অস্ট্রিয়ার পানির নিচের অদ্ভুত পার্ক

স্কুবা ডাইভিং বলতে বোঝায় পানির নিচে শ্বাসযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার করে ডাইভ দেয়া। সারা বিশ্বেই স্কুবা ডাইভিং বেশ জনপ্রিয় একটি অ্যাডভেঞ্চার। পানির নিচের জগত দেখা এবং সেখানে স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করার জন্য স্কুবা ডাইভিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। স্কুবা ডাইভিং বললেই আমাদের শুধু সমুদ্রের তলদেশে ডাইভিংয়ে কথা মনে আসে। পানির নিচের বিভিন্ন রকমের কোরাল আর রঙবেরঙের মাছ দেখার জন্য স্কুবা ডাইভিং জনপ্রিয়। এ তালিকায় নাম রয়েছে মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিজির মতো দেশগুলো।
অস্ট্রেলিয়ার কোরাল রীফও অনেক নামকরা স্কুবা ডাইভিংয়ের গন্তব্য। আমাদের দেশের একমাত্র কোরাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনেও শীতের সময় স্কুবা ডাইভিং করা যায়। তবে আজ আমরা আলোচনা করবো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের স্কুবা ডাইভিং নিয়ে। সমুদ্র না বরং লেকের তলদেশের ডুবে থাকা পার্ক দেখার জন্য এ স্কুবা ডাইভিং।

গ্রীন লেক-ছবি tourismontheedge.com

অস্ট্রিয়ার উত্তরপূর্বে স্টাইরিয়া এলাকায় হস্কব পর্বতমালার নিচে সবুজ পানির চমৎকার একটি লেক ও পার্ক আছে। অস্ট্রিয়ান ভাষায় একে বলে গ্রীন সী যার অর্থ হচ্ছে সবুজ লেক। তুষারে আবৃত পর্বত দিয়ে ঘেরা চমৎকার এই লেক ও পার্ক ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চারের জন্য বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এই গ্রীন লেকটির একটি ভিন্ন পরিচয় আছে। পানির নিচে ডাইভিংয়ের জন্য এ জায়গাটিই যে ইউরোপের মধ্যে অন্যতম সেরা। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালের কারণে গ্রীষ্মের সময় পর্বতের তুষারগলা নতুন করে আসা পানিতে তলিয়ে যায় এই পার্ক। তাতেই বদলে যায় এর স্বরূপ। পার্ক থেকে পরিণত হয় নয়নাভিরাম স্বচ্ছ পানির লেকে।
ত্রাগোস ভিলেজের কাছে এ জায়গাটি মূলত অনেকগুলো হাইকিংয়ের শুরুর স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্টাইরিয়ার হস্কব রেঞ্চটি ইউরোপের বেশ জনপ্রিয় হাইকিংয়ের গন্তব্য। এর কারণ হচ্ছে তুষারে আবৃত অনেকগুলো পর্বত রয়েছে এখানে, সর্বোচ্চ পর্বতটি প্রায় ২,৭০০ মিটার অর্থাৎ প্রায় ৯,০০০ ফিট উঁচু। শীতের সময়ও পার্কের একটি ছোট অংশ লেক হিসেবেই থাকে যার গভীরতা মাত্র ৩ ফিট। কিন্তু মার্চ মাস থেকে গরম পড়তে থাকলে পর্বতের ‍তুষার গলে সে পানিতে ডুবে যেতে থাকে পার্কটি।
গরমকালে ডুবতে থাকে পার্কটি-ছবি tourismontheedge.com

জুন মাসে এসে এ লেকের গভীরতা ৩৬ ফিট হয়ে যায়। স্বচ্ছ পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে পার্কের সবকিছু। প্রথমে পার্কের বেঞ্চ, ছোট ব্রীজ, ট্রেইল এগুলো তলিয়ে যায়। আস্তে আস্তে এর গভীরতা বাড়তে থাকে। একসময় বড় বড় গাছগুলোও সম্পূর্ণরূপে পানিতে তলিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় পানির নিচের অবিশ্বাস্য অতিপ্রাকৃত দেখতে এ পার্কটির। যে পার্কের বেঞ্চে মানুষ বসত, যে ছোট ব্রীজ পার হয়ে মানুষ যেত বা যে ট্রেইলে হাঁটত; গ্রীষ্মে সেখানেই ঘোরাঘুরি করতে থাকে স্থানীয় ট্রাউট মাছেরা।
চলছে লেকে ডাইভিং-ছবি tourismontheedge.com

তবে পানির নিচের পার্ক দেখতে হলে আপনাকে স্কুবা ডাইভিংয়ের সরঞ্জাম নিয়ে নামতে হবে। আগে থেকে স্কুবা ডাইভিংয়ের সার্টিফিকেট না থাকলে সরঞ্জাম থাকলেও আপনাকে পানিতে নামতে দেবে না। তবে সেখানেই স্কুবা শিখে ডাইভ দেবার ব্যবস্থা আছে। চাইলে সেখানে স্কুবা ডাইভিং ভালোভাবে শিখে তবেই ডাইভ দেয়া যাবে। ডাইভিংয়ের পাশাপাশি শেখানে হয় পানির নিচের ফটোগ্রাফি ও জলজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক। সার্টিফিকেট হাতে পেলেই নেমে যেতে পারবেন এক ভিন্ন পৃথিবীতে। তবে শীতের জন্য ভালো প্রস্তুতিও থাকতে হবে। এ জন্য পরতে হবে বিশেষ ধরনের স্কুবা ডাইভিংয়ের পোশাক যেটা আপনাকে ৪-৭ ডিগ্রী তাপমাত্রার ভয়াবহ ঠাণ্ডা এ পানিতে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।
এ ব্রীজেই বছরের অন্য সময় মানুষ হাটাহাটি করে–ছবি tourismontheedge.com

একবার পানিতে নামলেই এ অন্য পৃথিবীটা দেখতে পারবেন। পানির নিচের এ স্বর্গের ভিজিবিলিটিও অবিশ্বাস্য, ৫০ মিটার পর্যন্ত স্পষ্টই দেখা যায়। মনে হবে পুরো পৃথিবী যেন কোনো এক বিশাল বন্যায় তলিয়ে গেছে। যে বেঞ্চে সারা বছর লোকজন বসতো সে বেঞ্চের উপর দিয়ে বা পাশ দিয়ে সাঁতার কাটতে আপনার অন্যরকম অনুভূতি হবে। পানির নিচে দেখা মিলতে পারে স্থানীয় ট্রাউট প্রজাতির মাছের। আর বড় বড় গাছগুলোর ঝরাপাতা খুঁজে পাবেন ট্রেইল ও মাঠের মধ্যে।
বড় বড় গাছগুলোও ডুবে যায় পুরোপুরি, এসব গাছের মধ্যে দিয়ে ডাইভ করতে পারা নি:সন্দেহে আপনাকে অন্যরকমের স্কুবা ডাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা দেবে। এ লেকে ডাইভিংয়ের জন্য গুনতে হবে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০,০০০ টাকা। আর যেতে হয় মে মাসের শেষ দিক থেকে জুনের মধ্যে। জুলাই থেকে আবার পানি সরে যেতে শুরু করে। শীত আসতে আসতে লেক ছোট হয়ে আবার আগের জায়গায় চলে যাবে, জেগে উঠবে পার্ক।
এ যেন অন্য পৃথিবী-ছবি tourismontheedge.com

তবে গ্রীন লেক কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে লেকে ডাইভিং করা বন্ধ রেখেছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে অতিরিক্ত পরিমাণ পর্যটক ডাইভিং করতে আসায় লেকে ভূমিক্ষয় হয়ে পরিবেশ দূষণ করছে বলে তারা মনে করছে। সেজন্য বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে গ্রীন লেকের পর্যটন কর্তৃপক্ষ লেকে পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা ভালো করে খতিয়ে দেখছে। ডাইভিংয়ের পাশাপাশি এ লেকের পানিতে নামা, গোসল করা বা নৌকা চালানোও আপাতত নিষিদ্ধ করে রেখেছে। ডাইভারদের আশা, অচিরেই কর্তৃপক্ষ অন্তত ডাইভিংয়ের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। সারা বিশ্বেই ডাইভিংকে পরিবেশ বান্ধব বিনোদন হিসেবেই ধরা হয়। অস্ট্রিয়ার পাশাপাশি ইউরোপে আরও কয়েকটি এধরনের ডাইভিংয়ের গন্তব্য আছে, সেটা নিয়ে আরেকদিন আলোচনা হবে।

ফিচার ছবি: tourismontheedge.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কাশ্মীরের রোমাঞ্চকর যোজিলা পাস

কেরালা: এক ভিন্ন ভারতের গল্প