পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: রাজগিরির পথে পথে

গয়া-বেনারস ভ্রমণের প্রথম দিন পার হয়ে গেল গয়ার নগর ভ্রমণ করতে করতে। গয়াতে দুইদিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি আমি এবং আমার পুরো পরিবার। দেশের বাইরে এই প্রথম পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা। এমনিতেই দায়িত্ব নিতে আমি বরাবরই অপরাগ, তার উপর বাড়ির বড় ছেলে। ভারতীয় ট্রেনের টিকেট কাটা থেকে শুরু করে ভারতে আসার পর থেকে পুরো পরিবারের যাবতীয় খরচের দায়িত্ব আমার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

গয়া সম্পর্কে একদম শূন্য জ্ঞান নিয়ে এসে প্রথম দিন বেশ ভালই ঘুরে নিলাম এখানকার বিখ্যাত জায়গাগুলো। গয়া থেকে বেনারসের ট্রেন ছিল একদিন পর। মাঝখানের একদিন ঠিক কোথায় যাবো, আদৌ যাবো কিনা না রুমে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হোটেলের স্টাফ জানালো, “স্যার, আপ পাটনা অওর রাজগির চ্যালে যাইয়ে, আচ্ছা হোগা!”

রাজগিরের পথে, ছবিঃ লেখক

আমি একা হলে বা ছেলেপেলে সঙ্গে আসলে পাটনাই যেতাম। কিন্তু যেহেতু পরিবার এসেছে তীর্থ করতে তাই ধর্মীয় স্থান রাজগিরই পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে ঠিক করে ফেললাম। গয়ার বিষ্ণুপদ মন্দির আর বৌধগয়া ঘুরে হোটেলে ফিরে এসে কীভাবে রাজগির যেতে হয় তার একটা পরিষ্কার ধারণা নিয়ে নিলাম হোটেল স্টাফ থেকে। রাতে রুটি-আলুর দম আর আলুভাজি দিয়ে নিরামিষ ভোজ করে ঘুমিয়ে গেলাম কারণ পরদিন সকাল ৬টায় রাজগিরের বাস।

ভেনু ভান, ছবিঃ লেখক

গয়ার “নদী পাড়” থেকে রাজগিরের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায় প্রতি ২০ মিনিট পর পর। তবে বিহারীদের ভাষায় “একদাম প্রেম সে” যদি ঘুরতে চান তবে সকাল সকাল প্রথম বাসটা ধরাই ভালো। স্টেশন থেকে নদীপাড় যেতে বেবিট্যাক্সির জনপ্রতি ভাড়া ১৩ রুপি। সেখান থেকে রাজগির যাওয়ার বাসে উঠে পড়লাম আমরা।

গয়া থেকে সরাসরি বিহার যায় যে বাসগুলো সেগুলোতে চড়ে বসাই সবচেয়ে উত্তম, নাহলে রাজগির যাবার আগেই মাঝপথে নামিয়ে দেবে। গয়া থেকে রাজগিরের ভাড়া জনপ্রতি ৬০ রুপি। সময় লাগে ২ ঘণ্টা। রাস্তা বেশ ভালো আর নতুন হওয়ায় সকালের বাস ভ্রমণটা বেশ আরামদায়ক ছিল।

রাজগির মন্দির, ছবিঃ লেখক

আমরা রাজগির পৌঁছে যাই সকাল ৮টার দিকে। বাসের হেল্পারকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম কোথায় কোথায় কীভাবে ঘুরবো। উনারা জানালেন, যেখানে বাস থামাবে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তিনটি জায়গা দেখা হয়ে যাবে। আর বাকি জায়গাগুলো ঘোড়ার গাড়িতে যেতে হবে। এখানকার ঘোড়ার গাড়িগুলোকে “টাংগা” বলে।

টাংগা, ছবিঃ লেখক

আমরা বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চলে গেলাম “ভেনু ভান” এ। ভেনু ভান মূলত একটি বৌদ্ধ পার্ক বিশেষ। বিদেশীদের থেকে যেখানে ১০০ রুপি করে টিকেটের দাম রাখে সেখানে ভারতীয়দের জন্য তা মাত্র ১০ রুপি। তাই কিছুক্ষণের জন্য ভারতীয় হয়ে টিকেট কেটে নিলাম পাঁচ জনের ৫০ রুপিতে। ভেতরে ঢুকেই একদম সামনেই একটি বৌদ্ধ-মন্দির পড়বে। গয়ার চিরায়ত বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর মতোই এটি।

বৌদ্ধ মন্দির থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই পার্ক, মাঝখানে সুবিশাল এক পুকুর দুটো ঘাট দিয়ে বাঁধানো। দুটো ঘাটের কাছেই পুকুরের পানি উপরে ছুঁড়ে দিয়ে নান্দনিকতা বাড়ানোর জন্য ফোঁয়ারার ব্যবস্থা করা আছে। পুকুরে আছে বিশাল সাইজের কাতলামাছ আর রাজহাঁস। কিছুক্ষণ বসে শান্ত মনে শান্তি উপভোগ করার জায়গা এটি।

শান্তি স্তুপায় যাওয়ার ক্যাবল কার, ছবিঃ লেখক

ভেনু ভান থেকে বের হয়ে চলে গেলাম এখানকার সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দিরে। আসলে এটি একটি মন্দির কমপ্লেক্স মানে অনেক মন্দিরের সমন্বয়ে তৈরী এটি। হনুমান মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির, কালী মন্দির সহ বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির রয়েছে এখানে। আছে পুণ্যস্নানের সুযোগ।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে জিনিসটা চোখে ধরা পড়েছে তা হলো এখানকার অপরিষ্কারতা। মন্দির বিশাল হলেও দর্শনার্থীরা এর পবিত্রতা ধরে রাখতে পারেনি। মন্দির কর্তৃপক্ষেরও সেদিকে দৃষ্টিপাত করার সময় নেই মনে হলো। তবে দূর থেকে দেখতে বেশ লাগে মন্দিরগুলোকে।

রাজগির শান্তি স্তুপা, ছবিঃ লেখক

মন্দির থেকে বের হয়ে রাজগিরের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার দুইপাশে প্রচুর দোকান, দোকানে সাজানো আছে নানান ধর্মীয় জিনিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবার-দাবার। সকালের নাস্তাটা সেরে নিলাম পাঞ্জাবি এক ধাবায়। অল্প অল্প বাংলাও জানে তারা। পুরি, আলুর দম আর জিলাপি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। এক থালি নাস্তার দাম ২০ রুপি মাত্র।

নাস্তা সেরে বের হলাম ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করতে। বাসের হেল্পার বলে দিয়েছিলেন পুরো রাজগির ঘুরতে ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া লাগবে ১,০০০ রুপির মতো। পরে একজনের সাথে কথা বলে ৫৫০ রুপিতে ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করলাম। বেশ আমুদে এই ঘোড়ার গাড়ির ভ্রমনটি। বেশ টগবগে ছিল আমাদের ঘোড়াটি। চালকও বেশ ভালো মনে হলো, কয়বয়সী ছেলে। টুকটুক করে চলছে আমাদের ঘোড়ার গাড়ি, মোটামুটি ৬ জন আরামে বসতে পারে এখানে।

টগবগিয়ে চলছে টাংগা, ছবিঃ তীর্থ

প্রথমেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো রাজগির মূল এলাকা থেকে খুব কাছে মনসাঁ মন্দিরে। বহু প্রাচীন এই মন্দির যেমনভাবে বানানো হয়েছিল উপরে টিনের চাল আর লাল ইট দিয়ে ঠিক তেমনই রাখা হয়েছে এখনো। অনেকটা আমাদের দেশের কুমিল্লার ময়নামতির মতো। পাহাড় কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে আর নিচের বাগানকে সংরক্ষণ করা হয়েছে ভালো করে।

খুব গভীর এক গর্ত আছে মূল মন্দিরে যেখানে ধারণা করা হয় বিষধর সাপের আবাস রয়েছে। মনসাঁ মন্দির থেকে বের হয়ে ফের চড়ে বসলাম ঘোড়ার গাড়িতে। গন্তব্য বিশ্ব শান্তি স্তুপা। এর আগে নেপালের পোখরায় একটি বিশ্ব শান্তি স্তুপা দেখেছিলাম, রাজগিরের বাসের হেল্পার বলেছিলেন এখানে উঠতে পাহাড় চড়তে হয়। আমি ভাবছিলাম হেঁটে উঠতে গেলে তো সবাই পারবে না, তখনই ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে সকল চিন্তা দূর করলো ক্যাবল কার। এই শান্তি স্তুপায় যেতে পাহাড় চড়তে হয় ঠিকই, কিন্তু হেটে নয় ক্যাবল কারে।

জনপ্রতি ৮০ রুপি দিয়ে টিকেট কেটে দাঁড়িয়ে গেলাম লম্বা লাইনে। একসময় ক্যাবল কারে ওঠার পালা এলো। জীবনের প্রথম ক্যাবল কার, তাও আবার সিঙ্গেল চেয়ারের। আমাকে এবং আমার পরিবারকে নিয়ে তরতর করে উঠে গেল শান্তি স্তুপায়।

শান্তি স্তুপা থেকে ফেরার পথে, ছবিঃ লেখক

নেপালের পোখরায় সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সেখানকার বিশ্ব শান্তি স্তুপা বা ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা। কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে যখন রাজগিরের শান্তি স্তুপায় উঠলাম দেখলাম শতকরা ৮০ ভাগ মিলে যায় এটি নেপালের স্তুপাটির সাথে। শান্তি স্তুপাগুলো সাধারণত বিশাল জায়গা নিয়ে হয় আর মূল মন্দির হয় একদম ধবধবে সাদা পাথরে গড়া।

মাঝখানে পবিত্র বুদ্ধদেবের সোনালি প্রতিকৃতি পূর্ণতা দেয় মন্দিরটিকে। শান্তি স্তুপাগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো অনেক উপরে অবস্থিত হওয়ায় স্তুপাগুলো থেকে পুরো এলাকার বিশাল এক ল্যান্ডস্কেপ দেখা যায় প্রাণভরে।

ভিরায়াতান জাদুঘর, ছবিঃ লেখক

শান্তি স্তুপা থেকে আমরা চলে গেলাম “ভিরায়াতান” জাদুঘরে। এটি আসলে জাদুঘর নয়, গল্প কথক বলা যেতে পারে। ছোট ছোট পুতুল আর পাতলা কাঠ দিয়ে রাজ্যদরবার বানানো রয়েছে কাঁচের ভেতর। তারা গল্প বলে মহাবীর, বাহুবালী আর গৌতম বুদ্ধের। প্রতিটি কাঁচের বক্সের উপর কাহিনী লেখা আছে হিন্দি, ইংরেজী এবং বাংলায়। সময় নিয়ে পড়ে দেখলে যে কারো ভালো লাগতে বাধ্য এই জাদুঘরটি।

রাজগির বৌদ্ধ মন্দির, ছবিঃ লেখক

ভিরায়াতান থেকে আসার পথে হাতের বামের এক রাস্তা দিয়ে একটু এগিয়ে চলে গেলাম আরেকটি বৌদ্ধ মন্দিরে। নাম বলেছিল ঘোড়ার গাড়ি চালক, কিন্তু কোনো নাম লেখা নেই মন্দিরে। গতদিন গয়ার বৌধগয়ায় এমন অনেক মন্দির দেখেছি বলে আর সময় নিলাম না সেখানে, মূল রাজগিরে এসে সকালের পাঞ্জাবী ধাবাটায় দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম ভাত আর আলু-সবজী দিয়ে। এখানে এর চেয়ে ভালো কোনো অপশন নেই।

খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার ঘোড়ার গাড়িতে করে ১০ রুপি জনপ্রতি দিয়ে চলে গেলাম বাস স্ট্যান্ডে। বিকেল ৩টার বাসে উঠে বসলাম আর গয়া পৌঁছে গেলাম বিকেল সাড়ে ৫টায়। আগামীকাল ভোর ৬টায় বেনারস যাওয়ার ট্রেন ধরতে হবে। তাই রাতের খাবার খেয়েই ঘুম দিলাম সেদিনের মতো আর গয়া ভ্রমণ শেষ হলো অবশেষে।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুণ্যস্থান বেনারস কাব্য: সন্ধ্যা-আরতির মায়া

এক নজরে একটি জেলা: পাবনার ধর্মশালা