এই বর্ষায় ঘুরে আসুন চলন বিল

নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এই তিনটি জেলার অংশ বিশেষ জুড়ে অবস্থান করছে চলন বিল। এই বিলটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল এবং সমৃদ্ধতম জলাভূমিগুলোর একটি। দেশের সর্ববৃহৎ এই বিলটি বিভিন্ন খাল বা জলখাত দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত অনেকগুলো ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সজ্জিত এই বিলটি ভ্রমণ প্রিয়দের আকর্ষণ। বিলটির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দেখার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসে পর্যটকরা। নৌকা ও ট্রলার ভাড়া করে ঘুরে বেড়ায়।
চলুন জেনে নেয়া যাক দেশের সবচেয়ে বড় এই বিলটি সম্পর্কে কিছু জানা, অজানা কথা ও চলন বিল ভ্রমণে সহযোগী কিছু তথ্য।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ চলন বিল:

বিলের সৌন্দর্য; source: Abu Nasar

প্রকৃতি দুই হাত উজাড় করে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এখানে। দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে থাকা এ বিলের জলরাশি মুগ্ধ করবে অনায়াসে। বিলের চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গাছপালা, পাখিদের কলরব সেই মুগ্ধতা আরো বাড়িয়ে তোলে। বিলের বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কচুরিপানা, খুদিপানা ও অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ সবুজাভ জলের বুকে ভিন্ন এক চিত্র যোগ করেছে।
বিল জুড়ে উড়ে বেড়ায় নানা জাতের পাখি। সেসব পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত থাকে বিলের চারপাশ। বিলের বুকে ভেসে ভেসে প্রকৃতির অপরূপ এই সৌন্দর্য দেখে আনমনেই কাব্যিক হয়ে ওঠা যায়।

চলন বিলের অবস্থান ও আয়তন:

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য; source: Sayham Siddique Riday

চলন বিল উত্তর বঙ্গের নাটোর, সিরাজগঞ্জ এবং পাবনা জেলার মধ্যে অবস্থিত। বিলটি সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ ও পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলা দুটির অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এছাড়া সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ থানার তিন-চতুর্থাংশই এ বিলের মধ্যে অবস্থিত। বিলটির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পাবনা জেলার নুননগরের কাছে অষ্টমনীষা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ জেলায় চলন বিলের উত্তর সীমানা হচ্ছে সিংড়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে ভদাই নদী পর্যন্ত টানা রেখাটি যা নাটোর, পাবনা ও বগুড়া জেলার মধ্যবর্তী সীমানা নির্দেশ করে।
ভদাই নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত তাড়াশ উপজেলা ও পাবনা জেলা বরাবর উত্তর-দক্ষিণমূখী একটি রেখা টানলে তা হবে বিলটির মোটামুটি পূর্ব সীমানা। বিলটির প্রশস্ততম অংশ উত্তর-পূর্ব কোণে তাড়াশ থেকে গুমনী নদীর উত্তর পাড়ের নারায়ণপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। সিংড়া থেকে গুমনী পাড়ের কচিকাটা পর্যন্ত অংশে এটির দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি, ২৪ কিলোমিটার।

অসংখ্য বিলের দেখা এক চলন বিলে:

বিশাল জায়গা জুড়ে বিল; source: Sayham Siddique Riday

ছোট ছোট অসংখ্য বিলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে বিশালাকার এই চলন বিল। চলন বিল গঠনকারী ছোট ছোট বিলগুলো হলো- পিপরূল, পূর্ব মধ্যনগর, লারোর, ডাঙাপাড়া, তাজপুর, নিয়ালা, চলন, মাঝগাঁও, ব্রিয়াশো, চোনমোহন, শাতাইল, খরদহ, দারিকুশি, কাজীপাড়া, গজনা, বড়বিল, সোনাপাতিলা, ঘুঘুদহ, কুরলিয়া, গুরকা, দিক্ষিবিল এবং চিরল।
চলন বিলের মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি নদী প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- করতোয়া, আত্রাই, গুড়, বড়াল, মরা বড়াল, তুলসী, ভাদাই, চিকনাই, বরোনজা, তেলকুপি ইত্যাদি।

ঋতু বৈচিত্র‍্যে নানারূপ:

ঋতু বৈচিত্র‍্যে নানা রূপ; source: Abu Nasar

কখনো জলে টইটুম্বুর চারপাশ, কখনো কমে যায় জলের উচ্চতা। কোথাও কোথাও দেখা যায় শুকনো মাঠ। ঋতু বৈচিত্র‍্যের এই বাংলাদেশে রূপ বদল হয় চলন বিলেরও। বর্ষায় পানির উচ্চতা বেড়ে যায়, আশপাশের এলাকা বন্যাপ্লাবিত হয়। অনেকের জন্য সে সময়টি অভিশাপের মতো।
আবার বর্ষা শেষে যখন যমুনার পানি নেমে যায় তখন নেমে যায় চলন বিলের পানিও। শুষ্ক মৌসুমে বিলের বৃহত্তর অংশ শুকিয়ে ২৫.৯ থেকে ৩১.০৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এক জল গহ্বরে পরিণত হয়। কোথাও কোথাও ধান চাষ হয়। সে সময়টি আবার অনেকের কাছে হয়ে ওঠে আশীর্বাদের।

চলন বিল ও কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলী:

প্রকৃতির অপার বিস্ময়; source: Sayham Siddique Riday

চলন বিল নিয়ে অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটনা রয়েছে। অনেকের ধারণা বিশাল এই বিলে ভূত কিংবা জ্বিনের চলাচল রয়েছে। এই বিষয়টি অনেকে হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেও স্থানীয়রা লোকেরা বিষয়টি খুব ভালোভাবে বিশ্বাস করেন। তাদের অনেকের কাছে শোনা যায়, তারা বেশ কয়েকবারই এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে স্থানীয়দের কাছে রাতের চলন বিল একটি ভৌতিক জায়গা। তারা একা চলতে ভয় পান রাতে।
স্থানীয় মাঝি ও জেলেদের মুখে এসব অতিপ্রাকৃত, ভৌতিক গল্পগুলো শোনা যায়। তাই ভৌতিক বিষয় সম্পর্কিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আর্টিকেল বা গল্পে চলন বিলের নাম শোনা গেছে অসংখ্যবার। আপনি চলন বিল ভ্রমণে গেলে স্থানীয় কারো থেকে শুনে থাকবেন হয়তো ভৌতিক কোনো ঘটনা।

চলন বিলে যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে বাসে যেতে চাইলে:

ঢাকার মহাখালী থেকে ‘সৌরভ পরিবহন’, ‘এস আই এন্টারপ্রাইজ’ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এছাড়া গাবতলী থেকে ‘ইউনিক’ বাস যায় সিরাজগঞ্জ। ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার ভাড়া পড়বে ১৭০ টাকা।

ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে:

ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর স্টেশন থেকে টিকেট কাটতে হবে। নামতে হবে ‘সদানন্দপুর স্টেশন’। সদানন্দপুর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে আগাতে হবে সাত কিলোমিটার। স্টেশন থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সিরাজগঞ্জ শহর। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন খুলনাগামী ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’, রাজশাহীগামী ট্রেন ‘সিল্কসিটি এক্সপ্রেস’ ট্রেনগুলো সদানন্দপুর স্টেশনে থামে। ট্রেন ভাড়া ১২৫ টাকা।
চলনবিলে বেড়ানোর জন্য স্থানীয় নৌকা পাওয়া যায় ভাড়ায়। সারাদিনের জন্য ভালো মানের একটি নৌকার ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। এছাড়া ইঞ্জিন নৌকা পাওয়া যাবে ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। বড় দল হলে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়াতে পারেন।

সতর্কতা:

চলন বিল যেহেতু জলে ভরা এলাকা, এবং যেহেতু জলের সৌন্দর্যই উপভোগ করতে যাবেন তাই সাঁতার না জানলে অধিক সর্তক থাকবেন। যারা সাঁতার জানেন না তারা অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নেবেন। নিজেদের নিরাপত্তার দিকে অধিক খেয়াল রাখবেন।
নৌকায় ভ্রমণ করার সময় হৈচৈ, লাফালাফি করবেন না। স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। বিলের পানিতে ময়লা ফেলবেন না। পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
ফিচার ইমেজ- Mahbub Rubel

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদের ছুটিতে কাশ্মীর – বাই এয়ার

১৪০ দিনে ৭ মহাদেশের ৩২টি দেশ ভ্রমণ: দুর্দান্ত এক জাহাজ ভ্রমণের হাতছানি