পাহাড় খোদাই করে হাজার বছর ধরে তৈরি অজন্তা-ইলোরা গুহার অজন্তা পর্ব

গত পর্বে আমরা ইলোরা গুহার অসাধারণ সব ভাস্কর্য সম্পর্কে জেনেছি। এবার আমরা আপনাদের নিয়ে যাব তার দোসর অজন্তা গুহাগুলোতে। যারা ইলোরা গুহাতে যায়, তারা অজন্তাতেও ঘুরে আসে একবার। এই দুটি মিলেই সম্পন্ন হয় এক অসাধারণ ভ্রমণ।গুহাগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে প্রাচীন সেগুলো নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টের জন্মেরও দু’শ বছর আগে। আর শেষটির কাজ চলেছে সপ্তম শতকেও। ইলোরার গুহাগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের নিদর্শন থাকলেও এখানে শুধু বৌদ্ধধর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়।
একসময় মানুষের পদচারণায় জমজমাট থাকলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন আসে। আস্তে আস্তে মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত হয়। মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় একদা মানুষের পদচারণায় মুগ্ধ এই মন্দিরগুলো। বুনো প্রকৃতি গ্রাস করে নেয় সমস্ত। বুনোলতা, গাছগাছালি বিস্তার লাভ করে এখানে। বাসা বাঁধে পশুপাখিতে। সবাই ভুলেই গিয়েছিল এই অসাধারণ স্থাপত্যের কথা।

১৯ নাম্বার গুহা; ছবি:.trawell.in

সময় পেরোতে থাকে। একসময় এ দেশ দখল করে নেয় ইংরেজরা। তাদেরই তখন জয়জয়কার। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আবির্ভাব হয় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন স্মিথের। তিনি শিকার করতে খুবই পছন্দ করতেন। ১৮১৯ সালের কথা, একদিন জঙ্গলে বাঘ শিকার করতে গিয়ে দেখলেন পাহাড়ের গায়ে কতগুলো গুহা- ঠিক প্রাকৃতিক নয়। যেন মানুষের বানানো। কিন্তু বুনো ঝোপ ঝাড় আর বাদুড়, সাপ আর অন্যান্য ছোট বড় জন্তু বাসা বেঁধেছে সেখানে। তবু জন স্মিথ কৌতূহলী হয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয় এক অতুলনীয় শিল্পের সমাহার। এরপর এখানে শুরু হয় প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান।
অজন্তার গুহাগুলো গোতম বুদ্ধের প্রতি উৎসর্গীকৃত। এগুলো গভীর খাড়া গিরিখাতের গায়ে পাথর কেটে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় ৩০টি গুহা। ধারণা করা হয়, গুহাসমূহ খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ৭০০ অব্দের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। সে হিসেবে ইলোরা থেকেও প্রাচীন এগুলো। গুহাগুলোর সামনে রয়েছে বারান্দা । বারান্দার উপরে রয়েছে ছাদ। আর ছাদকে ধরে রাখার জন্য রয়েছে স্তম্ভ।
পঞ্চম থেকে অষ্টম গুহা; ছবি:.trawell.in

অজন্তায় গুহাচিত্রের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের গুহাচিত্রের পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক। অজন্তা গুহার চিত্রাবলী ভারতের প্রাচীনতম মন্দির চিত্রের অন্যতম নিদর্শন। নিপুণতার সাথে এমন নিখুঁতভাবে এখানকার গুহাচিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা হতবুদ্ধিকর। আর এর গঠন মানে পাহাড় কেটে কীভাবে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তা তো আজও স্থাপত্য-জ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় বিস্ময়। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক অজন্তার এই অত্যাশ্চর্য গুহা মন্দির দেখতে আসে। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। চলুন অজন্তার কয়েকটি বিখ্যাত গুহা ঘুরে আসা যাক।
অজন্তা ফুট কেভ বাস স্ট্যান্ড থেকে ৩৫০ মিটার দূরে অবস্থিত এক নম্বর গুহাই এখানকার সবচেয়ে সংরক্ষিত গুহা। এটি পূর্ব কোণে অবস্থিত। এবং পর্যটকেরা প্রথমে এখানেই ভ্রমণ করে। এক নম্বর গুহা তার অতি মনোহর চিত্রকলার জন্য খ্যাত। ধারণা করা হয়, এটি সম্রাট হরিসেনার আমলে নির্মিত হয়েছিল। গুহার সম্মুখভাগের দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের জীবনের নানা দৃশ্য খোদাই করা আছে। বারান্দায় এখনো কিছু চিত্রের অবশেষ রয়েছে। ধারণা করা হয়, এর সমস্তটুকুই একসময় অতুলনীয় সব চিত্রে পরিপূর্ণ ছিল।
১ নাম্বার গুহা; ছবি:.trawell.in

একেবারে মূল দেয়ালে আঁকা একটি চিত্রে দেখা যাচ্ছে গৌতম বুদ্ধ তার শিষ্যদের উপদেশ দান করছেন। দরজার দুপাশে দুটি বোধিসত্ত্ব চিত্র আঁকা রয়েছে- ডানপাশে দেখা যাচ্ছে অবলোকিতেশ্বর বুদ্ধ বা বজ্রপাণি। অবলোকিতেশ্বর বৌদ্ধ মহাযান বৌদ্ধপন্থায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আর বাঁপাশে দেখা যাচ্ছে পদ্মপাণি বৌদ্ধ হাতে একটি পদ্মফুল ধরে আছে। এই গুহার দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলো ভারতের প্রাচীন চিত্রকলার সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এক নম্বর গুহার পাশে অবস্থিত দুই নাম্বার গুহা অজন্তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গুহাগুলোর অন্যতম। এখানে দর্শনার্থীরা মূলত গুহার দেয়ালে, স্তম্ভ এবং সিলিংয়ে আঁকা ছবি দেখতে যায়। তাছাড়া এখানে ভাস্কর্যও রয়েছে, যেখানে নাগরাজ এবং তার অনুসারীদের দেখা যাচ্ছে।
অজন্তার গুহাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিহার চতুর্থ গুহাতে অবস্থিত। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এটি অসম্পূর্ণ। গৌতম বুদ্ধের পদতলে পাওয়া একটি খোদাই থেকে জানা যায় যে, এটি মাথুর নামে একজন ব্যক্তি গৌতম বুদ্ধের প্রতি উৎসর্গ করেছেন। একটি হল এবং বারান্দার সমন্বয়ে গঠিত এই গুহাটি আনুমানিক ষষ্ঠ শতকে তৈরি করা হয়েছে। এতে একটি মূল প্রবেশদ্বার এবং দুটি পার্শ্বদ্বার রয়েছে। এখানে যে সমস্ত চিত্র দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে উড়ন্ত অপ্সরা, জাতক, গৌতম বুদ্ধের জীবনের নানা বিষয়, গাছপালা, রমণে নিবৃত্ত নারী-পুরুষ এবং পাগলা হাতি থেকে পলায়নপর জনতা।
১৬ নাম্বার গুহা; ছবি:.trawell.in

অজন্তার গুহাগুলোর মধ্যে একটি বিখ্যাত গুহা হলো ১৬ নাম্বার গুহা। এখানে কিছু নিপুণ চিত্রকলা অবশিষ্ট রয়েছে। অজন্তার ঠিক মাঝের দিকে অবস্থিত এটি। একে অজন্তার ‘স্বাগত দ্বার’ও বলা হয়। কারণ এর ঠিক সম্মুখে দুটি হাতি আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। অবশ্য তারা জীবন্ত নয়- প্রস্তর মূর্তি। এক, দুই এবং সতের নাম্বার গুহার মতো এখানেও কিছু অসাধারণ চিত্রকলা সংরক্ষিত রয়েছে।
এখানে পাওয়া শিলালিপি অনুযায়ী এটি সম্রাট হরিসেনার মন্ত্রী বরাহদেব কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এই গুহার মূল কক্ষ অনুপম চিত্রকলায় সজ্জিত। এখানকার একটি বিখ্যাত চিত্রকলার নাম ‘রাজকুমারীর মৃত্যু’। গৌতম বুদ্ধের সৎভাই নন্দের স্ত্রী ‘সুন্দরী’ যখন শুনলেন তার স্বামী সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন তিনি দেহত্যাগ করেন।
এখানে আরেকটি চিত্রকলা রয়েছে যেখানে সুজাতার ক্ষীর অর্পণকে দেখানো হয়েছে। গৌতম বুদ্ধ যখন যখন বোধি অর্জন করেন, তখন সুজাতা প্রথম তাকে আহার নিবেদন করেন। বৌদ্ধ ধর্মে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
১৭ নাম্বার গুহা; ছবি:.trawell.in

অজন্তার যে সমস্ত গুহার চিত্রাবলী এখনো সংরক্ষিত রয়েছে তার মধ্যে ১৭ নম্বর গুহা অন্যতম। এতে পাওয়া ব্রাহ্মী হরফে লেখা একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সম্রাট হরিসেনা এটি নির্মাণ করেন। এর নির্মাণ রীতি খুবই সরল এবং অসাধারণ। সতের নাম্বার গুহাতে আঁকা দেয়াল চিত্রে অধিকাংশ জায়গায় গৌতম বুদ্ধকে ধর্মচক্র মুদ্রায় উপনিবেশিত অথবা শিষ্যদের জ্ঞানদান করছেন।
এখানে ভক্তক যুগের চিত্রকলার কিছু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে বসন্তরা জাতক, একটি প্রকাণ্ড চক্র যা জীবন চক্র নামে পরিচিত, উড়ন্ত অপ্সরা, গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক উন্মত্ত নলগিরি হাতিকে শান্ত করা প্রভৃতি।
অন্যান্য গুহাগুলোতেও অসাধারণ সব চিত্রকলা রয়েছে। যা আপনাকে হারিয়ে নিয়ে যাবে সময়ের অতীতে কোনো এক সময়ে। আপনি মানস চক্ষে দেখতে পাবেন একদল লোক তাদের হাতুড়ি, গাইতি আর ছেনি নিয়ে কী অপূর্ব কুশলতায় ফুটিয়ে তুলছেন অমূল্য সব সৃষ্টি।

কীভাবে যাবেন:

দিল্লি থেকে ট্রেনে আওরঙ্গবাদ পর্যন্ত- ১,২৫৮ কিলোমিটার।
হায়দ্রাবাদ থেকে ৫,৩৪ কিলোমিটার।
আর মুম্বাই থেকে ৩,৫০ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন:

ইলোরাতে রাত্রিবাসের জন্য রয়েছে
হোটেল কৈলাস
ভাড়া ১,৯০০-৩৮,০০ টাকা।
যোগাযোগ-০২৪৩৭২৪৪৫৪৩।
হোটেল চৈতন্য
ভাড়া ১,০০০ টাকা।
যোগাযোগ-০৯৮২৩১৪২৮৪১।
Feature Image: Youtube

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজসিক রাজধানী এক্সপ্রেসের কথকতা

ভ্রমণে গেলে যে রোগগুলো হতে পারে