পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: প্রথম দিনের নগর ভ্রমণ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ প্রহর গুনতে শুরু করেছি। সবাইকে খুব ঘটা করে জানিয়ে দিলাম আর কোনো ভ্রমণে বের হচ্ছি না আগামী ২-৩ বছরের জন্য। কিন্তু কাছের বন্ধুরা সব ভ্রমণ-পাগল। আজকে কেরালা তো কালকে উত্তরাখন্ডের ভয়ংকর সব ট্রেকিং, পরশু মেঘালয় নিয়ে হাজির হয় তারা প্রতিদিন। আমি বরাবরের মতো তাদের নিরাশ করি।

এক ছুটিতে বাসায় যাই মাঝখানে, মা কানের সামনে শুনিয়ে বলছে, “অনেক তো ঘুরো একা একা, এইবার আমাদেরও নিয়ে যাও!” ছোটবোনটা কোথা থেকে উড়ে এসে বললো “কলকাতা, কলকাতা!” আমি বাজেট কত লাগতে পারে তার একটা ধারণা দিয়ে ক্যাম্পাসে চলে আসি। আমার পরীক্ষা চলাকালীন বাসা থেকে জানানো হয়, তারা যেতে রাজি আছে। উদ্দেশ্য তীর্থযাত্রা, গন্তব্য গয়া এবং বেনারস। আমার ফাইনালের পর এমনিতেও ২৫ দিনের বন্ধ, তাই গয়া-বেনারসের একটি খসড়া পরিকল্পনা করে ট্রেনের টিকেট কেটে ফেললাম শিয়ালদাহ-গয়া, গয়া-বেনারস আর বেনারস-হাওড়ার।

সকালের গয়া, ছবিঃ লেখক

টিকেট কাটার পর খুব ব্যস্ত হয়ে গেলাম পরীক্ষা নিয়ে। ভারত ভ্রমণের তারিখ ছিল আমাদের ১৪ আগস্ট, ২০১৮। ১৪ তারিখের আগ পর্যন্ত এতই ব্যস্ত ছিলাম পরীক্ষার আগে করা টাকার খসড়া বাদে কোনো পরিকল্পনাই করা হয়নি। এমনিতে নেটে গয়া সম্পর্কে তেমন কিছু পেলাম না, যা পেলাম তা দিয়ে শুধু বেনারস ঘোরা যাবে।

চিন্তা হচ্ছিল খুব, এমনিতে ছেলেপেলে গেলে সমস্যা হয় না, কিন্তু ফ্যামিলি নিয়ে ভ্রমণ করতে গেলে মাথায় সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটিই রাখতে হয়। চিন্তা করতে করতেই ভ্রমণের আগের রাতটি পার হয়ে গেল।

বিষ্ণুপদ মন্দির, ছবিঃ লেখক

১৪ আগস্ট আমরা খুলনা থেকে বেনাপোল হয়ে রওনা দেই শিয়ালদাহর উদ্দেশ্যে। শিয়ালদাহ থেকে রাত ১০:৫৫ মিনিটে গয়ার ট্রেন ছিল আমাদের। ট্রেনের নাম “শিয়ালদাহ আজমির এক্সপ্রেস”। শিয়ালদাহ থেকে গয়ার ভাড়া নিয়েছিল প্রতিজন ৩০০ রুপি। শিয়ালদাহ নেমে খাওয়া-দাওয়া করে নিলাম সবাই। সময় যেহেতু আছেই তাই বিগ বাজারে ঢুঁ মারলাম রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত।

আমাদের ট্রেন ঠিক ১০:৫৫ তে “৯এ” প্লাটফর্ম থেকে ছেড়ে দিল। সারাদিন ধরে ভ্রমণ করছি তাই উঠেই শোবার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম এবং ঘুমিয়েও গেলাম তাড়াতাড়ি। মাঝখানে টিটি এসে টিকেট চেক করে গিয়েছেন। ঘুম ভাঙল আমার সকাল সাড়ে পাঁচটায়। ট্রেনটি গয়া পৌঁছায় ঠিক সকাল ৬:১৫ তে।

বৌধগয়ায় উট দর্শন, ছবিঃ লেখক

আমরা ট্রেন থেকে নেমে প্রথমে এক আশ্রমে গিয়ে উঠেছিলাম, আশ্রমের পরিবেশ দেখে আমাদের কারোরই তেমন পছন্দ না হওয়ায় আধ-ঘন্টার ভেতর স্টেশনের পাশেই “হোটেল পৃথিবী”তে গিয়ে উঠি।

গয়াতে দুইদিন থাকার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। খুব সস্তায় মোটামুটি মানের নন-এসি রুম পেয়ে গেলাম, প্রতি রুমের জন্য প্রতিদিন দিতে হবে ৪৫০ রুপি। আমরা ৫ জন দুটো রুম নিয়ে নিলাম দুই দিনের জন্য।

বৌধগয়ার বিখ্যাত জাপানিজ মন্দির, ছবিঃ লেখক

গয়াতে ঘুরতে সবচেয়ে সুবিধাজনক যানবাহন হলো বেবিট্যাক্সি। এখানকার বিখ্যাত জায়গাগুলো হলো বিষ্ণুপদ মন্দির, বৌধগয়া আর মঙ্গলগিরি। নিশ্চয়ই ভাবছেন মাত্র তিনটি জায়গা? উপরের তিনটির দুটো দেখে শেষ করতেই আমাদের বিকেল ৪টা বেজে গিয়েছিল।

গয়ার কথা শুনলে আমরা অধিকাংশই মনে করি গয়া মূলত হিন্দুদের পূণ্যস্থান যেখানে তীর্থযাত্রার জন্য শুধু হিন্দুরা আসে। গয়া আসার আগে আমিও এমনটাই ভাবতাম। তবে গয়া এসে বুঝেছি এটি আসলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য স্বর্গ। কেন আমার এমন উপলব্ধি তা একটু পরেই বুঝে যাবেন।

বৌধগয়ার অনন্য মন্দির, ছবিঃ লেখক

হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে সকাল নয়টার দিকে বের হয়ে নাস্তা সেরে নিলাম আমরা। গয়া বিহার অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত। তাই এখানে একদম শতভাগ নিরামিষ খাবার-দাবারের চল। মাছ-মাংসের পাশাপাশি বিহারে আরেকটি জিনিস একদম নিষিদ্ধ, তা হলো যে কোনো প্রকার হার্ড ড্রিংকস এবং অ্যালকোহল। পুরো ভারতবর্ষে মনে হয় এই একটি জায়গা যেখানে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ। যাই হোক, নাস্তা শেষ করে একটা বেবিট্যাক্সি ডেকে ১৫ রুপি দিয়ে প্রথমে চলে গেলাম বিষ্ণুপদ মন্দিরে। খুব বেশিক্ষণ লাগলো না মন্দিরে যেতে।

বেশ বড়সড় মন্দির বিষ্ণুপদ মন্দির। গয়ার বিখ্যাত হিন্দু মন্দির এটি যেখানে হিন্দু ব্যতীত অন্য সবার প্রবেশ নিষেধ। কালো পোড়ামাটির তৈরী বিশাল এই মন্দিরটি মূলত কালী মন্দির। মন্দিরটির ভেতরে অন্ততপক্ষে আরো ১৫টি মন্দির রয়েছে। এই মন্দিরে হিন্দুদের চিরায়ত প্রয়াত মানুষদের নামে “পিন্ড দান” করা হয়। প্রচুর সন্ন্যাসীর ঠিকানা এই বিষ্ণুপদ মন্দির। মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে বয়ে চলেছে “ফালগু” নদী।

বিষ্ণুপদ মন্দির থেকে বের হয়ে আমরা একটা বেবিট্যাক্সি ঠিক করলাম বৌধগয়া ঘুরে বেড়ানোর জন্য। ভাড়া ঠিক হলো ৩০০ রুপি। বৌধগয়া হলো বুদ্ধদেবের মন্দির নিয়ে গড়া বিশাল এক এলাকা। ধারণা করা হয় পরম গৌতম বুদ্ধ এখানেই বুদ্ধত্ব লাভ করেন। পুরো বৌধগয়া ঘুরতে সময় লাগে পাক্কা ৩-৪ ঘণ্টা। গয়া মূল শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৌধগয়া। ভারত সরকারের পাশাপাশি সেখানে মন্দির নির্মাণ করেছে জাপান, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মিয়ানমার সহ বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র।

প্রতিটি মন্দিরে আছে অপূর্ব সব দেয়ালিকা, ছবিঃ লেখক

গয়ায় আসার আগে জানতামই না বৌধগয়া নামের কোনো জায়গার অস্তিত্ব আছে আর আরো বেশি ভালো লাগলো যখন নানা কারুকাজে সাজানো বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পবিত্রতায় আর সৌন্দর্যে মন ছুঁয়ে যেতে লাগলো। সবচেয়ে ভালো বিষয় হচ্ছে আপনাকে হেঁটে কষ্ট করে মন্দিরে মন্দিরে যেতে হবে না, বেবিট্যাক্সিই নিয়ে যাবে মন্দিরগুলোর প্রধান ফটকে।

গয়া থেকে রওনা দিয়ে বৌধগয়া পৌঁছে গেলাম আধঘণ্টার ব্যবধানে। প্রথমে ট্যাক্সিওয়ালা নিয়ে গেল “দ্য গ্রেট বুদ্ধ স্ট্যাচু”তে। ট্যাক্সি থেকেই বিশাল বৌদ্ধ মূর্তির পেছনের অংশটা দেখে অবাক হয়েছিলাম, সামনে থেকে যখন দেখলাম তখন মনে হলো গয়ায় আসা সার্থক আমার। দৈর্ঘ্য আর প্রস্থে মিলিয়ে বিরাট এলাকার অসাধারণ একটি জায়গা এই কমপ্লেক্সটি। গয়ার “দ্য গ্রেট বৌদ্ধ স্ট্যাচু” নির্মাণকারী দেশ হলো জাপান। বেশ নিপুণতার চিহ্ন রেখে গেছে তারা পবিত্র বুদ্ধদেবের প্রতিকৃতির প্রতিটা কোণায়।

মিয়ানমার বৌদ্ধ মন্দির, ছবিঃ লেখক

“দ্য গ্রেট বুদ্ধ স্ট্যাচু” থেকে বের হয়েই দেখা হয়ে গেল গুপ্ত মনের সুপ্ত ইচ্ছে মরুভূমির জাহাজ রাজস্থানি উটের সাথে। রাজস্থানের গরম বালিতে উটের পিঠে চড়ার ইচ্ছে আমার বহুদিনের। আগামীতে সে ইচ্ছে পূরণ করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে গেলাম দশ কদম।

ঠিক দশ-বারো কদম দূরেই আছে আরেকটি বৌদ্ধ মন্দির। এটিও জাপানের তৈরী। জাপানিজ আর হিন্দি ভাষায় প্রতিটি মন্দিরের নাম লেখা থাকায় সাইনবোর্ড পড়ে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তবুও মন্দিরের নির্মলতা আর বিশুদ্ধ সৌন্দর্য মনকে ঠাণ্ডা করে দিচ্ছিল বারবার।

প্রতিটি মন্দিরের রয়েছে নিজস্বতা, ছবিঃ লেখক

এক একটা বুদ্ধ মন্দির একেক ধাঁচে বানানো। প্রতিটা মন্দির দেখার সময় মনে হবে আগের মন্দির থেকে একদম আলাদা এবং নিজস্বতায় স্নিগ্ধ সুন্দর।

থাই বৌদ্ধ মন্দির, ছবিঃ লেখক্য

কিছু কিছু মন্দিরের ভেতরের দেয়াল বুদ্ধদেবের জীবনী নিয়ে সাজানো যা নিজের চোখে না দেখলে এর সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। কেউ যদি নাও জেনে থাকে গৌতম বুদ্ধ কে এবং কেন তবে এই দেয়ালগুলোই যথেষ্ট তাকে পবিত্র বুদ্ধজ্ঞানে জ্ঞানান্বিত করার জন্য।

কিছু কিছু মন্দিরের দেয়াল আবার ত্রিমাত্রিক সাজসজ্জায় সাজানো। প্রতিটা দেয়াল যেন জীবন্ত, কথা বলে গৌতম বুদ্ধ নিয়ে, তাঁর জীবনাচরণ আর শিক্ষা নিয়ে।

থাই মন্দিরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, ছবিঃ লেখক

শেষের দিকে আমরা থাইল্যান্ডের বানানো বুদ্ধ মন্দিরের গেলাম। মন্দিরের ফটকের কাছে ড্রাগনের প্রতিকৃতি আর ভারত-থাই প্রধানমন্ত্রীদের মেলবন্ধনের স্মারক জানান দিচ্ছিল আমরা থাই বুদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করেছি। সোনালি বুদ্ধ প্রতিকৃতি আর ভেতরকার সাজসজ্জা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিলো আমাদের। প্রতিটা মন্দিরেই একটু সময় নিয়ে ঘুরে দেখলাম।

সবশেষে গেলাম মহাবোধি মন্দিরে। ট্যাক্সিওয়ালাই নিয়ে যাবে সব জায়গায়। মহাবোধিতে মোবাইল ফোন একদম নিষিদ্ধ। তবে চাইলে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া যায় যার জন্য খরচ করতে হবে ৫০০ রুপি। মোবাইল ফোনগুলো মন্দির কর্তৃপক্ষের লকারে রাখার ব্যবস্থা আছে ফ্রিতে। লকারে রেখে চলে গেলাম ভেতরে। মন্দিরের কড়াকড়ি ব্যবস্থার জন্য ভেতরকার সাজসজ্জা আর অত্যন্ত সুন্দর পবিত্র বৌদ্ধ প্রতিকৃতি আর “বুদ্ধ গাছ” যার নিচে গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্বলাভ করেছিলেন তা দেখাতে পারছি না।

তবে আমার মনে হয়েছে এ পর্যন্ত যতগুলো মন্দির দেখেছি তাদের মধ্যে এটা সেরাদের সেরা।

মহাবোধী মন্দির, ছবিঃ লেখক

গয়ার নগর ভ্রমণ করতে করতে আমাদের বিকেল ৪টা বেজে যায়। তাই আর মঙ্গলগিরি যাইনি। বেবিট্যাক্সি করে ফিরে আসি স্টেশন রোডে, আমাদের হোটেলে। আজকে আর হাতে কোনো কাজ নেই,আগামীকাল খুব ভোরে রওনা দিবো রাজগিরের উদ্দেশ্যে। রাজগির গয়া থেকে প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার দূরের এলাকা, সেখানেও আছে দেখার অনেক কিছু। সে গল্প নিয়ে আসছি পরের লেখায়। ভ্রমণ হোক প্রাঞ্জল।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারত ভ্রমণের আগেই যে কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে

পুণ্যস্থান বেনারস কাব্য: সন্ধ্যা-আরতির মায়া