ঢাকার প্রাণ, বুড়িগঙ্গায় ভ্রমণ

আজকাল আমাদের নাগরিক জীবনের নানা রকম ব্যস্ততার মাঝে, একটি অন্যতম আনন্দ হলো কোথাও না কোথাও ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া। কারণ চাইলেই সেই আগের মতো আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাওয়া হয়ে ওঠে না, বা সবার সময়ের সাথে মেলে না। তাই ছোট পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব মিলে কোথাও না কোথায় ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন বা বের হতে চান অনেকেই। কিন্তু সময় স্বল্পতায় সব সময় তো আর দূরের কোনো পাহাড়, সমুদ্র বা অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া যায় না। তাই আমরা মনে মনে কাছে-পিঠে নান্দনিক কোনো জায়গা খুঁজি মনে মনে।

ভ্রমণের নানা অনুষঙ্গ বা প্রকৃতির স্পর্শ আছে এমন কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে চাইলেই প্রথমেই চলে আসে নদীর কথা। আর নদী হলো যে কোনো দেশের ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রার্থিত একটা জায়গা। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই, তাদের মূল পর্যটন ভাবনাটা গড়ে উঠেছে নদীকে ঘিরে। কারণ নদীর কাছে যত সহজে পৌঁছানো যায় আর যতটা নির্ভার হয়ে কিছু মুহূর্ত কাটানো যায়, সেটা অন্য কোনো জায়গায় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমনকি অনেক বড় বড় শহরের মাঝেও রয়েছে নানা রকম সৌন্দর্যের আর আকর্ষণের নদী বন্দর বা ভ্রমণের একটা অন্যতম আকর্ষণ।

লঞ্চ থেকে নদীর রূপ। ছবিঃ লেখক

ঠিক তেমন ভাবনা থেকেই কদিন আগে গিয়েছিলাম ঢাকার বুকে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদী দেখতে। কিন্তু যাবার আগে মনে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, আদৌ যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা? কারণ শেষবার যখন নিঝুম দ্বীপ যাবার সময় সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়েছিলাম, মনটা ব্যথায় অবসন্ন হয়ে গিয়েছিল, ওর দূষিত রূপ দেখে! গন্ধে দম বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছিল, দুর্গন্ধে! সেই শঙ্কা মাথায় রেখেই পথ ধরেছিলাম। কিন্তু এবার পুরো পরিবার নিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি আমি এবং আমার পুরো পরিবারই!

কারণ সদরঘাটে পৌঁছে কোনো গন্ধ পেলাম না! আহ স্বস্তি। তারপর ৫ টাকার টিকেট কেটে ঢুকে পড়লাম বিশাল বিশাল তিনতলা লঞ্চের উপরে গিয়ে নদী দেখতে, আর নদীর বাতাস খেতে। ওরা এর আগে কখনো এত বড় নদীর কাছাকাছি যায়নি আর লঞ্চ তো দেখেইনি! তাই দুজন দারুণ উচ্ছ্বসিত এত বড় নদী আর তার উপর বিশাল লঞ্চ দেখে। ওদের নিয়ে উঠে পড়লাম তিন তলা লঞ্চের একদম উপরে, অনুমতি নিয়েই! আর তারপর একটা অলস দুপুর কাটিয়েছিলাম বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ের দোলায়, ঝিরঝিরে বাতাসে, মিহি রোদে।

লঞ্চের ভিতরে ঘুরে দেখা। ছবিঃ লেখক

তিনজন মিলে লঞ্চের ছাদে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো চেয়ারে বসে উপভোগ করছিলাম, বুড়িগঙ্গার টলমলে জল, ঢেউয়ে ভেসে ভেসে চলা খেয়া নৌকা, ধীর লয়ে চলা স্টিমার, মাল বোঝাই কার্গো, ভাসমান ফলের দোকান, দুই পারের মানুষের জীবন, উপরে শরতের মেঘ মুক্ত ঝকঝকে নীল আকাশ, অল্প কিছু সাদা মেঘের বিচরণ, মুক্ত বিহঙ্গদের ওড়াউড়ি, হেমন্তের হিমেল হাওয়া, মাঝে মাঝে বড় বড় ঢেউয়ের দোলায় লঞ্চের দুলে ওঠা! এটা একটা বাড়তি আকর্ষণ ছিল ওদের কাছে। অনেকটা অবসর সময় অলস কাটিয়ে দেয়া যায় বুড়িগঙ্গার যে কোনো লঞ্চের ছাদে বা ভিতরে। দেখা যায় জলজ জীবনের নিত্যকার জীবন। লঞ্চের মধ্যেই রান্না, খাওয়া, গোসল আর ঘুমের অন্য রকম এক জীবন।

আপনিও চাইলে বেরিয়ে পড়তে পারেন কোনো এক ছুটির দুপুরে বা বিকেলে। ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার গর্ব, বুড়িগঙ্গার তীরে। কাটিয়ে আসতে পারেন একটি বিলাসী বিকেল বা সোনালী সন্ধ্যা! চাইলে লঞ্চে উঠতে পারেন, নামতে পারেন কোনো খেয়া ঘাটে, শীতল জলে পা ভেজাতে, চড়তে পারেন খেয়া নৌকায়, এপার-ওপার করে নদীকে আরও কাছ থেকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে উপভোগ করতে। এমনকি চাইলে ঘণ্টা ব্যাপী ভাড়াও করতে পারেন কোনো নৌকা। ভেসে পড়তে পারেন প্রিয়জনের হাত ধরে। দেখবেন একটা অসাধারণ মনে রাখার মতো বিকেল পাবেন।

আকাশ, মেঘ আর নদী। ছবিঃ লেখক

কেননা আজকাল আর বুড়িগঙ্গায় সেই দুর্গন্ধ নেই, যেটা মানুষকে বিভীষিকায় ঠেলে দিত। ট্যানারিগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ায়, বুড়িগঙ্গার পানি এখন আর কালো বা নোংরা নয়, টলটলে আর স্বচ্ছ পানিতে চাইলে নিজেকে ভেজাতে পারেন আপন খেয়ালে। এছাড়া বুড়িগঙ্গার নদীর আশেপাশেই রয়েছে নান্দনিক আহসান মঞ্জিল, একটু ভেতরেই লাল বাগের কেল্লাসহ আরও নানা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।

ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বাস ভাড়া দিয়ে চলে যেতে পারেন সদরঘাট বা বুড়িগঙ্গার তীরে। এপার-ওপার নৌকা ভাড়া পড়বে ১০ টাকা করে। সদরঘাট, কালিগঞ্জ, শ্যামবাজার ছাড়াও আছে আরও বেশ কয়েকটা খেয়া পারাপারের ঘাট। যে কোনোটি আপনি বেছে নিতে পারেন, সুবিধামতো।

বুড়িগঙ্গায় ভেসে চলা। ছবিঃ লেখক

এছাড়া ঘণ্টাব্যাপী নৌকা ভাড়া পড়বে ২০০-৩০০ টাকা। দরদাম করে নেবার উপরে নির্ভর করবে।

খাওয়ার জন্য রয়েছে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নানা রকম মুঘল খাবার, কাবাব বা বিরিয়ানি, লাচ্ছি, আর মুখরোচক মিষ্টান্ন।

খোলা নৌকার মেঝেতে বসে, নদীর ঢেউয়ের দোলা খেয়ে, নদীতে ভেসে নীল আকাশ আর সাদা মেঘেদের ভেলা দেখে, ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে, উড়ে যাওয়া গাঙচিল দেখে, ভাসমান জীবন দেখে, দূরের ব্রিজে যান্ত্রিক জীবনের ছুটে চলা দেখে!

ঘুরে আসতে পারেন একটু ছুটির দিনের এক বেলার কোনো এক অবসরে।

আমাদের ঢাকার প্রাণ, বুড়িগঙ্গার তীরে, নদীতে ভেসে, ঢেউয়ে দুলে আর হাওয়ায় উড়ে-উড়ে!

বুড়িগঙ্গার মাঝি। ছবিঃ লেখক

ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে এই ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ হবে খুব বেশী হলে ২০০-৩০০ টাকা আর দুপুরের খাবার যোগ করলে ৪০০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিয়াসের মনমাতানো আহ্বানে

গাইডহীন তাজিংডং জয়ের গল্প!