ভ্রমণ, কলকাতা ও কেনাকাটার পাগলামির প্রভাব

dav

এসে গেছে ভ্রমণ মৌসুম। যদিও আজকাল আমাদের অনেকেই সারা বছরই একটু অবসর পেলেই কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাই বা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু সেটা সবার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে, বছরের এই শীত মৌসুমের জন্য অনেকেই তাদের বাৎসরিক ভ্রমণের দিনক্ষণ ঠিক করে রাখি। আর আজকাল দেশের বাইরে অল্প খরচে, অল্প সময়ে নানা রকম বৈচিত্রে ভরপুর জায়গায় যেতে চাইলে প্রথমেই এসে যায় ভারতের নাম।

কারণ বেশ অল্প সময়ে, সাধ্যের মধ্যে থেকেই নানা রকম প্রাকৃতিক জায়গা দর্শনের জন্য ভারতের চেয়ে উপযুক্ত খুব কম দেশই আছে। তাই আমাদের অনেকেরই বছর শেষের একটা লক্ষ্য থাকে, ভারতের কোনো একটা বরফে ঢাকা এলাকায় যাবো, কেউ হয়তো এই শীতের মধ্যেই সুযোগ সুবিধা করে রাজস্থানের মরুভূমিতে বেড়িয়ে আসতে চাইবেন। আবার অনেকের ইচ্ছা হয়তো সাদা কাশ্মীরের কমনীয় রূপ দেখতে যাবেন। কেউ যেতে চায় গোয়ার জৌলুশে ভরপুর সমুদ্রতট বা স্বাধীন বীচের স্বাদ নিতে।

কোলবা বীচ, গোয়া। ছবিঃ লেখক

তো যে যেখানেই যেতে চান না কেন, সবাই একটা জায়গায় গিয়ে দারুণভাবে নিজেদের ভ্রমণের সর্বনাশ ডেকে আনেন কলকাতা গিয়েই। মূল ভ্রমণ শুরুর আগেই ভ্রমণের আনন্দ অনেকের মাটি হতে বসে কলকাতায় পৌঁছে কেনাকাটার নেশায় পেয়ে। আর সেই নেশায় আসক্ত হয়ে ভ্রমণ বাজেটের অনেকটাই শেষ করে ফেলে, মন খারাপ হয়ে যায়। এটা আমার মনগড়া কোনো কথা নয়। নিজেদের ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতা, অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা নানা সময়ের গল্প, পরিবার নিয়ে গিয়ে কেনাকাটা নিয়ে পড়া নানা রকম বিড়ম্বনা থেকে আসছে ভ্রমণ মৌসুমে সবার জন্য এই লেখার চেষ্টা।

কলকাতায় কেনাকাটার নেশাটা কতটা, কী রকম আর পরিশেষে ভ্রমণের শুরুতেই এর পরিণাম ও ভ্রমণের মাঝে এর তিক্ততা কতটা এবং ভ্রমণ শেষে সারা জীবনের আক্ষেপে পোড়া কয়েকটি ঘটনার ছোট্ট ছোট্ট গল্প বা অভিজ্ঞতা আগে শেয়ার করি।

অভিজ্ঞতা এক: সেবার আমরা শিমলা আর মানালি যাব। যেটা ছিল আমাদের তৃতীয় ভারত ভ্রমণ, কিন্তু সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সবদিক থেকেই। আমাদের ৬ জনের টিম নানা রকম বাধা পেরিয়ে কলকাতা পৌঁছে দিল্লীগামী ট্রেনের টিকেট কেটে। ছয় জনের দল, তিনজন করে দুটি আলাদা দলে ভাগ হয়ে নিউমার্কেট ঘুরতে গিয়েছিলাম।

সবাইকে বারবার করে বলে দেয়ার পরেও একজন, উডল্যান্ডের শোরুমে এক ললনার নানা রকম আকর্ষণে আকর্ষিত হয়ে ১৫০ ডলার দিয়ে একটা উইন্টার জ্যাকেট কিনে ফেলেছিলেন! আর আমি নিজেও প্রায় ১০০ ডলার দিয়ে একটা বুট প্রায় কিনে ফেলেছিলাম! অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলাম।

উডল্যান্ডের জ্যাকেট। ছবিঃ  উডল্যান্ড শোরুম

উল্লেখ্য যে সেবার আমাদের সাকুল্যে বাজেটই ছিল ৩০০ ডলার করে জনপ্রতি। তো এর মধ্যে যদি ১৫০ ডলার জ্যাকেটের পিছনেই চলে যায় তাহলে পুরো ট্যুরের কী অবস্থা হয়েছিল সেটা অনুমান করাই যায়। শুধু এইটুকু বলি, শুধুমাত্র টাকার কারণে আমাদের হাতে সময় থাকা সত্ত্বেও মানালিতে একদিন বেশী থাকতে পারিনি আর সেদিন থেকেই স্নোফল শুরু হবে জেনেও দিল্লী ফিরে আসতে হয়েছিল!

একটু ভেবে দেখুন স্নোফলের মতো প্রার্থিত আর দুর্লভ ব্যাপার প্রায় হাতের মুঠোয় পেয়েও ফিরে আসতে হয়েছিল শুধু টাকা কম থাকার জন্য! এই আক্ষেপ সারাজীবনে যাবে না, তাতে করে যতই স্নোফল দেখি না কেন। আর সেই ব্যক্তিকে অনন্তকাল ধরে আমরা কথা শুনিয়ে যাচ্ছি, সময় আর সুযোগ পেলেই।

গল্প দুই: একবার একটা পারিবারিক ভ্রমণে কয়েকজন মিলে কাশ্মীর যাবে বলে আগে থেকেই সব ঠিকঠাক করে রেখেছে। সব টিকেট, হোটেল, গাড়ি কোনো রকম ঝামেলা না রেখে। তো কলকাতায় গিয়ে তারা প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় হাতে পেয়েছে তাদের ট্রেন ছাড়ার আগে। তো কী করবে, কী করবে? এই সময় একজন বুদ্ধি দিল, চলেন নিউমার্কেট ঘুরে আসি। বেশ, সময় কাটাতে নিউমার্কেটে গেল সবাই মিলে। আর সেখানেই গিয়েই নিজেদের পুরো ভ্রমণের সর্বনাশ করে ফেলেছিল। পুরো ভ্রমণে তাদের আনন্দের চেয়ে ঝগড়া আর একে অন্যের উপর নিউমার্কেট যাবার দোষ চাপাতেই পুরো ভ্রমণ তিক্ততায় ভরে গিয়েছিল!

মানালিতে আমাদের কটেজ, তুষার পাতের আগের দিন! ছবিঃ লেখক

কারণ কী জানেন? ওনাদের পরিবারের কেউ কেউ মনের মতো করে শাড়ি কিনে এক সুটকেস ভরে ফেলেছিলেন! একজন শ্রী লেদারসে ঢুকে ১০ জোড়া স্যান্ডেল কিনে সেইগুলো বহন করার জন্য আলাদা স্যুটকেস কিনেছিলেন! একজন পরে কেনা যাবে কি যাবে না এই ভাবনা থেকে প্রায় ৫,০০০ রুপীর চকলেট কিনেছিলেন দেশের সকলের জন্য! পাঁচ হাজার রুপীর চকলেট মানে কি জানেন তো! তিনি আরস্যুটকেস কিনে পার পাননি, তাকে আস্ত একটা বস্তা ধরনের ব্যাগ কিনতে হয়েছিল শুধু চকলেট বহন করার জন্য!

আর এইসব কেনাকাটার প্রভাব কী ছিল জানেন? কেউ আর আগের মতো আনন্দ আর স্বচ্ছন্দ নিয়ে চলা ফেরা করতে পারছে না, একটা বাহনে হচ্ছে না, ট্রেনে জায়গায় সংকুলান হওয়া খুব কষ্টের ছিল, ফেরার সময় দিতে হয়েছিল প্রায় টিকেটের সমপরিমাণ মূল্যের অতিরিক্ত ওজন চার্জ! কারণ তারা কাশ্মীর থেকেও শালে শালে নিজেদেরকে ঢেকে ফেলেছিল টাকার অভাব না থাকাতে! আর তারপর সুন্দর সম্পর্কগুলো ভ্রমণ শেষ হতে হতেই প্রায় শেষের পথে চলে এসেছিল, শুধু কলকাতার কেনাকাটার মাদক নেশাতে!

শ্রীলেদারস, কোলকাতা। ছবিঃ লেখক 

এই লেখা শেষ করবো অনেকেরই পড়া আমার পুরনো একটা লেখা দিয়ে। “ পাঞ্জাবের কমলা আমাদের ভ্রমণ বিভীষিকা!” লেখার সংক্ষেপ দিয়ে। সেবার পাঞ্জাব থেকে ২০ রুপী কেজির কমলা পেয়ে এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে কোনো কিছু না ভেবেই সবাই ১০ কেজি করে কমলা কিনে নিজেদের পুরো ভ্রমণকেএকটা বিভীষিকায় পরিণত করেছিলাম দেশে ফিরে আসতে আসতে। যেটা সারা জীবনের জন্য ভ্রমণের একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে আছে আমাদের জন্য। মূল গল্পের লিংক (https://tripzone.xyz/the-pathitic-story-of-orange/)

আর একদম শেষে কলকাতায় ফিরে যেটা ঘটে, সেটা অবর্ণনীয় আসলে। নিউমার্কেট গিয়ে আমাদের মাথাটা এতটাই খারাপ হয়ে যায়, যে স্বাভাবিক বোধ লোপ পেয়ে কেনাকাটার নেশায় পরে ফিরে আসার সময় নিজের পকেটে কোনো টাকা পয়সা থাকে না। একদম শেষে একটা অসহায় অবস্থায় পড়ে যাই আমরা সবাই। কী যে একটা অবস্থা দাঁড়ায় না দেখলে সেই করুণ মুখগুলোর মানসিক অবস্থা বোঝানো সম্ভব নয়।

শাড়ির দোকানে আক্ষেপের চাহুনি। ছবিঃ লেখক

তাই এই ভ্রমণ মৌসুমে সবার প্রতি অনুরোধ, ভ্রমণকে সুন্দর, সার্থক, আনন্দময় আর উপভোগ্য করতে ভ্রমণ শেষের আগে কোনো কেনাকাটা নয়, কলকাতাতে তো নয়ই। যদি খুব প্রয়োজন হয়ই, তাহলে ভ্রমণ শেষে, একদম খুব ভালো লাগার আর দরকারি কেনাকাটাগুলো করাই ভ্রমণ, অর্থ আর পরবর্তী ভালোমনে বাড়ি ফেরার জন্য আদর্শ।

আমার পরামর্শ মানবেন কিনা পুরোটাই আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। আমি শুধু আমার দেখা, পাওয়া, শোনা কয়েকটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সবার সাথে শেয়ার করলাম মাত্র। যা আমাদের ভ্রমণের আনন্দের পরিবর্তে দুঃখ, কষ্টে, হতাশায় আর আক্ষেপে পরিণত হয়েছিল।    

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. কলকাতাতে কেনাকাটা করতে আমরা বাংলাদেশিরা যে বেশি পাগল হই তার পেছনে অন্য একটি সুক্ষ্ম কারণও আছে। তা হলো, যদিও কলকাতাতে রূপিতে লেনদেন হয় কিন্তু বাঙলা ভাষার সুবাদে তারা রূপিকেও টাকা বলে। যেমন হয়তো একটি শাড়ি দেখে আপনি দাম জিজ্ঞেস করলেন, ওরা বলবে চারশো টাকা, সাইকোলজিক্যালি মানুষের মাথায় যেটা তাৎক্ষনিক হিট করে তা হলো, মাত্র চারশো টাকা! এত সস্তা! এই শাড়ি তো আমার দেশে হাজার টাকার নিচে পাওয়াই যাবে না। অর্থাং এখনই কিনতে হবে। কিন্তু আপনি তো আসলে পরিশোধ করছেন রূপিতে। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে টাকা থেকে ডলার, তারপরে ডলার থেকে রূপি করার সময় যে বাট্টা চলে যায়, তাছাড়া রূপি আর টাকার মূল্যমাণের পার্থক্য হিসাব করলে দামের আসল পার্থক্য বোঝা যায়।
    মহিলাদের মাঝে আরও একটি বিষয় কাজ করে কলকাতাতে বেশি কেনাকাটা করতে। তা হলো, তারা সারাদিন জি-বাংলা, স্টার জলসাতে যেসব জিনিসের লোভনিয় বিজ্ঞাপন দেখে, সেগুলো যখন চোখের সামনে দেখে তখন আর লোভ সামলাতে পারে না, তার উপর আবার কম দামে পাচ্ছে(?)!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন 'ছোট সোনা মসজিদ'

বিস্তীর্ণ মুপ্পোছড়া ও প্রশান্তির ন'কাটা ঝর্ণা