উয়ারী-বটেশ্বর; ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় নগর সভ্যতা

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো সভ্যতা হলো সিন্ধু সভ্যতা। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নগর সভ্যতা। এই সমৃদ্ধ সভ্যতাটি ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে সিন্ধু সভ্যতার কোনো চিহ্ন পায়নি প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তবে সিন্ধু সভ্যতার এক হাজার বছর পর খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় আবার একটি নগর সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। এই সভ্যতাকে দ্বিতীয় নগর সভ্যতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই পর্যন্ত উপমহাদেশের প্রায় ৪১টি প্রত্নস্থানে দ্বিতীয় নগর সভ্যতার চিহ্ন আবিষ্কার হয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশের পুণ্ড্রনগর ওরফে মহাস্থানগড় এবং উয়ারী বটেশ্বর দ্বিতীয় নগর সভ্যতার নিদর্শন।

উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলের প্রত্নস্থল। সোর্স:লেখিকা

নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত দুইটি গ্রামের বর্তমান নাম উয়ারী এবং বটেশ্বর। সে সময়ে বর্তমান উয়ারী গ্রামের উত্তর দিকে ছিল কয়রা নদী। বর্তমানে মৃতপ্রায় নদীটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলত। কয়রা নদীটি সহ নরসিংদীর পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ ও আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে দুর্গনগরীর সন্ধান পাওয়া গেছে। মুদ্রাতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে যা ২,৩০০ বছরের পুরনো। তার মানে আড়াই হাজার বছরের পুরনো বাঙালি কেবলমাত্র কৃষিকাজই করেনি, দুর্গনগরীও তৈরি করেছিল। এই সভ্যতাটিতে নদীবন্দর ছিল।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সে বাণিজ্যকেন্দ্রে আসত ভিনদেশি বণিকেরা। কয়রা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও আড়িয়াল খাঁ নদীর মাধ্যমে সেসব বণিকরা এদেশে প্রবেশ করতো। ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো। প্রাচীন নগর সভ্যতার নিদর্শন স্বরূপ এখানে দুর্গপ্রাচীর, পরিখা, পাকা রাস্তা ও পার্শ্বরাস্তাসহ ইট-নির্মিত অনন্য স্থাপত্য কীর্তি পাওয়া গেছে। রোলেটেড মৃৎপাত্র ও স্যান্ডউইচ কাঁচের পুঁতির আবিষ্কার উয়ারী-বটেশ্বরকে ভূমধ্যসাগর এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করে। নবযুক্ত হাইটিন ব্রোঞ্জ নির্মিত পাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে উয়ারী-বটেশ্বরের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা বলে।
রেপ্লিকা গর্ত বসতি। সোর্স: লেখিকা

সমসাময়িককালে ভারতীয় উপমহাদেশের ১৬টি বিখ্যাত জনপদের নাম জানা গেলেও, উয়ারী-বটেশ্বরে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরটির নাম এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। মনে করা হচ্ছে, টলেমি বর্ণিত সৌনাগড়াই উয়ারী-বটেশ্বর। এই জনপদগুলো ছিল এক একটি পৃথক রাষ্ট্র। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দে মৌর্য আমল চলছিল। বর্তমান বাংলাদেশ অংশের ইতিহাস মৌর্য যুগের সম্রাট অশোকের সময় থেকে জানা যায়।
ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে ছিল গঙ্গাঋদ্ধি জাতির বাস। সেই সময়কার প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে গঙ্গাঋদ্ধি নামে একটি পরাক্রান্ত ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের কথা শোনা যায়। গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্রটি গঙ্গারিডি, গঙ্গারিডই, গঙ্গাহৃদি, গঙ্গাহৃদয়, গঙ্গারাঢ়, গঙ্গারাষ্ট্র প্রভৃতি নামেও পরিচিত। যে রাষ্ট্র গঙ্গা দ্বারা ঋদ্ধ বা সমৃদ্ধ সেই রাষ্ট্রই গঙ্গাঋদ্ধি, গঙ্গাহৃদি বা গঙ্গাহৃদয়। বিদেশি ভাষায় ঋদ্ধি হয়ে গেছে রিডি বা রিডই। নদীজল দ্বারা একটি অঞ্চল ঋদ্ধ হতেই পারে। কেননা, সভ্যতায় নদীর ভূমিকা অপরিসীম।
জানখারটেক বৌদ্ধ পদ্ম মন্দির। সোর্স: লেখিকা

ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় নগর সভ্যতাটি ধ্বংস হয়ে কালের পরিক্রমায় মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে উয়ারী বটেশ্বর অঞ্চলে জমি চাষ, গর্ত খনন প্রভৃতি গৃহস্থালি কাজে ভূমির মাটি উলট-পালট হয়। জমি-চাষ, পুকুর-খনন, বৃষ্টির কারণে ভূমির উপরিভাগের ক্ষয় প্রভৃতি কারণে প্রত্নবস্তুর প্রাপ্তি হয়েছিল দৈবাৎ।
১৯৩৩ সালে উয়ারী গ্রামে শ্রমিকরা মাটি খনন করার সময় একটি পাত্রে জমানো কিছু মুদ্রা পায়। মুহম্মদ হানিফ পাঠান নামে একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সেখান থেকে ২০-৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এগুলো ছিল বঙ্গদেশের এবং ভারতের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা। সেটিই ছিল উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রথম প্রচেষ্টা। তিনি তার ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠানকে এ সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। ১৯৫৫ সালে গ্রামের শ্রমিকরা দুটি লৌহপিণ্ড ফেলে যায়। ত্রিকোণাকার ও একমুখ চোখা ভারী লোহার পিণ্ডগুলো হাবিবুল্লাহ তার বাবাকে দেখালে তিনি অভিভূত হন। ১৯৫৬ সালে উয়ারী গ্রামে মাটি খননকালে হাবিবুল্লাহ পাঠান ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রার একটি ভাণ্ডার পান। সেখানে প্রায় চার হাজার মুদ্রা ছিল। ১৯৭৪ সালের পর তিনি এখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে প্রচুর প্রত্নবস্তু পান। তার এই জমাকৃত প্রত্নবস্তু জাদুঘরে জমা দিলে ২০০০ সালে এখানে খননকাজ শুরু হয়।
পুকুনিয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রক্রিয়া। সোর্স: লেখিকা

খননকাজ শুরু করার পর যা যা পাওয়া যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর ধারণা, উয়ারী-বটেশ্বর গ্রাম দুটির অধিকাংশ স্থানজুড়ে প্রাচীন বসতি ছিল। এই প্রত্নতত্ত্ব স্থাপত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও যথাযথ পরিকল্পনায় তৈরি। এই জায়গাটি সেসময়ে সৌনাগড়া নামে পরিচিত নগর সভ্যতাটির রাজধানী ছিল।
তাম্র-প্রস্তর যুগের নিদর্শন গর্ত-বসতিও আবিষ্কৃত হয়েছে এই উয়ারী-বটেশ্বরে। লালমাটির আদি মাটির মেঝে পুকুর বা বিল থেকে সংগৃহীত অনেকটা সাদা বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে লেপা। মূল গর্তের মধ্যে আরেকটি গর্ত রয়েছে যার মেঝে চুন-সুরকির তৈরি। সম্ভবত এটি ছিল শস্যাগার। গর্ত-বসতির পাশে একটি ‘ধাপ কূপ’ আবিষ্কৃত হয়েছে। ধাপ অংশে পাওয়া গেছে একটি খুঁটি পোতার গর্ত। এই গর্তের নিচে তিন কোপে কাটা একটি নারকেলের প্রায় অর্ধেক অংশ পাওয়া যায়। ছাই ভর্তি একটি চুলা পাওয়া গেছে গর্ত-বসতির পশ্চিম পাশে। চুলার মেঝেতে ছিল পাথর। ধারণা করা হয়, চুলা থেকে অধিকতর তাপ পাওয়ার জন্য পাথর ব্যবহার করা হতো। বাংলাদেশে এই ধরনের স্থাপত্য উয়ারী- বটেশ্বর ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায়নি। আবিষ্কৃত গর্ত-বসতিটি প্রায় ২ মিটার নিচে। বর্ষাকালে ভূগর্ভস্থ পানি উপরে ওঠায় বর্তমানে গর্ত-বসতিটি স্থায়ী সংরক্ষণের অভাবে অস্থায়ীভাবে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।
টঙ্গিরটেকের বৌদ্ধ মন্দির। সোর্স: লেখিকা

এছাড়াও ২০০৭-০৯ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ইটের একটি বিশেষ স্থাপত্য আবিষ্কৃত হয়। মাটির নিচে ১২ ফুট উচ্চতায় চারটি দেয়াল এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কাদামাটির গাঁথুনিতে স্থাপত্যটিতে বড় বড় ইট ব্যবহৃত হয়েছে। অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ইট বিছানো মেঝে। পোড়ামাটির টালি আবিস্কৃত হওয়ায় অনুমিত হয় এই স্থাপত্যটির ছাদ টালি দ্বারা আবৃত ছিল। কিন্তু দরজা, জানালা কিংবা নিচে নামার সিঁড়ি না থাকায় এর ব্যবহার জানা যায়নি। এটি কোন কাজে ব্যবহৃত হতো, তা গবেষণাধীন। তবে পোড়ামাটির একটি নব দৃষ্টিগোচর হওয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের স্থাপত্যটি বৌদ্ধদের কুণ্ড বা পুকুনিয়া বলে মনে হয়।
আশেপাশে পঞ্চাশটির মতো পুরনো জায়গা পাওয়া গেছে। পার্শ্ববর্তী গ্রাম যেমন-রাঙ্গারটেক, সোনারুতলা, কেন্দুয়া, মরজাল, চন্ডীপাড়া, পাটুলি, জয়মঙ্গল, হরিসাঙ্গন, যোশর, কুন্ডাপাড়া, গোদাশিয়া এবং আব্দুল্লানগরেও প্রাচীন বসতি চিহ্ন পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে স্বল্প-মূল্য পাথরের পুঁতি, কাঁচের পুঁতি, লৌহনির্মিত প্রত্নবস্তু, ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রাসহ আরও অনেক ধরনের প্রত্নবস্তু পাওয়া যায়। সম্প্রতি এক সীমিত আকারের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তুর সন্ধান মিলেছে। এগুলোর মধ্যে রুলেটেড মৃৎপাত্র, নবড মৃৎপাত্র, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, স্বল্প-মূল্য পাথরের পুঁতি, কাঁচের পুঁতি, পাথরের ফ্লেক, চিলতা এবং সার অংশ, লৌহবস্তু এবং লৌহ গলানোর ফলে তৈরি বল জাতীয় বস্তু, মাটির দেয়ালের অংশ এবং পোড়ানো কার্যক্রমের চিহ্ন খুবই গুরুত্ব বহন করে। এছাড়াও পাথর ও কাঠের হাতকুঠার, বাটালি, তীরের ফলক ইত্যাদি পাওয়া গেছে, যা প্রাগৈতিহাসিক বা প্রস্তর যুগের বলে ধারণা করা হয়।
জানখারটেকের বৌদ্ধ বিহারিকার রেপ্লিকা। সোর্স: লেখিকা

স্থানীয়ভাবে মন্দিরভিটা নামে পরিচিত ধুপিরটেক, কামরাব গ্রামে একটি ঢিবিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে অষ্টম শতকের বৌদ্ধ পদ্ম-মন্দির। মন্দিরের দেয়ালের গাঁথুনি কাদামাটির। এ পর্যন্ত বৌদ্ধ পদ্ম-মন্দিরটিতে দুটি নির্মাণ যুগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয় নির্মাণ যুগে তৈরি একটি বেদির কাছে আটটি পাঁপড়ি যুক্ত একটি পদ্ম অক্ষত আছে। মেঝেতে পাওয়া গেছে লাল ইটের আরোও সাতটি পদ্ম। পদ্মের উপস্থিতি মন্দিরটিকে পদ্ম-মন্দিরের মর্যাদা দেয়।
যোশর ইউনিয়নের জানখারটেক প্রত্নস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে বর্গাকৃতির বৌদ্ধ বিহারিকা। উত্তরদিকে একটি আধুনিক ঘর থাকায় বিহারের প্রবেশপথ শনাক্ত না করা গেলেও এতে ১৫টি ভিক্ষু কক্ষ শনাক্ত করা গিয়েছে। সোমপুর মহাবিহারে ভিক্ষু কক্ষ সংখ্যা ১৭৭ এবং শালবন বিহারে ১১৫টি। ভিক্ষু কক্ষের বিচারে মহাবিহার ও বিহার নামকরণ করা হয়। এতদিন মহাবিহার ও বিহারের নাম শুনলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম বিহারিকা পাওয়া গেল। কার্বন চৌদ্দ তারিখ পদ্ধতিতে এর সময়কাল ৬ষ্ঠ শতক।
মন্দিরভিটার বৌদ্ধ পদ্মমন্দিরের রেপ্লিকা। সোর্স: লেখিকা

উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত জিনিসগুলো, চুন সুরকির রাস্তা, ইট নির্মিত স্থাপত্য, দুর্গ- এর সবকিছুই বহন করে একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার পরিচয়। বর্তমানে সবগুলোই প্রত্ন স্থাপনা অস্থায়ীভাবে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে আমার মতো প্রাচীনতা-অন্বেষীদের জন্য উয়ারী গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে একটি উন্মুক্ত জাদুঘর। আশা করা যাচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে নরসিংদীর এই শিবপুর উপজেলা প্রত্ন-প্রেমী দর্শনার্থীদের জন্য স্বর্গ হয়ে উঠবে।
পুকুনিয়ার রেপ্লিকা। সোর্স: লেখিকা

তথ্যসূত্র:
১। উয়ারী গ্রামে স্থাপিত উন্মুক্ত জাদুঘর।
২। সরকার কর্তৃক পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্য বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কীভাবে করবেন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট?

কুয়েতের সেরা পাঁচটি দর্শনীয় স্থান