এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাশয়ে আট ঘণ্টা নৌভ্রমণের আদ্যোপান্ত

রাঙামাটিতে প্রথম ভোর দেখলাম কাপ্তাই লেকের ধারে বসে। সূর্যোদয় দেখলাম। গতদিনই নৌকাওয়ালাকে ১,৪০০ টাকায় রিজার্ভ করা হয়েছে। সারাদিনে আটটা জায়গার নাম লেখা আছে। ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝর্ণা, জেলা প্রশাসক বাংলো, পেদা টিং টিং, জুমঘর, টুকটুক ইকো ভিলেজ, রাজবন বিহার, ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজার রাজবাড়ি।

নৌকায় ওঠার আগে দোয়েল চত্বরের একটা হোটেল থেকে নাস্তা নিতে গেল শিহান। আমি পাশের দোকানটায় গেলাম পানির বোতল কিনতে। গিয়ে দেখি, একটা বোলে নারকেলের পুরের পাটিসাপটা সাজানো আছে। কী মনে হতে ওখান থেকে চারটা পাটিসাপটাও নিয়ে নিলাম। আট টাকা করে প্রতি পিস।

ইঞ্জিনচালিত রিজার্ভ বোট বাঁধা আছে কাপ্তাই লেকে। মাঝি বললো আটটা জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে। আগেই বলেছি কার্ডেও আটটা জায়গার কথাই লেখা আছে।

রাজবন বিহার। সোর্স: শিহান

নৌকা চালু হতেই ইঞ্জিনের বিকট শব্দ শুরু হলো। শব্দ উপেক্ষা করে ছইয়ের মধ্যে বসে নাস্তা করে নিলাম। খাওয়া শেষ করেই দুজনে ছইয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসলাম। সকালের ফিনফিনে পাতলা একটা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে মুখে। কিছুক্ষণ নৌকাভ্রমণের পর নৌকা যে ঘাটে এসে ভিড়লো, সেটি রাজবন বিহার।

রাজবন বিহার নামার সময় বোটম্যান বলে দিল, এখানে যেন আধঘণ্টার বেশি সময় না কাটাই। কারণ আমাদের অনেকদূর যেতে হবে। বিহার ঘুরে বেরিয়ে এলাম আধঘন্টার মধ্যেই। বিহারের কাছেই চাকমা রাজার বাড়ি। দুই মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। রাজার বাড়িও ঘুরে এলাম আধঘণ্টার মধ্যে।

কাপ্তাই হ্রদ। সোর্স: অফরোড বাংলাদেশ

রাজার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এবারে এগুচ্ছি ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে। ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য অনেকটা সময় নৌকাভ্রমণ করা হলো। এর মধ্যে আমাদের বোটম্যান দুটো চেয়ার নিয়ে এলো তার বাড়ির কাছে নৌকা থামিয়ে।

আমরা যতোই বললাম, লাগবে না। ছইয়ের উপর বেশ আছি, সে মানলো না। কিছুক্ষণ পর নাকি রোদের তেজের জন্য উপরে থাকাই যাবে না! আমরা তখন পড়েছিলাম উভয় সঙ্কটে। উপরে প্রচণ্ড রোদ, আর নিচে ট্রলারের মেশিনের ঘটঘট শব্দ।

একটা ছাতার অভাব বোধ করছিলাম প্রচণ্ডভাবে। ঝুলন্ত ব্রীজে আসার পথেই দেখলাম ডিসির বাংলো। পানি থেকে যে অংশটা দেখলাম, দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল। এই জায়গাটার নাম “কোচপানা”। পানির উপরে শেড দেওয়া চা পানের জায়গা। পাথরের একটা গোল টেবিল আর ওটার চারপাশে সাজানো চেয়ার। মূল বাংলো থেকে জায়গাটি বিচ্ছিন্ন।

সংযুক্ত করা হয়েছে একটি লম্বা ব্রিজ দিয়ে। ব্রিজটিও নান্দনিক। ভাবছি, পূর্নিমা রাতে এখানে আয়েশ করে বসে কাপ্তাই লেকের স্বর্গীয় রূপ দেখতে কী দারুণই না লাগবে! প্রথমবারের মতো মনে হলো, আহা আমি যদি ডিসি হতাম!

ডিসির বাংলো। সোর্স: লেখিকা

ডিসির বাংলোয় যেতে চাইলাম। বোটম্যানকে আমার ইচ্ছের কথা জানাতেই উনি বললেন, ‘ডিসির বাংলোয় ঢুকতে অনুমতি লাগে।’ ঝপ করে মন খারাপ হয়ে গেল। কী আর করা, পানি থেকে টপ করে ছবি তুলে নিলাম।

ঝুলন্ত ব্রিজের এপারে আমাদের নৌকা ভেড়ানোর সময়ে দেখলাম, ঝুলন্ত ব্রিজটা পুরোপুরি ঝুলন্ত নয়। ব্রিজের নিচে ভিত হিসেবে প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ আমি এতকাল জানতাম ঝুলন্ত ব্রিজ পুরোপুরিই ঝুলন্ত! ব্রিজের উপরে অনেক মানুষ। দর্শনার্থী তো আছেই, সাধারণ মানুষও লেকের এই অংশটুকু পেরুবার জন্য ব্রিজটা ব্যবহার করে।

পায়ে পায়ে ব্রিজের শেষ মাথায় এগিয়েছি, হুট করে পাড় থেকে একটা লোক এসে বললো, ‘৭০ টাকা করে দিন।’
আমরা তো আকাশ থেকে পড়লাম। কীসের টাকা?
শিহান বলল, ‘টাকা কিসের জন্য?’
জবাব এলো, ‘ঝুলন্ত ব্রিজে উঠলেই টাকা দিতে হয়।’

মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। এই যে এত লোক ব্রিজ পার হচ্ছে, সবাই কি ৭০ টাকা দিয়ে যাচ্ছে? কই, কাউকে তো টাকা দিতে দেখলাম না! পাড়ে একটা পার্কমতোন দেখা যাচ্ছে। নাকি ওটায় ঢোকার ফি?
জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই পার্কে ঢোকার জন্য ৭০ টাকা ফি চাচ্ছেন?’

লোকটা কেমন ইতস্তত ভঙ্গীতে মাথা ঝাঁকালো। কী আশ্চর্য! আমরা তো পার্কে ঢুকতেই যাইনি। আগ বাড়িয়ে টাকা নিতে এসেছে, এটা আবার কেমন নিয়ম! শিহান ধমকের সুরে এই কথাটা বলতেই সে পিছন ফিরে সেদিকে ফিরে গেল। আমরাও আর অপেক্ষা করলাম না। এমনিতেও ঝুলন্ত ব্রিজে আর কিছু দেখার নেই। ফিরে এলাম নৌকায়। ধরেই নিয়েছি যে লোকটা জোচ্চুরি করতে চেয়েছিল।

ঝুলন্ত ব্রিজ। সোর্স: লেখিকা

বোটম্যানকে ব্যাপারটা জানাতেই সে বলল, ‘ব্রিজে উঠলে টাকা দিতে হয়। কিন্তু ৭০ টাকা নয়, ২০ টাকা। এত টাকা চাইল কেন, বুঝলাম না।’ লোকটা ৭০ টাকা না চেয়ে ২০ টাকা চাইলে আমরা ঠিকই দিতাম। কিন্তু টাকার পরিমাণ শুনেই খটকাটা লেগেছিল।

নৌকাওয়ালা আর দেরি করলো না। এরপরের যাত্রা সুবলং ঝর্ণার দিকে। এবারে অনেকটা পথ যেতে হবে। কাপ্তাই লেকে অনেকটা পথ পেরুনো কিন্তু বেশ আনন্দের ব্যাপার। রোদ না থেকে মেঘলা আবহাওয়া হলে খুব জমতো। অবশ্য এতক্ষণে অনেকটা সয়ে গেছে রোদটা।

“কাপ্তাই লেক  বাংলাদেশে, এমন কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মনুষ্যসৃষ্ট স্বাদুপানির হ্রদ।” প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে লাইনটা আওড়াচ্ছি। কী যেন একটা অসংগতি আছে। হঠাৎ করে ধরতে পারলাম ব্যাপারটা।

মনুষ্যসৃষ্ট! তারমানে এই কাপ্তাই লেক কৃত্রিম! এটা কী করে সম্ভব! এই যে পাহাড়ের কোলঘেঁষে শুয়ে থাকা পানির এই নহর, পাললিক শিলার খাঁজকাটা খাঁজকাটা স্তর এগুলো কী করে কৃত্রিম হয়! পাহাড় কেটে এরকম একটা হ্রদ বানানো তো অসম্ভব!

পাললিক শিলার খাঁজকাটা খাঁজকাটা স্তর। সোর্স: অফরোড বাংলাদেশ

লেকের পানির উপর নৌকায় বসে মনে হচ্ছে, দূরে আকাশ ছুঁই ছুঁই করা এক সারি পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু উঁচু হলেই ওই পাহাড়ের সারি আকাশটা ছুঁয়ে ফেলবে। অথচ পাহাড়গুলো কিন্তু মোটেও কাছাকাছি নয়।

নৌকাটা পাহাড়ের কাছে এগিয়ে গেলেই দেখতে পাচ্ছি, হ্রদের মধ্যে দ্বীপের মতো করে আলাদা আলাদাভাবে অবস্থান করছে নিঃসঙ্গ পাহাড়গুলো। একেকটা পাহাড়, নিজের চারপাশে স্থির জলরাশি নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে পাহাড় এবং লেকের পানির নীচ থেকে পাহাড় ও উঁচু ভূমি দেখা যায় বলে লেকের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সেদিকে তাকিয়ে শিহান বললো, ‘তুমি নিশ্চিত, এটা কৃত্রিম? এগারো হাজার বর্গ কিলোমিটারের একটা পাহাড়ি লেক মানুষের সৃষ্টি?’ অনিশ্চিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়লাম। মনে পড়লো, আদিবাসী জাদুঘরে গিয়েও কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার কারণে প্লাবিত রাঙামাটির আগের মানচিত্র দেখেছিলাম।

পরে জানতে পেরেছিলাম, কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলি নদীর উপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হলে রাঙামাটি জেলার ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় এবং এ হ্রদের সৃষ্টি হয়।
পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৬২ সালে এর নির্মাণ শেষ হয়। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ ও ৫৪.৭ মিটার উচ্চতার এ বাঁধটি নির্মাণ করে।

এ বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি পানি নির্গমন পথ বা স্প্রিলওয়ে রাখা হয়েছে। এ স্প্রিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফিট পানি নির্গমন করতে পারে। এ প্রকল্পের জন্য তখন প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ৪৮ কোটি ছাড়িয়ে যায়।

কাপ্তাই হ্রদের কারণে ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় যা ঐ এলাকার মোট কৃষি জমির ৪০ শতাংশ। এছাড়া সরকারি সংরক্ষিত বনের ২৯ বর্গমাইল এলাকা ও অশ্রেণীভুক্ত ২৩৪ বর্গমাইল বনাঞ্চলও ডুবে যায়। প্রায় ১৮ হাজার পরিবারের মোট এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়। ঠিক এই বাঁধের কারণেই পাহাড়িদের সাথে বাঙালিদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এমনকি পুরাতন চাকমা রাজবাড়ি কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের সময় লেকে তলিয়ে গিয়েছিল।

কাপ্তাই লেকে কায়াকিং করা যায়। সোর্স: allevents.in

সবকিছুরই ভালো দিক, মন্দ দিক দুটোই থাকে। এই যে এখন আমরা খুব আনন্দ নিয়ে কাপ্তাই লেক আর লেক সংলগ্ন জায়গাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছি। দেখে মন জুড়াচ্ছি। অথচ এর পিছনের গল্পটা কত ভয়াবহ! শুধু ওটুকুই নয়, বর্তমানেও এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

বদ্ধ ও ধীর গতিসম্পন্ন বিশাল জলাধার  মশা ও অন্যান্য পোকামাকড় বংশবিস্তারে খুবই সহায়ক হওয়ায় ম্যালেরিয়া রোগের ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ রাঙ্গামাটি শহরে যে পানীয় জল সরবরাহ করছে তাতে জীবাণুর অনুপাত গ্রহণযোগ্য মাত্রার ১০ গুণেরও বেশি।

এছাড়াও নৌপরিবহণের কারণে অনেকের পক্ষেই অবৈধভাবে  বনজ সম্পদ উজাড় করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে এমন সব প্রত্যন্ত অগম্য অঞ্চল থেকে, যেখানে লেক সৃষ্টি হওয়ার আগে যোগাযোগ খুবই অসুবিধাজনক ছিল। এর দরুণ ১২৭ বর্গ কিমি ব্যাপী সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ৬০৬ বর্গ কিমি খাসজমি ও পাহাড়ি বন-জঙ্গল উজাড় হতে চলেছে।

স্থানীয় লোকজন হ্রদটিকে ঘিরে রাখা প্রতিরক্ষামূলক গাছপালা উজাড় করে ফেলায় এ সব শিলাপাথর বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে সহজেই ক্ষয় হচ্ছে। এতে ভূমিধ্বস সংঘটিত হচ্ছে এবং আলগা শিলা পদার্থসমূহ ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নদীবাহিত হয়ে হ্রদে গিয়ে পড়ছে। ফলে হ্রদটি দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নববইয়ের দশকের প্রথম দিকে যখন হ্রদটির বয়স ৩০ বছর, তখনই এর প্রায় ২৫% ভরাট হয়ে এসেছিল।

নৌভ্রমণ। সোর্স: লেখিকা

অতিবর্ষণে পাহাড় ধস নামলেই বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয়। ফলে কাপ্তাই লেকে পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। প্লাবিত হয় রাঙামাটির বিভিন্ন অঞ্চল। হুমকিতে পড়ে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

তবে কাপ্তাই লেকের ইতিবাচক দিকও কম নয়। প্রধানত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এর সৃষ্টি হলেও, এ জলাধারে প্রচুর পরিমাণে মিঠাপানির মাছ চাষ হয়। লেককে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে কর্মসংস্থান হচ্ছে পাহাড়িদেরও। তবে কাপ্তাই লেকের ইতিবাচক দিকটিকে ধরে রাখার জন্য, আমরা যারা ঘুরতে যাই তাদের সতর্ক থাকতে হবে। লেকে ময়লা ফেলে জলজ পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না।

মূলত রাঙ্গামাটি জেলাতেই জলাধারটি সীমিত যার অন্তর্ভুক্ত উপজেলাসমূহ হচ্ছে রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই, নানিয়ারচর, লংগদু, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি। ভূতাত্ত্বিকভাবে কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি অঞ্চলের কাপ্তাই হ্রদের নিম্নাঞ্চল প্রতিবর্তী কর্দমশিলা ও পলিশিলার সঙ্গে প্রধানত হলুদাভ-বাদামি, সূক্ষ্ম থেকে মাঝারি দানাদার, ঘন থেকে তীর্যক স্তরিত বেলেপাথরে গঠিত (টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টি) এবং ঊর্ধ্বাঞ্চল হলুদাভ-বাদামি, সূক্ষ্ম থেকে মাঝারি দানাদার, উপকৌণিক থেকে উপগলিত, মাঝারি থেকে কম বাছাই, ভারি থেকে ঘন স্তরিত এবং সুরক্ষিত পত্রছাপসমৃদ্ধ মাঝে মাঝে তীর্যক স্তরিত বেলেপাথর এবং তার সঙ্গে স্ফটিক দানা, নুড়ি ও কাদা পাথর দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত (ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি)।

পাহাড়ের কোলঘেঁষে শুয়ে থাকা পানির এই নহর। সোর্স:BDlive24

কিছুক্ষণ পর পর পাহাড়ের বাঁক পেরিয়ে, শিলাদের স্তর দেখতে দেখতে যখন সুবলং পৌঁছালাম, তখন সূর্য মাথার উপরে। সুবলং ঘুরে গেলাম জুমঘরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়লাম বুদ্ধমূর্তির দ্বীপ আর টুক টুক ইকোভিলেজ ঘুরতে। জায়গাগুলো একেকটা একেক দ্বীপে। এই সবগুলো জায়গা ঘুরে নৌকায় ফিরতে ফিরতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল।

এবার ফেরার পালা। কিন্তু ফেরার সময় লেকে নৌকা ভ্রমণ এতটা উপভোগ্য হবে ভাবিইনি। বিকেলের মৃদু লালচে-কমলা আলোয় নৌকা রিজার্ভ বাজারের দিকে ছুটে চলছে। কিছুক্ষণ পর পর এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। পড়ন্ত বিকেলের এই আলো আর কাপ্তাই লেকের পাহাড়-বারির অপূর্ব সংমিশ্রণের এই পরিবেশটা যেন একটা অপার্থিব আবহের সৃষ্টি করেছে।

সূর্যটা তখন আকাশ থেকে নেমে কাপ্তাইয়ের স্বচ্ছ, স্থির জলে চুমু খাবার লোভ সামলে ধীর লয়ে নেমে আসছে। শেষ দিকে আমার মনটা কেমন হু হু করে কেঁদে উঠলো। প্রত্যেকবার প্রকৃতি ছেড়ে চলে যাবার সময় আমার এমন হয়। অদ্ভুত এক বিষাদ ছেয়ে থাকে আমায় ঘিরে। বিড়বিড় করে নিজের অজান্তেই আওড়াই, “আবার আসব প্রকৃতির বুকে।”

পাহাড়ি খানাপিনা। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন

রাঙ্গামাটিতে আপনি বিভিন্নভাবে পৌঁছাতে পারেন। রাঙ্গামাটিতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে হানিফ, ইউনিক, সাউদিয়া, এস আলম, শ্যামলী ইত্যাদি। প্রায় ৬০০/- টাকা ভাড়ায় ৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টায় আপনি ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে যাবেন। শ্যামলী পরিবহনের একটি মাত্র এসি বাস ছাড়া রাঙ্গামাটিতে কোনো এসি বাস চলাচল করে না।

এছাড়া আপনি ঢাকা থেকে চট্রগ্রামে বাসে যেতে পারেন এবং সেখান থেকে বাসে করে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছাতে পারেন। তবে, ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি রাঙ্গামাটিতে যাওয়াই সহজতর হবে।

কোথায় থাকবেন

রাঙ্গামাটিতে থাকার জন্য অনেক হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউজ আছে। আপনার সুবিধার্থে সে সম্পর্কে কিছু তথ্য নিম্নে দেওয়া হলো:
১। হোটেল গোল্ডেন হিল
ঠিকানাঃ রিজার্ভ বাজার, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ ০১৮২০৩০৪৭১৪
২। হোটেল গ্রিন ক্যাসেল
ঠিকানাঃ রিজার্ভ বাজার, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ ৬১২০০
৩। হোটেল লেক ভিউ
ঠিকানাঃ রিজার্ভ বাজার, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ ৬২০৬৩
৪। হোটেল সুফিয়া
ঠিকানাঃ কাঁঠালতলী, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ ৬২১৪৫
৫। পেদা টিংটিং, ফোনঃ ৬২০৮২

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের চমৎকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাস ডায়েরি

আমেরিকার দুর্দান্ত সব জলপ্রপাতের গল্প