উদ্দব চন্দ্র সাহার জমিদার বাড়ি ও তার বংশধরের সাথে কথোপকথন

নরসিংদীর ডাঙ্গায় লক্ষণ সাহা আর তার বংশধরদের জমিদার বাড়ি ছাড়াও আরোও একটি প্রাচীন বাড়ি আছে। আমাদের রিকশাওয়ালা যখন লক্ষ্মণ সাহার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিচ্ছিল, তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই বাড়িটির ব্যাপারে। তিনি বলেছিলেন, এখান থেকে পাঁচ মিনিট উত্তর দিকে হাঁটলেই পাবেন সিধেন সাহার জমিদার বাড়ি।
পাঁচ মিনিট নয়, প্রায় দশ মিনিট হাঁটতে হয়েছিল বাড়িটি পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। প্রত্যেকটি মোড়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে সামনে এগিয়েছি। কয়েকজনকে বলতে শুনলাম, ‘এই পুরনো ভাঙা বাড়ি আবার দেখতে আসার কী আছে?’
তাদের কথা শুনে আমি হাসি। তারা তো আর জানে না, এই পুরাতন-ভাঙা জমিদার বাড়িতে আমি কী খুঁজে পাই!

বাড়ির সামনের দিক। সোর্স: লেখিকা

লক্ষ্মণ সাহার বাড়ির নিপুণ কারুকাজ দেখে এসে এই বাড়িটি দেখলে যে কেউ হতাশ হবে। কারণ পরিত্যক্ত এই বাড়িটি এখন আগাছা আর পরগাছার আখড়া। লালচে ইটের বাড়িটি এখন সবুজে ঢেকে গেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো প্রাণহীন ইটের লাল আর উদ্ভিদের সবুজে মিলে লাল-সবুজের অপূর্ব শেড তৈরি করেছে।
বাড়িটির সামনে কিছু দিনমজুর ইট ভাঙছে। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, বাড়ির মালিকেরা এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে কাছেই নতুন বাড়ি বানিয়েছে। এই প্রাচীন বাড়িটি এখন একটু একটু করে ভাঙা হবে। এখনো মূল বাড়িতে হাতুড়ির ঘা পড়েনি, সামনের ছোট কিছু স্থাপনা ভাঙছে। আমরা ঢাকা থেকে এই বাড়ি দেখতে এসেছি শুনে বললো, ‘ভেতরে অনেক বড়। ঘুরে দেখেন।’
কিন্তু আমি ঘুরে দেখার জন্য ভেতরে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পেলাম না। ভাঙা কক্ষ ভেতরে যাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণ উঁকিঝুঁকি দিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম।
এরকম অনেকগুলো প্রবেশপথ আছে পুরো বাড়ি জুড়ে।

দিনমজুর লোকগুলোর একজন আঙুল তুলে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললো, ‘ওই পাশ দিয়ে যান। ওদিকে অনেক বড়।’
তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে সরু পায়ে চলা পথ ধরে সামনে এগিয়ে দেখি, সত্যিই অনেক বড় এই দালান। আরোও কিছুদিন এভাবে পড়ে থাকলে সবুজ উদ্ভিদ পুরোপুরিভাবে গিলে নেবে একে।
উদ্ভিদের জঙ্গল তো আমাকে প্রাচীনতা থেকে দূরে রাখতে পারবে না। সাপখোপের ভয় না করে, শিহানের বারণ উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে কয়েকটি পদক্ষেপ দিয়ে সিঁড়িতে এসে উঠলাম। কয়েকধাপ সিঁড়ির পর বারান্দামতোন জায়গা আছে। ওখানটাতেও বিশালাকার কচু গাছসহ সদর্পে রাজ করছে আরোও নানা জাতের গাছ। আর পুরোনো বাড়িতে সবচেয়ে বেশি শিকড় ছড়ানো বটবৃক্ষ তো আছেই। কিছুক্ষণ একা একাই ঘুরে ফিরে দেখলাম। বারান্দা থেকেই বাড়ির অন্ধকার কক্ষগুলো দেখে নিলাম। ভেতরে ঢুকিনি। ভয়ে নয়, ঘরগুলোর মেঝে অসম্ভব রকমের নোংরা বলে ঢুকতে ইচ্ছে করেনি।
সবুজ উদ্ভিদের আধিপত্য থাকা স্বত্ত্বেও বাড়ির নান্দনিকতা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। সোর্স: লেখিকা

কিছুক্ষণ এই প্রাচীন বাড়ির ভেতরে ঘুরেফিরে দেখলাম। একা একা আর কতক্ষণই দেখা যায়? সবুজ গাছের জঙ্গল পেরিয়ে বাড়িটাকে পিছনে ফেলে বেরিয়ে এলাম। ঘুরে আবার বাড়ির সামনে এসে দেখি ঘাসের উপর কিছু কাঠগোলাপ পড়ে আছে। ওগুলো কুড়োচ্ছি, তখনই মিস্ত্রি একজন লোককে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনিই এই বাড়ির মালিক।’
কাঠগোলাপ কুড়ানো রেখে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। বললাম, ‘এত বড় একটা প্রাচীন বাড়ি, ভেঙে ফেলছেন কেন? সংরক্ষণ করে এখানে থাকা যায় না?’
উনি হেসে বললেন, ‘গত বছর আমরা এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে সামনে বাড়ি বানিয়েছি। তার আগ পর্যন্ত এখানেই থাকতাম। কিন্তু দিন দিন এত বেশি খারাপ অবস্থা হচ্ছে বাড়িটার, এখানে থেকে আর পোষাচ্ছে না।’
আরোও কিছুদিন এভাবে পড়ে থাকলে সবুজ উদ্ভিদ পুরোপুরিভাবে গিলে নেবে একে। সোর্স: লেখিকা

‘কে বানিয়েছিল বাড়িটা? আপনার পূর্বপুরুষ?’
‘হ্যাঁ, আমার বাবার দাদা।’
‘মানে আপনার প্রপিতামহ।’
‘হ্যাঁ, আমার প্রপিতামহ বানিয়েছিলেন এই বাড়ি।’
‘তার নাম কী ছিল?’
‘উদ্দব চন্দ্র সাহা।’
আমি সাথে সাথে নামটা নোটপ্যাডে লিখে লোকটাকে নামের বানানটা দেখিয়েছি। কথাবার্তায় মনে হয়েছে, তিনি শিক্ষিত। এই এলাকার মানুষের মুখে মুখে নামটা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। একেকজন একেক নামে ডাকে। কেউ কুণ্ডু সাহার বাড়ি হিসেবে চেনে, কেউ চেনে সুদান সাহার বাড়ি হিসেবে। তবে এখানে আসার আগে একজন বৃদ্ধ লোককে বাড়িটার কথা জিজ্ঞেস করার পর তিনি যে নাম বলেছিলেন, তার শুদ্ধরূপ এই উদ্দব চন্দ্র সাহাই হবে। তাছাড়া কেউ নিশ্চয়ই নিজের প্রপিতামহের নাম ভুল বলবে না? আমরা আবার আলোচনায় চলে গেলাম। আমাদের আগ্রহ দেখেই হোক, কিংবা অন্য যে কারণেই, উদ্দব চন্দ্র সাহার বংশধর আমাদের সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলেন।
বারান্দা। সোর্স: লেখিকা

‘আচ্ছা, বাড়িটা যে ভাঙছেন, ভেতরে কী পাওয়া যাবে বলে মনে করেন?
‘কাঠ। এটা বানানোর সময় যেসব লোহাকাঠ ব্যবহার করা হয়েছে, আরোও ১০০ বছর গেলেও সেসব কাঠের কিচ্ছু হবে না।’
‘আর লোহার বীম নেই? আমি লক্ষ্মীপুরের দালালবাজার জমিদার বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম, বাড়ির ছাদ তৈরিতে লোহার বীম ব্যবহার করা হতো সেসময়ে। সেসব?’
‘হ্যাঁ, তখন তো রড ছিলো না, চুন-সুরকি, লোহাকাঠ আর লোহার বীম দিয়েই বাড়ি বানানো হতো।’
‘আচ্ছা, আপনি কি এই বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে জানেন?’
এখানে কেউ বেড়াতে এলে মনে হয় এসব কিছু কেউ জিজ্ঞেস করে না। মানুষটা প্রবল আগ্রহ নিয়ে বলতে শুরু করলেন-
‘একদিনের ব্যবসার লাভ দিয়ে এই বাড়ি বানানো হয়েছিল। আমার পূর্বপুরুষ পাটের ব্যবসা করতো। সে বছর পাটে প্রচুর লাভ হওয়ায় কেবল একদিনের লাভ দিয়ে বাড়িটা বানানো গিয়েছিল। এই যে লালচে ইটগুলো দেখছেন? এগুলোর আকার কিন্তু এখনকার সাধারণ ইটের মতো নয়। এই বাড়ির ইটের কাটিং কলকাতার। কলকাতা থেকে মিস্ত্রি আনিয়ে বাড়ি বানানো হয়েছিল। তখন তো আর কলকাতা আর এই নরসিংদী আলাদা ছিল না, একটা দেশেরই অংশ ছিলো পুরো বাংলা।
বারান্দার দেয়ালের অলঙ্করণ। সোর্স: লেখিকা

এই বাড়ির জমিদারের খুব প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিলো। এখান দিয়ে যাওয়ার সময় প্রজারা কখনো শব্দ করতো না। বাড়ির সামনে দিয়ে অবনত মস্তকে পা টিপে টিপে যেত। কারণ শব্দ হলেই সেটাকে বেয়াদবি হিসেবে দেখা হতো। আর প্রচণ্ড শাস্তি দেওয়া হতো।
প্রতিমাসে একবার একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হতো এখানে। সাতদিন ধরে সেই উৎসব চলতো। দেশের সেরা নাচিয়েদের আনা হতো, সার্কাস পার্টি আসতো, সাপের খেলা হতো, আরোও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো সেই অনুষ্ঠানে। এসব অনুষ্ঠানে প্রজাদের কোনো স্থান ছিলো না।’
একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে যেন হাঁপিয়ে গেল মানুষটা। তাকে দেখে মনেই হয় না, তার পূর্বপুরুষ এত অত্যাচারী ছিল। সময় আর সম্পদ বংশধরদের কত পরিবর্তনশীল করে ফেলে।
বললাম, ‘আপনি তো এসবের কিছু দেখেননি?’
‘নাহ। তবে আমি যখন ছোট ছিলাম তখনো আমাদের প্রচুর জায়গাজমি ছিল। আশেপাশের অনেক জায়গা আমাদের ছিল। অনেক বংশধর থাকায় ওসব ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেছে। বেশিরভাগ জায়গাই বিক্রি করে দিতে হয়েছে বিভিন্ন কারণে।
বারান্দার থামগুলোর অলঙ্করণ। সোর্স: লেখিকা

‘উদ্দব চন্দ্র সাহার ছিল সাত ছেলে। একজন উকিল। তিনি তার পরিবার আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ চলে গিয়েছিলেন। আমেরিকায় একজন চলে গিয়েছিলো। বাকিরাও একেকজন একেক জায়গায়। এখানে কেবল আমার বাবা ছিল, আর আমার এক ফুপু। ফুপুর বাড়ি কাছেই। অনেক হাত পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত এই বাড়ি আমার হাতে এসে পড়েছে।’
লোকটার সাথে আরোও অনেকক্ষণ কথা হলো। তিনিই বাড়ির সামনের ছোট্ট মন্দিরটা দেখালেন। তিনি না বললে আমি বুঝতামই না এটা জমিদার বাড়ির মন্দির। জমিদার বাড়ির মন্দিরের এতো জীর্ণদশা কেন, প্রশ্নটা মুখের ভেতর নড়লে-চড়লেও, মুখ ফুটে আর জিজ্ঞেস করিনি।
এত কথা বললাম যার সাথে, তার নামটাই জানা হয়নি মনের ভুলে। অনেক পরে এসে মনে পড়েছে, আহহা! নামটাই জিজ্ঞেস করলাম না!
জমিদার বাড়ি থেকে বাইরের সবুজের জঙ্গল। সোর্স: লেখিকা

এখান থেকে বেরিয়ে ডাঙ্গা বাজার যেতে হবে পাঁচদোনা ফেরার জন্য। কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছিলাম না। দুইটা রিকশা যাচ্ছিল, একজন করে যাত্রী। একজন রিকশাওয়ালা নিজ থেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনারা কই যাবেন? ডাঙ্গা?’
আমরা মাথা ঝাঁকাতেই, তিনি অন্য রিকশাওয়ালাকে ডেকে নিজের যাত্রীকে দেখিয়ে বললেন, ‘আপনে ইনারে নিয়া যান, আমি ইনাদের নিয়া যাই।’
অন্য রিকশাচালক কোনো দ্বিমত না করে রাজি হয়ে গেল। দুই রিকশাচালক আর দুই আরোহী, চারজনের সৌজন্যতায় মুগ্ধ হলাম, মন থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ডাঙ্গার এই জমিদারবাড়ির গ্রাম থেকে বেরিয়ে গেলাম।
বাড়ির সামনের জীর্ণশীর্ণ মন্দির। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে ডাঙ্গা আসার তিনটি রাস্তা আছে।
ঢাকার গুলিস্তান থেকে আসতে হলে গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে থেকে মেঘালয় লাক্সারী, মেঘালয়, বিআরটিসি, সোহাগ বাসে পাঁচদোনা। বাসে মাধবদীর টিকিট কাটবেন। মূলত মাধবদীর টিকিটে আপনি পাঁচদোনা মোড় নামতে পারবেন। অবশ্যই বাস সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন পাঁচদোনা মোড় নামায়।
পাঁচদোনা মোড় নেমে যে কাউকে বললেই আপনাকে ডাঙ্গা সিএনজি স্ট্যান্ড দেখিয়ে দিবে। এক সিএনজিতে সর্বোচ্চ পাঁচ জন। ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। ডাঙ্গা পৌঁছাতে সময় লাগবে ৪০-৪৫ মিনিট।

ছোটো একটা মজা পুকুর। সোর্স: লেখিকা

মহাখালী বনানী উত্তরা থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে ৩০০ ফিট দিয়ে কাঞ্চন ব্রিজ পেরিয়েই মায়ার বাড়ি মোড়ে নামবেন। মোড়েই ডাঙ্গা আসার জন্যে চার্জের অটোগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। জন প্রতি ভাড়া দিয়ে অথবা রিজার্ভও নিয়ে আসতে পারবেন।
যারা টংগী ও আবদুল্লাহপুর থেকে আসবেন তারা সরাসরি বাসে অথবা লেগুনায় কালিগঞ্জ চলে আসবেন। কালিগঞ্জ নদীর ঘাটে এসে নৌকায় নদী পার হয়ে এই পারে আসবেন। না চিনলে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবেন যে ডাঙ্গা যেতে কোন ঘাট দিয়ে পার হবেন। নদী পেরিয়ে ডাঙ্গা আসার সরাসরি রিক্সা, অটো ও সিএনজি পাবেন। ঘাট থেকে ডাঙ্গা বাজার মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার।
পুরনো বাড়ি মানেই বৃক্ষের প্রভাব। সোর্স: লেখিকা

ডাঙ্গা বাজার নেমে রিক্সায় যেতে পারবেন উদ্দব সাহার বাড়ি। ডাঙ্গা বাজার থেকে এক কিলোমিটার দূরত্ব। ভাড়া ২০ টাকা। সমস্যা হলে কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন। ডাঙ্গায় এলে একই জায়গায় তিনটি জমিদার বাড়ি দেখতে পারবেন। ক্রমান্বয়ে লক্ষ্মণ সাহা ও তার ছেলেদের বাড়ি, মঠ, পুকুর দেখে নিয়ে উদ্দব সাহার বাড়ি গেলে ভালো হয়। লক্ষ্মণ সাহার বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটাপথ পরেই উদ্দব সাহার বাড়ি।
যেখানেই বেড়াতে যান, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক ট্রেইলে দুই ঝর্ণা: হামহাম ও সিতাপ ঝর্ণা

বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ