উদয়পুর: লেক এবং প্রাসাদের নগরী

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। সেই দেশ ভ্রমণে গেলে একই সাথে মরুভূমির উষ্ণতা, মেরু অঞ্চলের ঠাণ্ডা আবার আমাদের দেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, সবই পাওয়া যায়। তাই আমাদের মতো ভ্রমণ রসিক বলেন কিংবা ভ্রমণ পাগলই বলেন, বন্ধুবান্ধব মিলে প্ল্যান করে ভারতে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছার কমতি নেই একটুও। আর  ভ্রমণের রুটও প্রায় মুখস্থ সবার। বাজেট বেশি হলে মানালি-কাশ্মির, মাঝারি হলে দিল্লী-রাজস্থান আর কম হলেও কলকাতা কিংবা মেঘালয়। (এর ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই। উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে কমন এই তিনটি রুটের কথা উল্লেখ করা।)

রাজস্থানে যাওয়ার প্ল্যান করলে মূলত আমরা কোথায় যাই? জয়পুরে নিশ্চয়ই, মরুভূমির মতো ঠাণ্ডা রাত দেখা যায় কিংবা যোধপুরের মেহরানগড় প্রাসাদ দেখা। অথচ রাজস্থানে রয়েছে আরো কত জায়গা যেগুলো আমাদের বলতে গেলে ঠিকমতো না জানার কারণে ঘুরতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়াই হয় না! যেমন ধরুন, পুসকার, আজমির, আলওয়ার কিংবা উদয়পুর।

তাই আজকে বলবো পর্যটকদের কাছে রাজস্থানের সবচেয়ে কম পরিচিত জায়গাগুলোর মধ্যে একটা, হৃদ ও প্রাসাদের নগরী উদয়পুরের গল্প।

হৃদ ও প্রাসাদের নগরী উদয়পুর  ; ছবিসূত্র: Scoopwhoop.com

আজ আমি মূলত লিখছি যে ৮টি কারণে আপনাকে দিল্লী-রাজস্থান ট্যুর প্ল্যানে উদয়পুরকে রাখতেই হবে! উপেক্ষা করা যাবে না কোনোভাবেই!

১. কম দূরত্ব – কম সময়

রাজধানী দিল্লী থেকে রাতে বাস বা ট্রেনে উঠে সকালেই পোঁছে যেতে পারবেন উদয়পুরে। ট্রেনে সময় লাগবে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা, বাসে করে গেলে আরো কম। দূরত্ব কম হওয়ায় খরচটাও বেড়ে যাচ্ছে না আবার সময়টাও বেঁচে যায়। এই বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন সেখানকার আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলো থেকেও।

উদয়পুরে ট্রেনে করে আসতে সময় লাগবে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা, বাসে করে গেলে আরো কম। ছবি সূত্র: IndiaRailInfo

২. থাকার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত সুব্যবস্থা

সাধারণ নানারকম হোটেলের মধ্য থেকে মনের মতো হোটেল বাছাইয়ের সুবিধা রয়েছে। একই সাথে ‘বুটিক হোটেল’ এরও খোঁজ পাওয়া যায় এখানে। বুটিক হোটেল হচ্ছে মূলত ছোট পরিসরে (কিন্তু ১০০ রুমের মধ্যে) কিন্তু বেশ পরিপাটি কোনো হোটেল যেখানে স্থানীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতির ছাপে হোটেল সাজানো হয়ে থাকে।

উদয়পুরে রয়েছে মনের মত হোটেল বাছাইয়ের সুবিধা। ছবি সূত্র: udaikothi

আপনি আপনার পছন্দ মত এবং সামর্থ্য অনুযায়ী হোটেল বাছাই করে নিতে পারেন ভারতের প্রথম ব্যাকপ্যাকার্স হোটেল চেইন Zostel থেকে কিংবা Bonfire হোটেল থেকে। এছাড়াও আপনি যদি কিছুটা সৌখিন হয়ে থাকেন এবং পুরনো দিনের বাড়িঘরে থাকতে চান তাহলে সেই ব্যবস্থাও আছে এখানে।

প্রাসাদসম পুরনো বাড়িঘরগুলো সংস্কার করে এখানে হোটেল হিসেবে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। এতে করে আপনার কেবল পুরনো দিনের বাড়িঘর দেখার ইচ্ছাই মেটে না, সেখানে থাকার মতো রোমাঞ্চকর সুযোগও মেলে।

Zostel এর অন্তর্ভুক্ত একটি হোটেল রুমের অভ্যন্তরভাগ।  ছবি সূত্র: Zostel

৩. সিটি প্যালেস: উদয়পুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাসাদ

এই প্রাসাদের কাঁচের কাজ থেকে শুরু করে পাথরের কাজ, মোটিফ কিংবা দেয়ালে ঝুলতে থাকা শত শত বছরের পুরনো পেইন্টিংস এবং পুরনো দিনের নানারকম জিনিসপত্রের সংগ্রহশালা মুগ্ধ করে রাখবে যেকোনো পর্যটককেই! আপনার নিজের মধ্যে থাকা শিল্পী সত্তার জাগরণও ফুটে উঠবে এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ আর পুরনো দিনের সংগ্রহশালার মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে।

উদয়পুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাসাদ, সিটি প্যালেস;  ছবিসূত্র: Picquery.com

এই সিটি প্যালেস কমপ্লেক্সের মধ্যেই রয়েছে ‘পালকি খানা’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট। খোলা আকাশের নিচে বসে সিটি প্যালেসের নজরকাড়া ভিউও পাবেন সেখান থেকে। বিকেল বেলার হালকা নাস্তার সাথে প্রাসাদের কারুকাজময় ফটকও দেখতে পারেন আবার চাইলে সেখানে জড়ো হওয়া মানুষজনের সাথে জুড়ে দিতে পারেন জম্পেশ আড্ডাও। সব মিলিয়ে বেশ ইউরোপীয় একটা ভাব আছে!

‘পালকি খানা’য় ইউরোপিয়ান স্টাইলে বিকেলবেলার রিল্যাক্স সময় কাটানো ; ছবিসূত্র: visittnt.com

৪. সত্যিকারের রাজস্থানী খাবারের স্বাদ

ঘুরতে এসে অনেকেই সেই এলাকার স্থানীয় খাবার খেতে বেশ পছন্দ করেন। নিদেনপক্ষে একটু চেখে দেখার জন্যে হলেও চাই। সেখানে রাজস্থানী খাবারের সুনাম তো সবখানেই! কিন্তু আপনি সব জায়গায় স্থানীয় খাবারের আসল স্বাদ পাবেন না। কারণ স্থানীয় লোকদের হাতের রান্না ছাড়া স্থানীয় খাবারের মজাটা আসবে কেমন করে! উদয়পুরে তাই সেই ব্যবস্থাও আছে।

এখানে স্থানীয়রাই ছোট পরিসরে তাদের ঘরবাড়ির সামনে বসিয়েছেন একেকটা রেস্তোরাঁ। সেখান থেকে চাইলেই পেতে পারেনডাল বাটি চুর্মা  অথবা গাট্টে কি সাবজি  নামক নানা রকম মজাদার স্থানীয় খাবার।

মজাদার রাজস্থানী খাবার ডাল বাটি চুর্মা ; ছবিসূত্র: Shalini’s Kitchen/Youtube

৫. রাজস্থানী সংস্কৃতির সাথে পরিচয়

পিচোলা লেকের গাঙ্গোরি ঘাটের তীরে বাগোরে কি হাভেলি  নামক পুরনো প্রাসাদসম বাড়ি, এটি এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ধারোহার  নামক লোকনৃত্য এবং পুতুল নাচের শো দেখার মাধ্যমে রাজস্থানী শিল্প-সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক নতুন সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবেন নিঃসন্দেহে।

বাগোরি কি  হাভেলিতে ধারোহার  নামক লোকনৃত্য ; ছবিসুত্র: Scoopwhoop.com

আবার, প্রতিদিন সন্ধ্যায় সিটি প্যালেসের অভ্যন্তরে লিগ্যাসি অফ অনার  নামে আলো আর শব্দের এক বিশেষ শো সেখানে অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে রাজস্থানী মেওয়ার রাজপরিবারের অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মৃতি রোমন্থনে সামিল হবেন আপনিও।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সিটি প্যালেসের অভ্যন্তরে আলো আর শব্দের এক বিশেষ শো ‘লিগ্যাসি অফ অনার’  ; ছবিসূত্র: visittnt.com

৬. আশেপাশের আরো দর্শনীয় জায়গাগুলোও ঘুরে দেখার সুযোগ

আপনি চাইলে ক্যাবল কারে চড়ে ঘুরে আসতে পারেন কারনি মাতা মন্দির থেকে। এক পাহাড় চূড়ায় মন্দিরটির অবস্থান। মজার ব্যাপার হলো, এই মন্দিরে নিয়মিত দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে পোষা হয় বেশ কিছু ইঁদুর।

মন্দিরের সম্মুখভাগ থেকে বিস্তৃত লেকের পাশে ছড়িয়ে থাকা পুরো শহরটাও ফুটে উঠবে আপনার চোখের সামনে।

কারনি মাতা মন্দিরের সম্মুখভাগ ; ছবিসূত্র: Theplanetd.com

অথবা, যেতে পারেন সুবিশাল সাজ্জান গড় প্রাসাদেও। এটি ‘মুনসুন প্যালেস’ হিসেবেও প্রসিদ্ধ। জেমস বন্ড সিরিজের একটি ছবি Octopussy (1983)-এর একটি সিকোয়েন্স শ্যুট হয়েছিল এই প্রাসাদে। তাছাড়াও এই প্রাসাদের ছাদ থেকেই পুরো উদয়পুর শহরটি দেখে ফেলা যায়। সারাদিন ঘুরে ক্লান্ত শরীরে প্রশান্তিদায়ক সূর্যাস্ত দেখার জন্যও আদর্শ জায়গা এই মুনসুন প্যালেস!

মনসুন প্যালেস হিসেবে প্রসিদ্ধ সাজ্জান গড় প্রাসাদ ; ছবিসূত্র: trawell.in

এগুলো ছাড়াও উদয়পুর থেকে মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টা দূরত্বে থাকা চিত্তরগড়, কুম্ভলগড় কিংবা হালদি ঘাটি থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। বিশেষ করে আপনি যদি আমার মতো ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়াতে একটু বেশী পছন্দ করেন কিংবা নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে খুবই পছন্দ করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চিত্তরগড় ; ছবিসূত্র: rajasthandirect.com

৭. সৌখিন জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্যে এরচেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না!

উদয়পুরে পাওয়া যায় ভারতের সবচেয়ে অসাধারণ জ্যাকেটগুলোর এক সমাহার। সেগুলোতে এমব্রয়ডারির কাজের পাশাপাশি কাঁচ বসানো জ্যাকেটও পাওয়া যায়। ঠিক যেন সত্তরের দশকের বলিউড সুপারস্টার! আপনি চাইলেও নিজেকে কেবল যেকোনো একটা জ্যাকেট কিনে সন্তুষ্ট করতে পারবেনই না!

উদয়পুরের স্থানীয় লোকজনের জ্যাকেটে সাজান নিজেকে ; ছবিসূত্র: scoopwhoop.com

৮. স্বচ্ছ পানির লেকের সমাহার

ফতেহ সাগর লেকের পাশের স্ট্রিট ফুডের সমাহার যেমন আপনাকে জিভে জল এনে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন খাবারের খোঁজ দিবে আবার সেই লেকের পাশে বসে কাটানো সন্ধ্যাটা মনে গেঁথে যেতে পারে সারা জীবন।

ফতেহ সাগর লেকের পাশের স্ট্রিট ফুডের সমাহার ; ছবিসূত্র: udaipurtimes

একই কথা খাটে পিচোলা লেকের বেলায়ও। হালকা খাবারদাবার নিয়ে বসে যাবেন এই লেকের পাশে। রিল্যাক্স করতে চাইলে সেখানে বসেই লেকের পানির ওপর এসে পড়া বাহারী আলোর সমাহার দেখেই কাটিয়ে দিতে পারবেন সারারাত।

পিচোলা লেকের পাশে বসেই কাটিয়ে দেওয়া যায় সারারাত ; ছবিসূত্র: zostel

আবার, রাতের বেলা পিচোলা লেক সংলগ্ন আম্ব্রাই রেস্তোরাঁ থেকে প্রাসাদের রাজকীয় ভিউ দেখে সেখান থেকে আর ফিরে যেতে ইচ্ছাই করবে না। 

আম্ব্রাই রেস্তোরাঁ থেকে প্রাসাদের রাজকীয় ভিউ দেখে সেখান থেকে আর ফিরে যেতে ইচ্ছাই করবে না ; ছবিসূত্র: sagmart.com

উদয়পুর ভ্রমণের পেছনে কারণ দর্শানো শেষ হলো। আসছে শীতে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ভারত ভ্রমণের সময় এতসব প্রাসাদ, লেক, খাবার কিংবা সৌখিন জ্যাকেট – যেকোনো কিছুর জন্য হলেও কিংবা সব বাদ দিয়ে চুপচাপ নিরিবিলি লেকের পাড়ে বসে স্নিগ্ধ বিকেল কিংবা শান্তিময় রাত্রি যাপনের জন্য হলেও উদয়পুরে নিশ্চয়ই অন্তত একবার যেতেই হয়!

ফিচার ছবি: Picquery.com

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. আমি family নিয়ে উদয়পুর য়েতে চাই December hotel adds কোন এলাকায় কমটাকায় ভালথাকা যাবে,or যদি কোন ভালো লোকে mobile number থাকে pls দিবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আলতাদীঘি: বাংলাদেশের লুকানো আভিজাত্য!

আশুরার ছুটিতে অনিন্দ্য সুন্দর তিনাপ সাইতার ভ্রমণ