ভিয়েতনামের যত পুরোনো মুখ

একটা দেশের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিই সেই দেশকে বাঁচিয়ে রাখার মূল মন্ত্র। অতীত হারিয়ে যায় এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একবারেই যদি নিঃশেষ হয়ে যায়, এক অর্থে যদি যেতে দেওয়া হয় তবে সেটি কষ্টদায়ক। এমনটি কোনো দেশের জন্যই চাওয়া নয়। ঐতিহ্য যেন বেঁচে থাকে, হারিয়ে না যায় সে লক্ষ্যে ভিয়েতনামের জাতিগত সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করেছিলেন ফটোগ্রাফার রেহান।

গত আট বছর ধরে ট্রাভেল ফটোগ্রাফার রেহান ভিয়েতনামের পরিচিত ৫৪টি জাতিগত সম্প্রদায়ের মানুষদের ছবি তুলছেন। সেখান থেকে তিনি তুলে এনেছেন হারিয়ে যাওয়া অনেক ঐতিহ্যের গল্প, ইতিহাস।

সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা রেহানের প্রকল্পটি নিয়ে তিনি নিজেই জানান, ‘আমি ‘ঐতিহ্য’ শব্দটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম যখন আমি বাবা হলাম। সকল বাবার মতো আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম- আমার সন্তানেরা আমার কাছ থেকে কী শিখবে, আমি তাদের কী দিতে পারবো?’

ফ্রান্সের নরম্যান্ডি শহরের বায়াক্স থেকে আসা রেহান ২০১১ সাল থেকে ভিয়েতনামের হো আন শহরে বাস করছেন। গত আট বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের ওপর একটি প্রকল্পে তিনি কাজ করছেন। প্রকল্পটি ভিয়েতনামের ৫৪টি স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ছবি তোলার কাজ নিয়ে।

বাবা হওয়ার পর রেহান ভিয়তেনামে সমুদ্রযাত্রা করেন একজন পোট্রেট আলোকচিত্রী হিসেবে। বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষের সঙ্গে কথা হয় তার। তারা দুঃখের সঙ্গে বলেন, তাদের সন্তানেরা বংশপরম্পরায় চলে আসা ভাষা ও শিল্পকর্ম আর শিখছে না। যতই রেহান এসব উপজাতিদের দেখলেন, ততই তিনি অনুধাবন করলেন যে, ঐতিহ্য কত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। যদি মানুষের মুখে না থাকে তবে কোনো অলিখিত ভাষা টিকে থাকতে পারে না। যেসব গান গাওয়া হয় না সেগুলো অবশেষে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। রেহান বুঝতে পারলেন এসব অমুল্য ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি। 

সর্বশেষ উপজাতি গোষ্ঠী

ভিয়েতনামের সর্বশেষ নৃগোষ্ঠীগুলোর একটি ‘চাট’। এরা চাট ভাষায় কথা বলে। রেহান এই গ্রীষ্মে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান এবং তাদের ছবি তুলতে চান। ভিয়েতনাম সরকার নিবন্ধিত ৫৪টি নৃগোষ্ঠির বাইরেও অনেকগুলো গোষ্ঠী রয়েছে। সম্প্রতি রেহান উত্তর ভিয়েতনামের তিউয়েন কুয়াং প্রদেশে পা দেন একটি অনিবন্ধিত নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে ‘দ্যু’ নামক অন্য একটি অনিবন্ধিত গোষ্ঠীর দেখা পান।

রেহান বললেন, ’এই গুরুত্বপূর্ণ  ঐতিহ্য প্রকল্প সত্যিকার অর্থে শেষ হওয়ার মতো নয়। আমি ৫৪টি নৃগোষ্ঠীকে নথিবদ্ধ করার যে প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়েছি তা শীঘ্রই শেষ করবো। কিন্তু এর বাইরেও অনেকগুলো উপগোষ্ঠী রয়েছে যারা তালিকার বাইরে। পুরো সফরে আমি অনেক বন্ধু পেয়েছি, অনেক পরিবারের সঙ্গে থেকেছি। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে চাই না। আমি আমার শুরুর লক্ষ্য পূরণ করেছি। আমি অবিরত তাদের মুখচ্ছবি হালনাগাদ করতে চাই। তাদের শিল্পকর্ম ও পোশাকগুলো সংগ্রহ করতে চাই। আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে চাই, যেমনটি গত আট বছর ধরে করে আসছি।’

image source: bbc.com

এখানে আসার আগে আমি কল্পনা করেত পারিনি যে, একটি দেশে অনেকগুলো ভাষা, প্রথা এবং পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় পাশাপাশি থাকতে পারে। আমি কোনো জাতি বিশেষ্জ্ঞ নই যে, আমি বিভিন্ন দেশের জটিল সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলবো না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি বিশ্বে এরকম দেশিয় গোষ্ঠীগুলো থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। তাদের সমৃদ্ধ এবং প্রাচীন সংস্কৃতিকে আমরা সম্মান দিতে পারি। তাদের আমরা নিজেদের মতো বাঁচতে দিতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য প্রকল্পের অধীনে ভিয়েতনামের নৃগোষ্ঠীগুলোর যেসব সদস্যদের ছবি তুলেছেন, যাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন তাদের বেশ কিছু ছবি রেহান এখানে উপস্থাপন করেছেন। ছবিগুলো তার কাছে বেশ প্রিয়। 

চাম

যখন আমি কৌতূহলী নীল চোখের আন ফুওকের সঙ্গে দেখা করেছিলাম তখন তার বয়স ছিল কেবল ৭ বছর। সে চাম সম্প্রদায়ের মেয়ে। আমার তোলা ছবির কারণে বর্তমানে সে ভিয়েতনামের এক পরিচিত মুখ।

image source: bbc.com

আন ফুওক যে গোষ্ঠীর , তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিন তুয়ান প্রদেশে বাস করে যা পূর্বে চম্পা নামে পরিচিত ছিল। চাম সম্প্রদায় এ অংশেই দীর্ঘদিন ধরে বাস করে আসছে। মেয়েটির ছবিটি আসলে আমাকে এক ধরনের প্রেরণা যোগায় আমার পুরনো প্রজেক্টগুলোর কাছে ফিরে যেতে, যেখানে আমার তোলা ছবির মানুষগুলোকে আমি কিছু না কিছু ফিরিয়ে দিতে পারি।

এই প্রজেক্টের মানে আমি ছবি তুলেছি এমন কিছু শিশুর পড়ার খরচ আমি দিয়েছি। এমনকি নিজের কাজের জন্য গরু, নৌকা আর ক্যামেরাও কিনেছি অথবা কাউকে সাহায্য করেছি তাদের চিকিৎসার খরচ বা বাড়ি সারানোর কাজে। আমি বিশ্বাস করি, আমি যাদের ছবি তুলছি তাদেরকেও আমার কিছু ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ।  

আন ফুওক আর তার পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য আমি বেশ কয়েকবার ফিরে এসেছি। আমি তার বোনসহ তাদের দুইজনের পড়ালেখার খরচ দিচ্ছি যেন তারা জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা পায় যা তাদের প্রাপ্য।

জিন মুন

উত্তর ভিয়েতনামে থাকা জিন মুন নামক এক নৃগোষ্ঠীর সদস্য ১০৩ বছর বয়সী নারী ভি তি ইন। তার জন্ম ১৯১৬ সালে।

image source: bbc.com

তার বাড়িতে যখন গেলাম তখন তিনি রান্না করছিলেন নিজের এবং নাতির জন্য। আমায় দেখে তিনি তার কাছে ডাকলেন। বোঝাই যাচ্ছিল একজন বিদেশির সাথে বেশ আগ্রহ ভরেই তিনি সাক্ষাৎকার দিতে চান। তার কাছ থেকে ছবির মতো সুন্দর গ্রাম আর পুরনো গল্প শুনে সত্যিই গ্রামটার প্রতি মায়া জন্মে গিয়েছিল।  

ব্ল্যাক হ’মং

২০১২ সাল থেকে প্রায় ১০ বার আমি উত্তর ভিয়েতনামের সাপা পাহাড়ের আশেপাশে বসবাসরত হ’মং নৃগোষ্ঠীদের দেখতে গিয়েছি। এই নৃগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি উপদল রয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্ল্যাক হ’মং।

image source: bbc.com

লো থো সি এই দলের একজন নারী সদস্য। এই নৃগোষ্ঠীর সকলের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে। সেটি হচ্ছে তাদের অসাধারণ বুনন কৌশল। এই সম্প্রদায়ের মেয়েরা ৭ বছর বয়স থেকে নিজেদের কাপড় নিজেরা বুনতে শেখে। কাপড়গুলো শণজাতীয় গাছ থেকে তৈরি হয়। সেলাই এর আগে এগুলোকে নীল রঙ করা হয়।  

লাও

৯৫ বছর বয়সী মাদাম লো তি বান। তিনি ছিলেন আমার ছবির পছন্দের মডেলদের একজন। ছবিতে তিনি আভিজাত্যের সঙ্গে ধূমপান করছিলেন। তার সমসাময়িক অন্য নারীদের মতো তিনিও কানে রৌপ্য গয়না পরেন। 

image source: bbc.com

লাও উপজাতি লাওস থেকে উদ্ভুত। তারা এখনো সে দেশের এক ধরনের ভাষায় কথা বলে। গত কয়েক বছর ধরে তাদের সংস্কৃতি ও পোষাক অনেকাংশেই পরিবর্তিত হয়েছে। যে গ্রামটিতে আমি ছবি তুলতে গিয়েছেলাম সেটিই শেষ গ্রাম যেখানে এখনো ঐতিহ্যবাহী লাও রীতির পোশাক তৈরি হয়ে থাকে।

 ব্ল্যাক লো লো

ব্ল্যাক লো লো নৃগোষ্ঠি দেখতে সর্বপ্রথম ২০১৩ সালে উত্তর ভিয়েতনামের কাও বাং প্রদেশের বাও লাক- গিয়েছিলাম। সেখানে আমি দেখলাম অনেক নারী তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। এর দুই বছর পর আমি দেখতে পেলাম তা অনেকাংশেই কমে গেছে।

৭৫ বছর বয়সী কা তি নান নামক একজন নারীর ছবি যখন তুলতে গেলাম তখন তার পরনে ছিল পুরনো আর জীর্ণ পোশাক, কিন্তু তবু সেই ঐতিহ্যের অংশ সে পোশাকে তাকে বেশ সুন্দর লাগছিল। এই পোশাকে তার ছবি তোলার উদ্দেশ্য সবাইকে এটা জানানো যে, কীভাবে আসলে পুরনো ঐতিহ্যগুলো পেছনে পড়ে যায়, হারিয়ে যায়।

পা থে

উত্তর ভিয়েতনামের তিউয়েন কিউয়াং প্রদেশে ‘পা থে’ সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে সেখানে বেশ দারুণ একটা পদ্ধতি চালু আছে। সেখানে শিশুদের প্রতি সোমবার তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে স্কুলে আসতে হয়। আর এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করার জন্য বলতে গেলে আমি এক প্রকার উদগ্রীব ছিলাম।

image source: baomoi.com

আট বছর বয়সী জিন তি হুওংকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত অবস্থায় বেশ আনন্দিত দেখাচ্ছিল। না নহে’র পা থে গ্রামে আগে যেরকমটি দেখা যেত এখন তার চেয়ে ভিন্ন রূপ লক্ষ্য করা যায়। শিশুদের এই অভ্যাসটাই সম্ভবত এখানকার সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কো হো

কো হো সম্প্রদায় ভিয়েতনামের লাম দং প্রদেশে বাস করে। ১০১ বছর বয়সী কো লং কে ছিলেন এই নৃগোষ্ঠীর এক নারী। তিনি ১১ সন্তানের জননী। তার ১৬৫ জন নাতি-নাতনী ও তাদের সন্তান-সন্ততি রয়েছে। তিনি কো হো সম্প্রদায়ের অতীত ও ভবিষ্যতের জীবন্ত এক সংযোগ।

image source: bbc.com

যখন তিনি মারা যান তখন তার পরিবার আমাকে তার হাতে তৈরি একটি কম্বল দিয়েছিল যাতে আমি এটি মূল্যবান ঐতিহ্য জাদুঘরে তার ছবির পাশে সংরক্ষণ করতে পারি। 

লু সম্প্রদায়

লো ভন বও লু সম্প্রদায়ের একজন নারী। সম্প্রদায়টি দূরবর্তী উত্তর ভিয়েতনামের লাই চাও অঞ্চলে বাস করে। যখন তার ছবি তুলতে যাই তখন আমি অবাক হই। তিনি আমাকে বললেন, যখন আমি যুবতী ছিলাম তখন কেন আসোনি? তার এই কথায় উৎসাহিত হয়ে ভিয়েতনামে বৃদ্ধদের গুরুত্ব দিয়ে আমি শাশ্বত সৌন্দর্য সিরিজের ছবিগুলো তুলতে শুরু করি।

image source: bbc.com

এই নারী ‘নাম তাম’ নামক গ্রামে বাস করেন। এটি ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখে। এর ফলে নাম তাম সবচেয়ে শান্ত ও সংরক্ষিত গ্রাম হয়ে উঠেছে। 

দা রেড দ্যও

আমি বিশেষভাবে রেড দ্যও নৃগোষ্ঠীর লি লো মে’র ছবিটি পছন্দ করি। তার রয়েছে ঈর্ষণীয় মর্যাদা, যা তার প্রশস্ত পোশাক দ্বারা ফুটে উঠেছে। দ্যও-দের রয়েছে সমৃদ্ধ বুনন ঐতিহ্য যা আমাকে মূল্যবান ঐতিহ্য প্রকল্পটি শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উত্তর ভিয়েতনামের এই নৃগোষ্ঠীর ৯টি স্থানীয় উপগোষ্ঠীর গল্প হো আনের জাদুঘরে আমি যুক্ত করতে চাই।

image source: bbc.com

জ্যু দ্যং

ভিয়েতনামের কন তুম প্রদেশ থেকে ৫০ কিমি. দূরে বাস করেন ৭৬ বছর বয়সী অ্য দিপ। তিনি ‘তো দ্র’  নামক একটি সম্প্রদায়ের সদস্য যা একটি জ্যু দ্যং নৃগোষ্ঠীর একটি উপদল। গত দু বছরে  আমার পছন্দের যেসব মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

image source: bbc.com

যখন শেষবার আমি ২০১৮ সালে তার কাছে যাই তখন আমি তার কিছু প্রতিভা আবিষ্কার করি। তিনি তার গ্রামের মধ্যে একমাত্র কারিগর যিনি বাঁশ দিয়ে এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী ঝুড়ি তৈরি করতে পারেন। এছাড়া তো দ্র-দের বিশেষ এক ধরনের বদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন।    

ব্ল্যাক হ্য নি

৮৯ বছর বয়সী পু ল মা ও তার ৬০ বছর বয়সী মেয়ে ব্ল্যাক হ্য নি সম্প্রদায়ের। ২০১৭ সালে লাই চ্যু ও লাও চাই প্রদেশ ভ্রমণের সময় তাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়।

image source: bbc.com

ব্ল্যাক হ্য নি সম্প্রদায়ের পোশাকে আমি মুগ্ধ হই, যা বুনতে ছয় মাস সময় লাগে। এর সঙ্গে যুক্ত একটি বড় বেনুনী করা হয় যা দেখতে সত্যিকার অর্থে মানুষের চুলের মতোই দেখায়।

Feature image: bbc.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শাহাজাদপুরের পথে রবীন্দ্রনাথের সাথে: মখদুমিয়া জামে মসজিদ

লাদাখের পথে যাত্রা শুরু