এক ট্রেইলে দুই ঝর্ণা: হামহাম ও সিতাপ ঝর্ণা

সামনেই শুরু হচ্ছে ভরা বর্ষাকাল। এই সময় ঝর্ণাগুলো পূর্ণ যৌবন ফিরে পাবে। আর যাদের পাহাড়-ঝর্ণার নেশা সিন্দাবাদের মত ঘাড়ে চেপে বসে আছে তারা বেড়িয়ে পড়বে ঝর্ণা দর্শনে।

শহুরে যান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে যারা একদিনের ট্যুর দিতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য হামহাম ট্রেইল সেরা। অল্পস্বল্প হাঁটাহাঁটির অভ্যাস থাকলে একসাথে দুই দু’টি সুন্দর ঝর্ণা দেখে আসা যায়।

হামহাম ঝর্ণা; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

দুই বছর ধরে হামহাম ঝর্ণায় যাওয়ার প্ল্যান করছিলাম। কিন্তু ব্যাটে-বলে মিলছিল না। এটা সেটাই বার বার আটকে যাচ্ছিলাম। গতবছর মে মাসে হুট করেই প্ল্যান করি। যেই কথা সেই কাজ। রাতের বাসে ফকিরাপুল থেকে রওনা দেই। যাওয়ার দিন রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়। রাস্তায় যানজট না থাকায় অনেক আগেই শ্রীমঙ্গল পৌঁছে যাই। অগত্যা সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। খিচুড়ি-ডিম দিয়ে নাস্তা শেষে জীপে করে কলাবন পাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে সবুজ গাছপালা যেন আরও সজীব হয়ে উঠেছে।
দু’পাশে সারি সারি চা বাগান দেখতে দেখতে সমরেশ মজুমদারের বইয়ে পড়া চায়ের বাগানের কথা মনে পড়ে গেল। চারদিকে সবুজের সমারোহ, মনে একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি নিয়ে আসে। চা বাগানের ভিতর দিয়ে সামনে এগোতেই নৈসর্গিক দৃশ্য যেন আরও মনোরম হয়ে উঠল।
ট্রেকিং এর আগে; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

ঘণ্টা দেড় পর পৌঁছে যাই কলাবন পাড়ায়। এখান থেকে গাইড নিয়ে হামহামের দিকে ট্রেকিং শুরু।
দু’ভাবে হামহাম ঝর্ণায় যাওয়া যায়। প্রথমত, ঝিরি ধরে যাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, পাহাড়ি রাস্তা ধরে। আমরা ঝিরি ধরেই যাই।
আকাশচুম্বী পাহাড়; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

যতই ঝিরি ধরে সামনের দিকে যাচ্ছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। দু’পাশে আকাশচুম্বী পাথুরে দেয়াল পথ রুদ্ধ করে রাখতে চাইছে। পাহাড়ের পাঁচিলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝিরির পানি। কোথাও হাঁটু সমান পানি আবার কোথাও বা কোমর সমান!
ঝিরি; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙে নির্জনতার। মোকামটিলার বাম পাশের ঝিরি ধরে কিছুক্ষণ হাঁটলে দেখা মিলেবে সিতাপ জলাশয়ের। চারদিক থেকে অনেকগুলো ঝিরি এসে মিলেছে এই জলাশয়ে। আর কিছুটা সামনে গেলে দেখা মিলবে সিতাপ ঝর্ণার।
অসম্ভব সুন্দর এই ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি এসে যেখানে পড়েছে, সেখানেই তৈরি হয়েছে জলাশয়ের। সিতাপের সৌন্দর্য দু’নয়ন ভরে উপভোগ করে হামহামের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করি।
সিতাপ ঝর্ণা; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

সিতাপ পুকুর থেকে সামনেই মোকামটিলা। জোঁকের রাজ্য বলা যায় এই টিলাকে। চিনা জোঁক থেকে টাইগার জোঁক সব রকম জোঁকের স্বর্গরাজ্য মোকামটিলা।
মোকামটিলা; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

ছোট ছোট কয়েকটি টিলা পার হলেই পড়বে ঝিরি। সেই ঝিরি ধরে ২/৩ ঘণ্টা হাঁটতে থাকলে দেখা মিলবে হামহাম ঝর্ণার।
হামহাম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গভীরে অবস্থিত একটি জলপ্রপাত বা ঝর্ণা। এই জলপ্রপাতটি হামহাম কিংবা হাম হাম বা চিতা ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি চিতা ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত, কেননা একসময় এই জঙ্গলে চিতা পাওয়া যেত।
হামহাম ঝর্ণা; ছবিঃ মাজহারুল জিয়ন

বর্ষাকালে প্রচণ্ড ব্যাপ্তিতে জলধারা গড়িয়ে পড়ে। দু’পাশে সবুজ অরণ্য ঝর্ণাকে দিয়েছে এক অনিন্দ্য রূপ! পাথুরে শক্ত দেয়াল বেয়ে আছড়ে পড়ছে স্বচ্ছ টলটলে জলধারা। নির্জন এবং পাহাড়ের প্রায় দেড়শ ফুট উপর থেকে কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে এর জলধারা।
সবুজে ঘেরা এই ঝর্ণা কিছুক্ষণের জন্য হলে আপনাকে বিমোহিত করে রাখবে। অসংখ্য ছবি আর ভিডিও করা শেষে, এবার ঝর্ণার পানিতে দেহমনকে সিক্ত করবার পালা।
পাহাড়ি পথ ধরে ফিরতে হয়। হামহাম সংলগ্ন রাজকান্দি বনাঞ্চলে দেখা যাবে সারি সারি কলাগাছ, জারুল ও কদম গাছ। এরই ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাবে বিভিন্ন রকম প্রজাপ্রতি। আরও আছে হনুমান ও বানর।
সকালের নাস্তার পর আর তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। তাই পাহাড়ে উঠতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে যাই। একটু পর পর জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ধপাস করে বসে পড়ি। পা যেন আর কোনোভাবেই চলতে চাইছে না।
তিন ঘণ্টা হাঁটার পর কলাবন পাড়ায় গিয়ে পৌঁছাই। সেখানেই আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাছের ঝিরি থেকে গোসল সেরে খেতে বসে যাই। আর খাওয়ার শেষে ডেজার্ট হিসেবে থাকে সিলেটের মিষ্টি আনারস। এবার ক্লান্ত শরীর আর তৃপ্ত মনে ঘরে ফিরার পালা।
বোল্ডারে বসে হামহাম দর্শন

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে সিলেট গামী যেকোনো বাসে উঠবেন। শ্যামলী, হানিফ, এনা সহ অনেক পরিবহণ যায়। এছাড়া ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল আসতে পারেন। শ্রীমঙ্গল থেকে জীপে করে কলাবন পাড়া। জীপ ভাড়া আপ-ডাউন ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা।

গাইড খরচ:

কলাবন পাড়া থেকে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে গাইড নিতে হবে। গাইড খরচ ৩০০-৫০০ টাকার মধ্যে।

থাকার ব্যবস্থা:

শুধু এই ট্রেইলে গেলে থাকার দরকার হয় না। যদি এই ট্রেইলের সাথে অন্য কোনো জায়গা যোগ করেন তাহলে থাকতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে শ্রীমঙ্গলে ভালো মানের কিছু হোটেল আছে। তাছাড়া মৌলভীবাজার গিয়ে থাকতে পারবেন।

খাওয়ার ব্যবস্থা:

সকালের নাস্তা শ্রীমঙ্গল থেকে সেরে নিতে হবে। দুপুরের খাওয়ার জন্য কলাবন পাড়ায় স্থানীয়দের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করা যাবে। আর সাথে অবশ্যই কিছু শুকনা খাবার রাখবেন।

সতর্কতা:

বর্ষাকাল মানেই জোঁকের উৎপাত। আর সিলেট মানেই জোঁকের উপদ্রব বেশি। তাই জোঁক থেকে বাঁচার জন্য ইনার নিয়ে যেতে একদম ভুলবেন না। লবন এবং ভ্যাসলিন সাথে রাখবেন।

অবশ্যই মনে রাখবেন:

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
ফিচার ইমেজ- মাজহারুল জিয়ন 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ার জামদানি পল্লীর গল্পকথন

উদ্দব চন্দ্র সাহার জমিদার বাড়ি ও তার বংশধরের সাথে কথোপকথন