উচ্চতার স্বপ্ন ও চন্দ্রখনি পাসের ইতিবৃত্ত

চন্দ্রখনি পাস বেইসক্যাম্পে রাত নামার সাথে সাথেই ঠাণ্ডার প্রকোপ বাড়তে থাকল। প্রায় ১১ হাজার ফুট উপরে এই বেইস ক্যাম্পে আজ প্রথম দিন। পৌছানোর পরই অনেকের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। ক্যাম্পের বাইরে ট্রেকিং লিডার একজন ট্রেকারের সেবা করছে। সন্ধ্যার শেষ আলোয় দূরে দিও তিব্বার উজ্জ্বল শিখর দেখা যাচ্ছে।

টেন্টে ঢুকে টিম মেটদের সাথে খানিকক্ষণ গল্প করলাম। আজ ট্রেকিং ডিস্টেন্স কম ছিল কিন্তু ট্রেইল ছিল ভয়াবহ রকমের পিচ্ছিল। সারাদিন বেশ রোদ থাকায় বাকি ট্রেইলটুকু শুকিয়ে যাবার কথা। না হলে কাল বেশ বিপদেই পড়তে হবে। তাছাড়া স্নোফল হলে আরো বেশী বিপদ, কারণ আমার কাছে স্নোর উপর হাঁটার উপযোগী বুট ছিল না। 

চন্দ্রখনি বেইস ক্যাম্প সাইট। ছবি ঃ ইয়াশ চৌহান 

রাতের বেলা প্লানিং চলল রুটের। দুই-তিনটা রুট আছে চন্দ্রখনি পাসে ওঠার। তবে খুব একটা কঠিন হবে না সেটা আগে থেকেই ধারণা ছিল। ঘণ্টা দুয়েক ট্রেকিং করলেই পাসের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছানো যাবে। তাই রাত জেগে আড্ডা দিতে ভালোই লাগছিল। সকাল সকাল ঘুমালে আড্ডার রাতটাই বৃথা যেত।

কিন্তু আড্ডার ফাঁকেই আমার মাথা যন্ত্রনা শুরু হলো। আসলে এক্লিমাটাইজেশন ঠিকঠাকভাবে হয়নি বুঝতে পারছিলাম। আবারো নাপা এক্সটাই আমার শেষ ভরসা। রান্না করা হয়েছিল খিচুড়ি আর টুনা সসেজ। খাবার ভালো হলেও উচ্চতার সমস্যাগুলোর কারণেই ঠিকঠাক খেতে পারলাম না। তাই দেরি না করে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকলাম। জিপার টেনে গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়েছি মনে নেই।

তখন পাইনের সারি ছাড়াচ্ছি সবে। ছবি ঃ ইয়াশ চৌহান 

ভোর ৫টায় উঠে পড়লাম। খুব তাড়াহুড়ো করে সব কিছু প্যাক করে নেয়ার ফাঁকে রনি ভাই রান্না সেরে ফেললেন। পাহাড়ে এসে বাংলা কায়দায় নুডুলস রান্না করে সামনে দিতেই গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। দুজন বিদেশী ছিলেন, লুইন এবং স্টুয়ার্ট। ইংল্যান্ড থেকে এসেছেন ওনারা। এরকম শুকনো নুডুলস দেখে তারাও লোভ সামলাতে না পেরে যোগ দিলেন আমাদের সাথে। খেতে খেতে গল্প হলো তাদের সাথে।

রনি ভাইয়ের নুডুলসের তারিফ করতে হয়। পাহাড়ে এসে স্যুপ নুডুলস খেতে খেতে জিহ্বায় যেন কড়া পড়ে গিয়েছে সকলের। এটা খেয়ে বেশ চাঙা হয়ে সকলে উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। সবুজ বন ছাড়িয়ে তখন মেঘের দিকে এগোচ্ছি।

এই রিজ লাইনে সারাজীবন হাঁটতে ইচ্ছে হয়।। ছবি ঃ ইয়াশ চৌহান 

পেছনে পাইনের ঘন জঙ্গল ছাড়াতেই আমরা রিজ লাইনে এসে পড়লাম। আমি সারা জীবন স্বপ্ন দেখে এসেছি একটা বিশাল লম্বা পাহাড়ের রিজ লাইন ধরে সারাদিন হাঁটব। আজ সেই স্বপ্ন যেন পূরণ হতে শুরু করেছে। চারপাশে উঁচু নিচু অনেক পাহাড়ের উপরে উঠে গিয়েছি ততক্ষণে। উচ্চতা বেশী হলেও শরীর ভালো ছিল। নিঃশ্বাস নিতে মাঝে মাঝে একটু কষ্ট হচ্ছিল তবুও সবুজ মাঠের মধ্যে দিয়ে কখনো পাহাড় বেয়ে, কখনো মেঘের মধ্যে দিয়ে হাঁটার আনন্দের কাছে অতটুকু খারাপ লাগা কিছুই মনে হয় না।

হাঁটতে এত ভালো লাগছিল যে হালকা কিছু খেয়ে নেবার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ট্রেক লিডার ইয়াশ চৌহান ডাক দিয়ে কিছু খেজুর আর দুইটা চকলেট দিয়ে সামনের দিকে চলে গেলেন।

ট্রেইলের পাশেই তিন হাজার ফুট খাঁদ। ছবিঃ ইয়াশ চৌহান 

যতটা সহজ ভেবেছিলাম ব্যাপারটা মোটেই সহজ ছিল না। বৃষ্টির জন্য পিচ্ছিল পাথর আর মেঘের মধ্যে দিয়ে হু হু শব্দের বাতাসের জন্য কষ্ট হচ্ছিল খুব। মাঝে মাঝে হোয়াইট আউট হয়ে একা পড়ে যাচ্ছিলাম। ইয়াশ ভাই ডেকে সবাইকে এক জায়গায় করলেন। এরপর লম্বা একটা রশি ধরিয়ে দিলেন সবার হাতে। সবার আগে থেকেই লিড দিচ্ছিলেন উনি।

ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পরও দেখলেম আরো ১ ঘন্টার পথ বাকি, দলের সবাই নিজেদের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি শুরু করলাম। এত সহজ ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম তাই। একটু পর হোয়াইট আউট কেটে গেলে আমরা আবার রশি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। সকাল ১১টার দিকে আমরা চন্দ্রখনি পাসের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছলাম

চন্দ্রখনি পাস। ছবিঃ ইয়াশ চৌহান 

জীবনে প্রথম বারের মতো হিমালয়ে ট্রেকিং করতে এসেছি। ৩,৬৬০ মিটার উপরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ উল্লাস করলাম সবাই মিলে। একটু দূরেই গাঢ় বরফ দেখতে পেয়ে ট্রেক লিডারকে বললাম চলেন ওখানে যাই। ইয়াশ ভাইয়া হেসে দিয়ে বললেন ওখানে যেতে প্রায় দুইদিন লাগে কারণ সামনে পাহাড়ের রিজলাইন শেষ।তাই মালানা গ্রাম ঘুরে যেতে হয় অন্য রুটে।

অবাক হয়ে দেখলাম আসলে সোজা তাকালে মনে হয় এই তো কাছেই। ১ ঘণ্টা লাগবে বড় জোর। চন্দ্রখনি পাস থেকে মাউন্ট দিও তিব্বা বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। আমার কাছে কোনো ক্যামেরা বা ক্যামেরা যুক্ত ফোন ছিল না।  তাই অন্যের তোলা ছবির জন্য তাগাদা দিয়ে ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

মালানা ভিলেজ থেকে ফেরার দিন। ছবিঃ তাউস খান 

চন্দ্রখনি পাস থেকে মালানা গ্রামে পৌঁছাতে প্রায় ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এই পথটুকু আরো বেশী কঠিন মনে হচ্ছিল আমার কাছে। তবে ট্রেকিংয়ের সময় উঁচু থেকে চারদিকের দানবের মতো সব পাহাড়গুলো দেখতে দেখতে সেই ভয়াবহ ট্রেইল বা শারীরিক ক্লান্তির কিছু বোঝা যায় না। দুপুরের পর হালকা খাবার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের কাছে। আর দিনে প্রায় ৬ ঘণ্টা ট্রেকিং করার পর গ্রামের অর্ধেক পথ এসেই ক্লান্তি ঘিরে ধরল আমায়।

মনে হচ্ছিল এখানেই যদি শুয়ে পড়তে পারতাম। অন্যদিকে দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের রহস্যময় লুকানো মালানা গ্রামটি। যখন মালানায় পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে হিমালয়ে বুকে। এখান থেকে বাড়ি ফেরার জন্য পাড়ি দিতে হবে আরো প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার পথ।  

রুট ও খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে দিল্লি বা চণ্ডীগড় পর্যন্ত ট্রেনে আসা যাবে। খরচ পড়বে ৬৮০-৩,২০০ রুপি পর্যন্ত। এখান থেকে বাসে করে কুল্লু অথবা মানালি চলে আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ৬৫০ থেকে ১,২০০ রুপি। মানালি বা কুল্লুতে এসে হোটেলে থাকতে হবে। খরচ পড়বে ৩০০ – ২,০০০ রুপি পর্যন্ত। কুল্লু বা মানালি থেকে নগর এসে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। টোটাল ৫ দিন ট্রেকিংয়ের জন্য খরচ হবে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার রুপির মতো।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও অলস কলকাতায় বৃষ্টি বিলাস

রাজা টংকনাথের রাজবাড়ির আত্মকথন