢাকা থেকেই সীতাকুণ্ডের একটি হোটেলে ২টি সিঙ্গেল রুম বুকিং দিয়ে রাখা ছিল।

রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সেখানকারই একটি হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নেই আমরা সবাই। এরপর রওনা হই খৈয়াছড়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে অসংখ্য সিএনজি ও লেগুনা যায় খৈয়াছড়া ঝর্ণার কাছাকাছি একটি পথে। এরপর শুরু হয় পায়ে হাঁটা পথ। সীতাকুণ্ড থেকে লেগুনা রিজার্ভ না নিলে মাঝপথে নেমে আবার সিএনজি নিয়ে যেতে হবে।

ট্রেকিংয়ে সহায়ক বাঁশের লাঠি যেখানে পাবেন; সোর্স: লেখিকা

আমরা সীতাকুণ্ড থেকে সরাসরি লেগুনা নিয়ে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল পথ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। এরপর শুরু হয়েছিল পায়ে হাঁটা পথ। সুন্দর সবুজ-শ্যামল গ্রাম, ফসলের মাঠ, আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মিরসরাই পুরো জায়গাটিই বেশ সুন্দর। তাই পথের সবুজ, দূরের পাহাড় আর মেঘ মিলে যে খুচরো সৌন্দর্য চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল সেসবও মিস করে যাইনি কোনোভাবে।

খৈয়াছড়া ঝর্ণা যাওয়ার পথে বেশ কিছু খাবারের হোটেল তৈরি হয়েছে। এত খাবার হোটেলের ব্যাপারটি যেমন একদিকে উপকারি আবার অন্যদিকে ভ্রমণের আনন্দকে বা ভ্রমণের এডভেঞ্চারকে উপভোগ করার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। চলতি পথে প্রত্যেক হোটেলের লোকেদের সামনে এসে দাঁড়ানো, কাস্টমার জোগাড়ের চেষ্টায় নানা কথা বলে আমাদের ভ্রমণকে অনেকটাই বিরক্তিকর করেছে (যেহেতু সংখ্যাটা অনেক বেশি)। তবে এই ব্যাপারটি বাদ দিলে পুরোটা পথই ছিলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।

পাহাড়ি গ্রাম ও ঝিরিপথে নারী দলের পথচলা; সোর্স: লেখিকা

পুরো গ্রামটি সবুজে মোড়ানো। হাঁটতে হাঁটতেই দেখা পাচ্ছিলাম দূরের পাহাড়ের। যে মেঠো পথ ধরে চলছিলাম তার পাশ ঘেঁষা ফসলের মাঠের পরেই পাহাড় দিব্যি দাঁড়িয়ে ছিল। পথে গ্রামের উপর দিয়ে চলে গেছে অসংখ্য ঝিরিপথ। সেসব ঝিরিপথেরও ছিল ভিন্ন এক উপভোগ্য সৌন্দর্য।

পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের শব্দ সে সৌন্দর্যে আরো এক আলাদা মাত্রা জুড়ে দেয়। ঝিরিপথগুলোতে বেশ কয়েকবার বড় আকৃতির লাল কাঁকড়ার দেখা পেলাম। এটা আমার জন্য একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা। কিছু পথ পার হতে না হতেই একেকটা ঝিরিপথের দেখা মেলে। তার উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যায় কাঁকড়ার দল। ভাবতেই বেশ দারুণ লাগে না দৃশ্যটি?

সবুজে মোড়ানো পাহাড় ও পাহাড়ি গ্রাম; সোর্স: লেখিকা

মোটামুটি ২০ মিনিটের ট্রেকিং শেষে আমরা খৈয়াছড়া ঝর্ণার প্রথম ধাপে এসে পৌঁছালাম। দূর থেকেই ঝর্ণার শব্দ আর ঠাণ্ডা টের পাচ্ছিলাম যদিও। ভোরের দিকে হয়তো বৃষ্টি হয়েছিল। তাই ট্রেকিংয়ের পুরো পথটিই ভেজা আর পিচ্ছিল ছিল। তবে ট্রেকিং খুব একটা কঠিন মনে হয়নি আমার।

দূর শহর থেকে প্রকৃতির মাঝে হারাতে, নিরিবিলি শান্তির খোঁজে এসেছিলাম পাহাড়ের বুকে, ঝর্ণার টানে। তবে আমার এবং আমাদের মতো লোকের সংখ্যা যে নেহাত কম নয় সে কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ঝর্ণার প্রথম ধাপে এসেই তাই থমকে যেতে হলো। এত মানুষ! সারাপথের আনন্দ আর উচ্ছ্বাস এখানেই মাটি চাপা পড়লো।

খৈয়াছড়া ঝর্নার প্রথম ধাপ; সোর্স: বিথিকা

প্রথম ধাপটি খুব একটা বড় নয়, তার সামনে অসংখ্য মানুষ। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঝর্নার পানি নেমে আসছে মানুষের গা ধুয়ে। একদল পাহাড়ের উপর বসেছে নিশ্চিন্তে, নামার নাম নেই। ঝর্নার পানি যেখানে জড়ো হচ্ছে সেখানেও একদল মানুষ। মোটামুটি তার মধ্যেই আমরা গোসল সেরে নিলাম।

দ্বিতীয় ধাপে ওঠার পথটি বেশ খাড়া। ভোরে বৃষ্টি হওয়ার কারণে বেশ পিচ্ছিলও ছিল। তাছাড়া পথে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী একজন অসুস্থও হয়ে পড়ে। দলের অনেকের দোটানায় ও বাকি অনেক দিক বিবেচনা করে ‘না’ জয়যুক্ত হওয়ায় উপরের ধাপগুলোতে আমাদের আর যাওয়া হলো না। পাহাড়ের কোলঘেঁষে গা এলিয়ে, প্রথম ধাপের ঝর্ণার শীতল জলে অনেকটা সময় ভেসে থেকে আমরা হোটেলের পথ ধরি।

ঝর্ণার প্রথম ধাপে গোসল সেরে নেয়া; সোর্স: বিথিকা

আসার সময়ই পথের একটি হোটেলে দুপুরের খাবারের অর্ডার দেয়া ছিল। হোটেলে ফিরে পোশাক পাল্টে বেশ আয়েশ করে দুপুরের খাবার পর্ব সেরে নেই। ছোট্ট ছাউনির নিচে বসে, প্রকৃতির শীতল বাতাসে গা জুড়িয়ে, খুব কাছাকাছি থাকা পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে খাওয়ার স্মৃতিটুকুও আলাদা করে তুলে রাখার মতোই। খাওয়া-দাওয়ার পর্বটি গ্রামের টং দোকানের এক কাপ চায়ে ইতি টানি। এরপর পথ ধরি অন্য আরেক মায়ায় হারাতে।

উল্লেখ্য, খৈয়াছড়া ঝর্ণাটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত। এলাকার নামানুসারে এই ঝর্ণার নাম রাখা হয় খৈয়াছড়া ঝর্ণা। এই ঝর্ণাটির মূল ধাপ ৯টি এবং আরও কিছু বিচ্ছিন্ন ধাপ রয়েছে। অনেকে আবার খৈয়াছড়া ঝর্ণাকে ঝর্ণা রাণীও বলে থাকে।

যেভাবে যাবেন:

আমরা ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী পরিবহনে গিয়েছিলাম। ভাড়া (নন এসি) ৪৮০ টাকা। নেমেছিলাম সীতাকুণ্ড বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে লেগুনায় খৈয়াছড়া ঝর্ণার ঝিরির আগ পর্যন্ত আসি। ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। এরপর পায়ে হাঁটা পথ। লেগুনা থেকে গ্রামের বাজারে নেমে ১৫/২০ মিনিট হাঁটলেই ঝর্নার দেখা পাওয়া যায়।

তাছাড়া চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে করেই আপনারা সীতাকুণ্ড বা মিরসরাই পর্যন্ত যেতে পারেন।

যেখানে খাবেন:

পথে অসংখ্য খাবার হোটেল রয়েছে। খেতে চাইলে আগেই এখানে খাবারের অর্ডার দিয়ে যেতে হবে। আপনারা ফিরে আসতে আসতে তারা খাবার তৈরি করে রাখবে। আগে অর্ডার না করলে পরে এসে খাবার নাও পেতে পারেন। তাই আগে অর্ডার করে যাওয়াই ভালো।

কিছু জরুরি তথ্য:

বর্তমানে বর্ষায় পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে ভ্রমণকারিদের নানা রকম বিপদে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। সেক্ষেত্রে ভ্রমণকারিদের আরো সতর্ক হওয়া জরুরী। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় চোখ-কান খোলা রেখে, সবদিক ভালোভাবে বিবেচনা করে পথ চলাই উত্তম। সেদিক থেকে খৈয়াছড়া ঝর্ণা বেশ সহজ একটি ট্রেকিং পথ। তবে ঝিরিপথে হাঁটার সময় (যেহেতু পিচ্ছিল থাকে) এবং ঝর্ণার প্রথম ধাপের পর উপরের ধাপগুলোতে যেতে চাইলে অনেক সাবধান থাকা ও অনেক প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়াই উত্তম। কারণ ‘নিরাপত্তাই প্রথম’।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেনীর শুভপুরে শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্টে পদচারণ

ভারতের অনলাইন ভিসা ফর্ম পূরণ সম্পর্কিত সকল খুঁটিনাটি