বানরের অভয়ারণ্য ভালুকার বিটবনে একদিন

ভালুকা গিয়েছিলাম বান্ধবীর জন্মদিন উদযাপন করতে। কিন্তু উদ্দেশ্য কেবল সেটাই নয়। শিহান বলছিল- ভালুকার কোথাও কোথাও ভাওয়াল গড়ের মতো প্রাকৃতিক কিছু বন আছে। সেগুলো নাকি রীতিমতো জঙ্গল। তা বলাই বাহুল্য, অরণ্যের প্রতি আমার যতটা টান আছে, ততটা বোধহয় নিজের প্রতিও নেই। প্রকৃতির এমন নিশ্চুপতার কাছাকাছি যেতে পারলে আমার আর কিছুর দরকার পড়ে না।

তাহলে এবার কেন নয়? ম্যাপ ঘেটে দেখা গেল জায়গাটা বান্ধবীর বাসা থেকে খুব কাছে। সব শুনে রনি ভাই বললেন- কাদিরগড় জায়গাটা তেমন আহামরি কিছু নয়। জঙ্গলের মধ্যে মাঝে মাঝে ব্যাঙের ছাতার মতো কিছু ছাউনি বানিয়ে রেখেছে। তার ওপর ওদিকে যেতে ভয়ঙ্কর রাস্তা। কোমরের হাড্ডিগুড্ডি সব খুলে যেতে পারে।

গহিন অরণ্যের পথে একা আমি।  সোর্স: শিহান

ভাবলাম- রনি ভাই রসিক মানুষ। মজা করার জন্য বলতে পারে। আমি আর শিহান সিদ্ধান্তে অনড়। কথা যখন উঠেছে, তখন যাবই। পাশ থেকে বান্ধবী কেয়া বলে উঠল- আচ্ছা, বনেই যখন যাবে, তখন ওদের বীটের বন ঘুরিয়ে আনতে পারো। ওদিকে আবার বানরও আছে।

শুনে বেশ উৎসাহ জাগল। চিড়িয়াখানা বাদে খুব কম জায়গায়ই বন্য বানর দেখেছি আমি। এখানে ওদের পেলে মন্দ হয় না। ব্যস, সকালের খাওয়া সেরে আমি, শিহান আর রনি ভাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম।

সিডস্টোর বাসস্টপেজ থেকে একটু দক্ষিণে রাস্তার বামপাশেই বীটবন অফিস। ভালুকার আঞ্চলিক সমস্ত বন ও তার রক্ষণাবেক্ষনের দায়দায়িত্বে আছেন তারা। রনি ভাই বললেন- চাইলে ভেতরে ঢোকা যাবে।

এই অরণ্যে ভারি ভারি ট্রাক চলাচল করে। সোর্স: শিহান

শিহানও বলল- ঢুকলে কিছু তথ্য যোগাড় হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু সরাসরি রিকশা ঠিক করে ফেলেছি বলে আর ভেতরে যেতে ইচ্ছে করল না। এসব ক্ষেত্রে দেখেছি- সাংবাদিক না হলে কর্মকর্তারা খুব ভালো সহযোগিতা করে না। প্রশাসনিক দোহাই দিয়ে বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়।

কিন্তু আমি মনে মনে ভাবছি অন্য কথা। এসব দিয়ে কী হবে? আমার দরকার বন। একদম প্রাকৃতিক অরণ্য। আর থম ধরা গা ছমছমে পরিবেশ, বন্য পাখিদের হালকা কিচিরমিচির। সেই সাথে রনি ভাইয়ের প্রাকৃতিক বানর।

এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া এসব রাস্তা আমায় খুব টানে। সোর্স: শিহান

খানিক দূরে গিয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে আমদের রিকশা গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেল। ঢালাই ছাড়া কংক্রিটের রাস্তা। রিকশায় বসে বেশ ঝাঁকুনি খেলাম। চারপাশে সাধারণ সব গ্রাম্য পরিবেশ। উঠোনের পাশে কিংবা জমির আইলে তথাকথিত গাছগাছালির বাহার। খানিক বাদে বাদে পাকা ঘরবাড়ি। জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায়- স্টার জলসা কিংবা বাংলা সিনেমার কোনো ফাইটিং সিন চলছে। তাহলে বন কোথায়?

অরণ্যের মাটিও কত আলাদা! সোর্স: শিহান

রিকশা এগোচ্ছে। এর মধ্যে হাতের বাম পাশে চোখে পড়ল একটা খোলা ময়দান। সমান্তরাল ভূমি থেকে একটু উঁচুতে। মাঝখানে কিছু তালগাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওপাশে একটা ঝাঁকড়া আম গাছ। কয়েকজন লোক গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আয়েশ করছিল। আর তাদের গরুগুলো ময়দানময় ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে।

খুব ছোটবেলা থেকেই এরকম মাঠ দেখলে আমার ঐ গাছতলায় গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কোনো কারণ নেই, কিন্তু এই তেপান্তরের ধূ ধূ শূন্যতা আমায় খুব টানে।

বিস্তীর্ণ তেপান্তর। সোর্স: শিহান

রাস্তা টপকে এর ডানপাশে তিন চার একরের একটা ভিটে মতোন জায়গা। পুরোটা জুড়ে গাছ লাগানো। আকাশমনি, ইউক্যালিপ্টাস, মেহগুনি এবং মাঝেমধ্যে গজারি গাছের সারি লুকিয়ে আছে। চারপাশটা খোলা বলে এখানে খুব হাওয়া দিচ্ছিল। আহা, এইখানটায় একটা বাঁশের মাচান হলে তার ওপর শুয়ে শুয়ে বই পড়ার মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা পাওয়া যেত।

যাই হোক, ওটা পেরিয়ে আরেকটু সামনে এগোতেই গাছগাছালি ঘন হতে শুরু করেছে। চারপাশটা ভালো করে লক্ষ করার আগেই আমাদের নিয়ে রিকশাটি বনের ভেতর ঢুকে গেল। আশেপাশে তখন বুনো ঝোঁপ আর গাছগাছালিতে ঠাসা। কিন্তু কোথাও যেন একটা কমতি আছে- ব্যাপারটা ধরতে পারছি না।

সামনে তাকিয়ে দেখি- কংক্রিটের রাস্তা শেষ। এইবার শুরু হলো আসল বন। রিকশাওয়ালা মামারা আমাদের নামিয়ে উল্টোদিকে চলে গেল। তখনি শুরু হলো আসল ভাবনা- এবার আমরা ফিরব কী করে? সাধারণত এখানটায় কোনো রিকশা বা অটো আসে না।

অরণ্য কেটে করা হয়েছে ধানী জমি। সোর্স: শিহান

কিন্তু এটাও সত্যি যে এখনি সঠিক সময় এই দুর্গমতাকে ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য। যান্ত্রিক ব্যাপারটা প্রকট হয়ে উঠলে এটা সম্ভব হতো না। আমরা কাঁচা পথটা ধরে সামনে এগোতে শুরু করলাম। রাস্তাটা মোটেও সুবিধের নয়। আগেরদিন বৃষ্টি হওয়াতে খানাখন্দে পানি জমেছে। সম্ভবত এপথে ট্রলি জাতীয় কিছু কিছু যানবাহন চলাচল করে।

রাস্তার যেখানে যেখানে পানি জমেছে, সেখানে চলাচল করতে বিকল্প শাখা পথ তৈরি হয়ে গেছে আপনাআপনি। ছোটবেলায় কোথায় যেন পড়েছিলাম- পথের জন্য সভ্যতা নয়, সভ্যতার জন্যই পথ। আসলেই তাই! মানব সভ্যতা একবার যেখানে পা ফেলে, সেটাই মানুষের জন্য পথ হয়ে যায়।

লোকমুখে শোনা- এই বিটবনটা কাদিরগড় জাতীয় উদ্যানের মতো পুরোপুরি প্রাকৃতিক। তবে এখানে বসার বা বিনোদনের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। যারা সত্যিকারার্থেই প্রাকৃতিক বনজঙ্গল ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বিটবন আদর্শ জায়গা। এখানকার গাছপালার মধ্যে বেশিরভাগই গজারি। মাঝেমধ্যে কিছু গামার গাছ চোখে পড়ে।

আর চারপাশটা জুড়ে অসংখ্য বেত বন। বুনো ফুলের মধ্যে আছে কাঠমালতি। সবুজ থমথমে অরণ্যের মাঝে এই সাদা কাঠমালতির থোকা আসলেই এক অন্যরকম সোন্দর্য প্রদর্শন করেছে। তবে শঙ্কার কথা হচ্ছে, আজকাল কিছু অসাধু লোকজন এই বনের কিছু অংশ কেটে চাষের জমি তৈরি করছে।

রাস্তার পাশে পার্শ্ব রাস্তাও থাকে। সোর্স: শিহান

আমরা তিনজনে তখন ঘেমে নেয়ে উঠেছি। বনের মধ্যে খুব ঘন জঙ্গল বলে একদম হাওয়া নেই। ভ্যাপসা একটা গরম। তবে আলো আছে। ধবধবে মেঠোপথের ওপর ঘাছগাছালির ফাঁক গলে রোদ এসে পড়েছে। চমৎকার এক আলোছায়ার খেলা। শিহানকে দেখলাম বেশ উৎফুল্ল হয়ে আছে। আমার মতোই সেও অরণ্য প্রিয় মানুষ। এমন জঙ্গল দেখলে নাকি এর ভেতর বসবাস করতে ইচ্ছে করে তার। রনি ভাই বলল- একমাস থাকলে টের পাবেন, জীবন কাকে বলে।

আমরা সেই মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাই নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম। শুনে সে একটুও দ্বিরুক্তি করল না, বরং আমাদের উপেক্ষা করে ভরাট গলায় গাইলো- ‘আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা…আলো নয়ন ধোয়া আমার, আলো হৃদয় হরা…।’ আমরা তন্ময় হয়ে শুনতে শুনতে ওপথ হাঁটছি। নাকি জীবনের পথ?

বেতবন। সোর্স: শিহান

তখন জঙ্গল পেরিয়ে আমরা অনেকখানি ভেতরে চলে গেছি। রনি ভাই বলল- এবার ফেরা দরকার। আরো ভেতরে গেলে ফিরতে কষ্ট হবে।

কিন্তু অদূরে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে কিছু একটা দেখা যায়। একটু এগিয়ে গিয়ে বুঝলাম- ওটা একটা ধানক্ষেত। তবে বেষ্টিত নয়, বেশ খোলামেলা। পাশে একটা ঝাঁকড়া আমগাছ। তার নিচে গিয়ে বসতেই খোলা হাওয়ার ঝাপটায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল। আরাম পেয়ে অনেক্ষণ বসে রইলাম। সেসময় স্থানীয় কয়েকজন পথিকের সাথে আলাপ হলো। বানরের কথা জিজ্ঞেস করতে বলল- আরও পূর্বে যেতে হবে।

কাঠমালতি। সোর্স: শিহান

কিন্তু রনি ভাই আর যেতে দিল না। আমারো গরমে অস্থির লাগছিল। অগত্যা আমাদের ফেরার পথ ধরতে হলো। এখানে কোনো স্টপেজ নেই, তাই যানবাহন পাবারও আশা নেই। ঘেমে নেয়ে হেঁটেই ফিরতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ হেঁটে সদ্য বনায়ন হচ্ছে এমন কিছু গাছের সারির ছায়ায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। তবে তার আগেই এই কাজটা করে ফেলেছে শিহান। দেখাদেখি, রনি ভাইও। অরণ্যে শুয়ে বই পড়ার আকাঙ্ক্ষা আমার পূরণ হলো। আধা ঘণ্টার মতো শুয়ে শুয়ে বই পড়েছি। কিন্তু এই আরামদায়ক আলস্য নিয়ে শুয়ে থাকলে চলবে? ফিরতে হবে না?

আবারো মেঠো পথ মাড়িয়ে ফিরতে ফিরতে বুঝলাম- অরণ্যে হারিয়ে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় হলো শীতকাল। খুব গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে, কুয়াশাময় পথ মাড়িয়ে এই নিশ্চুপতার মধ্যে নিজেকে সঁপে দেয়ার মতো সুখ আর কিছুতে নেই।

অরণ্যে শুয়ে বই পড়ার আকাঙ্ক্ষা আমার পূরণ হলো।সোর্স: শিহান

অবস্থান

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার সিডস্টোর থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার পূর্বে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালি বাসস্ট্যান্ড বা উত্তরা থেকে নিয়মিত ময়মনসিংহগামী বাস ছেড়ে যায়। লোকালে সিডস্টোরের ভাড়া পড়বে ৮০-১০০ টাকা। আর সিটিং বাস সৌখিনে ১৫০ টাকা। এছাড়া এনা পরিবহনের কাউন্টার বাস পাবেন। নির্দিষ্ট ভাড়ায় এক সকালে সহজেই চলে যেতে পারবেন ভালুকার সিডস্টোরে। সময় লাগবে বড়জোর দুই-আড়াই ঘণ্টা। সেখান থেকে রিকশাওয়ালাকে বীটবনের কথা বললেই তারা পৌঁছে দেবে।

ফিচার ইমেজ: শিহান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আদিবাসীদের জাদুঘরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ঐতিহ্য খুঁজে বেড়ানো একটি বিকেল

পৃথিবীর উচ্চতম গ্রাম কিবের অভিযান