নড়াইল বাধাঘাট ভ্রমণ: যার মায়ায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কয়েকদিনের ছুটি পাওয়ায় পরিকল্পনা করলাম নড়াইল যাব। বন্ধুবর অচিন্ত্য আসিফ নড়াইল শহরেই বাসা নিয়ে তার কাব্য আর সংগীত সাধনায় মগ্ন। একদিন কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিলাম যে সে নড়াইলেই আছে। কিন্তু আমি যে যাচ্ছি, তা বুঝতে দিলাম না।
তারপর বাসে চড়ে বসলাম খুলনা থেকে। রাস্তা বেশ সঙ্গিন তবে পথের দুধারের দৃশ্য ততোধিক মনোহর। তাই বাসের লোম ওঠা সিটে বসে ঝাঁকুনি খেতে খেতে আর দু’পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে নড়াইল পৌঁছাতে বেশি বেগ পেতে হলো না। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। নড়াইল নেমে ওকে ফোন দিলাম। ও তো হতভম্ব, সাথে খুশিও। তড়িঘড়ি ছুটে এলো।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তখন তাই বাসায় যাওয়াই স্থির হলো। তারপর পরের দিনের কর্মপরিকল্পনা স্থির করে আমরা দর্শন আর সাহিত্য আলোচনায় মন দিলাম। নাহ, স্বীকার করতেই হয় বন্ধু আমার তার জ্ঞান সাধনার চর্চা পুর্ণোদ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে- কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝে গেলাম।

চিত্রা নদী; ছবিঃ লেখক

কত রাতে ঘুমিয়েছিলাম, তা ঠিক জানা নেই। কিন্তু এলার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। চমকে উঠে লাফ দিয়ে বসলাম। কিন্তু আমার দার্শনিক বন্ধু তখনো নাক ডাকছে। ওকে জাগাতে গলদঘর্ম হতে হলো। তারপর ফ্রেশ হয়ে দুজনে বেরলাম। সুয্যি মামা পুব গগন থেকে উঁকি মারছে। চারপাশে সতেজ একটি ভাব। আমাদের প্রথম গন্তব্য নড়াইল বাধা ঘাট।
নড়াইল শহরের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান এই বাধা ঘাট। চিত্রা নদীর পাড়ে জমিদারদের হাতে নির্মিত এই বাধা ঘাটটি ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো। এটি রোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ঘাটের ওপরে রয়েছে ছাদ আর সেই ছাদকে ধরে রাখার জন্য আছে ২০টি কারুকার্যময় থাম, যেগুলোর প্রতিটি থাম ২০ ফুটের মতো উঁচু। জমিদার বাড়ির নারীদের ধর্মীয় বিভিন্ন পর্বের স্নানযাত্রার উদ্দেশ্যেই এই ঘাটটি নির্মিত হয়েছিল। তাছাড়া সেই সময়ে চলাচলের মূল মাধ্যম ছিল নদীপথ। জমিদারদের বজরা এই ঘাটেই ভিড়ত। বড় বড় জাহাজ আর নৌকা চিত্রার বুক চিরে গন্তব্যে ভেসে চলতো।
নিশনাথরতলা, ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

এছাড়া এই ঘাটের অদূরেই রয়েছে সীতারাম রাজার প্রতিষ্ঠিত হিন্দুদের পবিত্র ধাম নিশিনাথ তলা। এটি প্রায় চারশো বছরের পুরনো। এখানে অনুষ্ঠান উপলক্ষে দর্শনার্থী-ভক্তরা বাধা ঘাটে স্নান যাত্রা সম্পন্ন করতো। তখন জমজমাট হয়ে উঠত সমস্ত এলাকা। এখনো এখানে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মেলা বসে। তখন আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয় বাধা ঘাট। দেশ বরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতান স্মরণে আয়োজিত সুলতান মেলাও জমজমাট হয়ে ওঠে বাধা ঘাট।
এই ঘাটের সাথে বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত লেখক সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামও জড়িত। তিনি চাকরি করতেন খুলনা কালেক্টরেটে। নড়াইল তখন বর্ধিষ্ণু মহকুমা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার কর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে নৌকায় আসতেন নড়াইল মহকুমা শহরে। তার যাত্রাপথেই পড়তো এই বাধা ঘাট। বঙ্কিমচন্দ্র চিত্রা নদীতে তার বজরায় ভাসতে ভাসতে কারুকার্যময় ঘাটটি দেখতেন। নড়াইল জমিদারদের বিভিন্ন ইতিহাস আর ঘাটটির প্রতি তার একটি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। ধারণা করা হয় ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ গ্রন্থে নড়াইল জমিদারদের দুই শরিকের পারিবারিক বিবাদের ছায়া পড়েছে।
আমরা যখন বাধা ঘাটে পৌঁছালাম তখন দেখি কয়েকজন ঘাটে প্রভাত স্নান সারছে। আমরা ঘাটের এক জায়গায় গিয়ে বসলাম। এর মধ্যেই প্রবল শব্দ আর জলে আলোড়ন তুলে একটি ট্রলার এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল। সেটি খড় ভর্তি। সকালের সোনা রোদ পড়ে সেটি ঝলমল করে উঠলো।

আমাদের হঠাৎ ইচ্ছা হলো, আমরাও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো নদীর বুক থেকে বাধা ঘাটের সৌন্দর্য দেখব। সেই উদ্দেশ্যে চিত্রা খেয়াঘাটের দিকে রওনা দিলাম। ঘাট থেকে চারশো মিটারের মতো দূরে খেয়াঘাট। সেখানে গিয়ে দেখি এর মধ্যেই পরিশ্রমী মাঝিরা তাদের নৌকা নিয়ে হাজির হয়েছে সেখানে। আমরা তাদের মধ্যে একজনকে নিয়ে ভেসে পড়লাম বাধা ঘাটের উদ্দেশ্যে।
স্রোতের বেগে নৌকা ভেসে চলল। নড়াইল নিরিবিলি শহর। এখনো শহুরে যান্ত্রিকতা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেনি। নদীর দুপাশে এখনো তাই গাছপালার প্রাচুর্য। নদীর জলও স্বচ্ছ। সেই জলের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানার দল। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বাধা ঘাটে। ক্লাসিক যুগের স্থাপত্যের মতো তার অপূর্ব সুন্দর গাম্ভীর্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলো নড়াইল বাধা ঘাট। ঠিক এমনভাবে সে একদিন হাজির হয়েছিল সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সামনে।

খাবার:

নড়াইল নানারকম খাবারের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে নলেন গুড়ের সন্দেশ তুলনাহীন। তাছাড়া ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশে রয়েছে কয়েকটি শতাব্দী প্রাচীন মিষ্টির দোকান যারা যুগ যুগ ধরে সুনামের সাথে মিষ্টি তৈরি করছে।
এর মধ্যে রূপগঞ্জ বাজারের কার্তিক কুণ্ডুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং পরিতোষ ঘোষের মিষ্টি ভাণ্ডার বিখ্যাত। এদের দোকানের গুড়ের সন্দেশ, প্যাড়া সন্দেশ, চমচম, রাজভোগ, ছানার জিলাপি এবং খিরসা মিষ্টির নাম মনে উঠলে মিষ্টি পিয়াসুদের জিহ্বায় জল আসে। সুতরাং সেগুলো টেস্ট করতে কিন্তু ভুলবেন না।

কাত্তিক কুণ্ডুর মিষ্টির দোকান দেখে উল্লসিত আমার বন্ধু অচিন্ত্য আসিফ; ছবিঃ লেখক

কীভাবে যাবেন?

নড়াইলের সাথে রাজধানী ঢাকার সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে। নড়াইলে কোনো রেলস্টেশন নেই। তবে সড়কপথ যথেষ্ট উন্নত। ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে করে নড়াইলে পৌঁছাতে আপনার লাগবে প্রায় ৫ ঘণ্টা। নড়াইলে পৌঁছে আপনি রিকশা অথবা ভ্যানে কিংবা ইজি বাইকে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতে পারবেন। শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ইজি বাইকের সর্বোচ্চ ভাড়া দশ টাকা। সুতরাং সবকিছু ভালভাবে দেখার জন্য আপনি পায়ে হাঁটতেও পারেন।
ঢাকা থেকে নড়াইল পৌঁছাতে আপনার খরচ হবে-
১। হানিফ এন্টারপ্রাইজ
গাবতলি কাউন্টার, ফোন: ৮০১১৭৯
ভাড়া: ৩৫০ টাকা।
২। ঈগল পরিবহন
গাবতলি কাউন্টার, ফোন: ০৪৪৯৪৪১৩৬৭৩
ভাড়া: প্রায় ৩৫০ টাকা
৩। সাদ সুপার ডিলাক্স পরিবহন
গাবতলি কাউন্টার, ফোন: ০১৭২৭৫২১৪১৪
ভাড়া: প্রায় ৩১০ টাকা

কোথায় থাকবেন

নড়াইলে উন্নতমানের তেমন কোনো হোটেল নেই। যেগুলো আছে তার মধ্যে-
১। সম্রাট আবাসিক হোটেল
যোগাযোগ: ০১১৯৮০৫২৭৮৯
২। মডার্ন আবাসিক হোটেল
যোগাযোগ: ০১৯১৭৮৩৫০২৮
৩। সার্কিট হাউজ
যোগাযোগ: ০৪৮১-৬২২৬৮
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে ভারতের সেরা ১০টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা

যশোরের ভাটপাড়া: যে গ্রামের বয়স ২,০০০ বছরেরও বেশি