সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্ত: টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট এবং জাদুকাটা নদীর জাদু

বাংলাদেশের একটি বড় পর্যটন কেন্দ্র ধরে রেখেছে উত্তরের দিকে অবস্থিত বিভাগ সিলেট। সিলেটকে আমি নাম দিয়েছি জলের দেশ। এর প্রধান কারণ সিলেটের মূল সৌন্দর্য এর সুবিশাল পানির ভাণ্ডারকে ঘিরে আছে। মূলত পানিকে কেন্দ্র করেই এর বেশিরভাগ পর্যটন স্থান গড়ে উঠেছে। সিলেটের ভ্রমণস্থান এতই বেশি যে এ পর্যন্ত তিনবার সিলেট গিয়েছি তারপরও বাদ রয়ে গেছে ২টি ভ্রমণস্থান। আজ থেকে শুরু করি তাহলে সিলেট ভ্রমণের গল্প। গল্পটা শুরু হবে পেছন থেকে, মানে যে ট্যুরে সবার শেষে গিয়েছি গল্পের শুরু সেখান থেকে। শেষবার সিলেট গিয়েছি বাসা থেকে, গন্তব্য ছিল টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট আর জাদুকাটা নদী।

গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওর, ছবিঃ লেখক

সময়টা ছিল ২০১৭ সালের কুরবানির ঈদের ঠিক পর পর। বাসায় এসেছি কুরবানির ঈদের বন্ধে। এলাকায় একটা রীতি চালু হয়েছে, ঈদের পর ঘুরতে যেতে হবে। যথারীতি কুরবানির ঈদ শেষ হলো। বন্ধুমহলের সবাই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি পেয়ে বাসায়। তাই শুরু করলাম নতুন ট্যুরের পরিকল্পনা। গন্তব্য স্থান নয়নাভিরাম সিলেট। কয়েকদিন ধরেই চোখের সামনে সবার টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরতে যাওয়া দেখছিলাম। তাই ঠিক করে ফেললাম এটাই হবে আমাদের পরবর্তি ট্যুরের প্রধান আকর্ষণ।

রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর, ছবিঃ লেখক

টাঙ্গুয়ার হাওর হলো বাংলাদেশের বিশাল এক হাওর যা সরকার দ্বারা বিশেষভাবে সংরক্ষিত। এজন্য এই রকম হাওরকে বলা হয় রামসার সাইট। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে অবস্থিত বিশাল এই হাওরে ঘুরতে হয় নৌকা নিয়ে। এজন্য আগেই মাঝির নাম্বার নিয়ে রেখেছিলাম। তো যাত্রার দুইদিন আগেই মাঝিকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আসছি আমরা ১০ জন। আমার বাসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেটের ট্রেনের টিকেট আগেই কাটা ছিল, ভাড়া ১০০ টাকা। ঢাকা থেকে ২৫০ টাকার মতো হতে পারে। ঢাকা থেকে বাসেও সিলেট আসা যায়, ভাড়া ৩৫০ টাকার মতো।
দূরের পাহাড়গুলো মেঘালয়ের, ছবিঃ লেখক

সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখ আমরা রওনা দিলাম সিলেট পানে। রাতের উদয়ন ট্রেনে রওনা দিলাম যাতে সকালে গিয়ে সিলেটে পৌঁছাই। পৌঁছেও গেলাম সকাল সকাল। স্টেশনে পৌঁছেই সিএনজি দিয়ে চলে গেলাম আম্বরখানা, ভাড়া ১০ টাকা। আম্বরখানা থেকে সিএনজি দিয়ে চলে যেতে হবে কুমারগাঁও বাসস্ট্যাণ্ডে, ভাড়া ২০ টাকা। কুমারগাঁও বাসস্ট্যাণ্ড শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই। কুমারগাঁও থেকে ৯০ টাকা দিয়ে সুনামগঞ্জের বাসের টিকেট কেটে নিলাম। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা। আমরা ১০ টার দিকে সুনামগঞ্জ পৌঁছে যাই। সেখান থেকে লেগুনা ছাড়ে তাহিরপুরের উদ্দেশ্যে, ভাড়া ৮০ টাকা। সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর যেতে সময় লাগলো ২ ঘণ্টা। আমরা তাহিরপুর গিয়ে পৌঁছালাম দুপুর পৌনে একটার দিকে।
ওয়াচ টাওয়ার, ছবিঃ লেখক

তাহিরপুর বাজার পার হয়ে আস্তে আস্তে নৌকাঘাটের দিকে এগোতে লাগলাম। নৌকাঘাটে গিয়ে মাঝিকে ফোন দিতেই এগিয়ে এলেন তিনি, বললেন নৌকা রেডি আছে। রাতে নৌকায় থাকবো আর টেকেরঘাট, জাদুকাটা নদী ঘুরে আসবো এই চুক্তিতে ৪,৫০০ টাকা দিয়ে নৌকা ঠিক করলাম। তবে আরো কমেও পারা যায় এটা, ৩,৫০০ টাকায়ও সম্ভব অফ সিজন হলে। তবে অফ সিজনে এখানে এসে লাভ নেই, পানি একদম থাকে না বললেই চলে। আর দেরী না করে উঠে পড়লাম নৌকায়, ভেতরে ১০ জন ঘুমানোর মতো জায়গা করে দেয়া আছে। তবে আমরা উঠে গেলাম ছাউনির উপর, তখনি বৃষ্টি নামল। সারাদিনের যাত্রা ধকল যেন এক নিমেষে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে সে বৃষ্টিতে। সেই প্রশান্তধারায় ব্যাঘাত ঘটলো মাঝির ডাকে, তাহিরপুর পুলিশ স্টেশনে সবার নাম লিখিয়ে আসতে হবে। আমিই দৌড়ে গেলাম, নাম লিখিয়ে চলে আসলাম।
টেকেরঘাট ঘাট, ছবিঃ লেখক

এখন আর কারও বাধা নেই, শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় ভারী জামাকাপড় খুলে একটা টিশার্ট আর হাফ-প্যান্টে বসে পড়লাম নৌকার একদম সামনের অংশটায়। নৌকা আধ-ঘণ্টা চলার পরেই ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো আকাশ ভেঙে। নিজেকে বেদুইন বেদুইন লাগছিল, মরুভূমির নয় জলাভূমির। টাঙ্গুয়ার হাওর বিখ্যাত হওয়ার মূল কারণ একটু পরেই বুঝলাম। নৌকা যত সামনে এগোচ্ছে দূরের বিশাল পাহাড়গুলো পরিষ্কার হচ্ছে। নীলাভ সবুজ সেই অপরূপা পাহাড়ি সাম্রাজ্য ভারতের মেঘালয়ের। মেঘালয়ের একদম পাশ ঘেঁষে রয়েছে আমাদের টাঙ্গুয়ার হাওর। একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে হাওরের এক পাশে, সেখান থেকে মেঘালয়ের পুরো পাহাড়ি রেঞ্জ দেখা যায়।
মোটরসাইকেল ভ্রমণ, ছবিঃ লেখক

নৌকা চলছে যান্ত্রিক মোটরে আপন গতিতে। হঠাৎ আমাদের একজন দিলো পানিতে লাফ! কী হলো কী হলো? একটু পর উঠে এলো সে, জানালো এত সুন্দর টলটলে পানি দেখে ঝাপ দেয়ার লোভ সামলাতে পারেনি। তাকে অতর্কিত ঝাপ দেয়ার জন্য হাসিমুখে হালকা-উত্তম মধ্যম দিয়ে ছেড়ে দিলাম সবাই। আমার এলাকার বন্ধুমহলটাই এমন, তার উপর একসাথে ১০ জন এসেছি। একসময় মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর একদম সামনে চলে আসি, চোখের তারায় জ্বলজ্বলে সৌন্দর্য নিয়ে অপরূপ পাহাড়গুলো সৌন্দর্য বিলাচ্ছিল। বিকেল তখন সাড়ে তিনটা, পেটে এক ফোঁটা দানাপানি পড়েনি সকাল থেকে। মাঝি জানাল, আর কিছুক্ষণের মধ্যে টেকেরঘাটে নৌকা ভিড়বে, সেখানে পাওয়া যাবে দুপুরের খাবার।
জাদুকাটা নদী যাওয়ার রাস্তায় বাম পাশের অংশটি মেঘালয়, ছবিঃ লেখক

আমাদের নৌকা টেকেরঘাট পৌঁছালো বিকেল চারটায়। টেকেরঘাটের সৌন্দর্য দেখে কতক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম জানা নেই। এখন পর্যন্ত প্রচুর জায়গায় ঘোরা হয়েছে, তবে সবসময়ই সৌন্দর্য আমাকে বরাবরের মতো বিমোহিত করেছে। মনে হচ্ছিল, স্বর্গদ্বারে পৌঁছে গেছি। এত স্বচ্ছ পানি আর পানির নিচে ডুবে থাকা সোনালি ঘাস এবং পাড় ঘেঁষে বিশাল সব পাহাড় থেকে চোখ ফেরাতে বেজায় কষ্ট হয়েছে। ক্ষিদের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। মাঝি বললো, “খেয়ে আসেন বাপজান, খাওয়া-দাওয়া শেষে জাদুকাটা নদী যাবেন”। দলবল নিয়ে ঢুকে গেলাম টেকেরঘাট বাজারের এক খাবার হোটেলে। মাছ, ডাল, সবজি দিয়ে পেটপুরে খেলাম, টাকা লাগলো ১০০।
জাদুকাটার পথে, ছবিঃ লেখক

খাওয়া-দাওয়া শেষে খুব আয়েশ করে এক কাপ চা খেলাম। চা খেতে খেতেই একদল হোণ্ডাচালক মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির। আমরা পাঁচটি মোটরসাইকেল ঠিক করলাম জাদুকাটা নদী যাওয়ার জন্য। প্রতি মোটরসাইকেল ভাড়া ২৫০ টাকা। মানে প্রতিজনের হিসেবে পড়ল ১২৫ টাকা করে। মোটরসাইকেল ছুটলো জাদুকাটার দিকে। তখন বৃষ্টির মেঘ সরে গিয়ে সূর্য উকি দিয়েছে গোধূলীর আভা নিয়ে। আপনি যদি টেকেরঘাটের এই মোটরসাইকেল ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে নতুন করে বলার কিছু নেই, যদি না করে থাকেন তাহলে জেনে রাখুন একপাশে মেঘালয় আরেকপাশে বাংলাদেশ রেখে মাঝের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে মোটরসাইকেলগুলো। আমরা সবাই তখন মানতে নারাজ ছিলাম যে এটা বাংলাদেশের কোনো ভ্রমণস্থান।
জাদুকাটা নদী, ছবিঃ লেখক

প্রচণ্ড সুন্দর গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে হাতের বাম পাশে মেঘালয় রেখে ছুটে চলছিল আমাদের মোটরসাইকেল। একসময় মোটরসাইকেল খাড়া রাস্তা ধরে উপরে উঠে গেল, ভয়ই পাচ্ছিলাম পড়ে যাই নাকি। চালক বললেন শক্ত করে ধরে রাখতে। তবে মাথায় আরেক চিন্তাও উঁকি দিচ্ছিলো, এই খাড়া পথ যদি পায়ে হেঁটে উঠতে হতো কী অবস্থা হতো? এইসব চিন্তা করতে করতে হুশ ফিরে এলো বন্ধুর ডাকে, আমরা এসে গেছি। সত্যি বলতে একের পর এক চমক দিয়ে যাচ্ছে টেকেরঘাট আর জাদুকাটা নদী। আমি সত্যি চিন্তা করিনি এত সুন্দর জায়গার দেখা পাবো এখানে। বালির ফাঁকে ফাঁকে নীল পানির যে মোহনীয় দৃশ্য আমি জাদুকাটা নদীতে দেখেছি তা মনে হয় সারাজীবন চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবো। এত সুন্দর নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়ের পাহাড়, সেই পাহাড় থেকে অজগরের মতো ধীর গতিতে নেমে আসছে সুন্দর এক ঝর্ণা। অনেকক্ষণ ধরে সেই মায়ার দৃশ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম আমরা।
নীলাদ্রী লেক, ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

জাদুকাটা নদী থেকে যখন ফেরার পথ ধরি তখন পড়ন্ত বিকেল। ফেরার পথে একটি ছোট ঝর্ণা পড়ে রাস্তায়, নাম নেই এই ঝর্ণার। তবে মোটরসাইকেল চালককে বললেই নামিয়ে দেবে। সেই ছোট কিন্তু হিমশীতল পানির ঝর্ণায় মন ভরে গোসল সেরে নিলাম সবাই। গোসল শেষে চলে এলাম টেকেরঘাটে। টেকেরঘাটের সাথেই একটি কৃত্রিম হ্রদ বিশেষ আছে, নাম নিলাদ্রী লেক। যাওয়ার সময় ঠিক করে রেখেছিলাম এখানে এসে বাকিটা বিকেল কাটাবো। একটু উঁচু টিলার মতো জায়গায় উঠে বসে পড়লাম। আহা কী দৃশ্য, কী দুর্দান্ত ল্যাণ্ডস্কেপ! নীলাদ্রী লেকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, যত সময়ই আপনি এখানে বসে থাকেন বিরক্ত লাগবে না একটুও।
নীলাদ্রীতে গোধূলী বিলাস, ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

নীলাদ্রী লেক থেকে ফেরার পথ ধরলাম সন্ধ্যা নামার পর। মুড়ি আর চানাচুর কিনে উঠে গেলাম নৌকায়। আজ রাতে তাহিরপুর বাজারে নৌকা থামবে, রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা হয়েছে নৌকায়ই। নৌকা ছেড়ে দিলো সন্ধ্যা ৭টায়। সৌভাগ্যবশত সে রাত ছিল পূর্ণিমার রাত। টলটলে জলের নদী, দশজনের বিশাল নৌকা আর একটা রুপালি চাঁদ। একটা ভ্রমণকাব্য লিখতে এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে বলে আমি মনে করি না। এত সুন্দর রাতের সাক্ষী হতে পেরে আমি সত্যিই ভাগ্যবান।
মাঝির সাথে গলা ছেড়ে গান ধরেছিলাম সে রাতে। রাত নয়টার দিকে গান গাইতে গাইতে পৌঁছে গেলাম তাহিরপুর বাজারে। বাজারেই ১২০ টাকা দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম আর নৌকার ভেতর ঢুকে ঘুম দিলাম। পরদিন মাঝিকে সম্পূর্ণ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসলাম সিলেটে দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে। যারা লেখাটি পড়ছেন তাদের মতো আমরাও ভেবেছিলাম ট্যুর হয়তো শেষ, কিন্তু হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে নেট ঘেঁটে আমরা সিলেট ট্যুর সেখানেই শেষ করিনি সেবার। সেই গল্প শুনতে হলে পড়তে হবে এই সিরিজের পরের লেখাটি।
ফিচার ইমেজ- শাহাদাৎ আলম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পর্যটন নগরী কক্সবাজারে চালু হলো অ্যাপভিত্তিক বাইসাইকেল সেবা “জোবাইক”

পূর্ণিমার আলোয় নাফাখুমে ক্যাম্পিং