আরব আমিরাতের শ্রেষ্ঠ আমিরাত দুবাইয়ের কিছু বিখ্যাত স্থান

যখন আমি খুব ছোট, তখন থেকেই আমার ফুপাতো বোন দুবাই থাকে। সে সময়ে ভাবতাম, দুবাই বুঝি একটা দেশের নাম। যেমনটি ভাবতাম লন্ডনের ক্ষেত্রে। আমার মতো এমন অনেকেই আছেন হয়তো। আসলে দুবাই হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশ।

এটি পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরে আরব উপদ্বীপে অবস্থিত। উপসাগর এবং মরুভূমি – এই দুটো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও দুবাইয়ে ঘোরার মতো অনেক জায়গা আছে। তাই তো দুবাইয়ের প্রধান রাজস্ব আয়ের মধ্যে অন্যতম শিল্প হলো- পর্যটন শিল্প। আসুন দেখে আসি দুবাইয়ের কিছু বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান।

বুর্জ খলিফা

দুবাই শহরের ল্যান্ডমার্ক বিল্ডিং বুর্জ খলিফা। ৮২৯.৪ মিটার উচ্চতার এই দালানটি শুধু এই শহরেরই নয়, বরং বিশ্বেরই সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্রগুলোর একটি। শহরের ভ্রমণকারীদের জন্য বুর্জ খলিফার ১২৪তম তলায় থাকা অবজার্ভেশন ডেকে অবশ্যই অবশ্যই যাওয়া উচিৎ। শহরের আকাশচূড়া থেকে বার্ডস-আই ভিউয়ে নিচের দিকের দৃশ্যটা একদম হাঁ হয়ে যাওয়ার মতো।

এই অবজার্ভেশন ডেকে যেতে হয় এলিভেটরে করে। আর এই এলিভেটর ভ্রমণটাও ফেলনা নয়। এলিভেটরে করে যাওয়ার সময় দেখার সুযোগ থাকে দুবাই এবং বুর্জ খলিফা নিয়ে তৈরি করা কিছু মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন। আর এরপর মোহনীয় অবজার্ভেশন ডেক থেকে দেখতে পাওয়া যায় পুরো দুবাই শহরের ৩৬০-ডিগ্রি ভিউ, যেটার একপাশে রয়েছে ধুধু মরুভূমি, আর অন্যপাশে পারস্য উপসাগর। ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ থাকলে এই ভ্রমণটা করা উচিৎ রাতের বেলায়। রাতের বেলায় আলোকোজ্জ্বলতার জন্য বিখ্যাত দুবাই শহরের মোহনীয় এক দৃশ্যপট পাওয়া যায়।

এ তো গেলো ওপরের দিকের কথা। বুর্জ খলিফার নিচের দিকের পুরোটা অংশই ঘিরে রেখেছে সুসজ্জিত, মোহনীয় কয়েকটি বাগান, সেই সাথে রয়েছে পায়ে হেঁটে চলার রাস্তাও। এছাড়াও এখানে প্রচুর পরিমাণ পানির ফোয়ারাও রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দুবাই ফাউন্টেইন। পৃথিবীরত সবচেয়ে দীর্ঘ কার্যকর পানির ফোয়ারা এটি। এর নকশা করা হয়েছে লাস ভেগাসের বেলাজিও ফোয়ারাগুলোর অনুকরণে।

রাতের বুর্জ খলিফা। সোর্স: বৃষ্টি

দুবাই মল

দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান মল এটি। এছাড়াও বুর্জ খলিফা এবং দুবাই একুরিয়ামে যাওয়ার একটি প্রবেশ পথও বটে। আনন্দভ্রমণের জন্য এখানে রয়েছে আইস স্কেটিং রিঙ্ক, গেমিং জোন এবং সিনেমা কমপ্লেক্স। এখানে সর্বক্ষণই শপিং এবং খাওয়া-দাওয়ার দোকানগুলো খোলা থাকে।

আর বলতে গেলে প্রায় সবসময়ই লাইভ মিউজিক বা ফ্যাশন শোয়ের মতো স্পেশাল ইভেন্ট চলতে থাকে এই মলে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দুবাই শপিং ফেস্টিভাল এবং জুলাই-আগস্টের দুবাই সামার সারপ্রাইজেস।

দুবাই মল। সোর্স: planetware.com

দুবাই জাদুঘর

আল-ফাহিদি দুর্গে গড়ে উঠেছে দুবাইয়ের এই চমৎকার মিউজিয়ামটি। দুবাই খাঁড়ির প্রতিরক্ষার জন্য ১৭৮৭ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল এই দুর্গটি। দুর্গের দেয়ালগুলো তৈরি করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কোরাল-ব্লক এবং চুন বা কলিচুন দিয়ে। এর সবচেয়ে ওপরের তলাটির ভার বহন করে রেখেছে কিছু কাঠের পোল এবং এর সিলিংটা তৈরি করা হয়েছে পাম গাছের পাতা, কাদা এবং প্লাস্টার দিয়ে।

নির্মাণের পর থেকে এই দুর্গটি শাসক পরিবারের বাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৭১ সালে এর সংস্কার করা হয়েছে একবার। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে আরেকবার বিস্তারিতভাবে সংস্কার করা হয়েছে এখানে। বর্তমানে এটাই এই শহরের প্রধান জাদুঘর। এর প্রবেশপথে রয়েছে আমিরাত এবং দুবাইয়ের পুরনো আমলের কিছু ম্যাপ, যেগুলো দেখলেই বোঝা যাবে তেল বিপ্লবের পর থেকে এই অঞ্চলগুলো কতটা বিস্তৃতভাবে বর্ধিত হয়েছে।

এর চত্বরে রেখে দেওয়া আছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী নৌকা এবং আমিরাতি উইন্ড-টাওয়ারসহ একটা পাম-পাতায় তৈরি বাড়ি। এর ডানদিকে হলটিতে রয়েছে অস্ত্রের প্রদর্শনী এবং বামদিকের হলটিতে রয়েছে আমিরাতের কিছু সংগীত বাদ্যযন্ত্র।

দুবাই জাদুঘর।  সোর্স: planetware.com

দুবাই খাঁড়ি

দুবাই খাঁড়ি শহরটাকে দুইভাগে ভাগ করে রেখেছে। শহরের উত্তরদিকের অংশটার নাম দেইরা এবং দক্ষিণ দিকের অংশটার নাম বুর দুবাই। শহরের উন্নয়নের পেছনে এই খাঁড়িটির বেশ বড় ভূমিকা রয়েছে। মাছ ধরা এবং মুক্তা শিকারিদের প্রধান আকর্ষণ এই জায়গাটা। খাঁড়ির কোল ঘেঁষে থাকা ছোট গ্রামগুলোর বেশ কয়েকটি গড়ে উঠেছে প্রায় চার হাজার বছর আগে।

আর আধুনিক যুগে ১৮৩০ সালের দিকে এখানে বসতি স্থাপন করেছে বানি ইয়াস জাতি। ধৌ জেটির অবস্থানটা দুবাই খাঁড়ির একদম তীর ঘেঁষেই আল-মাকতৌম ব্রিজের উত্তর দিকে। উপসাগর দিয়ে পারাপার করা বনিকেরা এখনো এই জেটিটি ব্যবহার করে। এদের কিছু কিছু শিপের নোঙ্গরগুলো প্রায় শতবর্শী পুরনোও হয়ে থাকে মাঝেমধ্যে। ঘুরতে গেলে এখানে একবার যাওয়াই যায়।

গেলে জেটিতে দিনব্যাপী কার্গো লোডিং-আনলোডিং’র দৃশ্য দেখতে পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। জাহাজের কর্মীরা মাঝেমধ্যে অতিথিদের শিপ ঘুরে দেখানোর জন্যও আমন্ত্রণ জানায়। এখান থেকে শিপগুলো বেশিরভাগ সময়ই যাত্রা করে কুয়েত, ইরান, ওমান, ভারত এবং আফ্রিকা মহাদেশে। দুবাইয়ের প্রাচীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র একটি স্মৃতিস্মারক হয়ে আছে খাঁড়িটি, শুধু স্মারকই না, ক্ষুদ্র পরিমাণ হলেও অবদান রাখছে দুবাইয়ের আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাতে। ভ্রমণের জন্য খুবই চমৎকার একটি গন্তব্য এটি।

দুবাই খাঁড়ির জেটিতে থাকা নৌকা সমূহ। সোর্স: planetware.com

জামেরা মসজিদ

জামেরা মসজিদটিকে দুবাইয়ের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি তৈরি করা হয়েছে কায়রোর আল-আযহার মসজিদের পুরোপুরি অনুকরণ করে, তবে কায়রোর ঐ মসজিদটি এই মসজিদের থেকে প্রায় আটগুণ বড়। জামেরা মসজিদ ইসলামিক স্থাপত্যশিল্পের চমৎকার একটি নিদর্শন। পাথরের এই স্থাপত্যটি তৈরি করা হয়েছে মধ্যযুগীয় ফাতেমীয় ঐতিহ্যের আদলে, রয়েছে দুটো মিনার যেটা এই মসজিদের পাথর শিল্পের পুরো বিবরণটাই তুলে ধরেছে। এটাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে সন্ধ্যায় ফ্লাডলাইটের আলোতে।

শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ সেন্টার ফর কালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এখানে ঘুরতে আসা অতিথিদের মসজিদ পরিভ্রমণের গাইড এবং তাদের কাছে মুসলিমদের বিশ্বাসের ভিত্তির ধারণাটাও বোঝানোর কাজ করছে। (এছাড়াও সংস্থাটি ভ্রমণ, লেকচার, আরবি শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক খাদ্যাভাস বোঝানোর ব্যাপারেও কিছু প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত)। শুক্রবার ব্যতীত এখানে ভ্রমণের সময় প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে।

জামেরা মসজিদ। সোর্স: planetware.com

ফিচার ইমেজ: planetware.com

সোর্স: https://www.planetware.com/tourist-attractions-/dubai-uae-dub-dubai.htm

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের জমসম ভ্রমণ

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের কাঠমান্ডু ভ্রমণ