অজানা এক দুর্গনগরীর টানে: মাচু পিচু ভ্রমণ কথন

মাচু পিচু নগরীর কথা আমরা কম বেশি সবাই জানি। এক সময়ের বিশ্বের সপ্তমাশ্চর্যের মধ্যে একটি ছিল মাচু পিচু। আন্দিয়ান পর্বতরাজি বেষ্টিত এই দুর্গনগরী পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কিছু নগরীর মধ্যে অন্যতম। বিশাল সব উপত্যকায় ঘেরা এই মাচু পিচু পর্যটন বিশ্বে এতই জনপ্রিয় যে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা প্রতিবছরই পাড়ি জমান মাচু পিচুর উদ্দেশ্যে। ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারীদের জন্য মাচু পিচু অনন্য এক স্থান, তাদের জন্য এই স্থান স্বর্গের চেয়ে কম কিছু না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালেও মাচু পিচুকে নিয়ে বিস্ময়ের পরিমাণে ঘাটতি পড়বে না এতটুকুও। বলা হয়, মাচু পিচু যত না বিস্ময়ে ভরপুর মনের অজান্তে চলে আসা প্রশ্নের উত্তর দেয় তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন তৈরী করে সে মনেরই অন্তরালে। মাচু পিচুতে গিয়ে দেখার মতো অনেক কিছু আছে যার অধিকাংশই হাতে সময় কম থাকলে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। তাই মাচু পিচুতে গিয়ে কোথায় কী দেখবেন তা নিয়েই আজকের আয়োজন। চলুন তাহলে এক নজরে দেখে নেয়া যাক মাচু পিচু ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।

১. দ্য সান গেট

দ্য সান গেট, ছবিঃ adventureswithinreach.com

পর্যটকদের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় মাচু পিচুর এই স্থানের নাম “দ্য সান গেট”। ধারণা করা হয়, এই নগরীর জীবনকালে সকল মানুষ এই সান গেট দিয়েই শহরে প্রবেশ এবং প্রস্থান করতেন। সমতল সিঁড়ি কাটা আছে এই ফটকে যাওয়ার রাস্তায়। পর্যটকদের জন্য এই সান গেটের মূল আকর্ষণ হলো এখান থেকে দেখা সকালের সূর্যোদয় যা স্থানীয়দের মতে এক কথায় অপার্থিব।

২. হুয়ায়না পিচু

হুয়ায়না পিচু, ছবিঃ ultimatechase.com

মাচু পিচুর উপর থেকে দৃশ্য দেখতে চাইলে, পাখির চোখে মাচু পিচু উপভোগ করতে চাইলে উঠে যেতে হবে হুয়ায়না পিচু নামক পর্বত চূড়ায়। মাচু পিচুর অসাধারণ সব দুর্গ নিয়ে গড়ে ওঠা প্রকাণ্ড শহরের বনসাই রূপ দেখতে হলে হুয়ায়না পিচু পর্বতই ভরসা। তেমন কোনো জটিল সক্ষমতা লাগে না এই পর্বত চড়তে। মাচু পিচু নগরীর ঠিক পেছনেই অবস্থিত হুয়ায়না পিচু যেখানটায় উঠতে গেলে অনুমতিপত্রের জন্য খরচ করা লাগবে অতিরিক্ত কিছু টাকা। কারণ অনুমতি ব্যতিত কাউকেই উঠতে দেয় না মাচু পিচু কর্তৃপক্ষ।

৩. ইনকা ব্রীজ

ইনকা ব্রীজ, ছবিঃ dreamstime.com

মাচু পিচু যাদের রাজ্য ছিল, যাদের ঠিকানা ছিল তাদেরকে বলা হয় ইনকা সম্প্রদায়। মাচু পিচুর পশ্চিমের এক উপত্যকা মুখের দিকে অবস্থিত এই ব্রীজটি তৈরী করা হয়েছিল ইনকান সৈন্যের গোপনীয় প্রবেশ পথ হিসেবে। এখন প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো ব্রীজ নেই, আছে পাথরের বিশাল ফোঁকড়ের উপর দুটি গাছের গুড়ি দেয়া ব্রীজ সদৃশ একটি পাটাতন। চারদিকের উপত্যকা আর ছোটখাট এই ব্রীজের অস্তিত্ব খারাপ লাগবে না একদমই।

৪. ওয়াচম্যান’স হাট

ওয়াচম্যান’স হাট, ছবিঃ machupicchutrek.net

মাচু পিচুতে প্রবেশকালেই মিলবে মেঘ, পাহাড় আর উচ্চতার কেন্দ্রবিন্দু “দ্য ওয়াচম্যান’স হাট”। পুরো মাচু পিচুর একটা অসাধারণ দৃশ্য চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে সেখানে। তাই মাচু পিচু শহরে প্রবেশকালে অবশ্যই ওয়াচম্যান’স হাটে যাওয়া উচিত, অন্যথায় হাতছাড়া হয়ে যাবে উপর থেকে দেখা মাচু পিচুর দুর্দান্ত সে দৃশ্য।

৫. দ্য ফিউনেরারি স্টোন

দ্য ফিউনেরারি স্টোন, ছবিঃ boletomachupicchu.com

ওয়াচম্যান’স হাটের ঠিক বাইরের অবস্থিত অস্বাভাবিকভাবে বলয়াকার এক পাথর যার স্থানীয় নাম “দ্য ফিউনেরারি স্টোন”। বহু বছর ধরে বহু গবেষক গবেষণা করছেন ঠিক কেন এই ফিউনেরারি স্টোন ব্যবহার করা হতো। অভিজ্ঞরা বলেন এটি আত্মাহুতির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো প্রাচীনকালে যার বর্তমান রূপ হিসেবে আমরা সিঁড়ি কাটা দ্য ফিউনেরারি স্টোনকে দেখি।

৬. টেম্পল অফ সান

টেম্পল অফ সান, ছবিঃ ytimg.com

মাচু পিচুর মূল ফোয়ারার ঠিক পরেই অবস্থিত এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান “টেম্পল অফ সান”। মাচু পিচুর সবচেয়ে দুর্দান্ত পাথরের কাজ হয়েছে এই টেম্পল অফ সানে। তৎকালীন সময়ে এই মন্দিরটি জ্যোর্তিবিজ্ঞান পর্ববেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মন্দিরের নিচতলার সিংহভাগে রয়েছে অনেক উপাসনালয় যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষ প্রার্থনা করে বেশ ভক্তি নিয়ে।

৭. রয়্যাল টম্ব- প্যালেস অফ দ্য প্রিন্সেস

রয়্যাল টম্ব, ছবিঃ blogspot.com

মাচু পিচুর রয়্যাল টম্ব বা রাজকীয় সমাধি, টেম্পল অফ সানের ঠিক পরেই অবস্থিত। মাচু পিচুর আবিষ্কারক হিরাম বিংহ্যাম বলেন এই সমাধিস্তম্ভের থেকে একটু বেরিয়ে আসলে দেখা যাবে আমেরিকান বিশ্বের সবচেয়ে দারুণ কিছু দেয়ালের সমারোহ। টেম্পল অফ সানের মতো এখানকার নিচতলাটিও উপসনালয়ে সাজানো। ভবনটি দেখতে অনেকটা গুহার মতো, তাই হিরাম বিংহ্যাম একে সমাধির সাথে তুলনা করেছেন যদিও এখানে কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি বা মৃতদেহ রাখা হয় না।

৮. দ্য ফাউন্টেইন্স

দ্য ফাউন্টেইন্স, ছবিঃ mountainguides.com

৭৫০ মিটার উঁচু পাথুরে চ্যানেলে গড়া এখানকার ফোয়ারাগুলো সর্বমোট ১৬টি ছোট ছোট ফোয়ারা নিয়ে গঠিত। ধারণা করা হয়, ফোয়ারাগুলো আত্মশুদ্ধি বা পাপমোচনের জন্য ব্যবহৃত হতো। যদিও এই তথ্যের সত্যতা কতখানি তা কেউ বলতে পারবে না।

৯. দ্য টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো

দ্য টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো, ছবিঃ pinterest

মাচু পিচুর রাজকীয় অংশ যে তিনটি ভবন দিয়ে গঠিত তার প্রথটি হলো একটি অনন্যসাধারণ মন্দির যার স্থানীয় নাম “দ্য টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো”। মাচু পিচুর আবিষ্কারক হিরাম বিংহ্যাম যখন “দ্য টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো” এর বর্ণনা দিয়েছিলেন তখন তিনি এই ভবনকে “বিশুদ্ধ ভবন” হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। অন্য দুটি ভবনের তুলনায় বেশ বড় পাথর দিয়ে গড়া হয়েছে দ্য টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো ভবনটি, এক একটি পাথরের ওজন প্রায় তিন টনেরও বেশি। ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে এর ভেতরে অবস্থিত তিনটি জানালার উপর ভিত্তি করে যার প্রতিটি একটি করে পাহাড়ের দিকে মুখ করে বানানো।
ফিচার ইমেজ- Pinterest

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চিলেদের সাথে ঘুরে আসুন লাদাখ ও মানালি

টাঙ্গুয়ার হাওর বিলাসে চিলেরা