জাপানের অন্যতম প্রধান কয়েকটি নিদর্শন

জাপানকে বলা হয় সূর্যোদয়ের দেশ। পূর্বদিকের প্রথম দেশ হওয়ায় এদেশের এমন নামকরণ করা হয়েছে। এই দেশটিতে প্রথমবার ভ্রমণ করতে যাওয়া অনেক পর্যটকই এশিয়ার এই ছোট দেশটির সমৃদ্ধ ইতিহাস জেনে অবাক হয়। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই দেশটির সাথে। সত্যি বলতে ইউরোপের মনোমুগ্ধকর ক্যাথেড্রালগুলো তৈরির অনেক আগে থেকেই জাপানের শিন্টো এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলো বিখ্যাত।

একই সাথে দক্ষতা এবং বাণিজ্যের দিক দিয়েও এগিয়ে আছে এই দেশটি। হাজার বছর ধরে প্রচুর যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ার পরেও জাপানের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো এখনো সংরক্ষিত রয়েছে, কয়েকটির পুনঃসংস্কারও করা হয়েছে। নিঃসন্দেহেই জাপান যাত্রা যে কারোরই স্মরণীয় ভ্রমণ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সূর্যোদয়ের দেশের সেরা কয়েকটি নিদর্শন নিয়ে আলোকপাত করা হলো।

মাউন্ট ফুজি

নিঃসন্দেহেই জাপানের সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন রাজসিক উচ্চতার মাউন্ট ফুজি। ৩,৭৭৬ মিটার উচুঁ এই পর্বতটি জাপানের সবচেয়ে উচ্চ পর্বত চূড়াও। এটি এতই উচুঁ যে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টোকিও থেকেও এটিকে দেখা যায়। শত শত বছর ধরেই মাউন্ট ফুজিকে শিল্প কলার অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরা হয়। এজন্যেই ২০১৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড কালচারাল সিগনিফিক্যান্সের মর্যাদা দিয়েছে। ফুজি-হাকোন-ইযু ন্যাশনাল পার্কের অংশ মাউন্ট ফুজির চূড়ায় প্রতি গ্রীষ্মেই প্রায় মিলিয়নখানেক পর্যটক আরোহণ করে।

চূড়ায় আরোহণটিকে তীর্থ যাত্রার অংশ হিসেবেই মানা হয় এবং এই যাত্রার সমাপ্তি ঘটে পর্বত চূড়া থেকে সূর্যোদয় দেখার মাধ্যমে। যদিও আরোহীদের একটা অংশ পর্বতের গোড়া থেকেই যাত্রা শুরু করে, তবে বেশির ভাগ আরোহীই যাত্রা শুরু করে পর্বতের মাঝামাঝিতে থাকা ফিফথ স্টেশন থেকে। ফিফথ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করতে প্রায় ছয় ঘন্টার মতো সময় লাগে। অবশ্য অনেকের কাছেই আরোহণ করার চেয়ে কাছ থেকে দেখতে পাওয়া বা দ্রুতগামীর ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া দৃশ্যটাই যথেষ্ট।

মাউন্ট ফুজিকে শিল্প কলার অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরা হয়; Image source: planetware.com

ইম্পেরিয়াল টোকিও

দেয়াল এবং পরিখায় ঘিরে থাকা সপ্তদশ শতাব্দীর সৌন্দর্য্যময় পার্কে থাকা ইম্পেরিয়াল প্যালেসই টোকিওর সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন। নিঃসন্দেহেই জাপানের রাজধানীতে ঘুরতে গেলে এই জায়গাটা অবশ্যই দেখা উচিত। যদিও প্যালেসের বড় একটা অংশই জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত নয়। প্রাসাদটিতে এখনো সম্রাটের পরিবার বাস করে। তবে এতে হতাশ হবার কিছু নেই। পার্কে হাঁটতে বেরুলেই দেখার মতো অনেক কিছু পাওয়া যাবে।

প্রাসাদের ভিউ দেখা ছাড়াও দেখার মতো রয়েছে পার্কের সাথে যুক্ত থাকা বিখ্যাত নিজুবাশি ব্রিজ বা ডাবল ব্রিজ। এছাড়াও অর্গানাইজড ট্যুরের সাথে গেলে ইস্ট হিগাশি-জিওয়েন গার্ডেনসহ আরো বেশ কিছু অংশ ঘুরে দেখার অনুমতিও পাওয়া যাবে। ইম্পেরিয়াল প্যালেস ছাড়াও টোকিওতে ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে জিঞ্জা শপিং ডিস্ট্রিক্ট। কাবুকি নৃত্য দেখার জন্য কাবুকি-যা থিয়েটার রয়েছে এখানে, এছাড়াও আযুমা-ওডোরি নৃত্য এবং বুনরাকু পারফরম্যান্স উপভোগ করার শিমবাশি এনবুজো থিয়েটারও রয়েছে এখানে।

ইম্পেরিয়াল প্যালেকেন এবং নিজুবাশি ডাবল ব্রিজ; Image source : planetware.com

হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক

১৯৪৫-এর আগস্টে হিরোশিমাতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতা নিয়ে আর নতুন করে বলার মতো কিছু নেই। তবে শহরটা পৃথিবীর পারমাণবিক আক্রমণটাকে কীভাবে স্মরণ করে রেখেছে সেটা নিয়ে বলার অনেক কিছুই রয়েছে। বিশেষ করে ঐ ঘটনার পর হিরোশিমা যে রকম শান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে তা নিয়ে বলতেই হবে। প্রতিবছরই বাইরের দেশ থেকে প্রায় মিলিয়নের মতো ভ্রমণকারী ঘুরতে আসে এই শহরে।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের ঠিক কেন্দ্রেই গড়ে উঠেছে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কটি। এক সময় এই জায়গাটিই ছিল ব্যস্ত একটি নগরী। পার্কে রয়েছে অসংখ্য স্মৃতিস্তম্ভ, স্মারক এবং ঐ দিন কালের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বেশ কিছু মিউজিয়াম। রঙ-বেরঙের চেরিফুল ফুটে থাকা বাগান ছাড়াও পার্কের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি হচ্ছে পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম। যেখানে সবসময়ই বিশ্ব শান্তির সাথে সম্পর্কিত ইস্যুগুলোর প্রদর্শনী করা হয়। এছাড়াও রয়েছে মেমোরিয়াল সেনোতাফ অ্যান্ড দ্য ফ্লেম অফ পিস, যেটি পারমাণবিক বোমার গম্ভুজ বা অ্যাটম বম্ব ডোম নামেও পরিচিত। এটি আসলে বিস্ফোরণের কেন্দ্রে থাকা একটি প্রশাসনিক দালানের ধ্বংসস্তুপ।

হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক; Image source : planetware.com

মন্দির শহর: নারা

শত শত বছর ধরে জাপানের সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে আছে সৌন্দর্য্যমন্ডিত শহর নারা। শহরটিতে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক দালান, সাথে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ন্যাশনাল ট্রেজার এবং শিল্পকর্ম। অসংখ্য ঐতিহাসিক সড়ক ছাড়াও শহরটি ভরে আছে প্রচুর পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো মন্দিরে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সপ্তম শতাব্দীর কফুকু-জি টেম্পল।

শত শত বছর ধরে জাপানের সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে আছে সৌন্দর্য্যমন্ডিত শহর নারা; Image source: planetware.com

এটি অবশ্য সেভেন গ্রেট টেম্পলস অফ নারা নামেই পরিচিত। রয়েছে ৭৪৯ সালে নির্মিত অষ্টম শতাব্দীর চোখ ধাঁধানো টোডা-জি বা গ্রেট ইস্ট টেম্পল। বুদ্ধের বিশাল আকৃতির ব্রোঞ্জের মূর্তি দাইবুতসুর জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে মন্দিরটি। এছাড়াও টোডা-জিতে আগ্রহ জাগানোর মতো রয়েছে ১৮টি কলামের ওপর ভর করে থাকা দ্বিতল ভবন গ্রেট সাউথ গেইট (নান্দাইমন)। আর মন্দির এই প্রবেশ পথটিকে অবিরত পাহারা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে আট মিটার উঁচু দুটো নিও মূর্তি। আর এখানে থাকা হলো অফ দ্য গ্রেট বুদ্ধ হলো কাঠে নির্মিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দালান।

Feature image source : planetware.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গাজীপুরে যা কিছু আছে ঘুরে দেখার মতো

অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্তের মধুপল্লী