ট্রানজিটের অবসরে…

অনেক দূরের গন্ত্যব্যে বিমান বা ট্রেনে যাবার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝেই বেশ লম্বা সময়ের ট্রানজিট থাকে। কখনো এই ট্রানজিটের সময়কাল ২ থেকে ৬ ঘণ্টাও হয়ে থাকে। অনেকেই এই লম্বা সময়ের ট্রানজিট নিয়ে নানা রকম বিষণ্ণতায় ভুগে থাকে। কী করবে না করবে সেটা ভেবে পায় না স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু একটু নিজের মতো করে ভাবলে আর দেখতে পারলেই কিন্তু ট্রানজিটের মতো বিরক্তিকর লম্বা সময় বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভালো আর আধুনিক বিমান বন্দরগুলোতে। একটু চোখ, কান খোলা রেখে কষ্ট করার মানসিকতা থাকলেই ট্রানজিটও হয়ে উঠতে পারে, স্মরণীয় আর সুখের। কীভাবে? আমি নিজেই ট্রানজিট সময়ের কথা বলছি। আপনি ভেবে দেখুন আপনার সাথে যায় কিনা।

কয়েক মাস আগের কথা। নিজের কর্মস্পৃহা বাড়াতে গোমুখ যাচ্ছিলাম। ঢাকা থেকে ট্রেনে আর কলকাতা থেকে দিল্লী প্লেনে গিয়ে দিল্লী থেকে দেরাদুন ট্রেনে যাবো। তো, কলকাতায় আমার শিডিউল অনুযায়ী ১২টায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। অবশ্য যদি আমি শেষ পর্যন্ত কলকাতায় যাই। আমি যেহেতু দমদম এয়ারপোর্ট থেকে দিল্লীর প্লেনে যাবো তাই আমার গন্তব্য ছিল বনগাঁ লোকাল থেকে দমদম স্টেশন পর্যন্ত। তার মানে আমি ১১:৩০ নাগাদ পৌঁছে যেতে পারবো।

ঘুরে দেখা এয়ারপোর্ট। ছবিঃ লেখক 

আর আমার ফ্লাইট হলো সেই ২:৫০ মানে প্রায় ৩ ঘণ্টার ট্রানজিট বা বিরতি ট্রেন আর প্লেনের মাঝে। এটা রাখতেই হয় যে কোনো ট্রানজিট বাহনে। কারণ কোনো না কোনো কারণে প্লেন হোক বা ট্রেন অথবা বাস দেরি তো হতেই পারে। আর সেই দেরিকে মাথায় রেখে আর সাথে কাশ্মীর থেকে প্লেনে দিল্লী এসে ২ ঘণ্টার ট্রানজিটে ট্রেন মিস করে নিদারুণ কষ্ট থেকে আমার নিজের জন্য নিজের এই শিক্ষা।

এরপর থেকে সকল ট্রানজিটে আমি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা ফাঁকা রাখার চেষ্টা করি। তাই বলে কি এই লম্বা ট্রানজিট সময় অযথা বসে বা শুয়ে কাটাবো? যা শেষ পর্যন্ত চরম বিরক্তিকর লাগবে নিজের কাছেই। প্রশ্নই আসে না। সময়কে কীভাবে কাজে লাগিয়ে নিজের মতো করে উপভোগ্য করা যায় সেটা আমি বেশ ভালোই রপ্ত করেছি নানা সময়, নানা জায়গায় ভ্রমণ করে আর বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। তাই কলকাতা এয়ারপোর্টের তিন ঘণ্টা সময়কেও শুয়ে, বসে বা অযথা না হেঁটে উপভোগের অনুষঙ্গ খুঁজে বের করতে ধীর লয়ে হাঁটা শুরু করলাম।

ছোট্ট বনভূমি! ছবিঃ লেখক 

ফ্রেশ হয়ে উঠে হাঁটা শুরু করতেই অনুভূত হলো আমার বেশ ক্ষুধা পেয়েছে। ঠিক আছে তবে কিছু খাওয়া যাক। সেই গতকাল রাতে বেশ ভালো খাওয়া দাওয়া করায় সকালে আর কিছুই খাওয়া হয়নি সেটা মনেই ছিল না। ক্ষুধা লাগায় সেটা মনে পড়লো। তাই স্বাদ, সাধ্য, পরিমাণ, দাম আর নিজের পছন্দের সমন্বয় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কাছে পিঠে যে চকচকে দোকানগুলো চোখে পড়ছে তার সবগুলোতেই সব মিষ্টি জাতীয় খাবারের সমারোহ। তাও সেগুলোর দাম কোনোটাই ১৫০ রুপীর নিচে নেই।

যেটা আমার বাজেটের বাইরে আর ওগুলো খেয়ে আমার ক্ষুধাও মিটবে না আর মনও ভরবে না। আর তাছাড়া আমার বাঙালি পেট তো এখন মিঠে কিছু চায় না, সে চায় একটু স্পাইসি কিছু, ভারী কিছু আর বেশ মন ভোলানো স্বাদের কিন্তু সাধ্যের মধ্যেও!

তাই গেট ছেড়ে ভেতরের দিকে এবার হাঁটা শুরু করলাম। লক্ষ্য ঠিক করেছিলাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবার পুরো এয়ারপোর্ট চক্কর দেব। এর মাঝে দর্শনীয় যা কিছু পাই তা দেখবো, ধীরে-ধীরে, হেঁটে-হেঁটে পছন্দের খাবারের দোকান খুঁজে দেখবো। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু না পেলে তখন না হয় ১৫০ রুপী দিয়েই কিছু খেতে হবে। না খেয়ে থেকে তো আর শরীর দুর্বল করে ফেলা যাবে না ভ্রমণের শুরুতেই।

চমৎকার আর্ট গ্যালারী। ছবিঃ লেখক 

এভাবে পুরো এয়ারপোর্ট ঘুরে দেখতে শুরু করার শুরুতেই চোখে পড়লো নিচ তলায় দারুণ ফোয়ারার মাঝে সবুজ ছোট ছোট গাছের ছড়াছড়ি। যেন ক্ষুদ্র আর মনুষ্য তৈরি ক্ষুদে এক বনভূমি বানানোর প্রয়াস। উপর থেকে সেই ক্ষুদ্র বনভুমি দেখে ছবি তুলে, কাঁচের সিঁড়ি ভেঙে ওপারে যেতেই চোখে পড়লো দারুণ এক আর্ট গ্যালারী। বাহ কিছু সময় অবহেলায় কাটাতে আর অল্প কিছু প্রাপ্তি যোগ করে নিতে এমন ছোট একটি আর্ট গ্যালারীর কোনো তুলনাই হয় না। বেশ কিছুটা সময় সেই আর্ট গ্যালারীর সামনে দাঁড়িয়ে থেকে মুগ্ধ চোখে নানান রঙের খেলায় মেতে কীভাবে যে কোনো এক তাৎপর্যময় ছবি ফুটিয়ে তোলে শিল্পীর তুলি সেই ভাবনা ভেবে অবাক হতেই পেট জানান দিল ওর ক্ষুধা পেয়েছে। তাই আবারো আর্ট গ্যালারীর আকর্ষণ ছেড়ে ছুটলাম পছন্দের কোনো খাবার দোকানের খোঁজে।

কিছুটা এগিয়ে একটি দারুণ নান্দনিক দোকানের সামনে দাড়িয়ে গেলাম আগে-পিছে না ভেবেই। একটু সামনে এগিয়ে, দোকানের ভিতরে ঢুকেই ভিড়মি খেলাম, এই দোকান তোর জন্য নয় রে পাগলা। এটা বনেদী বিদেশীদের সাময়িক আরাম আর পানীয় দিয়ে তাদের গলা ভেজানোর জায়গা। তবে যাই বলুন, সেই পানীয়র দোকানের নান্দনিকতা চোখে লেগে থাকার মতো সত্যি। এখনো সেই দোকানের নান্দনিক প্রতিচ্ছবি চোখে লেগেই আছে। আহা যদি থাকতো সাধ, সাধ্য আর পানীয়র অভ্যেস তবে সেই দোকানের নান্দনিকতার স্পর্শ মেখে নিতাম একটুখানি। সে তো আর হলো না, তাই আবারো অন্য পথে সামনের দিকে এগোতে থাকলাম।

dav

নানা রকম ফাস্টফুড, মিষ্টান্ন, আইসক্রিম, পোশাক, পানীয় আর প্রসাধনীর দোকান পেরিয়ে যেতে যেতেই দূরে চোখে পড়লো মন মাতাল করা আর প্রাণ পাগল করা সাইন বোর্ড ফুড টার্মিনাল! সাথে লাগোয়া সিঁড়ি উঠে গেছে তিন তলায়। আহা, আমাকে আর পায় কে? তার মানে এখানেই কিছু না কিছু মনের মতো খাবারের খোঁজ পাওয়া যাবে আমি নিশ্চিত হলাম ফুড টার্মিনালের বর্ণীল সাইনবোর্ড দেখেই।

ঝটপট কাছে চলে গেলাম সেই ফুড টার্মিনালের। পাশের সিঁড়ির কাছে যেতেই আমি উদ্ভাসিত। ঠিক, ঠিক, ঠিক পছন্দের খাবারের দোকানের সাইনবোর্ড দেখে! যেটা এই ফুড টার্মিনালের ভেতরেই অবস্থিত। আহা, সে হল কেএফসি। আমার সাধ্যের মধ্যেই সবটুকু সুখ। ভারত বর্ষে আমার প্রথম পছন্দের চেইন শপ আর তার রাইস ও চিকেন পপকর্ন মেন্যু।

নান্দনিক কফিশপ। ছবিঃ লেখক 

আর কোনো দেরি নয়। ক্ষুধা এতক্ষণ যতটা বোধ হচ্ছিল, কেএফসি দেখে যেন সেটা মুহূর্তেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল! কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা কাউন্টারে গিয়ে পছন্দের খাবারের অর্ডার দিয়ে ওদের কলের আশায় বসে রইলাম। ৫ মিনিটের মধ্যেই ডাক এলো, খাবার রেডি। ওয়াও, গরম গরম, ধোয়া ওঠা রাইস মিল সাথে পপকর্ন চিকেনের বিস্তার পুরো প্লাস্টিকের বোল জুড়ে। গরম, হালকা ঝাল, বাসমতী চাল আর সাথে ছোট ছোট চিকেনের মনকাড়া টুকরোর সাধ মতো ভাজা মিলে একদম একাকার হয়ে গেলাম মুখে তুলেই।

সবকিছু মিলে দারুণ কেটেছিল আমার সেই ট্রানজিটের অবসর। আপনিও চাইলে ট্রানজিটের একঘেয়েমি কাটাতে পারেন আপনার মতো করেই।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খুলনার রূপসা নদীর তীরে ক্যাম্পিং ও ফিশ বার বি কিউ

দার্জিলিং পাড়া গ্রাম ও সাঙ্গু নদীর গল্প