টাইগার নেস্ট ট্রেকিং আর পারো ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

পরদিন সকালে নাস্তা করে আমরা রওনা হলাম পারোর টাইগার নেস্ট ট্রেকিংয়ে। ১৬৯২ সালে এই মন্দির প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাক্তসাং গুহার পাশে। স্থানীয়রা বলে থাকে ‘তাক্তসাং’। নামের সাথে বাঘ থাকলেও এর আশেপাশে বাঘের চিহ্নও নেই। জায়গাটা আসলে একটা মনেস্ট্রি।
‘গুরু পদ্মসম্ভাব’ এখানে ধ্যান করেছিলেন। কতদিন ধ্যান করেছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। নামটা কেন টাইগার নেস্ট হলো সেটা নিয়েও অনেক মিথ প্রচলিত আছে যা খুবই উপভোগ্য। ‘পদ্মসম্ভাব’কে বলা হয় ভুটানের ধর্মীয় গুরু। উনিই প্রথম ভুটানে বুদ্ধিজম প্রচার শুরু করেন। তার স্মরণে মার্চ এপ্রিলের দিকে পারো তে ‘সেচু’ নামে ফেস্টিভাল হয়। যারা ভুটান ভ্রমণে গেছেন কিন্তু টাইগার নেস্টে যাননি তাদের জন্য অনেক কিছুই অদেখা রয়ে যাবে যা এখানে বলে বোঝানো যাবে না।

পাইন বন; ছবিসূত্র: লেখক

পারো থেকে আধা ঘণ্টার মতো গাড়িতে করে গিয়েছিলাম, তারপর সেখান থেকে শুরু হয় টাইগার্স নেস্ট যাবার ট্রেকিং। পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে থেকে শুরু হয় পাইনের বন। অপূর্ব সুন্দর এই পাইন বন। ট্রেকিং যেখান থেকে শুরু হবে, সেখানে দেখি আরো কিছু লোক। সবাই হাতে লাঠিসোটা নিয়ে ট্রেকিংয়ের জন্য তৈরি। আমরাও লাঠি নিয়ে তৈরি হলাম ট্রেকিংয়ের জন্য।
আমাদের মধ্যে অনেকেই ঘোড়া নিয়ে উপরে উঠল। একটা লেভেল পর্যন্ত ঘোড়া দিয়ে যাওয়া যায়, সেখানে একটি ক্যাফেটেরিয়া আছে। তবে ওঠার সময় বিস্কিট, পানি এগুলো নিয়ে উঠবেন। না হলে ক্যাফেটেরিয়া থেকে কিনতে গেলে প্রচুর দাম পড়বে। তবে আমার মতে ট্রেকিংয়ের সময় বেশি কিছু না খাওয়াই ভালো। হালকা বিস্কিট আর অল্প অল্প করে স্যালাইন পানি পান করাই শ্রেয়।
ছবিসূত্র: লেখক

টাইগার্স নেস্ট জায়গাটার কাছে আসলেই কেমন জানি শান্তি শান্তি অনুভব হতে থাকে। এখানে আসলেই স্পিরিচুয়াল কোনো ব্যাপার আছে কিনা আমার জানা নেই। পরিবেশটা একদম নীরব। অনেকেই আছে, কিন্তু কেউ উঁচুস্বরে কথা বলছে না যাতে মন্দিরের অসম্মান করা হয়। নেপালের পোখরাতে জাপানিজ শান্তি স্টুপাতে গিয়েও আমার এরকম ফিল হয়েছিল, চারদিকে শুনশান নীরবতা। সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন- আসলেই তাই একদম মিলে যায় কথার সাথে।
আরেকটা জিনিস আমার চোখে পড়েছে ভুটানের এই টাইগার নেস্টে। এই একই জিনিস আমি আগে লেহ লাদাখ এবং নেপালেও দেখেছি। বুদ্ধিস্টরা একটা পাথরের উপর আরেকটা পাথর রেখে একটা স্ট্যাকের মতো বানায়। এই নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে। আপনি চাইলেও ইন্টারনেট ঘেঁটে অনেক কিছু পাবেন, তবে আমি সত্য মিথ্যার যাচাই করতে যাইনি- এটুকু বলতে পারি ব্যাপারটা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
প্রেয়ার হুইল; ছবিসূত্র: লেখক

ভুটানের বিভিন্ন জায়গায় (পুরো হিমালয় রিজিওনে, আমি এর আগে ভারতের লেহ-লাদাখ, নেপালে দেখেছি ) কিছু গোল সিলিন্ডার টাইপের জিনিস দেখা যায়। এটাকে তারা বলে প্রেয়ার হুইল। এই সিলিন্ডারের বাইরে সংস্কৃত ভাষায় ‘ওমানি পাদমে হাম’ নামে এক মন্ত্র লেখা থাকে। তবে সব সময় একই মন্ত্রও লেখা থাকে না। সিলিন্ডারের অক্ষ হিসেবে যেটা থাকে, তাকে তারা বলে ‘লাইফ ট্রি’, যার উপরে আবার আরও হাজারটা মন্ত্র লিখে পেঁচানো থাকে। তিব্বতিয়ান বুদ্ধিস্টরা বিশ্বাস করে এই হুইল ঘুরালে, এই মন্ত্র মুখে পাঠ করলে সোয়াব পাওয়া যাবে। এই নিয়েও মতান্তর আছে, সত্য কতটুকু জানি না। আমি যেখানে গিয়েছি সেখানেই এটা ঘুরিয়েছি। আমার ভালো লাগে ঘুরাতে।
অবশেষে আবার সেই পর্বতগাত্র বেয়ে নেমে আসা। ক্লান্ত দেহে যুদ্ধবিজয়ের আনন্দ নিয়ে নামতে লাগলাম। নামার সময় একটু সাবধানে নামতে হবে। এখানে শ্বাসের কষ্ট আর হবে না, তবে হাঁটুর উপর অনেক চাপ পড়ে। তাই দেখেশুনে নামাই ভালো। আরেকটু জানিয়ে রাখি, পারো উপত্যকা থেকে টাইগার নেস্টের উচ্চতা ৯০০ মিটার। সকাল ১০.৩০ মিনিটে পায়ে হেঁটে ট্রেকিং শুরু করে নিচে নামতে নামতে আমাদের ৬টা বেজে গিয়েছিল। নামার সময় বুঝতে পেরেছি ক্ষুধা কাকে বলে। মনে হচ্ছিল পুরো জগতটা খেয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু চাইলেই কী সেসব পারে আমাদের মতো সমতলভূমির মানুষেরা?
ছবিসূত্র: লেখক

গাড়ির ড্রাইভার আমাদের এক সিঙ্গাপুরিয়ান রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল। সেখানে কোকা নামে আধা সিদ্ধ নুডলস খেলাম। আসলে এটাকে খাওয়া বলে না, কোনোমতে পেটটাকে জামিন দেওয়া। তবে চাইলেই আপনি খুব অল্প দামে ফ্রেস জুস খেতে পারবেন। আমরা এই ট্যুরে এরকম জুস প্রচুর খেয়েছি। তবে আমার মতে ভুটান ঘুরতে গিয়ে মাছ-মাংস খোঁজার চেয়ে ডিম, জুস, কলা আর পাউরুটি খেয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায়। আপনি চাইলে পিজ্জাও খেতে পারেন। হোটেলে বসে অর্ডার করলে পিজ্জা দিয়ে যাবে। ড্রুক পিজ্জা আর জুস খুবই বিখ্যাত। আরো একটা কোম্পানি দেখলাম, নাম তার রয়্যাল ভুটান। তাদের জুসটাও ভালো। আপনি সব জায়গায় ড্রুকের জুসটা পাবেন না। তবে আমি নিশ্চিত, সব জায়গায় প্রাণের প্রোডাক্ট- জুস থেকে শুরু করে সব কিছু পাবেন।
ছবিসূত্র: লেখক

সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে এসে আবার বের হই, আমরা যে জায়গায়টা ছিলাম তার আশপাশটা একটু ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। মার্কেট এরিয়ায় গিয়েছিলাম। হ্যান্ডি ক্রাফট, পেস্ট্রি শপ আরো কিছু ছোট-বড় অনেক দোকান দেখলাম। আমি যে দেশে যাই সেখান থেকে সুভ্যেনির কিনি, স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার জন্য। এখানকার দোকানপাট রাত ৯টায় বন্ধ হয়ে যায়, আবার খোলে সকাল ৯টায়।
রাতে আমাদের গ্রুপ লিডার একটা ভালো খাবারের আয়োজন করে। পুরোপুরি বাংলা খাবার– সাদা ভাত, শুকনো মরিচ দিয়ে আলু ভর্তা, মুরগির মাংস আর পাতলা ডাল। অসম্ভব ভালো স্বাদ হয়েছিল খাবারের। এদিন রাতে আমরা একটু দেরিতে ঘুমাতে যাই। পরদিন সকালে আমরা যাব থিম্পু। সকাল সাতটায় ব্রেক ফাস্ট। সে পর্যন্ত বিদায়।
ফিচার ইমেজ- wikimedia.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অসাধারণ সৌন্দর্যের বিশ্বের কয়েকটি কৃত্রিম পানির ফোয়ারা

এক সপ্তাহে ঘুরে আসুন সিঙ্গাপুরের দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থান থেকে