একদিনের ভ্রমণে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরের গল্পকথা

All-focus

যশোর বাংলাদেশের প্রথম জেলা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্বাধীন হওয়া জেলাটি যশোর। যশোর, সমতটের একটা প্রাচীন জনপদ। নামটি অতি পুরনো। যশোর নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়।

যশোর আরবি শব্দ, যার অর্থ সাকো। অনুমান করা হয়, কসবা নামটি পীর খানজাহান আলীর দেওয়া। এককালে যশোরের সর্বত্র নদী নালায় পরিপূর্ণ ছিল। পূর্বে নদী বা খালের উপর সাকো নির্মিত হতো। খানজাহান আলী বাঁশের সাকো নির্মাণ করে ভৈরব নদী পার হয়ে মুরলীতে আগমন করেন বলে জানা যায়। এই বাঁশের সাকো থেকে যশোর নামের উৎপত্তি।

তবে এই মতে সমর্থকদের সংখ্যা খুবই কম। ইরান ও আরব সীমান্তে একটি স্থানের নাম যশোর যার সাথে এই যশোরের কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। খানজাহান আলীর পূর্ব থেকেই এই যশোর নাম ছিল। অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, প্রতাপদিত্যের পতনের পর চাঁচড়ার রাজাদের যশোরের রাজা বলা হতো৷

যশোরের দড়াটানা মোড়; image source : মাদিহা মৌ

অভয়নগরের এগারো শিব মন্দির

ভৈরব নদ পেরিয়ে রাজা নীলকণ্ঠের এগারো শিব মন্দির যেতে হবে। মন্দির প্রাঙ্গণে ঠিক সামনেই মূল মন্দিরটি নিজের সমস্ত দর্প নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। পশ্চিম দিকে। পূর্ব ও পশ্চিম সারিতে চারটি করে মোট আটটি মন্দির। সব মিলিয়ে এগারোটি মন্দির। প্রত্যেকটি মন্দির মাঝখানের উঠোনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রধান মন্দিরটিকে সংস্কার করায় তার পূর্বের দম্ভ ফিরে এলেও, বাকি মন্দিরগুলোর অবস্থা সঙ্গীন।

মূল মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ২৪ ফুট ৪ ইঞ্চি আর প্রস্থ ২২ ফুট ৩ ইঞ্চি। দেয়ালের প্রস্থ ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি। মন্দির নির্মাণে ব্রিটিশ আমলে অনুসৃত চুন সুরকি এবং ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। ইটের আকৃতি পাতলা ও বর্গাকার। চুন-সুরকির প্রলেপ ধরে রেখেছে ইটগুলোকে।

এগারো শিব মন্দির; image source : মাদিহা মৌ

প্রত্যেকটি মন্দিরে আগে একটি করে মোট বারোটি শিবলিঙ্গ ছিল, এদের প্রত্যেকের নামে ১২০০ বিঘা জমি নিষ্কর দেওয়া হয়েছিল। প্রতিদিন দেবসেবায় যেসব ভোজ্য দেওয়া হতো, পূজা সম্পন্ন হবার পর তা গ্রামের ব্রাহ্মণ পরিবারগুলোতে ভাগ বাটোয়ারা করে পাঠানো হতো। তা দিয়ে ৩০টি ব্রাহ্মণ পরিবারের সংসার চলত। বারোটি শিবলিঙ্গের মধ্যে এখন শুধুমাত্র মূল মন্দিরেই একটি শিবলিঙ্গের কিছু ভগ্নাংশ আছে। বড় মন্দিরে এখনো নিয়মিত পূজা হয়। পূজারীর দেখা না পেলেও প্রমাণ পেলাম আমরা। বড় মন্দিরের দেয়ালে কিছু ইট পাথর ঝোলানো দেখলাম। দেখেই মনে হলো কোনো ধরনের মানতের চিহ্ন এগুলো।

মন্দিরের চারপাশে একসময় প্রাচীর বেষ্টিত ছিল। এখনও তার চিহ্ন রয়েছে। সেই সময়কার প্রচুর ইটও পড়েছিল সেখানে। সেসব ইট গ্রামবাসী কিনে নিয়ে নিজেদের বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করেছে। মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি পুকুর ছিল।

এগারো শিব মন্দির; image source : মাদিহা মৌ

মন্দিরগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল অনেকগুলো বছর। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রথম ধাপের সংস্কার কাজ শুরু করে, যা শেষ হয় ২০১৭ সালে। ফলে দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনাগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

চাঁচড়া শিব মন্দির

৩২৩ বছরের পুরাতন এই শিব মন্দিরটি যশোর জেলার যশোর-বেনাপোল হাইওয়ের চাঁচড়ায় অবস্থিত। মন্দিরটি ‘আট-চালা’ স্থাপত্য ঘরানায় নির্মাণ করা হয়েছিল। আট-চালা রীতি বাংলার মন্দির স্থাপত্যকলার বিশেষ এক ধরনের রীতি, যেখানে বর্গাকার বা আয়তাকার গর্ভগৃহের ‘চৌ-চালা’ ছাদের উপরে আরেকটি ছোট ‘চৌ-চালা’ ছাদ নির্মাণ করা হয়। এই স্থাপত্যটিকে ‘আট-চালা’ রীতি বলা হলেও এটি মুলত চারচালা। মূল চারচালা ছাদের মাঝে কিছুটা উঁচুতে আরেকটি ছোট চারচালা ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। এ নির্মাণ কৌশলে উঁচু চারচালা যুক্ত ছাদের যে অনুবল তৈরি হয় তা উপস্থিত থাকে না, ও ঘরের ভেতরে ছাদের সাপোর্ট নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পিলার ব্যবহার করতে হয়। 

চাঁচড়া শিব মন্দির; image source : মাদিহা মৌ

মন্দিরের সামনের দুইপাশের দেয়ালে টেরাকোটার ফলক ব্যবহারের কারণে বাইরের দিকে দারুণ নান্দনিক দেখায়। এখানে ছাঁচ টেরাকোটা ব্যবহৃত হয়েছে। টেরাকোটায় ৮ ধরনের নকশা দেখা যায়। তার মধ্যে ২টি নকশা খুবই সূক্ষ্ম। কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, সংস্কারের সময় মন্দিরের দেয়ালে বর্তমানে থাকা টেরাকোটার ফলকগুলো আদি টেরাকোটার আদলেই লাগানো হয়েছে।এখানে নিয়মিত পূজা হয়। প্রধান খিলান দিয়ে শিবমূর্তিটি দেখা যায়। এর টেরাকোটাগুলো এতই নিখুঁত দেখে মনেই হয় না প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের নির্দেশনা এই চাঁচড়া শিব মন্দির৷

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মধুপল্লী

সাগরদাঁড়ি গ্রামের মধুপল্লীর রাস্তার মুখেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের একটি প্রমাণ আকৃতির আবক্ষ মূর্তি ঠায় দাঁড়িয়ে। কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনা আর কবির স্মৃতিতে সমৃদ্ধ মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। কুটিরের আদলে তৈরি প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় মধুপল্লীতে। সামনেই কবির আরও একটি আবক্ষ মূর্তি। এটি গড়েছেন শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র। ভেতরে কবির বসতবাড়ি, সেটিকে এখন জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে৷ মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাবপত্র আর নানান স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে এ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন জাদুঘর। কবির পৈত্রিক কাছারি ভবনটিকে এখন মধুপল্লী পাঠাগারে পরিণত করা হয়েছে।

মধুসূদনের আবক্ষ মূর্তি; image source : মাদিহা মৌ

মধুপল্লীর চারপাশ প্রাচীরে ঘেরা। বাড়ির পশ্চিম পাশে আছে দিঘি। দিঘির ঘাটে কবি স্নান করতেন। দিঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। কাছারি ভবনের পিছনেই কবির কাকার বাড়ি। কাছারি ভবনটি সহ এই অংশটি একটি চতুষ্ক বাড়ির মতো। জাদুঘরের ভিতরের দিকেও কবির কাকার বাড়ির আরেকটি ভবন আছে, যেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার নেই। জাদুঘরের ঠিক পাশেই দত্ত পরিবারের পারিবারিক পূজা মন্দির রয়েছে। মন্দিরে এখনো প্রতিষ্ঠিত আছে দেবী দুর্গার বিগ্রহ।

কপোতাক্ষ নদের তীরে কবির স্মৃতি বিজড়িত কাঠবাদাম গাছের গোড়া শান বাঁধানো। বয়সের ভারে মৃতপ্রায় কাঠবাদাম গাছ ও বিদায় ঘাট ইতিহাসপ্রিয় দর্শনার্থীরা আগ্রহ নিয়ে দেখতে যায়। এখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় কপোতাক্ষ নদের সৌন্দর্য।

মধূসূদনের বাড়ি; image source : মাদিহা মৌ

গদখালী

আশির দশকের শুরুতে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয়েছিল। কয়েক দশকে সেই ফুল চাষে যশোর জেলাকে অন্যরকম পরিচিতি দিয়েছে। গদখালী এখন ফুলের রাজ্য। দেশ-বিদেশের মানুষ যশোরকে চিনছে গদখালী মাইলের পর মাইল ফুলের ক্ষেতের ফুল দিয়ে। গদখালীতে প্রায় ১,৫০০ হেক্টর জমিতে এখন বছরজুড়ে চাষ হচ্ছে অন্তত ৯ জাতের বাহারি ফুল। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। সেই সাথে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে রংবাহারী ফুলের সৌন্দর্য দেখার জন্য অনেক ভ্রমণকারীরই পছন্দের জায়গা যশোরের গদখালী।

গদখালী; image source : মাদিহা মৌ

গদখালী বাসস্ট্যান্ডেই ফুলের বাজার। ফুলের বাজার দেখতে হলে অবশ্যই খুব ভোরে যেতে হবে গদখালী। ভোরবেলায় ক্ষেত থেকে ফুল নিয়ে বাজারে জড়ো হয় ফুল ব্যবসায়ীরা। সকাল ৮টা নাগাদ জমে ওঠে “গদখালী ফুলের বাজার।”

গোলাপ, কয়েক রঙের গ্লাডিওলাস, গাদা, রঙ বেরঙের জারবেরা- গদখালী বাজারে গেলে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। এ যেন ফুলের স্বর্গ। সাইকেল, ভ্যানে করে চাষীরা তাদের ফুল নিয়ে বাজারে জমায়েত হয়। ১০-১১টার মধ্যেই বেচাকিনি শেষে বাজার নীরব হয়ে পড়ে।

বাজার দেখা শেষে ভ্যানে চড়ে চলে যেতে হবে পানিসারায় ফুলের বাগানে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুল চাষ হচ্ছে। এ যেন ফুলের স্বর্গ। দেশের ৭০% ফুলের জোগান আসে যশোরের এই গদখালী থেকে।

ফুলের শেড; image source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যশোর যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, কলাবাগান থেকে গ্রিন লাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, ঈগল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহনের এসি বাস যশোর যায়। ভাড়া ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। এ ছাড়া হানিফ, শ্যামলী, সোহাগ, ঈগল ইত্যাদি পরিবহনের নন-এসি বাসও যশোর যায়। ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

ঢাকার কমলাপুর থেকে সপ্তাহের শনিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৬টা ২০ মিনিটে আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস এবং সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় আন্তঃনগর ট্রেন চিত্রা এক্সপ্রেস যশোরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ভাড়া শোভন ৩৫০ টাকা, শোভন চেয়ার ৪২০ টাকা। প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৫৬০ টাকা। প্রথম শ্রেণি বার্থ ৮৪০ টাকা। স্নিগ্ধা শ্রেণি (এসি চেয়ার) ৭০০ টাকা। এসি বার্থ ১,২৬০ টাকা।

ফুলের বাজার; image source : মাদিহা মৌ

ঢাকা থেকে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স, রিজেন্ট এয়ারলাইন্স ও নভো এয়ারের বিমান নিয়মিত যশোরের পথে চলাচল করে।

ইতিহাস অংশের তথ্যসূত্র : যশোহর খুলনার ইতিহাস by সতীশচন্দ্র মিত্র

Feature image source : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজা নীলকণ্ঠ রায়ের স্মৃতি বিজরিত অভয়নগরের এগারো শিব মন্দির

ঈদ উল আযহা ও এক টুকরো মাংস…