ভালুকা থেকে মুক্তাগাছা হয়ে গৌরীপুর: একদিনে ময়মনসিংহ ভ্রমণের আদ্যন্ত

ভালুকা থেকে ভোর সকালে বের হবার সময় আমাদের পরিকল্পনার প্রথমে ছিল, আঠারো বাড়ি জমিদার বাড়ি ঘোরা। কিন্তু ভালুকা থেকে ত্রিশাল আসার পর জানতে পারি, ময়মনসিংহ থেকে আঠারো বাড়ি যাবার কোনো লোকাল যানবাহন নেই। সিএনজি ভাড়া করে যেতে হবে। সিএনজি ভাড়া শুনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! ১,৮০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে! ময়মনসিংহ পুরোটা ঘুরতেও তো এত টাকা লাগবে না। অগত্যা, পরিকল্পনার পরিবর্তন। ঠিক হলো, এখন শশীলজ যাবো।

শশীলজ

ত্রিশাল থেকে আবার বাস ধরতে হলো ময়মনসিংহ আসার জন্য। বাস থেকে নেমে অটোয় চড়ে বসলাম। কয়েক পাঁক এদিক ওদিক ঘুরে অটোওয়ালা শশীলজ পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি তখন রাস্তার দুইধার দেখছি। শশীলজ লেখা বিশাল গেটটা দেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘ওই তো শশীলজ!’

শশীলজ। সোর্স: লেখিকা

সবে নয়টা বিশ। শশীলজের গেট খোলে দশটায়। এখন কী হবে? চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকব গেটের সামনে? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাস্তা পেরুলাম। তখনই একজন গেট খুলে বেরিয়ে এলো। সাথে সাথে আমরা গার্ডকে পাকড়াও করলাম। গলায় সবটুকু মধু ঢেলে বললাম, ঢাকা থেকে এসেছি আমরা, দয়া করে যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। লোকটা প্রথমে রাজি না হলেও রনি ভাইয়ার মালিশকৃত তেলের বদৌলতে পরে রাজি হলো। কিন্তু ঢোকার সাথে সাথেই বললো, আগে যেন পেছনদিকে চলে যাই। কর্তৃপক্ষ দেখতে পেলে সমস্যা হবে। প্রবেশপথের একধারে শশীলজের ইতিহাস লেখা স্তম্ভ দেখতে পেলাম। চট করে ওটার ছবি তুলে পিচঢালা রাস্তা ধরে লজের পেছনের দিকে পা বাড়ালাম।
শশী লজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬টি গম্বুজ। ভেতরে প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে একই রকম দেখতে ঝাড়বাতি। সাধারণ বসতঘর ছাড়াও আছে নাচঘর, স্নানঘর। স্নানঘরে আছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয়, এই সুড়ঙ্গপথেও আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল ভবনের পেছন ভাগেও রয়েছে স্নানঘর। বাড়ির পেছনে একটি দৃষ্টি নন্দিত জলাশয়ের পাশের এই স্নানঘরটি দোতলা। বাংলাদেশের অনেকগুলো জমিদারবাড়ি ঘুরেছি, কিন্তু এরকম দোতলা স্নানাগারের এমন আভিজাত্য দেখিনি। প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ইতিহাসস্তম্ভে লেখা না থাকলে বুঝতেও পারতাম না, এই ঘরটি স্নানের জন্য ব্যবহার করা হতো! এখানে বসে জমিদারের স্ত্রী পাশের পুকুরে হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুরের ঘাট মার্বেল পাথরে তৈরি।
ভেনাসের শ্বেত মূর্তি। সোর্স: লেখিকা

শশী লজের মূল ভবনের সামনে বাগানের মাঝখানে আছে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্নানরত একটি মূর্তি। বর্তমানে এই মূর্তিটির কাছাকাছি যেতে দেওয়া হয় না। দেখতে হলে দূর থেকেই দেখতে হবে গ্রিক দেবীকে। পাশেই রয়েছে পদ্মবাগান। শশী লজের ভেতরে বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়। সেই রঙ্গালয়ের এক পাশে বিশ্রাম ঘর। বিশ্রাম ঘরের পর কাঠের মেঝেযুক্ত হলঘর। হলঘরের পাশেই বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি ফোয়ারা। অবশ্য এখন আর এসব দেখার কোনো উপায় নেই। বাইরে থেকে শশীলজের সৌন্দর্য দেখেই তৃপ্ত হতে হবে।
ভবনটির পেছনে আসার জন্য পিচঢালা রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। একজায়গায় দেখলাম জামগাছ। জামতলায় বিছিয়ে রয়েছে জাম। খুঁজে পেতে কয়েকটা আস্ত জাম তুলে নিয়ে মুখে পুরে নিলাম। জাম খেতে খেতেই লজের পেছনে চলে এলাম। প্রথমেই চোখে পড়লো সাদা শাণ বাঁধানো ঘাটের অপরিসর একখানা পুকুর। জলাশয়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট রয়েছে। তার দক্ষিণ পাশেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র দোতলা স্নানঘরটি। দ্বিতল স্নানঘাটটির সৌন্দর্য সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ। এখানটায় একচিলতে উঠান আছে। সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা রয়েছে সেই উঠোনে।

কীভাবে যাবেন শশীলজ:

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে ময়মনসিংহ বাস স্ট্যান্ডে নেমে অটোয় করে শশীলজ। অটো ভাড়া ১০ টাকা।

ময়মনসিংহ জাদুঘর

শশী লজ ঘুরে দেখে পা বাড়ালাম কাচারি মোড়ের দিকে। ঠিক মোড়েই একটা মসজিদ আছে। মসজিদের পাশের এক দোকানে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, মসজিদ ধরে খানিক সামনে এগিয়ে গেলেই ময়মনসিংহ জাদুঘরটি পেয়ে যাবো। অগত্যা আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

ময়মনসিংহ জাদুঘ। সোর্স: লেখিকা

মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর আরোও একটি চত্বর পেলাম। এই চত্বরের নাম “স্মৃতি অম্লান”। চত্বরের কাছাকাছি আসতেই শিহান লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে গেল জাদুঘর সম্পর্কে, আর আমি চত্বরটি ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। খুবই নান্দনিক এই চত্বরটি মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের সম্মানে বানানো হয়েছে। স্থপতি হাসান মাহদীর বানানো এই ভাস্কর্যটির সামনে লেখা আছে, “এই স্মৃতিস্তম্ভটি সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নির্মিত। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমার-আপনার-সকলের।”
কিন্তু কীসের রক্ষণাবেক্ষণ? স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে “বাসায় গিয়ে পড়ানো হয়”, “বাসা বদলানোর জন্য ভ্যান ভাড়া দেওয়া হয়”, নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার সাঁটানো। দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা বাঙালিরা কি সৌন্দর্য বুঝি না? যদি বুঝিই, তাহলে সব সৌন্দর্যময় জিনিস নষ্ট কেন করি? স্মৃতি স্তম্ভটির গায়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি আছে।
স্মৃতি অম্লান। সোর্স: লেখিকা

শিহান এসে বললো, ‘চত্বরের ওপাশেই জাদুঘর। চলো।’ জাদুঘরের সম্মুখদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই, হলদে রঙের ছোটখাটো বাড়িটি চোখে পড়লো। দেখেই মনে হলো এটি অনেক পুরোনো। সত্যিই তাই। ১৯৬৯ সালে স্থাপিত এই জাদুঘরটির তখনকার নাম ছিল মোমেনশাহী জাদুঘর।
ময়মনসিংহের এই জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত আছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জমিদারবাড়ির প্রত্নসম্পদ। গৌরীপুর জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাঠের পার্টিশন, সোফাসেট, শ্বেত পাথরের তৈরি টেবিল, কালো পাথরের তৈরি টেবিল টপ, ফুলদানি রাখার স্ট্যান্ড, কাঠের তৈরি বাড়ির মডেল ইত্যাদি। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে লোহার বল্লম, বলছিড়া, রামদা, খক্ষ, গণ্ডারের চামড়া, বন্য গরুর শিং ও চীন দেশের পাহাড়ি বাড়ির মডেল।
গণ্ডারের চামড়া জিনিসটা যে কত মোটা, লোকে কেন গালি দেওয়ার জন্য এই শব্দদুটো ব্যবহার করে এখানে এলে চাক্ষুষ দেখা যাবে। আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু নিদর্শন আছে এই জাদুঘরে। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এসব নিদর্শনের বেশিরভাগই ১৮০০-১৯০০ শতকের। আগে জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য টিকিটের মূল্য ছিল ১০ টাকা। এখন ১৫ টাকা করা হয়েছে।

কীভাবে যাবেন ময়মনসিংহ জাদুঘর:

এই জাদুঘর প্রধান শহরের (ব্রহ্মপুত্র নদ) কাছাকাছি অবস্থিত। শহরে থাকা কোনো ভিজিটর একটি রিক্সা ব্যবহার করে এই এলাকাটি সহজেই পরিদর্শন করতে পারে। এখানে ময়মনসিংহ শহরের কাচারী এলাকা এবং নিকটবর্তী পৌরসভা ভবন থেকে সহজেই পৌঁছানো যায়।

হাসান মঞ্জিল

জাদুঘর ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম হাসান মঞ্জিল। পুরাতন এই বাড়িটিতে এখন ময়মনসিংহ ডায়বেটিক সমিতির ক্লিনিক ও হাসপাতাল করা হয়েছে। নীরবতা বজায় রেখে বাড়িটির কারুকাজ আর শৈল্পিক নৈপুণ্যতা দেখে বেরিয়ে এলাম।

হাসান মঞ্জিল। সোর্স:লেখিকা

জয়নাল আবেদীন পার্ক ও সংগ্রহশালা

হাসান মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে জয়নাল আবেদীন সংগ্রহশালা দেখতে যাবো। কিন্তু কীভাবে যাবো, তাই জানি না। রাস্তায় দাঁড়ানো কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, আমরা রিকশায় করেই খুব সহজে যেতে পারি সংগ্রহশালায়। লোকগুলো অবশ্য পার্ক পার্ক বলছিল। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সংগ্রহশালা আবার পার্ক হয় কী করে! নাকি ভুল গন্তব্যে যাচ্ছি?
হাসান মঞ্জিলের রাস্তা ছেড়ে রিকশা একটা বড় রাস্তায় আসতেই শিহান বললো, ‘না, ঠিকই আছে। ওই দেখ ব্রহ্মপুত্র। আমি ম্যাপে দেখেছিলাম, ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে জয়নাল আবেদীন সংগ্রহশালা।’
নিশ্চিন্ত মনে রিকশাভ্রমণ করছি। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশের একটা মাজারে চোখ পড়লো। ওতে লেখা, “মাজারে সিজদা দেওয়া নিষেধ।” খুব কম সংখ্যক মাজারেই এই ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছি আমি। ভালো লাগলো।

জয়নুল আবেদীন সংগ্রহ শালা। সোর্স: লেখিকা

সংগ্রহশালার কাছাকাছি আসতেই একটা পার্ক পেলাম রাস্তার পাশে। ব্রহ্মপুত্র নদীর ধারে গাছগাছালির ছায়াঘেরা দীর্ঘ একটা পার্ক। হাতে সময় থাকলে এখানে কিছুক্ষণ বসে থাকতাম।
বিশাল এরিয়া নিয়ে জয়নাল আবেদীন পার্কটি। এখানে আছে মিনি চিড়িয়াখানা, বৈশাখী মঞ্চ, জেলা প্রশাসকের বাড়ি, প্রচুর ফুডকোর্ট। পিচঢালা রাস্তার একধারে এগুলো, অন্যপাশে পার্ক। সাইনবোর্ডে তীরচিহ্ন দিয়ে দেখানো আছে, কোনটা কোথায়। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেখা শেষ হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সংগ্রহশালাটি কোনদিকে?’ জবাব এলো, ‘সামনে এগিয়ে যান। একটা চত্বর আছে, ওখানে পাবেন।’
চত্বরের কাছে গিয়ে দেখি, চত্বরের ঠিক মাঝখানে শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের চারধারে শিল্পাচার্যের জীবন বৃত্তান্ত লেখা। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, সেদিন ছিল শুক্রবার। এবং শুক্রবারে বিকেল তিনটায় সংগ্রহশালার গেট খোলা হয়।
কী আর করা? বিরস বদনে এখান থেকে কাঁচির মোড় যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। যেতে যেতে দেখলাম, ভিতরে আর্ট কম্পিটিশন হচ্ছে। চিত্রশিল্পীরা আঁকছেন ঘাসে বসে।
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির শ্বেতমহল। সোর্স: লেখিকা

হাঁটতে হাঁটতেই কাঁচির মোড় চলে এলাম। ভুল বলেছি, এর মধ্যে দৌড়ও দিয়েছিলাম এই বলে যে, কে আগে যেতে পারে। কাঁচির মোড়ে বেশ কয়েকটা খাবারের হোটেল ছিল। একটায় দেখলাম, গরমাগরম সমুচা ভেজে তোলা হচ্ছে। সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এতক্ষণে কিছু হালকা খাবার পেটে না পড়লে চলে? হোটেলে ঢুকে, হাতমুখ ধুয়ে সমুচার অর্ডার করলাম। বেশ মজার সমুচা। একেকজন তিনটা করে সমুচা খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এরপর যাবো মুক্তাগাছায়।

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি

রিজার্ভ সিএনজিতে করে কাঁচির মোড় থেকে চলে গেলাম মুক্তাগাছায়। কাঁচির মোড় থেকে মুক্তাগাছায় যাওয়ার রাস্তাটি বেশ সুন্দর। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির প্রশংসা শুনেছি অনেক আগে থেকেই। এটি খুব বড় জায়গা নিয়ে স্থাপিত। জমিদার বাড়ির সামনে যখন গেলাম, তখন বাজে বেলা একটা। সদর দরজায় দাঁড়ানো গার্ড বললেন, ‘কোত্থেকে এসেছেন আপনারা?’ বললাম, ‘ঢাকা থেকে।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘বন্ধ হবার সময় হয়ে গিয়েছে। আপনারা ২০ মিনিটে ঘুরে আসুন।’ ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। খুব বেশি বড় তো নয়! তাছাড়া যেরকম নামডাক শুনেছি, সেরকম আহামরি বাড়িও নয়।
হ্যাঁ, খুব সুন্দর একটা সাদা বাড়ি আছে। আর আছে একটা টিনের দোতলা বাড়ি। বাকি সব স্থাপনার অবস্থাই একদম নাজুক। কর্তৃপক্ষ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। চুনসুরকি উঠে গিয়ে দেয়ালের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। এই তো। তাহলে যে এত নামডাক শুনেছি, তার রহস্য কী?

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির টিনের দোতলা ঘর। সোর্স: লেখিকা

বাইরে বেরিয়ে রহস্য উদঘাটিত হলো। যে স্থাপনাগুলো মজবুত ছিল, ওগুলোকে নিয়ে সরকারী কলেজ করা হয়েছে। তাছাড়া আশেপাশের আরোও অনেক জায়গা নিয়ে বিভিন্ন মঠ, মন্দির, নাটমন্দির দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম।
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির মঠ। সোর্স: লেখিকা

মুক্তাগাছা এসেছি যেহেতু বলাই বাহুল্য, অবশ্যই মুক্তাগাছার মন্ডা খাব। ঘোরাঘুরি শেষ করে রাস্তায় যাকে পেলাম, তাকেই জিজ্ঞেস করলাম, “মণ্ডার দোকানটা কোথায়?” হাত তুলে পথ নির্দেশনা দেখিয়ে একটা দোকানের কথাই সবাই বললেন। সেটা হলো ‘গোপাল পালের প্রসিদ্ধ মণ্ডার দোকান’।
আমরা বার বার জানতে চাচ্ছিলাম, আসল মণ্ডার দোকান খুঁজছি। কারণ এই পর্যন্ত বাংলাদেশের বিখ্যাত যে খাবারগুলো খেয়েছি, তার সবগুলো জায়গাতে গিয়েই আসল খাবারের দোকানটা খুঁজে পেতে কালোঘাম ছুটে গেছে। তাই খুঁতখুঁতে মনেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম মণ্ডার দোকানের দিকে।
মুক্তাগাছার মন্ডা। সোর্স: লেখিকা

দোকানে ঢুকে বসতেই মণ্ডা নিয়ে এলো। কেয়া বলছিল, এর আগে একবার রনিভাই এখান থেকে মণ্ডা কিনে নিয়ে গিয়েছিল। তেমন একটা ভালো লাগেনি ওর কাছে। চামচ দিয়ে ভেঙে খানিকটা মুখে পুরতেই গলে গেল। চারজনের জন্য স্টিলের পিরিচে করে মণ্ডা এলো। আহ! কী স্বাদ এর! অনেকটা নাটোরের কাঁচাগোল্লার মতো, তবে মুক্তাগাছার মণ্ডা নাটোরের কাঁচাগোল্লার চেয়ে অনেক মিহি। ঠিক যেন স্বর্গীয় কোনো খাবার। কেয়া এবারে বললো, ‘আজকে মজা লাগছে। কিন্তু সেদিন ভালো লাগেনি।’

কীভাবে যাবেন মুক্তাগাছায়:

ঢাকা মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসলাম বাসে সরাসরি মুক্তাগাছা যাওয়া যায়। এছাড়া ময়মনসিংহগামী বাসে চড়ে ময়মনসিংহ নেমে সিএনজিতে করে যাওয়া যায় মুক্তাগাছায়।
মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। আসার পথে খুব সুন্দর একটা মসজিদ দেখতে পেলাম। জুম্মার নামাজ হচ্ছে মসজিদে।

গৌরীপুর

বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে করে চলে এলাম ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে। ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুর যাবার ট্রেন আছে। ট্রেন পাই কিনা, ওটা জানাই উদ্দেশ্য। আমরা যখন ময়মনসিংহ স্টেশনে এসে পৌঁছেছি, তখন বাজে বেলা দুইটা। টিকিট কাউন্টার খুঁজে নিয়ে কাউন্টারের কাছেই দেয়ালে টাঙানো চার্টে দেখলাম, এখান থেকে গৌরীপুরের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। আমাদের ভাগ্যটা ভালোই বলতে হবে কারণ, গৌরীপুর যাওয়ার ট্রেনটি প্লাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছে। আড়াইটায় ছাড়বে। টিকিটের দাম শুনে শিহানের চক্ষু ছানাবড়া। মাত্র ১২ টাকা। তবে টিকিটের গায়ে লেখা ১১ টাকা। আমরা সানন্দেই ১২ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে মোটামুটি ফাঁকা দেখে একটা বগিতে উঠে বসলাম।

গোরীপুর মহিলা কলেজ। সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুর নেমেই আগে একটা খাবার হোটেলে ঢুকলাম। বেলা চারটা বাজে, পেটের মধ্যে ছুঁচো নাচছে। আশেপাশের হোটেলগুলোর মধ্যে এটাই নাকি একটু ভালো। খাবারের আইটেম শুনে ভাতের সাথে চিকেন আর ডালভুনা অর্ডার করলাম। সাথে হাফ লিটার কোক। রনিভাই কী যেন বললো ওয়েটারের কানে কানে, আমাদের চারজনের খাবারের বিল এলো মাত্র ১৬৫ টাকা। ওয়েটারের হাতে ৩০ টাকা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে।
ট্রেনে দুই ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তারা বলেছিলেন, ট্রেন স্টেশন থেকে অটোয় করে আমরা গৌরীপুর জমিদার বাড়ি দেখতে পারবো। ভাড়া পড়বে ১০ টাকা করে। গৌরীপুর জমিদার বাড়ি ঘুরে আবার স্টেশনে আসতে হবে। এখান থেকে রামগোপালপুর মন্দির যাব। ওখানকার ভাড়া ১০-১৫ টাকা।
অটোকে গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে গেলে অটোওয়ালা জানালো, চাইলে আমরা উনার অটো রিজার্ভ নিতে পারি। এখানে অনেকগুলো জমিদার বাড়ি আছে, সবগুলোতে ঘুরিয়ে দেখাবে, তারপর এই স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যাবে। ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা। রনিভাই অনেকক্ষণ ধরে দামাদামি করে ২০০ টাকায় রাজি করালো। তারপর শুরু হলো আমাদের গৌরীপুর উপজেলা ভ্রমণ।
প্রেস ক্লাব। সোর্স: লেখিকা

প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়লো, তা হলো একটা দেয়াল লিখন। কিছুক্ষণ পর পরই দেখতে পাচ্ছি লেখাটা, “গৌরীপুর জেলা চাই।” দেখে খুব মজা পেলাম। নোয়াখালী বিভাগ চাওয়ার পর এখন গৌরীপুর জেলা, মজা পাবারই তো কথা।
মহিলা কলেজ, দুর্গাবাড়ি পূজা মন্দির, গৌরীপুর প্রেসক্লাব ঘুরে একটা চত্বর পেরুলাম। এই চত্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য বানানো আছে। এরপর গেলাম গোরীপুর রাজবাড়িতে। এটা বর্তমানে সরকারী কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চত্বর। সোর্স: লেখিকা

এরপর অটোয় চড়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম রামগোপালপুর রাজবাড়িতে। রাজবাড়ির এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, কেবল প্রকাণ্ড একটা প্রবেশপথ আর মন্দির ছাড়া। রাজবাড়ির সীমানায় জামগাছ পেলাম আবারোও। খুঁজেপেতে কিছু আস্ত জাম কুড়িয়ে নিলাম, যেগুলো থেঁতলে যায়নি। এখানটায় কিছুক্ষণ ঘুরে জাম খেতে খেতে গোরীপুর জংশনের দিকে এগিয়ে গেলাম।
গৌরীপুর সরকারি কলেজ। সোর্স: লেখিকা

ট্রেনে আলাপপরিচয় হওয়া ওই দুই ভদ্রলোক বলেছিলেন, গৌরীপুরে লটকন খুবই সস্তা। মাত্র ৩০ টাকা করে কেজি। আমি শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলাম। এই সেদিনও ঢাকায় লটকন কিনে খেয়েছিলাম ১০০ টাকা কেজি দরে। অথচ এখানে এত কম দাম? ফিরতি পথে তাই অটোওয়ালাকে বললাম, ‘লটকন কিনব।’ সে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, ‘লটকন কী?’
আমি দ্বিগুণ অবাক হয়ে বলি, ‘লটকন চেনেন না!’
উনি মাথা নাড়লেন। অটোওয়ালা লটকন চেনে না বলে, লটকন না কিনে ফিরব! তাই কী হয়? তাই আমি লটকনের বর্ণনা দিয়ে উনাকে চেনানোর চেষ্টা করলাম। অবশেষে তার চোখেমুখে চেনার ভাব ফুটে উঠলো। উনি বললেন, ‘ও, বুবি? ৩০-৪০ টাকা কেজিদরেই কিনতে পারবেন।’
তারপর উনি নিজ দায়িত্বে ভালো লটকন কোথায় পাওয়া যাবে, সেখানে নিয়ে গেলেন। ৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া গেল বড় লটকন। কিনে ফেললাম কেজি তিনেক।
মন্দির। সোর্স:লেখিকা

স্টেশনে ফিরে অটোওয়ালাকে ২০ টাকা বেশি দিলাম। কিছু মানুষ ভালোবাসা দিয়ে নিজের পাওনাটুকু আদায় করে নিতে জানে। ইনি পুরো সময়ে একজন ভালো গাইডের মতো সহায়তা করেছেন। যদিও ভ্রমণ চলাকালে রিজার্ভ অটোতে আমরা কিছু লোকাল যাত্রী তুলে নিতে অনুমতি দিয়েছিলাম, যাতে মানুষটার বাড়তি কিছু আয় হয়। তবুও, আরোও কিছু বখশিশ দেওয়া উচিৎ ছিল তাকে।
একবার ভেবেছিলাম, গৌরীপুর থেকে ফেরার সময় বাসে ফিরে যাই। কিন্তু অটোওয়ালা বলেছিল, বাসগুলো লোকালের চেয়েও খারাপ। পাঁচ টাকার যাত্রীও তুলবে প্রত্যেক স্টেশনে দাঁড়িয়ে। তাই ট্রেনস্টেশনেই ফিরে এসেছি আমরা এখানে এসে দেখি ঢাকার একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে। প্রচুর মানুষ। ছাড়ে ছাড়ে ভাব। টিকিট কাউন্টারে টিকিট পাওয়া গেল না। ময়মনসিংহের যাত্রীবোঝাই ট্রেনে উঠে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারপর আবার একই হালে যাবো? উঠব কি উঠব না, তা নিয়ে দোটানায় ভুগছিলাম তাই। একলোক পাশ থেকে বললো, ‘টিকিট আছে আপনাদের?’ উত্তরে মাথা নাড়তেই উনি বলে উঠলেন, ‘তাহলে ট্রেনে উঠছেন না কেন! ছেড়ে দিচ্ছে তো!’
উনার ধমক খেয়েই মনে হয় লাফিয়ে উঠে পড়লাম। তবে সেদিনের মতো অতো ভিড় নয়। দাঁড়ানোর পরও আশেপাশে জায়গা ছিল। ভালো করেছি উঠে পড়ে। নইলে পরের ট্রেন কখন না কখন আসতো কে জানে!
রামগোপালপুর জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বার। সোর্স: লেখিকা

টিকিট চেকার এসে বললো, ‘আপনারা টিকিট কেটেছেন?’ দুপুরে আসার সময়কার টিকিট চেক করেনি কেউ, একবার ভাবলাম ওগুলো দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করবো কি না। পরে আর মন সায় দিল না। বললাম, ‘না কাটিনি।’
লোকটা ২০ টাকা করে ভাড়া চাইলো। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আমরা তো আসার সময় ১২ টাকা করে টিকিট কেটেছি।’
সে জবাব দিল, ‘ওটা লোকাল ট্রেন ছিল। এটা ডিরেক্ট ট্রেন।’
আর কথা না বাড়িয়ে টাকা দিয়ে দিল শিহান। সত্যিই সত্যিই ট্রেনটা ২০ মিনিটে নামিয়ে দিলো ময়মনসিংহ স্টেশনে। চমৎকার একটা ডে ট্যুর শেষ হলো আমাদের।

ময়মনসিংহ কীভাবে পৌঁছাবেন:

ময়মনসিংহ শহর ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। ময়মনসিংহে কোনো এয়ারপোর্ট নেই। বাসযোগে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বিমানবন্দর প্রায় ১১০ কিলোমিটার (৪ ঘন্টার ড্রাইভ) ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত কয়েকটি বাস সার্ভিস রয়েছে ঢাকার মহাখালী বাস স্টেশন (ঢাকা বিমানবন্দরের ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ) থেকে ময়মনসিংহের মশকান্দা বাস স্টেশন থেকে বাস ছাড়বে।
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত কয়েকটি ট্রেন চালু রয়েছে। ময়মনসিংহে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আপনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে উঠতে পারেন অথবা আপনি কমলপুর রেল স্টেশন থেকেও যেতে পারেন।
ফিচার ইমেজ: মাদিহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মেঘপাহাড়ের দেশ সুইজারল্যান্ডের স্বর্গরাজ্য থেকে বলছি

বান্দরবানের গোলাপি গোধূলি, রুপালী রাত ও সোনালী সকালের গল্প