পুণ্যস্থান বেনারস কাব্য: সন্ধ্যা-আরতির মায়া

পুরো পরিবার নিয়ে গয়া-বেনারস ভ্রমণে বের হয়েছি দুদিন হলো। গয়ার নগর ভ্রমণ আর রাজগির ভ্রমণের গল্প আগের দুটো লেখায় করেছি। গয়ায় দুইদিন কাটিয়ে ৩য় দিন ভোর ৬টায় রওনা দিই বেনারসের উদ্দেশ্যে। এক মাস আগে থেকেই ট্রেনের টিকেট কেটে রেখেছিলাম। গয়া থেকে বেনারস যাবার ট্রেনের নাম শব্দভেদী এক্সপ্রেস। স্লিপারের প্রতি সীটের ভাড়া ১৯৫ রুপি।

তবে ট্রেনে উঠে মনে হলো আগে থেকে টিকেট না কাটলেও হতো, খুব বেশি মানুষ ছিল না পুরো ট্রেনে। সকাল সকাল একদম স্নিগ্ধ সুন্দর একটি ভ্রমণ করে ফেললাম গয়া থেকে বেনারস পর্যন্ত। গয়া থেকে বেনারস যেতে সময় লাগে ৩-৪ ঘণ্টা। আমরা গয়া থেকে ৬টায় রওনা দিয়ে বেনারস পৌঁছে গেলাম সকাল ১০টার দিকে।

গঙ্গার পাড়ে বেড়ে উঠা বেনারস, ছবিঃ লেখক

বেনারসের খুব কাছেই কাশী স্টেশন। বেনারসের আগের নাম ছিল কাশী। তারপর বেনারসি শাড়ির জন্য এর নাম হয় বেনারস। এখনকার নাম ভারানসি। ভারানসি নামটি এসেছে দুটি নদী ভারুণ আর অসসি নদীর নাম থেকে। উত্তর দিকে গঙ্গা প্রবাহিত হয় এই বেনারসে।

কথিত আছে, ভারতের যেখানে যেখানে গঙ্গা নদী উত্তর দিকে অর্থাৎ চিরায়ত দিকের বিপরীতে প্রবাহিত হয় সেখানেই গড়ে উঠেছে হিন্দুদের তীর্থস্থান। বেনারস সেই তীর্থক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

বেনারস স্টেশন, ছবিঃ লেখক

স্টেশন থেকে বের হয়ে একটা অটো নিয়ে চলে গেলাম অসসি ঘাটে, উদ্দেশ্য হোটেল ঠিক করা। বেনারসের মূল সৌন্দর্য গঙ্গাকে কেন্দ্র করে। পুরো বেনারস জুড়ে গঙ্গা নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে মোট ৮৪টি ঘাট। এর মধ্যে ৮০টি ঘাটে পূজা হয় আর বাকি ৪টি ঘাট সন্ন্যাসীদের ধ্যান-জ্ঞানের জন্য সংরক্ষিত। তাই বেনারসের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে থাকতে হবে ঘাটগুলোর একদম কাছাকাছি। এক্ষেত্রে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো হলো আশি বা অসসি ঘাট এবং দশাশ্বমেধ ঘাট। কারণটা একটু পরে বলছি।

বেনারসের অলিগলি, ছবিঃ লেখক

আমরা প্রথমে আশি ঘাটে গেলাম হোটেল খুঁজতে। স্টেশন থেকে ভাড়া জনপ্রতি ২০ রুপি। অটো চালক খুব সম্ভবত চাচ্ছিল না আমরা আশি ঘাটে থাকি। আমার আশি ঘাটের থাকার ইচ্ছে ছিল মূলত দুটি কারণে, এখানে সকাল বেলায় আরতি হয় সেটা দেখবো আর এখানকার বিখ্যাত হোটেল “কালিকা ধাবা”য় ভুরিভোজ করবো। কিন্তু যেহেতু আশি ঘাটে সকালের আরতি হয়ে যায় সূর্য ওঠার আগে, তাই আশি ঘাটে থাকার ইচ্ছে ফুরিয়ে গেল। সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার পর আরেকটি ঘাটে আরতি হয়, ঘাটের নাম দশাশ্বমেধ ঘাট।

দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে ১ কিলোমিটারের ভেতর হোটেল খুঁজতে লাগলাম অটোতে চেপে। এখানকার হোটেল ঠিক করার আগে জেনে নেবেন তারা পাসপোর্ট দিয়ে এন্ট্রি করায় নাকি। কিছু কিছু হোটেল পাসপোর্ট দিয়ে এন্ট্রি করায়, এছাড়া অধিকাংশ হোটেলই শুধু ভারতীয় আধার কার্ড গ্রহণ করে। ঘাটের একদম কাছের হোটেলগুলোতে ভাড়া তুলনামূলক বেশি। আমরা “শিবালা চৌরাহে”তে হোটেল পেয়ে যাই ৬০০ রুপিতে। দুটো রুম ১,২০০ রুপিতে একদিনের জন্য নিয়ে নিই আমরা।

বেনারসের বিখ্যাত গঙ্গা ঘাট, ছবিঃ লেখক

গয়ার মতো বেনারসে নন-ভেজ খাবার-দাবারের সংকট নেই। এখানে খুব ভালোভাবেই আমিষ খাওয়া হয় এবং হিন্দু পুণ্যস্থানের হিসেবে মুসলমান নাগরিকের সংখ্যাও বেশ ভালো। এর প্রধান কারণ হলো বেনারসি শাড়ি, বেনারসি শাড়ির বোনাই এর কাজ থেকে শুরু করে একটা শাড়ি তৈরী করে বিক্রি করা পর্যন্ত সবটাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখানকার মুসলমান নাগরিকরা করে থাকেন।

হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে গেলাম, পেটে প্রচুর ক্ষিদে। হোটেল স্টাফ আমাদের নিয়ে গেল খুব কাছেই একটি নন-ভেজ হোটেলে, নাম “আংকেলস রেস্টুরেন্ট”। বেশ বয়স্ক এক লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। কথায় কথায় জানলাম উনিও বাংলাদেশি। খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে। সাথে বেনারস ঘুরে বেড়ানোর অনেক বুদ্ধি পরামর্শও পেলাম উনার কাছ থেকে।

গোধূলী বেলার গঙ্গা আর তার ঘাট, ছবিঃ লেখক

বেনারসে পা দিয়েই যে জিনিসটা বুঝলাম এখানে প্রতারকের অভাব নেই। ছলচাতুরী আর কথার প্যাঁচে ফেলে সবাই শুধু টাকা হাতিয়ে নিতে চায়। তাই একটু সাবধান হয়ে যাওয়া ভালো বেনারস বেড়াতে এলে। প্রতারণা হয় মূলত বেনারসি শাড়ি কিনতে গেলে, নগর ভ্রমণ করতে গেলে আর মন্দিরে প্রবেশের সময়। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দির বিশ্বনাথ মন্দির। এছাড়াও আছে দূর্গা মন্দির, সংকট মোচন মন্দির, তুলসী মন্দির, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রামনগর আর সারনাথ।

এদের মধ্যে প্রথমোক্ত চারটি মন্দির দুপুর সাড়ে বারোটায় বন্ধ হয়ে যায়, আবার খোলে দুপুর ৩টায়। তাই সেদিনকার মতো নগর ভ্রমণের চিন্তা বাদ দিতে হলো। আগামীকাল সন্ধ্যা ৬টায় আবার হাওড়া ফিরে যাওয়ার ট্রেন ধরতে হবে, তাই বেনারস ঘোরার পরিকল্পনা করলাম কিছুটা এইভাবে- আজকের দিনটা সূর্যাস্তের সময় গঙ্গায় নৌকা ভ্রমণ করবো আর সূর্য ডোবার পর দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যা আরতি দেখব। আগামীকাল বিকেল ৪টার আগ পর্যন্ত নগর ভ্রমণ করে ৬টায় ট্রেনে উঠে বসবো।

বেনারস মণিকারনিকা ঘাট, ছবিঃ লেখক

যেমনটা পরিকল্পনা করলাম সেভাবেই এগোতে লাগলাম। আশি ঘাটে সূর্যোদয়ের আগে এবং দশাশ্বমেধ ঘাটে সূর্যাস্তের পরে যে আরতি হয় তা দেখতে প্রতি বেলায় এই দুটো ঘাটে জড়ো হয় আনুমানিক ২০,০০০ লোক। একটু ধাক্কা লাগলো? ঠিকই পড়েছেন, বিশ হাজার লোকের সমাগমে প্রচণ্ড নির্মলতায় ভরপুর এই আরতী সন্ধ্যা হয়ে ওঠে জীবন্ত কোনো কিংবদন্তি কাহিনী। দেশ-বিদেশের প্রচুর লোক এই আরতি সন্ধ্যা উপভোগ করে ঘাটের সিঁড়ি এবং নৌকায় বসে।

আমরা বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কেদার ঘাটে চলে গেলাম। যে কোনো ঘাট থেকেই নৌকা ভ্রমণ করা যায়। মোট ৮৪ ঘাটের ৪৪-৫০টি ঘাট দেখা হয়ে যাবে নৌকায় বসে। রাজা হরিশচন্দ্রের ঘাট থেকে শুরু করে মনিকারনিকা ঘাট পর্যন্ত ঘুরিয়ে এনে দশাশ্বমেধ ঘাটে আরতি দেখাবে এবং সবশেষে আবার কেদার ঘাটে এনে ছাড়বে নৌকাগুলো জনপ্রতি ২০০ রুপি ভাড়ায়। সবচেয়ে ভালো জিনিস হলো, ঘাট ঘোরানোর পাশাপাশি তারা ঘাটের ইতিহাস, কে কখন কেন বানিয়েছেন, এখন কী কাজে ব্যবহৃত হয় ইত্যাদি বলতে থাকে। এক একটা নৌকায় ৩০-৩৫ জন বসতে পারে। শেয়ারে না নিয়ে রিজার্ভও নেয়া যায় নৌকা, সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৩,৫০০ রুপি।

আরতি চলছে পুরোদমে, ছবিঃ লেখক

আমরা শেয়ারে এক নৌকায় উঠে গেলাম। সন্ধ্যা ৬:১৫ এর দিকে নৌকা ছেড়ে দিলো। এক এক করে ঘাট দেখাতে লাগলো আমাদের আর বলতে লাগলো তাদের কাহিনী। এখানকার কিছু ঘাট শুধু মৃতদেহ পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, তাদের মধ্যে রাজা হরিশচন্দ্রের ঘাট আর মনিকারনিকা ঘাট সবচেয়ে বড় শবদাহের ঘাট।

গোধূলি রক্তিম আলো যখন গঙ্গার জলে মন্দিরগুলোর প্রতিচ্ছবিতে মেশে তখন এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের সময় গঙ্গায় নৌকা ভ্রমণ অনেকের জীবনের স্মরণীয় কিছু মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি।

নৌকা ভ্রমণের সাথে বলা হয় তাদের কাহিনীও, ছবিঃ লেখক

সাধারণত আশি ঘাটে আরতি শুরু হয় ভোর সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার ভেতর আর দশাশ্বমেধ ঘাটে আরতি শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। আমাদের নৌকা ধীরে ধীরে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে এগোতে লাগল। দেখলাম সব নৌকা আগেই ঘাঁটে বাধানো হয়ে গেছে। সেই তুলনায় বেশ পিছনে আছি আমরা। ঘাটের সিঁড়ি থেকে শুরু করে প্রতিটা নৌকায় বসে থাকা মানুষের পরিমাণ দেখে রীতিমত ভড়কে যাওয়ার মতো অবস্থা।

আরতি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে প্রায়, ২০০০০ লোক , ছবিঃ লেখক

একটু পরেই আরতি শুরু হয়। স্তবগানের সাথে পাঁচজন সুদর্শন মধ্যবয়সী পুরোহিত আরতী করছে। আমার কাছে মনে হলো আরতী শুরু হওয়ার পর পুরো এলাকাটি কেমন যেন অপার্থিব স্নিগ্ধতায় কেঁপে উঠলো। পেছন থেকে পাঁচজনের একজনকে দেখা যাচ্ছিলো শুধু। তাই কয়েকটা নৌকা ডিঙ্গিয়ে একদম সামনে চলে গেলাম আমি।

সামনে গিয়েই বুঝলাম পেছনে বসে সবাই কী হাতছাড়া করছে। এই আরতির সাক্ষী না হলে এর মাহাত্ম্য বোঝা খুব কঠিন। আগুনের ঢালি হাতে নিয়ে করা সেই আরতির দৃশ্য মনে গেঁথে আছে এখনো।

সন্ধ্যার দশাশ্বমেধ ঘাট, ছুবিঃ লেখক

আরতি চলে পুরো এক ঘণ্টা ধরে। সেই এক ঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু আরতি দেখেছি আর মাঝে মাঝে ছবি তুলেছি। জাপানিজ, চাইনিজ, আমেরিকান, আইরিশ, ভারতীয় আর বাংলাদেশি মানে আমরা সবাই একসাথে বসে আরতি উপভোগ করছি, অনুভব করছি প্রতিটি মন্ত্র রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুরো আরতিটি আমার কাছে এত বেশি ভালো লেগেছে যে আগামীকাল সকালে আশি ঘাটে আরতি দেখার ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।

জগৎ বিখ্যাত আরতী, ছবিঃ লেখক

সবটা আরতি দেখা শেষে নৌকা ঘুরিয়ে পুনরায় চলে গেলাম কেদার ঘাটে। কেদার ঘাটে গিয়ে দেখি হোটেল স্টাফ অপেক্ষা করছে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওনার সাথে হাঁটতে হাঁটতেই চলে গেলাম হোটেলে। রাতের খাবার-দাবার শেষে ঘুম দিলাম সেদিনকার মতো। কালকে নগর ভ্রমণে বের হতে হবে সকাল সকাল।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. গত বছর গিয়েছিলাম; খুবই ভাল লেগেছে নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে অনেক মন্দির ও রাজা হরিশ্চন্দ্র শ্বশানঘাটের ইতিহাস জানা আর অবশ্যই সন্ধারতি। আরতির সময় বড় বড় লাইটগুলোর কিছু বন্ধ করলে আরো উপভোগ্য হতো বলে আমার মনে হয়েছে। এটা রিফ্লেক্ট করে দূরের দর্শকদের। হরিদ্বারের সন্ধারতিটাও এদিক দিয়ে মোহনীয়, ভোলার নয়। এই লেখার মাধ্যমে বেনারস ভ্রমণ স্মৃতিচারণ করলাম। কাশীর ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টাও অনেক সুন্দর, শান্ত-স্নিগ্ধতায় ভরপুর। ফেরার পথে খেয়েছিলাম বেনারসি পান! আহ্…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: প্রথম দিনের নগর ভ্রমণ

পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: রাজগিরির পথে পথে