গাজীপুরে যা কিছু আছে ঘুরে দেখার মতো

জীবিকার প্রয়োজনে রাজধানীর বেশির ভাগ মানুষ সপ্তাহ জুড়ে ব্যস্ত থাকে। তাই সপ্তাহান্ত হয়ে ওঠে একটু নিজেকে সময় দেওয়ার মতো দিন। সপ্তাহান্তের একদিনের ছুটিতে দূরে যাওয়ার সুযোগ কই? তাই ঢাকার কাছাকাছি গাজীপুরই হতে পারে উত্তম গন্তব্য।

গাজীপুরের পূর্ব নাম ছিল জয়দেবপুর। তারও আগে একে ভাওয়াল নামে ডাকত লোকে। জনৈক মুসলিম কুস্তিগির গাজী এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তিনি বহুদিন সাফল্যের সঙ্গে এ অঞ্চল শাসন করেছিলেন। জনশ্রুতি বলছে, এই কুস্তিগিরের নামানুসারেই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর।

তবে অন্য আরেকটি জনশ্রুতি বলছে, সম্রাট আকবরের সময় চবি্বশ পরগনার জায়গিরদার ছিলেন ঈশা খাঁ। এই ঈশা খাঁরই একজন অনুসারীর ছেলের নাম ছিল ফজল গাজী। যিনি ছিলেন ভাওয়াল রাজ্যের প্রথম ‘প্রধান’। তারই নামের সঙ্গে যুক্ত ‘গাজী’ পদবি থেকে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর। আজকের পর্ব সাজানো হয়েছে গাজীপুরের কিছু দর্শনীয় স্থান নিয়ে।

ভাওয়াল রাজবাড়ি

গাজীপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ি। ভাওয়ালের রাজবাড়ি ছিল ভাওয়াল এস্টেটের মূল পরিচালনা কেন্দ্র। পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে পূর্ব বাংলার নওয়াব এস্টেটের পরেই ছিল ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারির অবস্থান।

আয়তন এবং কক্ষের হিসেবে এটি একটি বিশাল আকারের রাজবাড়ি। প্রায় ৫ একর জায়গার ওপর রাজবাড়িটি নির্মিত। এ রাজবাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি এবং সামনে রয়েছে বিশাল সমতল একটি মাঠ।

ভাওয়াল রাজবাড়ি; image source : তুলি

এই রাজবাড়ীর আওতায় ভাওয়াল এস্টেট প্রায় ৫৭৯ বর্গমাইল (১,৫০০ কিমি) এলাকা জুড়ে ছিল। ভাওয়াল এস্টেট পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে পূর্ব বাংলায় নওয়াব এস্টেটের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম। সম্পূর্ণ জমিদারিটি কয়েকটি সার্কেলে বিভক্ত ছিল।

মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে একেবারে পিছনে যেতে হলে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ, পেরুতে হবে অনেক অলিন্দ আর বারান্দা। ক্ষণে ক্ষণে চোখ আটকে যাবে বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শনে। বিশাল এ রাজপ্রাসাদটির বিশালত্ব দেখে যে কেউ অভিভূত হবেন। আবার অনেকেই রাজবাড়িতে ঢুকে গোলক ধাঁধায় পড়ে যেতে পারেন। কারণ এর অলিন্দ গলি উপগলি দিয়ে একবার হেঁটে গিয়ে নতুন যে কারোর পক্ষে পুনরায় সেগুলো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। এ রাজবাড়ির প্রতিটি স্থানে প্রতিটি কক্ষে ঘুরে দেখতে সারা দিন লেগে যেতে পারে।

ভাওয়াল রাজবাড়ি; image source : তুলি

বিংশ শতকের প্রথম দিকে একটি বিশ্ববিখ্যাত মামলা হয়েছিল। এটি ভাওয়ালের জমিদার বংশের রাজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়কে ঘিরে। এ ঘটনা থেকে কবিতা, উপন্যাস, যাত্রাপালা, এমনকি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল।

ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী

গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে মৃতপ্রায় চিলাই নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজশ্মশানেশ্বরী। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্ন ঐতিহ্যের অংশ এই রাজশ্মশানেশ্বরীটি ছিল ভাওয়াল রাজপরিবারের সদস্যদের শবদাহের স্থান। এখানে পরিবারের মৃত সদস্যদের নামে সৌধ নির্মাণ ও নামফলক স্থাপন করা হতো। শ্মশান চত্বরে একটি শিবমন্দির রয়েছে।

১৯৫১ সালে কালী নারায়ণের সময়ই ভাওয়াল শ্মশান মঠ নির্মিত হয়। আটটি মঠের মধ্যে সামনের তিনটি মঠের নির্মাণশৈলী সাধারণ। দেখতে প্রায় একই রকম। কিন্তু বাকি পাঁচটি মঠের নির্মাণশৈলী চিত্তাকর্ষক। এদের মধ্যে একটি মঠ সবচেয়ে উঁচু। সবচেয়ে বড় মঠটি নির্মিত হয়েছে ভাওয়াল জমিদারির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ নারায়ণ রায়ের উদ্দেশ্যে। উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই মঠগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে।

ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী; image source : শাওন

শ্মশানঘাটের পূর্ব দিকে চিতা। এখানে শবদাহ করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, মূল শ্মশানের কাজে হাত দিয়েছিলেন রাজা কীর্তি নারায়ণ রায়। পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে সমাধিসৌধ চত্বরটি। জানা যায়, লোক নারায়ণ রায় ভারতের পুরীর বিখ্যাত স্থপতি কামাখ্যা রায়কে দিয়ে ভাওয়াল রাজশ্মশানেশ্বরী নির্মাণ করান। ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরীর গায়ের অনিন্দ্য নকশাগুলো এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

ছয়টি স্তম্ভবিশিষ্ট শিবমন্দিরটি নির্মাণে মোগল স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে। আগে অনেক দূর থেকেও মন্দিরের স্তম্ভগুলো দেখা যেত। কিন্তু শ্মশান চত্বরের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় চোখের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মন্দিরটি। কিছুদিন আগেও নানা গাছগাছালির ভিড়ে শ্মশান ভূমির প্রবেশস্থল থেকে মঠগুলো দেখা যেত না। কিন্তু এখন গাছগুলো কেটে ফেলার ফলে সামনে পায়ে হেঁটে কয়েকগজ এগোলেই চোখে পড়ে বিস্ময়কর স্থাপত্য। সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় খসে পড়ছে স্তম্ভগুলোর গায়ের অনবদ্য সব কারুকাজ। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এই শ্মশানঘাট অবস্থিত।

কীভাবে যাবেন ভাওয়াল রাজবাড়ি ও মঠ

ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কপথে ও রেলপথে গাজীপুর যাওয়া যায়। গাড়িতে গেলে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে জেলা জাজ কোর্ট (রাজবাড়ী) তার ১০ মিনিট দূরত্বে শ্মশানঘাট।

এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে জয়দেবপুরগামী ট্রেনে জ্যাম এড়িয়ে অল্প সময়ই যেতে পারবেন। কোন ট্রেন জয়দেবপুর থামবে জেনে নেবেন। স্টেশনে নেমে রিকশা নিয়ে সোজা রাজবাড়ি ও শ্মশানঘাট।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক

চিড়িয়াখানায় জীবজন্তু থাকে আবদ্ধ অবস্থায় এবং দর্শনার্থীরা মুক্ত থেকে জীবজন্তু পরিদর্শন করেন। কিন্তু সাফারী পার্কে বন্যপ্রাণী উন্মুক্ত অবস্থায় বনজঙ্গলে বিচরণ করবে এবং মানুষ সতর্ক হয়ে চলমান যানবাহনে বসে মুক্ত প্রাণীদের দেখবেন। এতে বন্য পরিবেশে প্রাণীকুল কীভাবে জীবনযাপন করে, তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ধারণা নিতে পারবে।

সাফারি পার্ক; image source: ইভা

ঢালাই করা রাস্তার দুপাশে রকমারি ফুলের বেড। নানা জাতের ফুল আর পাতাবাহারে ছেয়ে আছে। সাফারি পার্কটিকে ৫টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে – কোর সাফারি, সাফারি কিংডম, বায়োডাইভার্সিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক এবং বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। সামনের অংশটুকু সাধারণ পার্কের মতোই। ওটুকু ঘুরে নিয়ে কোর সাফারির দিকে পা বাড়ালাম।

কোর সাফারিতে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে দুটি জিপ ও দুটি মিনিবাস। ১০০ টাকা ফি দিয়ে বন্য পরিবেশে মুক্ত প্রাণী দেখার জন্য নিজেদের বন্দী করতে হবে এসি বাসে। খানিক বাদেই দেখা যাবে জিরাফ, জেব্রা, কালো ভাল্লুক, সাদা সিংহ, লম্বা কেশরওয়ালা সিংহ, চিতা বাঘ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হাতিসহ আরও নানান প্রাণী।

সাফারি কিংডমের ভেতরে প্রথমেই পাখিরাজ্য। ম্যাকাওসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি পাখি রয়েছে ওতে।

সাফারি পার্কে ম্যাকাও পাখি; image source: ইভা

পাশেই অর্কিড হাউজ। তারপর হাঁটতে শুরু করলে বিশাল এক জলাশয়ে রাজহাঁস, কুমির দেখা যাবে। শকুন দেখা যাবে গাছে। গাধা আর ঘোড়ার এক ধরনের সংকরসহ লম্বা ঠোঁটওয়ালা ধনেশ পাখি, সারস পাখি, মুখপোড়া বানর, কাছিমসহ আরো অনেক কিছু দেখা যাবে। ময়ূর রাজ্যে নীলচে সবুজাভ ময়ূরের সাথে সাথে দুর্লভ সাদা ময়ূরও দেখা যাবে৷

সাফারী পার্কটি দক্ষিণ এশীয় মডেল বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সাফারী ওয়ার্ল্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপন করা হয়েছে। আবার ইন্দোনেশিয়ার বালি সাফারী পার্কের কিছু ধারণা এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে। সাফারী পার্কের চারদিকে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী ঘেরা এবং এর মধ্যে দেশী/বিদেশী বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি ও অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে পর্যটকরা চলমান যানবাহনে অথবা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করে শিক্ষা, গবেষণা ও চিত্ত বিনোদনের সুযোগ লাভ করতে পারেন।

সাফারি পার্ক; image source: ইভা

মূল সাফারি পার্ক ৯টায় খুললেও কোর সাফারি খোলে ১২টায়।

প্রবেশ ফি

প্রাপ্ত বয়স্ক জনপ্রতি পার্কে প্রবেশ টিকেট ৫০ টাকা এবং ১৮ বছরের নিচে প্রবেশ ফি ২০ টাকা। শিক্ষা সফরে আসা বা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা। গাড়িতে করে কোর সাফারি পার্ক পরিদর্শন প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিজনের টিকিট ফি ১০০ টাকা। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা।

প্যাডেল বোট ভ্রমণ ৩০ মিনিট ২০০ টাকা। বাস পার্কিং ২০০ টাকা। মিনি বাস বা মাইক্রোবাস পার্কিং ২০০ টাকা। গাড়ি বা জিপ পার্কিং ৬০ টাকা। অটোরিকশা বা সিএনজি পার্কিং ৬০ টাকা।

কীভাবে যাবেন

গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে বাঘের বাজার গেলেই চোখে পড়বে সাফারি পার্কের বিশাল সাইনবোর্ড। বাঘের বাজার থেকে সাফারি পার্কের দরজা পর্যন্ত যেতে রিকশা ও অটোরিকশা পাওয়া যায়। ভাড়া নেবে ৫০ থেকে ৭০ টাকা।

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাতায়াত করা বাসে করে বাঘের বাজার সরাসরি নামা যায়। এছাড়াও গুলিস্তান কিংবা আজিমপুর থেকে ২৭ নাম্বার বাসে উঠে গাজীপুর চৌরাস্তা। চৌরাস্তায় নেমে সোজা রাস্তা পার হয়ে বাস বা টেম্পুতে করে সাফারি পার্ক। চৌরাস্তা থেকে প্রায় ২০ কিমি দূরে সাফারি পার্ক। ভাড়া ৫০ টাকার মতো লাগবে।

পার্কের সময়সূচি

সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থিদের জন্য পার্কটি খোলা থাকে। প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক বন্ধ।

শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি

ঢাকার কাছেই জমিদারবাড়িটির অবস্থান। কঠিন বাংলা শব্দ শ্রীফলতলী লোকমুখে চলতে চলতে হয়ে গেছে ছিবলতলী।

একটা বিশাল এলাকা নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল জমিদারবাড়ি। বিখ্যাত তালিবাবাদ পরগণার শ্রীফলতলীর নয় আনা অংশের মালিকানা নিয়ে গঠিত হয় এটি। কিন্তু বর্তমানে সেই বিশালত্বের অনেকখানিই কমে গেছে বর্তমান স্থানীয় বাসিন্দাদের দৌরাত্ম্যে। দোকানপাট বসিয়ে অনেকটাই দখল করে নেওয়া হয়েছে এখন। যেটুকু বাকি আছে, তার জন্য বর্তমানকালে একটা প্রবেশদ্বার স্থাপন করা আছে। শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ির কাছেই আছে তার নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি। সেসব বাড়িও দেখতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল বাইরে থেকে। তবে সেখানে ঢোকার পথ বন্ধ।

শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি; image source: তাসমিয়া

জমিদার বাড়ির দুটি তরফ। বড় তরফ ও ছোট তরফ। দুই তরফের মাঝখানে মসজিদ। বড় দরজায় ভেতরে প্রবেশ করে বাম পাশে তাকালেই পাওয়া যাবে এই জমিদারদের বিস্তারিত বংশলতিকা। দাদা দাদী আর নানীর দিকের উভয় বংশলতিকাই বিস্তারিত দেওয়া আছে এখানে। ডান পাশে রহিম নেওয়াজ খান চৌধুরী এবং সৈয়দ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর কর্মযজ্ঞের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে ছবিসহ। সবই টাইলসের উপর আঁকা।

জমিদার বাড়ির দুই তরফের মধ্যে ছোট তরফের অবস্থা এখন বেশ ভালো। এখানে যারা বসবাস করছেন, তারা ছোট তরফকে পশ্চিম তরফ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মূল জমিদার বাড়ির পুরোটাই উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আমার দেখা বেশিরভাগ জমিদার বাড়িরই বেহাল দশা হলেও এটি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় নতুন রেলিং লাগানো হয়েছে। তবে পুরোনো বাড়িটির মরে যাওয়া সোনালি রঙ চমৎকার দেখাচ্ছিল। দেড়তলা বাড়ির একধারে একতলা ছাদ দেওয়া। পুরনো ছাদের রেলিংগুলোও খুব ভালো দেখায়।

শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি; image source: তাসমিয়া

কীভাবে যাবেন

ঢাকা মহাখালি থেকে টাঙ্গাইলের যে কোনো বাসে কালিয়াকৈর বাজারে নামা যায়। গাবতলি সাভার রোড ধরে আসলেও অনেক বাস আছে। গুলিস্থান থেকে প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহন কালিয়াকৈর আসে। সদরঘাট/গুলিস্থান থেকে আজমেরী পরিবহন চন্দ্রা পর্যন্ত আসা যাবে। পরে বাস বা টেম্পুতে কালিয়াকৈর। মিরপুর থেকে তিতাস পরিবহনে গাবতলি হয়ে চন্দ্রা। সাইনবোর্ড থেকে ঠিকানা বাসে চড়েও চন্দ্রা যাওয়া যাবে। তারপর অন্য বাস বা টেম্পুতে কালিয়াকৈর।

কিন্তু এগুলো লোকাল বাস। সবচেয়ে ভালো উত্তরবঙ্গের কোনো বাসে কালিয়াকৈর নেমে পড়লে। সেক্ষেত্রে আগে থেকে ভাড়া মিটিয়ে নেওয়া উচিৎ। ভাড়া ৬০/৭০ টাকার বেশি হবে না। সবচেয়ে ভালো রুট হলো মহাখালি থেকে টাঙ্গাইলের বাসে কালিয়াকৈর। কালিয়াকৈর বাজার এসে তারপর রিকশায় ২০/২৫ টাকা ভাড়া।

শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি; Image Source: তাসমিয়া

ফ্যান্টাসি কিংডম

বাংলাদেশের প্রথম থিম পার্কের নাম “ফ্যান্টাসি কিংডম”। প্রায় ২০ একর জায়গার ওপর স্থাপিত এটি। ফ্যান্টাসি কিংডম পার্কটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। ওয়াটার কিংডম, ফ্যান্টাসি কিংডম, রিসোর্ট আটলান্টিকা, এক্সট্রিম রেসিং (গো-কার্ট) ও হেরিটেজ কর্নার।

ফ্যান্টাসি কিংডমে প্রায় প্রত্যেকটা কর্ণারে ঢুকতে হলে টিকিটের টাকা গুনতে হয়। প্রবেশ পথেই প্রত্যেকটা কর্নার আলাদা করে দেওয়া আছে। কিন্তু হেরিটেজ কর্নারের জন্য আলাদা করে টিকিট কাটা লাগে না। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী কিছু নিদর্শন। সেই স্থাপনাগুলোর হুবহু নকল বানানো হয়েছে এই জায়গাটায়। রেপ্লিকাগুলো হলো সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, লালবাগ কেল্লা, ষাট গম্বুজ মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, কান্তজীর মন্দির, সীতাকোট বিহার, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, পুঠিয়া রাজবাড়ি, গ্রিক মেমোরিয়াল ও আহসান মঞ্জিলের। প্রতিটি রেপ্লিকার সামনে লেখা রয়েছে সেগুলোর বর্ণনা ও ইতিহাস। হেরিটেজ পার্কটি মূলত তৈরি করা হয়েছে স্কুল-কলেজ থেকে পিকনিকে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বিদেশি পর্যটকদের জন্য। যেন তারা বাংলাদেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে।

এগুলো ছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্য ধারণ করে এমন সব জিনিস রাখা হয়েছে এখানটায়। পালকি, গরুর গাড়ি, রিকশা।

ফ্যান্টাসি কিংডমের আহসান মঞ্জিল; image source: মাদিহা মৌ

ফ্যান্টাসি কিংডম কর্নারে রাইডসের মধ্যে রয়েছে জিপ অ্যারাউন্ড, জায়ান্ট ফেরিস হুইল, জায়ান্ট স্প্যানিশ, ম্যাজিক কার্পেট, জুজু ট্রেন, সান্তা মারিয়া, কফি কাপ, বাম্পার কার্ট, বাম্পার বোট, প্যাডল বোট, রোলার কোস্টার, ইজি ডিজি। এছাড়াও আছে ওয়াটার রোলার কোস্টার। এটায় সবচেয়ে মজা লাগে উপর থেকে নিচে পড়ার পর যখন পানির ঝাপটা লাগে তখন। তিনটা স্লাইড এতে। প্রথমটা একতলা সমান উচ্চতা, দ্বিতীয়টা দুইতলা, তৃতীয়টা তিনতলা।

ওয়াটার কিংডমে প্রবেশ করার আগেই মাটির নিচ দিয়ে রয়েছে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর ভার্চুয়াল অ্যাকোয়ারিয়াম টানেল। এটা পার হয়েই প্রবেশ করতে হয় ওয়াটার কিংডমে। অম্বুরাজ্যে বেড়ানোর মজাদার আর রোমাঞ্চকর সব রাইড নিয়ে সাজানো হয়েছে ওয়াটার কিংডম। মজার মজার ১১টি রাইড ছাড়াও রয়েছে বেড়ানোর মতো অনেক জায়গা। কৃত্রিম সমুদ্র সৈকত; ওখানটায় আর্টিফিশিয়াল নারকেল গাছের সারির ছবি দিয়ে বীচের আবহ আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

ওয়েবপুল; এখানটায় সমুদ্রের মতো নীল পানি দিয়ে কৃত্রিম সমুদ্র বানানো হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর ঝাঁকি দেওয়া হয় পানিতে, ফলে স্থির পানিতেই ঢেউ উৎপন্ন হয়, তীরে এসে ঢেউ আছড়ে পড়ে। কৃত্রিম গুহা আছে, গুহায় বুক সমান পানি থাকে। ঝর্ণা আছে। আছে বিশাল উঁচু জায়গা থেকে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে জল ভর্তি পুলে পড়ার জন্য স্লাইড ওয়ার্ল্ড, টিউব স্লাইড, পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করা যাবে ফ্যামিলি পুলে। এ ছাড়া লেজি রিভার, ওয়াটার ফল, ডুম স্লাইড, লস্ট কিংডম, প্লে জোন, ড্যান্সিং জোনের মতো মজার সব রাইডও আছে এখানে। ওয়াটার ফল, ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, মাল্টিস্পাইড, ডুম স্পাইড, স্পাইড ওয়ার্ল্ড, ফ্যামিলি পুল, টিউব স্পাইড, লেজি রিভার, লস্ট কিংডমসহ মজাদার সব রাইডস।

ওয়াটার কিংডমে ঢোকার জন্য এক্সট্রা ২০০ টাকা লাগে।

ফ্যান্টাসি কিংডম; image source: মাদিহা মৌ

এ ছাড়া ফ্যান্টাসি কিংডম থিম পার্কে বুমার কার, সান অ্যান্ড মুন, স্পিডি ওয়ে, ইগলু হাউসসহ বিভিন্ন ধরনের রাইডস উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে।

ইগলু হাউজটা হলো বরফের রাজ্যে এস্কিমোরা নিজেদের জন্য যেরকম গম্বুজের মতো বাড়ি বানায়, সেরকম। ভিতরের পরিবেশটায় ঠাণ্ডা আবহাওয়ার আমেজ রাখা হয়েছে। ভিতরে কৃত্রিম গাঢ় কুয়াশা, তুষারফল হচ্ছে। আছে পেঙ্গুইন, মেরু ভাল্লুকের প্রতিকৃতি। ভিতরে গান চলতে থাকে। সবাই মিলে ওখানে যেমন খুশি তেমন নাচে।

বিশেষ বিশেষ দিনে বা উৎসব উপলক্ষে ফ্যান্টাসি কিংডমে কনসার্ট, গেম শো, ফ্যাশন শো, ডিজে শো, র‌্যাফল ড্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজন করা হয়ে থাকে।

ফ্যান্টাসি কিংডমে খাওয়া দাওয়া করার জন্যে বেশ কিছু ভালো রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো আশুলিয়া ক্যাসেল রেষ্টুরেন্ট, ওয়াটার টাওয়ার ক্যাফে, রোলার কোস্টার স্টেশন।

খোলা ও বন্ধের সময়সূচী

পার্কটি সপ্তাহের ৭দিনই খোলা থাকে। সাধারণ দিনগুলোতে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং সরকারী ছুটির দিনগুলোতে এটি সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

টিকেটের মূল্য ও প্যাকেজ

ফ্যান্টাসি কিংডমে প্রবেশ মূল্য ও রাইড মিলিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। একমাত্র কোলের বাচ্চা ছাড়া সকলের টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। বয়স্কদের জন্য প্রবেশ ও ২টি রাইড ২২০ টাকা, তিন ফুটের নিচে বাচ্চাদের প্রবেশ ও ২টি রাইড ১২০ টাকা, বয়স্কদের প্রবেশ ও সব রাইড ৩৯০ টাকা, বাচ্চাদের প্রবেশ ও সব রাইড ২০০ টাকা এবং ৪ জনের প্রবেশ, সব রাইড এবং লাঞ্চ/ডিনারের প্যাকেজ ১,৬০০ টাকা। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আছে বিশেষ আয়োজন।

ফ্যান্টাসি কিংডম; image source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

মতিঝিল থেকে মঞ্জিল পরিবহন, হুইল লাইন্স ওয়াটার কিংডম মগবাজার, মহাখালি, উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর ও আশুলিয়া হয়ে। আর হানিফ মেট্রো সার্ভিস যায় মতিঝিল থেকে ছেড়ে শাহবাগ, শুক্রাবাদ, আসাদগেট, শ্যামলি, গাবতলি, সাভার, নবীনগর হয়ে। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা।

feature image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজা মনোহরের জমিদারির প্রতীক চাঁচড়া শিব মন্দির

জাপানের অন্যতম প্রধান কয়েকটি নিদর্শন