খুলনার চরের হাট: রূপসা, ভৈরব আর আতাই নদী যেখানে মিলেছে

উফ! আর পারিনে! পরীক্ষা দিতে দিতে একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। হররোজ পরীক্ষা আর ক্লাস টেস্ট। দিনে ক্লাস তো আছেই, সেই রাতে রাতেও ক্লাস। এমনকি বিকেলেও একটু মুক্ত বাতাস দেব ফুসফুসে তারও উপায় নেই। সেদিন বিকেলে ক্লাস থেকে ফিরে বসে আছি, এমন সময় ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। ফোন দিয়েছে প্রান্ত সর্দার। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ে ও। আমার এক ব্যাচ জুনিয়র।
তবে খুব কাছের মানুষ এই প্রাণোচ্ছল ছেলেটি। ফোন দিয়ে বললো, দাদা, আমি তো খুলনা আসছি কালকে। বিকেলে ফ্রি আছেন? আমি বললাম, ফ্রি না থাকলেও ফ্রি হয়ে নেব! তুমি চলে এসো। সাথে অপুদারে নিয়ে এসো। কাল বিকেলে চরের হাট ঘুরতে যাচ্ছি। কেমন?
সে তো মহাখুশি।

নোঙর করা কার্গো; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

পরদিন ক্লাস থেকে ফিরে ফোন দিলাম প্রান্তকে। তারপর তিনজন মিলে খুলনা নিউমার্কেটে দেখা করলাম। নিউমার্কেট থেকে ঝালমুড়ি খেয়ে একটা ইজি বাইকে চেপে বললাম, মামা! খালিশপুর, আলমনগর চলেন। আলমনগর থেকে পাঁচ টাকার পথ চরের হাট। আমরা তিনজনে নেমে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। নদীর দিক থেকে দমকা হাওয়া এসে আমাদের ছুঁয়ে দিলো। সতেজ, ঠাণ্ডা, আরামদায়ক সে ছোঁয়া।
এতক্ষণ চরের হাট চরের হাট করছি, কিন্তু চরের হাট যে কী তা বলা হয়নি। খুলনা শহরের অদূরে খালিশপুরের এক জায়গায় রূপসা, ভৈরব আর আতাই নদী একসাথে মিলে সৃষ্টি করেছে ত্রিমোহনা। এই জায়গাটিই চরের হাট নামে পরিচিত। একদিকে রূপসা চলে গেছে মূল শহরের দিকে। ভৈরব চলে গেছে দৌলতপুর হয়ে যশোরের দিকে আর আতাই হারিয়ে গেছে গ্রামের দিকে।
বড় বড় কার্গো আর লঞ্চ মাল খালাস করে কিংবা খালাস করার অপেক্ষায় এখানে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করে। একটু দূরে নদীর বুকে ছোট ছোট নৌকায় করে মাছ ধরে জেলেরা। নদীর ওপারে গ্রামের নামটি অদ্ভুত। চন্দ্রানীমহল। কেমন অদ্ভুত সুন্দর নাম। এর পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে? এখান থেকে ওপারে যাওয়ার জন্য নৌকাই ভরসা। পাশাপাশি নৌকা ভাড়া করে নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো যায় ঘণ্টা চুক্তিতে।
হাড়গোজা ফুল; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

অপুদা আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আজ নৌকায় করে ত্রিমোহনা ঘোরা যাক, নাকি? শুনেছি নদীর পানি ক্ষুধা বর্ধক। আমি হেসে বললাম তথাস্তু। কিন্তু সেদিকে পা বাড়ানোর আগে প্রান্ত সর্দার চেঁচিয়ে উঠলো।
দাদা, ওগুলো কী? দেখেন কি সুন্দর।
ওর কথায় সেদিকে তাকালাম। দেখি নীল রঙয়ে ছেয়ে গেছে সেদিকটা।
ও বললো, চলুন ওখান থেকে ঘুরে আসি।
আমরা কাছে যেতেই বুঝলাম ওগুলো হাড়গোজা ফুল। নদীর এপারটায় ঘাট থেকে দূরে যেখানে ইটের পাঁজা ঢাই করে রাখা, সেগুলোর শেষে হাড়গোজার জঙ্গল হয়ে আছে। আর সেই জংগল এখন নীল ফুলে হাসছে।
সেখানে যেতেই দেখি একটা ছেলে বড়শি দিয়ে এক মনে মাছ ধরছে। কীরে কী মাছ ধরলি?
সেই মলিন মুখে জানালো তখনো একটিও মাছ পড়েনি।
-আহারে! দেখিস ঠিকই পাবি। আমরা সান্ত্বনা দিলাম।
কয়েক মুহূর্ত পরেই সুতোয় টান। সে লাফ দিয়ে উঠে সন্তর্পণে বড়শি টেনে আনলো। তাতে একটি ছোট্ট সরপুঁটি গেঁথে আছে। এতেই সে মহাখুশি। আমার হাতে ক্যামেরা দেখে হাসিমুখে পোজ দিলো। আমরা এবার নদীর দিকে এগিয়ে গেলাম।
একটা খেয়া নৌকা দরদাম করে উঠে পড়লাম। আমরা শহুরে শহুরে বাতাসে অতিষ্ঠ। চাচাকে বললাম,
-চাচা, আতাই বেয়ে এগিয়ে চলেন।
জলস্রোতে ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

আমাদের কথামতো নৌকা এগিয়ে চলতে লাগলো। বড় বড় লঞ্চ, কার্গো, জাহাজ নোঙর দিয়ে রাখছে। আমরা সেগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম। সেগুলোর প্রকাণ্ড দেহের পাশে আমাদের নিতান্ত ক্ষুদ্রকায় লাগছিল। কিছুক্ষণ পরে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলে দেখতে পেলাম নদীর একপাড় কিছুটা ভেঙে গেছে। কয়েকটি খেজুর গাছের গোঁড়ার মাটি ধুয়ে নিয়ে গেছে আত্রাই নদী। তবুও সে তার শিকড়গুলো দিয়ে সজোরে আঁকড়ে ধরে রেখেছে মাটিকে নদীর টানকে অগ্রাহ্য করে। কিছুতেই সে নদীর বুকে আত্মা বিসর্জন দেবে না। কিন্তু কতক্ষণই বা আটকিয়ে রাখবে প্রবল জলস্রোত!
নদীর আশেপাশে জেলেদের পল্লী। তারা নৌকা তীরে বেঁধে রেখে বাড়ি চলে গেছে। জাল আর মাছ রাখার ঝুড়িসহ নৌকাগুলো দুলছে মৃদু মৃদু। কিছুক্ষণ পরে অপুদা আমাকে সম্বোধন করলেন, অমিতাভ, আপনি তো গাছ চেনেন ভালো। বলুন তো ওগুলো কী গাছ?
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, নদীর তীরে এক জায়গায় গোলপাতা গাছের ঝাড় জন্ম নিয়েছে। এখানে এই খুলনার বুকে গোলগাছ! কিন্তু কীভাবে? মাথায় টোকা মারতেই উত্তর মিললো। নিশ্চয়ই জোয়ারে ভেসে এসেছে। কিন্তু এখানকার পানি মিষ্টি। গোলগাছের জন্ম নেওয়ার কী কথা?
চরের হাটে চরের পরে প্রান্ত আর অপুদা।

কিন্তু ভাবনা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারলো না। প্রান্তের চিৎকারে চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল। আমাদের নৌকা যেখানে ঠিক সেখানেই হুশ করে ভেসে উঠেছে এক শুশুক। প্রচলিত ভাষায় ডলফিন বলে যাকে! সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে গাঙ্গেয় ডলফিন। এক সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীতে এদের দেখতে পাওয়া যেত। ক্রমশ এদের সংখ্যা কমে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে জলজ সম্পদ ক্রমাগত মানুষের চাপে। শহরের চাপে প্রকৃতি হচ্ছে সঙ্কুচিত।
যখন সন্ধ্যা নামে; ছবি; অমিতাভ অরণ্য

তিন নদী যেখানে মিলেছে, সেখান নদী থেকে কিছুটা চর জেগে উঠেছে। আমরা ফেরার সময় সেখানে নামলাম। তারপর এক পর্ব ছবি তোলা হলো।  আমরা এবার নৌকা উলটো দিকে ঘুরালাম। কিছুক্ষণের মধ্যে অপুদার কবিত্ব জেগে উঠলো। তিনি আবৃত্তি শুরু করলেন-
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন-
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল-
তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমনের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র ম্রিত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম…
ক্রমশ সন্ধ্যার আলোয় অপুদার কায়া ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। আমরা দুলছি। ভাবের দোলায়।

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে খুলনা আপনি বাসে কিংবা ট্রেনে যেতে পারবেন। আর খুলনা নিউমার্কেট থেকে ইজিবাইকে দশ টাকা ভাড়া নেবে আলমনগর পর্যন্ত। সেখান থেকে পাঁচ টাকা নেবে চরের হাট পর্যন্ত।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সকোত্রা দ্বীপ: যাকে বলা হয় পৃথিবীতেই এলিয়েনদের আবাস

এই শ্রাবণে কক্সবাজারে