রাঙামাটি শহরে পাহাড়িদের ঐতিহ্যময় উপহারের পসরা

সাগরে ভেসে বেড়ানো; source: whaleislandtours.com

রাঙামাটির তবলছড়িতে পাহাড়িদের বিপণীকেন্দ্র হতে পারে ঐতিহ্যময় উপহার সংগ্রহ করার স্থান। এই ভেবে রাঙামাটিতে পা রেখেই আদিবাসীদের মেলা খুঁজছিলাম। খোঁজ পাওয়া গেল আদিবাসী জাদুঘরের কেয়ারটেকারের কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আশেপাশে কোথাও আদিবাসীদের পোশাকের মেলা বসে কি না। উনি বলেছিলেন, ‘মেলা বসে, কিন্তু এখন চলছে না। পোস্ট অফিসে গেলে কিছু দোকানে আদিবাসীদের পোশাক পাবো।’

পোস্ট অফিস কীভাবে যাব, জিজ্ঞেস করতেই বলেছিল, রাস্তা পেরিয়ে ওপার থেকে সিএনজিতে করে যাওয়া যাবে।

আমরা রাস্তা পেরিয়ে হাত নেড়ে সিএনজি থামিয়ে, ওতে উঠে পড়লাম কিছু জিজ্ঞেস না করেই। সামনের স্টপেজটা ছিল ভেদভেদির বাজার। আমরা দুজন ছাড়া সিএনজির বাকি যাত্রীরা নেমে পড়লো ওখানে। সিএনজিওয়ালা জিজ্ঞেস করল, আপনারা কই যাবেন? উত্তর দিতেই কথায় পাহাড়ীদের টান নিয়ে বলল, আপনারা তো ওপাশ থেকে সিএনজিতে উঠবেন। পোস্ট অফিস পিছনে ফেলে এসেছি।

আদিবাসীমেলা; Image source : bdnews24.com

বুঝলাম না, আমরাই ভুল শুনেছি নাকি জাদুঘরের লোকটা ভুল ডিরেকশন দিয়েছিল। অবশ্য এক হিসেবে ভালোই হয়েছে। ভেদভেদির বাজারের কাছেই একটা গিরিখাত আছে, যেটা রাস্তা থেকে দেখা যায়। তাছাড়া আর্মি স্টেডিয়ামটাও হাঁটাপথ দূরত্বে। এক উসিলায় ওগুলো দেখা হবে, এই ভেবে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি রাস্তা, শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় হাঁটতে চমৎকার লাগছিল। গিরিখাতটার কাছে এসে দেখি, নিচে মানুষজনের বাড়ি রয়েছে। আর সেখানে যাওয়ার জন্য লম্বা সিঁড়িও বানিয়েছে। ইচ্ছে করলো, সিঁড়ি ধরে দৌড়ে নেমে যাই। কিন্তু শেওলা পড়ে পিচ্ছিল হয়ে আছে সিঁড়িগুলো। এক পা এক পা করে নিচে নামতে হচ্ছে। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়েই একটা দোকান। ভাবলাম, ওখানে চা খাব। কিন্তু কয়েকটা ছবি তুলে ফিরে এলাম।

গিরিখাতের সিঁড়ি; Image source : মাদিহা মৌ

হাঁটতে হাঁটতে আর্মি স্টেডিয়ামের কাছে চলে এলাম। সৈনিকেরা ফুটবল খেলছে। সাধারণ জনগণের নিশ্চয়ই প্রবেশ নিষেধ। ঢোকার চেষ্টাতেই গেলাম না। স্টেডিয়ামটার ঠিক অপোজিটে একটা কাবাব হাউজ দেখলাম, বেশ আকর্ষণীয়। রেস্টুরেন্টের বাইরেই একটা ট্রি হাউজ আছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হলো ওখানে বসে খাওয়াও যাবে। কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ট্রি হাউজটায় বসে খাওয়া যাবে?’

ওরা বলল, ‘ন্যুনতম আট জন না হলে ওটায় উঠতে দেওয়া হয় না। আর ওটা এখনো চালুও হয়নি। পার্টির বুকিং নেওয়ার জন্যই ওটা বানানো হয়েছে। কাজ শেষ হয়নি এখনো। আপনার নিচেই বসতে পারেন। ওখানেও ভালো লাগবে।’

রেস্টুরেন্টে; Image source : শিহান

সত্যিই তাই। ডেকোরেশন খুব চমৎকার। মাচার মতো প্লাটফরম। ওতে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে দেওয়া। আলোটা চমৎকার। খাবারের দাম স্বাভাবিক। আমরা চিকেন চাপ, বিফ চাপ আর পরোটা অর্ডার করলাম। খেয়ে বের হয়ে একজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পোস্ট অফিস কীভাবে যাব?’ উনি বললেন, ‘রাস্তা পার হয়ে সিএনজিতে করে চলে যান। পাঁচটাকা ভাড়া নেবে।’

তাই গেলাম। কয়েকটা কাপড়ের দোকান দেখে ওতে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা বলল, ‘তবলছড়িতে চলে যান। ওখানে পাহাড়িদের মার্কেট আছে। ১২ টাকা সিএনজি ভাড়া নেবে।’

সিএনজিতে উঠে বসতে বসতে খেয়াল করলাম, এখানকার মানুষ দূরত্ব মাপে সিএনজি ভাড়া অনুসারে।

দোয়েল চত্বর পেরিয়ে আরোও সামনে গেল সিএনজি। তবলছড়িতে যাওয়ার পর সিএনজিওয়ালা বলল, ভাড়া নাকি বিশ টাকা। যত বললাম, ভাড়া ১২ টাকা, মানলো না।

আদিবাসী বিপণী; Image source : মাদিহা মৌ

তবলছড়িতেই পেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই মার্কেট। রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসলে আপনি এখান থেকে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয়ভাবে তৈরি সামগ্রী কিনতে পারবেন। যেমন: গৃহস্থলীর কাজের জন্য বিভিন্ন হাতে তৈরি পণ্য, স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে বোনা কাপড় ইত্যাদি।

পাহাড়িদের অনেকগুলো মার্কেট এখানে। ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু কিনলাম। যেখানেই যাই, মনিহারি জিনিসে চোখ লেগে যায়। খুব লোভ হচ্ছিল আরোও অনেক কিছু কেনার। কিন্তু টাকা শেষ হয়ে গেল। ভাবলাম, ডাচ বাংলা বুথ থেকে টাকা তুলে নেব। কিন্তু খোঁজ নিয়ে শুনলাম, আশেপাশে কোথাও ডিবিবিএল বুথ নেই। অন্য ব্যাংকের বুথ আছে বনরূপায়। আবার সিএনজি চেপে বনরূপায় এলাম। উত্তরা ব্যাংকের বুথে কার্ড নিলো না। হাঁটতে হাঁটতে ইসলামি ব্যাংকের বুথে এলাম। ফলাফল শূন্য। ততক্ষণে ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে। কিন্তু টাকা তো লাগবেই।

আদিবাসী বিপণী; Image source : মাদিহা মৌ

আরও সামনে হেঁটে সোনালি ব্যাংকের বুথে গেলাম। ওটাতেও হলো না। ওখান থেকে বলল, ডিবিবিএলের কার্ড কোনো বুথ এক্সেপ্ট করে না। কাছেই নাকি ওদের এজেন্ট আছে। আবার হেঁটে সেখানে গেলাম। বলল, এজেন্ট বিকেল পাঁচটায় চলে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বন্ধুকে কল করে বললাম, বিকাশে টাকা পাঠাতে।

পাহাড়িরা তবলছড়িতে ঐতিহ্যময় উপহারের পসরা এমনভাবে সাজিয়ে বসেছিল যে, হাতে যা টাকা ছিল, তার সবটুকু খরচ করে কেনাকাটা করার লোভ সামলাতে পারিনি। একই ঘটনা ঘটতে পারে প্রতিটি ভ্রমণকারীর সাথেই। তাই সতর্ক করে দিচ্ছি, ঢাকায় প্রত্যেক মোড় ঘুরলেই ডিবিবিএলের বুথ থাকলেও, রাঙামাটিতে এটার কোনো এটিএম বুথ নেই!

কীভাবে যাবেন

রাঙ্গামাটিতে আপনি বিভিন্নভাবে পৌঁছাতে পারেন। রাঙ্গামাটিতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে হানিফ, ইউনিক, সাউদিয়া, এস আলম, শ্যামলী ইত্যাদি। ৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টায় আপনি ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে যাবেন। শ্যামলী পরিবহনের একটিমাত্র এসি বাস ছাড়া রাঙ্গামাটিতে কোনো এসি বাস চলাচল করে না।

চলছে কেনাকাটা; Image source : pahar24

এছাড়া আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বাসে যেতে পারেন এবং সেখান থেকে বাসে করে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছাতে পারেন। তবে, ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি রাঙ্গামাটিতে যাওয়াই সহজতর হবে।

Feature Image : pahar24

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাহাড় ট্রেকিংয়ে মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

ঈদের ছুটিতে মেঘ ছুঁতে যাই কালিম্পংয়ে